📄 যে ব্যভিচারের শাস্তি অপরিহার্য
শরিয়ত বিরোধী যে কোনো যৌন সম্ভোগ ব্যভিচার হিসেবে গণ্য এবং তার উপর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকরী হবে। কেননা যেসব অপরাধের জন্য শariয়ত শাস্তি নির্ধারণ করেছে, এটা তার অন্যতম। যে নারীর সাথে সংগম করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং যার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকার কোনোই সন্দেহ নেই, সেই নারীর যোনিতে পুরুষাংগের অগ্রভাগ বা তার যতটুকু অংশের চামড়া কাটা হয়, ততটুকু অংশ ঢুকে গেলেই শাস্তিযোগ্য ব্যভিচার সম্পন্ন হবে, চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক। যে নারীর সাথে সংগম অবৈধ, তার যোনি ব্যতীত অন্য কোথাও কামোত্তেজনা চরিতার্থ করলে ব্যভিচারের জন্য নির্ধারিত শাস্তি প্রযোজ্য হবেনা। তবে তাকে তা'যীর (অর্থাৎ অন্য কোনো শাস্তি) দিতে হবে। কেননা ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত:
এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এসে বললো: আমি মদিনার উপকণ্ঠ থেকে আগত এক মহিলার চিকিৎসা করেছিলাম। চিকিৎসার সময়ে তার সাথে অবৈধ কাজ করেছি, তবে সংগম করিনি। এখন আমি উপস্থিত। আমার উপর যা ইচ্ছা কার্যকরী করুন। উমর রা. বললেন: "আল্লাহ তোমাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। তুমিও নিজেকে লুকিয়ে রাখলেই পারতে।" রসূলুল্লাহ সা. কোনো জবাব দিলেন না। তাই লোকটি রওনা হলো। তৎক্ষণাত রসূলুল্লাহ সা. তার পিছু পিছু একজনকে পাঠিয়ে তাকে ডেকে আনলেন। অতপর তাকে এই আয়াতটি পড়ে শুনালেন:
وَأَقِمِ الصَّلوةَ طَرَفَي النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ اليْلِ ، إِنَّ الْحَسَنَتِ يُذْهِبْنَ السَّيَاسِ ، ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّرِينَ
"দিনের দুই প্রান্ত ভাগে ও রাতের প্রথমাংশে নামায কায়েম করবে। সৎ কর্ম অবশ্যই অসৎ কর্ম মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে এটা তাদের জন্য এক উপদেশ।" উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে একজন জিজ্ঞাসা করলো: হে রসূলুল্লাহ, এটা কি শুধু এই ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট, না সকলের জন্য? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: সকলের জন্য।" -মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি।
📄 ব্যভিচারীদের শ্রেণীভেদ
ব্যভিচারী দু'রকমের : বিবাহিত ও অবিবাহিত। উভয়ের জন্য পৃথক পৃথক বিধান রয়েছে:
📄 অবিবাহিতের শাস্তি
ফকিহগণ একমত হয়ে বলেছেন: স্বাধীন অবিবাহিত পুরুষ বা নারী ব্যভিচার করলে তাকে একশো বেত্রাঘাত করা হবে। কেননা আল্লাহ সূরা নূরে বলেছেন:
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِلٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ، وَلَا تَأْخُنْ كُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَيَعْمَلْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ . "ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী এদের প্রত্যেককে একশত কষাঘাত করবে, আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও, মুমিনদের একটি দল যেনো তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।"
এ আয়াতে শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তিকে অকার্যকর রাখার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা উচ্চারিত হয়েছে। কারো কারো মতে, প্রহারকে এতটা হাল্কা করতে নিষেধ করা হয়েছে, যাতে অপরাধী গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যথা অনুভব না করে। শাস্তি কার্যকর করার সময় কতজন তা প্রত্যক্ষ করবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন: তিনজন বা তার বেশি। কেউ বলেন: সাক্ষীরা ছাড়া চারজন থাকা চাই। আবু হানিফা বলেন: শাস্তি যদি সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হয়, তাহলে শাসক ও সাক্ষীরা থাকলে চলবে।
📄 বেত্রাঘাত ও নির্বাসনের একত্রিকরণ
