📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 হদ কার্যকরীকরণের শর্তাবলী

📄 হদ কার্যকরীকরণের শর্তাবলী


মদ পানের শরয়ি শাস্তি (হদ) কার্যকরী করার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলী পূরণ জরুরি:
১. সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া। কেননা শরিয়তের বিধান পালনের দায়িত্ব এটা ছাড়া অর্পিতই হয়না। তাই পাগল মদ পান করলে তার উপর হদ কার্যকরী হবেনা। বুদ্ধি প্রতিবন্ধীও এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। কোনো বালক বা শিশু মদ পান করলে তার উপর হদ কার্যকরী হবেনা। কেননা শরিয়তের বিধান পালনের দায়িত্ব তার উপর অর্পিত হয়নি।
৪. স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হওয়াঃ কেউ যদি বলপ্রয়োগে কাউকে মদ পান করায়, তবে পানকারীর উপর হদ কার্যকরী হবেনা, চাই এই বলপ্রয়োগ হত্যার হুমকির মাধ্যমে হোক, ভীষণ কষ্টদায়ক প্রহারের হুমকির মাধ্যমে হোক অথবা সমস্ত সহায় সম্পদ ধ্বংসের হুমকির মাধ্যমে হোক। কারণ বলপ্রয়োগ দ্বারা মানুষ নিজের কৃত গুনাহর দায় থেকে মুক্ত হয়।
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আমার উম্মতের উপর থেকে অনিচ্ছাকৃত কাজ বা ভুলক্রমে পরিত্যক্ত কাজের গুনাহ অপসারিত হয়েছে।" আর গুনাহ বা দায় যখন অপসারিত তখন তার উপর তো হদ কার্যকরী হতেই পারেনা। কারণ গুনাহই হদের কারণ। অনন্যোপায় হয়ে মদ পান বলপ্রয়োগে মদ পানের আওতাভুক্ত। কাজেই যে ব্যক্তি তীব্র পিপাসায় জর্জরিত এবং পানি না পেয়ে মৃত্যুর আংশকার সম্মুখীন, সে যদি মদ পায়, তবে তা পান করা তার জন্য বৈধ। অনুরূপ, ক্ষুধার আতিশ্যে যার মৃত্যুর আশংকা প্রবল, সেও মদ পেলে তা পান করতে পারে। কেননা তখন মদ পানের উপর তার জীবন নির্ভরশীল। বস্তুতঃ অনিবার্য প্রয়োজন নিষিদ্ধ জিনিসকেও বৈধ করে দেয়। আল্লাহ বলেন: فَمَنِ اضْطُرَّ غَيْرَ بَاغِ وَلَا عَادٍ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ ، إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ "কিন্তু যে অনন্যোপায় অথচ নাফরমান কিংবা সীমালঙ্ঘনকারী নয়, তার কোনো পাপ নেই। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।" আল মুগনিতে বলা হয়েছে: রোম সম্রাট আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফাকে আটক করে এমন একটা কক্ষে আবদ্ধ করে রাখে যেখানে মদ মিশ্রিত পানি ও শুকরের ভুনা গোশত ছাড়া আর কোনো খাদ্য পানীয় ছিলোনা, যাতে তিনি মদ ও শুকরের গোশত খেতে বাধ্য হন। তাকে এভাবে তিন দিন রাখা হয়। তথাপি তিনি সেই খাদ্য ও পানীয় স্পর্শ করেননি। অতপর তিনি মারা যেতে পারেন এই আশংকায় তাকে মুক্তি দেয়া হয়। মুক্ত হওয়ার পরে তিনি বললেন: "আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমার জন্য এই খাদ্য পানীয় হালাল করেছিলেন। কেননা আমার আর কোনো উপায় ছিলোনা। কিন্তু ইসলামের বিধান লঙ্ঘিত হতে দেখে তোমরা খুশি হবে, সেটা আমি হতে দিতে চাইনি।"
৪. পানকারীর জানা থাকা চাই যে, সে যা পান করতে চাইছে, তা মাতালকারী ও নেশাকর। যা পান করছে, তা মদ এ কথা না জেনেই পান করলে অজ্ঞতার জন্য তাকে অব্যাহতি দেয়া হবে এবং তার উপর হদ কার্যকরী করা হবেনা। কিন্তু যদি কেউ তাকে জানিয়ে দেয়া সত্ত্বেও সে পান করে বা করা অব্যাহত রাখে, তাহলে তাকে অব্যাহতি দেয়া হবেনা। কেননা তার অজ্ঞতা দূর হয়েছে এবং জেনে শুনেও সে আল্লাহর নাফরমানী করতে জিদ ধরেছে। কাজেই সে শাস্তির যোগ্য হয়েছে এবং তার উপর হদ কার্যকরী করা হবে। আর যদি এমন কোনো পানীয় পান করে, যার মদ হওয়া ফকিহদের মধ্যে বিতর্কিত। তবে তার উপর হদ কার্যকরী হবেনা। কেননা বিতর্ক ও মতভেদ সন্দেহের সৃষ্টি করে। আর সন্দেহ সর্বদাই হদ রহিত করে। অনুরূপ, যে ব্যক্তি আঙ্গুরের কাঁচা রস ঘন, জমাট ও ফেনাযুক্ত হওয়ার পর পান করে, অথচ সে কাফের দেশে থাকার কারণে কিংবা অল্পদিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করার কারণে জানেনা যে, এ ধরনের রস পান হারাম হওয়ার ব্যাপারে সকল ফকিহ একমত, তার উপরও হদ কার্যকরী হবেনা। কেননা তার অজ্ঞতা হদ রহিতকারী ওযর হিসেবে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মুসলমানদের দেশে বাস করে এবং অল্পদিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণকারীও নয়। তার উপর হদ কার্যকর করা হবে এবং অজ্ঞতার জন্য তাকে ছাড় দেয়া হবেনা। কেননা এ জিনিসটি ইসলামের অত্যাবশ্যকীয় জ্ঞানের আওতাভুক্ত।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 হদ কার্যকরকরণে স্বাধীন ও মুসলমান হওয়া শর্ত নয়

