📄 হদ কার্যকরকরণে স্বাধীন ও মুসলমান হওয়া শর্ত নয়
হদ কার্যকরকরণে অপরাধীর মুসলমান হওয়া ও স্বাধীন হওয়া শর্ত নয়। একজন গোলামও যদি মতো পান করে তবে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। কেননা সেও আল্লাহর আদেশ নিষেধের অধীন। তবে কয়েকটি কাজ এমন রয়েছে, যা তার মনিবের হুকুম পালনে ব্যস্ত থাকার কারণে করা তার পক্ষে কষ্টকর, যেমন জুমার নামায ও জামাতে নামায পড়া। মদ বর্জন করতে স্বয়ং আল্লাহই নিষেধ করেছেন। এ নিষেধাজ্ঞা স্বাধীন ও গোলাম উভয়ের উপর জারি করা হয়েছে এবং মদ বর্জন করা কোনো কঠিন কাজ নয়। আর মদের যে ক্ষতি, তা স্বাধীন ও গোলাম উভয়েরই হয়। কেবলমাত্র শাস্তি ছাড়া আর কিছুতে তাদের মধ্যে পার্থক্য নেই। কেননা গোলামের শাস্তি হবে অর্ধেক অর্থাৎ বিশ ঘা অথবা চল্লিশ ঘা বেত্রাঘাত। মদ পানের শাস্তি নির্ধারণে যে মতভেদ হয়েছে, তদনুসারেই এই দুই ধরনের শাস্তি।
হদ কার্যকরকরণে স্বাধীন হওয়া যেমন শর্ত নয়, তেমনি মুসলমান হওয়াও শর্ত নয়। কিতাবী ইহুদী ও খৃস্টানরা যদি মুসলিম দেশের নাগরিকত্ব লাভ করে এবং তাদের সাথে একত্রে বসবাস করে, যেমন মিশরে কিতাবীরা বাস করে। অনুরূপ, যে সকল কিতাবী মুসলমানদের দেশে বিশেষ নিরাপত্তা চুক্তির অধীন সাময়িকভাবে বসবাস করে, যেমন বিদেশীরা করে থাকে। তারা মুসলিম দেশে মদ পান করলে তাদের হদ কার্যকর হবে। কেননা তারা মুসলমানদের সমান অধিকার ভোগ করে এবং সমান দায়দায়িত্বও বহন করে। তাছাড়া মদ যেহেতু তাদের ধর্মেও হারাম, যেমন ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি।
আর ব্যক্তিগত জীবনে ও সামাজিক জীবনে মদের কুফল অত্যন্ত ব্যাপক এবং ইসলাম সমাজকে পবিত্র, ভারসাম্যপূর্ণ ও সুসংহত রাখতে বদ্ধপরিকর, যাতে মুসলমান বা অমুসলমান, কোনো নাগরিকই তাকে দুর্বল ও নোংরা করতে না পারে। এটা অধিকাংশ ফকিহর অভিমত এবং এ অভিমত কোনো মতেই পরিবর্তনযোগ্য নয়।
কিন্তু হানাফিরা মনে করেন, ইসলাম মদকে হারাম করার কারণে তা যদিও মুসলমানদের নিকট সম্পদ নয়, কিন্তু কিতাবীদের নিকট মদ একটা সম্পদ। কোনো মুসলমান কোনো কিতাবীর মদ ঢেলে ফেললে সে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে মূল্য দিতে বাধ্য কেননা তার মদ পান বৈধ। তাদের ধর্ম ও রীতিনীতি বর্জন করতে আমাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছে। তাই মদপানকারী কোনো কিতাবীকে শাস্তি দেয়া যাবেনা। যদিও তাদের ধর্মগ্রন্থে মদ হারাম করা হয়েছে। তথাপি আমরা তাদেরকে স্বাধীনতা দেবো। কেননা তারা তাদের ধর্মের এই নিষেধাজ্ঞা মানেনা। তাদের সাথে আমাদের আচরণ হবে তাদের ধারণা বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রকৃত সত্য যা রয়েছে, তদনুযায়ী নয়।
📄 মদ দ্বারা চিকিৎসা
ইসলামের পূর্বে জাহেলিয়াত যুগে লোকেরা চিকিৎসার জন্য মদ পান করতো। ইসলাম এসে তাদেরকে মদ দ্বারা চিকিৎসা করাতে নিষেধ করলো এবং মদকে হারাম করে দিলো।
আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযি বর্ণনা করেছেন, তারেক বিন সুয়াইদ জা'ফি রসূলুল্লাহ সা. কে মদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। রসূলুল্লাহ সা. জবাবে তাকে মদ পান করতে নিষেধ করলেন। জাফি বললেন: আমরা তো এটা ওষুধ হিসেবে বানাই। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: “এটা ওষুধ নয়, বরং রোগ।"
আবুদ দারদা রা. থেকে আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা রোগ ও ওষুধ, দু'টোই সৃষ্টি করেছেন। কাজেই ওষুধ দিয়ে রোগের চিকিৎসা করো, হারাম জিনিস দ্বারা রোগের চিকিৎসা করোনা।” ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যও লোকেরা ইসলাম পূর্বকালে কখনো কখনো মদ পান করতো। ইসলাম তাও নিষিদ্ধ করেছে। আবু দাউদ বর্ণনা করেন যে, দাইলাম হিময়ারি রসূলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞাসা করলেন : “হে রসূলুল্লাহ: আমরা একটা শীত প্রধান অঞ্চলে বাস করি। আমরা সেখানে অত্যন্ত কষ্টকরভাবে জীবন ধারণ করি। আমরা গম দিয়ে এমন এক পানীয় তৈরি করি, যা দ্বারা আমরা আমাদের কাজের শক্তি অর্জন করি এবং আমাদের দেশের শীতের মোকাবিলা করি। এতে কি কোনো অসুবিধা আছে? রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: এই পানীয়ে কি নেশা হয়?
হিময়ারি বললেন: হাঁ। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে এটা পরিত্যাগ করো। হিময়ারি বললেন: লোকেরা তো এটা ছাড়তে চাইছেনা। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: লোকেরা যদি ছাড়তে না চায় তবে তাদের সাথে যুদ্ধ করো।
কোনো কোনো আলেম মদ দ্বারা রোগের চিকিৎসার অনুমতি দিয়েছেন। তবে এই শর্তে অনুমতি দিয়েছেন যে, কোনো হালাল জিনিস থেকে তৈরি বিকল্প ওষুধ যদি পাওয়া না যায়। যার চিকিৎসা করা হচ্ছে, আনন্দ উপভোগ ও নেশা করা যেন তার উদ্দেশ্য না হয় এবং চিকিৎসক যে পরিমাণ নির্ধারণ করে তার চেয়ে বেশি যেন সেবন করা না হয়। যে পরিস্থিতিতে অনন্যোপায় হয়ে মদ পান করার অনুমতি রয়েছে, ঠিক সে রকম পরিস্থিতিতে মদ দ্বারা চিকিৎসা করার অনুমতি রয়েছে। ফকিহগণ এর উদাহরণ দিয়েছেন এভাবে: যেমন কোনো ব্যক্তির গলায় খাবারের গ্রাস আটকে গেলো এবং গ্রাসটি গলার নিচে সরিয়ে দিতে মদ ব্যতীত আর কিছু পাচ্ছে না অথবা প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কেউ মরতে বসেছে এবং এক গ্লাস বা এক চুমুক মদ পান করা ব্যতীত মৃত্যু ঠেকানোর আর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেনা, অথবা কেউ হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে পড়েছে, এমতাবস্থায় জানতে পারলো বা চিকিৎসক তাকে জানালো যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ মদ পান করা ব্যতীত এই আশংকা দূর করার আর কোনো উপায় নেই।