ফকিহগণ যদিও বেত্রাঘাতের অপরিহার্যতা সম্পর্কে একমত হয়েছেন, কিন্তু তারা এর সাথে নির্বাসন দণ্ডের সংযোজন বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন: ১. শাফেয়ি ও আহমদ বলেছেন: একশকোটি বেত্রাঘাতের সাথে এক বছরের নির্বাসনও দিতে হবে। কেননা বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত:
"জনৈক বেদুইন রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট এলো এবং বললো: হে রসূলুল্লাহ, আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, আমার ব্যাপারে আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফায়সালা করে দিন। তার অপর প্রতিপক্ষ তার চেয়ে অধিক অভিজ্ঞ ছিলো। সে বললো: জ্বি হা, আমারও একই কথা। আমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করে দিন এবং আমাকে ঘটনার বিবরণ বলার অনুমতি দিন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: বলো। সে বললো: আমার ছেলে এই ব্যক্তির বাড়িতে মজুর খাটতো। সে তার স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করেছে। আমি শুনেছি, আমার ছেলের 'রজম' এর শাস্তি প্রাপ্য। তাকে সে শাস্তি থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য আমি একশো ছাগল ও একজন ক্রীতদাসী মুক্তিপণ হিসেবে এনেছি। পরে জ্ঞানীজনদেরকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, আমার ছেলের প্রাপ্য শাস্তি রজম নয়, একশো বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন। আর এই ব্যক্তির স্ত্রীর প্রাপ্য রজম। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: আমি অবশ্যই তোমাদের দু'জনের ব্যাপারে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ফায়সালা করবো। ছাগলের পাল ও ক্রীতদাসী তুমি ফেরত পাবে। আর তোমার ছেলে পাবে একশো বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন। আর বনু আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বললেন: "হে উজাইস, তুমি এই ব্যক্তির স্ত্রীর নিকট যাও, সে যদি ব্যভিচারের কথা স্বীকার করে, তবে তাকে রজম করো। লোকটি তার স্ত্রীর কাছে গেলো এবং সে স্বীকারোক্তি করলো। অতঃপর রসূলুল্লাহ সা. তাকে রজম করার আদেশ দিলেন এবং রজম করা হলো।"
বুখারি আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন: "রসূলুল্লাহ সা. অবিবাহিত ব্যভিচারীকে এক বছরের জন্য নির্বাসন ও তার উপর 'হদ' (বেত্রাঘাত) কার্যকর করার আদেশ দিয়েছেন।"
খুলাফায়ে রাশেদীনের সকলেই নির্বাসন দণ্ড কার্যকর করেছেন। কেউ এর বিরোধিতা করেনি। আবু বকর সিদ্দীক রা. ফিদিক অঞ্চলে, উমার ফারুক রা. সিরিয়ায়, উসমান রা. মিশরে ও আলী রা. বসরায় নির্বাসিত করতেন। বেত্রদণ্ড ও নির্বাসন দণ্ড এ দুটির কোন্টি আগে ও কোন্টি পরে কার্যকর করা হবে, সে ব্যাপারে শাফেয়িরা কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম মানা জরুরি মনে করেন না। যে কোনোটা আগে বা পরে করা যায়। তবে নির্বাসনের ক্ষেত্রে শর্ত আরোপিত হয়েছে যে, নামায কসর করা যায় এতটা দূরত্বে করা চাই। কেননা এর উদ্দেশ্য হলো, তার নিজ আবাসিক এলাকা ও আপনজনদের থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়া। নামাযের কসর হয়না এমন দূরত্বকে নিজের আবাসিক এলাকা গণ্য করা হয়। শাসক যদি তাকে আরো বেশি দূরত্বে নির্বাসন করা ভালো মনে করেন, তবে করতে পারেন। মহিলাকে নির্বাসিত করতে হলে স্বামী কিংবা মুহাররম ব্যক্তিকে তার সাথে পাঠাতে হবে। যদি সে মজুরি ব্যতীত যেতে না চায়, তবে মজুরি দেয়া বাধ্যতামূলক হবে এবং তা মহিলার সম্পদ থেকে আদায় করে দেয়া হবে।
২. ইমাম মালেক ও আওযায়ি বলেছেন: অবিবাহিত স্বাধীন পুরুষ ব্যভিচারীকে নির্বাসন দেয়া ওয়াজিব, অবিবাহিত স্বাধীন নারী ব্যভিচারিণীকে নয়। নারীকে নির্বাসিত করা হবেনা। কেননা নারী পর্দার বিধানের অধীন। (অজানা বিদেশ ভূমিতে পর্দা মেনে চলার সম্ভাবনা অনিশ্চিত।)
৩. আবু হানিফা র. বলেছেন: নারীর ক্ষেত্রে বেত্রদণ্ডের সাথে নির্বাসন দণ্ড যুক্ত করা হবেনা। অবশ্য শাসক এটাকে ভালো মনে করলে যত দূরত্বে পাঠানো ভালো মনে করেন পাঠাতে পারেন।