📄 হদ কার্যকরকরণে স্বাধীন ও মুসলমান হওয়া শর্ত নয়


হদ কার্যকরকরণে অপরাধীর মুসলমান হওয়া ও স্বাধীন হওয়া শর্ত নয়। একজন গোলামও যদি মতো পান করে তবে তাকে শাস্তি দেয়া হবে। কেননা সেও আল্লাহর আদেশ নিষেধের অধীন। তবে কয়েকটি কাজ এমন রয়েছে, যা তার মনিবের হুকুম পালনে ব্যস্ত থাকার কারণে করা তার পক্ষে কষ্টকর, যেমন জুমার নামায ও জামাতে নামায পড়া। মদ বর্জন করতে স্বয়ং আল্লাহই নিষেধ করেছেন। এ নিষেধাজ্ঞা স্বাধীন ও গোলাম উভয়ের উপর জারি করা হয়েছে এবং মদ বর্জন করা কোনো কঠিন কাজ নয়। আর মদের যে ক্ষতি, তা স্বাধীন ও গোলাম উভয়েরই হয়। কেবলমাত্র শাস্তি ছাড়া আর কিছুতে তাদের মধ্যে পার্থক্য নেই। কেননা গোলামের শাস্তি হবে অর্ধেক অর্থাৎ বিশ ঘা অথবা চল্লিশ ঘা বেত্রাঘাত। মদ পানের শাস্তি নির্ধারণে যে মতভেদ হয়েছে, তদনুসারেই এই দুই ধরনের শাস্তি।
হদ কার্যকরকরণে স্বাধীন হওয়া যেমন শর্ত নয়, তেমনি মুসলমান হওয়াও শর্ত নয়। কিতাবী ইহুদী ও খৃস্টানরা যদি মুসলিম দেশের নাগরিকত্ব লাভ করে এবং তাদের সাথে একত্রে বসবাস করে, যেমন মিশরে কিতাবীরা বাস করে। অনুরূপ, যে সকল কিতাবী মুসলমানদের দেশে বিশেষ নিরাপত্তা চুক্তির অধীন সাময়িকভাবে বসবাস করে, যেমন বিদেশীরা করে থাকে। তারা মুসলিম দেশে মদ পান করলে তাদের হদ কার্যকর হবে। কেননা তারা মুসলমানদের সমান অধিকার ভোগ করে এবং সমান দায়দায়িত্বও বহন করে। তাছাড়া মদ যেহেতু তাদের ধর্মেও হারাম, যেমন ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি।
আর ব্যক্তিগত জীবনে ও সামাজিক জীবনে মদের কুফল অত্যন্ত ব্যাপক এবং ইসলাম সমাজকে পবিত্র, ভারসাম্যপূর্ণ ও সুসংহত রাখতে বদ্ধপরিকর, যাতে মুসলমান বা অমুসলমান, কোনো নাগরিকই তাকে দুর্বল ও নোংরা করতে না পারে। এটা অধিকাংশ ফকিহর অভিমত এবং এ অভিমত কোনো মতেই পরিবর্তনযোগ্য নয়।
কিন্তু হানাফিরা মনে করেন, ইসলাম মদকে হারাম করার কারণে তা যদিও মুসলমানদের নিকট সম্পদ নয়, কিন্তু কিতাবীদের নিকট মদ একটা সম্পদ। কোনো মুসলমান কোনো কিতাবীর মদ ঢেলে ফেললে সে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে মূল্য দিতে বাধ্য কেননা তার মদ পান বৈধ। তাদের ধর্ম ও রীতিনীতি বর্জন করতে আমাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছে। তাই মদপানকারী কোনো কিতাবীকে শাস্তি দেয়া যাবেনা। যদিও তাদের ধর্মগ্রন্থে মদ হারাম করা হয়েছে। তথাপি আমরা তাদেরকে স্বাধীনতা দেবো। কেননা তারা তাদের ধর্মের এই নিষেধাজ্ঞা মানেনা। তাদের সাথে আমাদের আচরণ হবে তাদের ধারণা বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রকৃত সত্য যা রয়েছে, তদনুযায়ী নয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 মদ দ্বারা চিকিৎসা

