📄 ব্যভিচার নিষিদ্ধকরণে পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা
বহু ফকিহ মনে করেন, ব্যভিচারের শাস্তি নির্ধারণে পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে যেমন করা হয়েছে রোযা ফরযকরণে ও মদ নিষিদ্ধকরণে। শুরুতে ব্যভিচারের শাস্তি ছিলো শুধুমাত্র তিরস্কার ও ভর্ৎসনা। আল্লাহ বলেন:
وَالَّذِينَ يَأْتِينِهَا مِنْكُمْ فَخُذُوهُمَا ، فَإِنْ تَابَا وَأَصْلَحَا فَأَعْرِضُوا عَنْهُمَا ،
অর্থ: তোমাদের মধ্য হতে যে দু'জন এ কাজে লিপ্ত হবে (অর্থাৎ ব্যভিচারে) তাদেরকে তোমরা শাসন করবে। এতে যদি তারা উভয়ে তওবা করে ও নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয়, তবে তাদেরকে রেহাই দেবে।" (সূরা নিসা: আয়াত ১৬)
এরপর বিধিটি এখান থেকে বাড়ির ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখায় উন্নীত হয়। আল্লাহ বলেন:
وَالَّتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِنْ نِسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةٌ مِنْكُمْ فَإِنْ شَهِدُوا فَامْسَكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَفََّهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلَ اللَّهُ لَهُنَّ سَبِيلاه
অর্থ: তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য হতে চারজন সাক্ষী তলব করবে। যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তবে তাদেরকে গৃহে অবরুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তাদের মৃত্যু হয়, অথবা আল্লাহ তাদের জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা করেন।" (সূরা নিসা : আয়াত ১৫)
এরপর পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলো এবং আল্লাহ অন্য ব্যবস্থা করলেন। এ পর্যায়ে অবিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তি একশো বেত্রাঘাত ও বিবাহিতের শাস্তি মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত রজম (প্রস্তর নিক্ষেপ) নির্ধারণ করলেন। এই পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিলো মানব সমাজ উন্নয়ন ও বিকাশের সুযোগ পাক এবং তাকে নম্রতা ও সহযোগিতার মধ্যদিয়ে সততা ও পবিত্রতার দিকে নিয়ে যাওয়া হোক, যেনো এই পরিবর্তনটা মানুষের জন্য দুরূহ না হয় এবং ইসলামের ব্যাপারে তারা কোনো কঠোরতার সম্মুখীন না হয়। এ বিষয়ে উবাদা ইবনুল সামেত বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণ দর্শানো হয়েছে:
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমরা আমার কাছ থেকে নিয়ে নাও। আল্লাহ তাদের জন্য অন্য ব্যবস্থা করেছেন। অবিবাহিত নারীর সাথে অবিবাহিত পুরুষ ব্যভিচার করলে তার শাস্তি একশো বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য দেশ থেকে বহিষ্কার। আর বিবাহিতের সাথে বিবাহিতের ব্যভিচারের শাস্তি একশো বেত্রাঘাত ও রজম।-মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি।
দৃশ্যত: আমাদের নিকট প্রতীয়মান হচ্ছে, এ আয়াত দুটো (সূরা নিসা, ১৫ ও ১৬) নারী সমকাম ও পুরুষ সমকামের বিধান বর্ণনা করেছে। এই দুটির বিধান সূরা নূরে বর্ণিত ব্যভিচারের বিধান থেকে পৃথক।
১. প্রথম আয়াতের মর্ম হলো: যে সমস্ত নারী অশ্লীল কাজে লিপ্ত হবে, অর্থাৎ নারীর সাথে নারী সমকামে লিপ্ত হবে, তাদের ব্যাপারে চারজন পুরুষের সাক্ষ্য তলব করো। চারজন পুরুষ সাক্ষ্য দিলে তাদেরকে গৃহে এমনভাবে অন্তরীণ করো যেন সমকামী নারীদ্বয়ের একজন অপর জন থেকে দূরে থাকে, যতক্ষণ না সে মারা যায় অথবা তওবার মাধ্যমে বা বিয়ের মাধ্যমে সমকাম থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে অন্তরীণাবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার বিকল্প পথ আল্লাহ তৈরি করে দেন।
২. দ্বিতীয় আয়াতের মর্ম হলো, যে দু'জন পুরুষ অশ্লীল কাজ করবে, অর্থাৎ সমকাম করবে, তাদের এই অপকর্ম সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হওয়ার পর তাদেরকে শাস্তি দাও। শরয়ি হদ কার্যকরী করার মাধ্যমে তাদের উভয়কে শাস্তি দেয়ার আগেই যদি তারা তওবা করে ও নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয়, তাহলে তাদের ওপর শাস্তি কার্যকর করা থেকে বিরত হও ও তাদেরকে রেহাই দাও।