📄 মদ দ্বারা চিকিৎসা


ইসলামের পূর্বে জাহেলিয়াত যুগে লোকেরা চিকিৎসার জন্য মদ পান করতো। ইসলাম এসে তাদেরকে মদ দ্বারা চিকিৎসা করাতে নিষেধ করলো এবং মদকে হারাম করে দিলো।
আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযি বর্ণনা করেছেন, তারেক বিন সুয়াইদ জা'ফি রসূলুল্লাহ সা. কে মদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। রসূলুল্লাহ সা. জবাবে তাকে মদ পান করতে নিষেধ করলেন। জাফি বললেন: আমরা তো এটা ওষুধ হিসেবে বানাই। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: “এটা ওষুধ নয়, বরং রোগ।"
আবুদ দারদা রা. থেকে আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা রোগ ও ওষুধ, দু'টোই সৃষ্টি করেছেন। কাজেই ওষুধ দিয়ে রোগের চিকিৎসা করো, হারাম জিনিস দ্বারা রোগের চিকিৎসা করোনা।” ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যও লোকেরা ইসলাম পূর্বকালে কখনো কখনো মদ পান করতো। ইসলাম তাও নিষিদ্ধ করেছে। আবু দাউদ বর্ণনা করেন যে, দাইলাম হিময়ারি রসূলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞাসা করলেন : “হে রসূলুল্লাহ: আমরা একটা শীত প্রধান অঞ্চলে বাস করি। আমরা সেখানে অত্যন্ত কষ্টকরভাবে জীবন ধারণ করি। আমরা গম দিয়ে এমন এক পানীয় তৈরি করি, যা দ্বারা আমরা আমাদের কাজের শক্তি অর্জন করি এবং আমাদের দেশের শীতের মোকাবিলা করি। এতে কি কোনো অসুবিধা আছে? রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: এই পানীয়ে কি নেশা হয়?
হিময়ারি বললেন: হাঁ। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে এটা পরিত্যাগ করো। হিময়ারি বললেন: লোকেরা তো এটা ছাড়তে চাইছেনা। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: লোকেরা যদি ছাড়তে না চায় তবে তাদের সাথে যুদ্ধ করো।
কোনো কোনো আলেম মদ দ্বারা রোগের চিকিৎসার অনুমতি দিয়েছেন। তবে এই শর্তে অনুমতি দিয়েছেন যে, কোনো হালাল জিনিস থেকে তৈরি বিকল্প ওষুধ যদি পাওয়া না যায়। যার চিকিৎসা করা হচ্ছে, আনন্দ উপভোগ ও নেশা করা যেন তার উদ্দেশ্য না হয় এবং চিকিৎসক যে পরিমাণ নির্ধারণ করে তার চেয়ে বেশি যেন সেবন করা না হয়। যে পরিস্থিতিতে অনন্যোপায় হয়ে মদ পান করার অনুমতি রয়েছে, ঠিক সে রকম পরিস্থিতিতে মদ দ্বারা চিকিৎসা করার অনুমতি রয়েছে। ফকিহগণ এর উদাহরণ দিয়েছেন এভাবে: যেমন কোনো ব্যক্তির গলায় খাবারের গ্রাস আটকে গেলো এবং গ্রাসটি গলার নিচে সরিয়ে দিতে মদ ব্যতীত আর কিছু পাচ্ছে না অথবা প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কেউ মরতে বসেছে এবং এক গ্লাস বা এক চুমুক মদ পান করা ব্যতীত মৃত্যু ঠেকানোর আর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেনা, অথবা কেউ হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে পড়েছে, এমতাবস্থায় জানতে পারলো বা চিকিৎসক তাকে জানালো যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ মদ পান করা ব্যতীত এই আশংকা দূর করার আর কোনো উপায় নেই।

ফন্ট সাইজ
15px
17px