📄 যে ব্যভিচারের শাস্তি অপরিহার্য
শরিয়ত বিরোধী যে কোনো যৌন সম্ভোগ ব্যভিচার হিসেবে গণ্য এবং তার উপর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকরী হবে। কেননা যেসব অপরাধের জন্য শariয়ত শাস্তি নির্ধারণ করেছে, এটা তার অন্যতম। যে নারীর সাথে সংগম করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং যার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকার কোনোই সন্দেহ নেই, সেই নারীর যোনিতে পুরুষাংগের অগ্রভাগ বা তার যতটুকু অংশের চামড়া কাটা হয়, ততটুকু অংশ ঢুকে গেলেই শাস্তিযোগ্য ব্যভিচার সম্পন্ন হবে, চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক। যে নারীর সাথে সংগম অবৈধ, তার যোনি ব্যতীত অন্য কোথাও কামোত্তেজনা চরিতার্থ করলে ব্যভিচারের জন্য নির্ধারিত শাস্তি প্রযোজ্য হবেনা। তবে তাকে তা'যীর (অর্থাৎ অন্য কোনো শাস্তি) দিতে হবে। কেননা ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত:
এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এসে বললো: আমি মদিনার উপকণ্ঠ থেকে আগত এক মহিলার চিকিৎসা করেছিলাম। চিকিৎসার সময়ে তার সাথে অবৈধ কাজ করেছি, তবে সংগম করিনি। এখন আমি উপস্থিত। আমার উপর যা ইচ্ছা কার্যকরী করুন। উমর রা. বললেন: "আল্লাহ তোমাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। তুমিও নিজেকে লুকিয়ে রাখলেই পারতে।" রসূলুল্লাহ সা. কোনো জবাব দিলেন না। তাই লোকটি রওনা হলো। তৎক্ষণাত রসূলুল্লাহ সা. তার পিছু পিছু একজনকে পাঠিয়ে তাকে ডেকে আনলেন। অতপর তাকে এই আয়াতটি পড়ে শুনালেন:
وَأَقِمِ الصَّلوةَ طَرَفَي النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ اليْلِ ، إِنَّ الْحَسَنَتِ يُذْهِبْنَ السَّيَاسِ ، ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّرِينَ
"দিনের দুই প্রান্ত ভাগে ও রাতের প্রথমাংশে নামায কায়েম করবে। সৎ কর্ম অবশ্যই অসৎ কর্ম মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে এটা তাদের জন্য এক উপদেশ।" উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে একজন জিজ্ঞাসা করলো: হে রসূলুল্লাহ, এটা কি শুধু এই ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট, না সকলের জন্য? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: সকলের জন্য।" -মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি।
📄 ব্যভিচারীদের শ্রেণীভেদ
ব্যভিচারী দু'রকমের : বিবাহিত ও অবিবাহিত। উভয়ের জন্য পৃথক পৃথক বিধান রয়েছে:
📄 অবিবাহিতের শাস্তি
ফকিহগণ একমত হয়ে বলেছেন: স্বাধীন অবিবাহিত পুরুষ বা নারী ব্যভিচার করলে তাকে একশো বেত্রাঘাত করা হবে। কেননা আল্লাহ সূরা নূরে বলেছেন:
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِلٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ، وَلَا تَأْخُنْ كُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَيَعْمَلْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ . "ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী এদের প্রত্যেককে একশত কষাঘাত করবে, আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও, মুমিনদের একটি দল যেনো তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।"
এ আয়াতে শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তিকে অকার্যকর রাখার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা উচ্চারিত হয়েছে। কারো কারো মতে, প্রহারকে এতটা হাল্কা করতে নিষেধ করা হয়েছে, যাতে অপরাধী গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যথা অনুভব না করে। শাস্তি কার্যকর করার সময় কতজন তা প্রত্যক্ষ করবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন: তিনজন বা তার বেশি। কেউ বলেন: সাক্ষীরা ছাড়া চারজন থাকা চাই। আবু হানিফা বলেন: শাস্তি যদি সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হয়, তাহলে শাসক ও সাক্ষীরা থাকলে চলবে।