📄 মদ্যপানের শাস্তি
ফকিহগণ একমত যে, মদখোরকে শাস্তি দেয়া ওয়াজিব এবং তার শাস্তি বেত্রাঘাত। কিন্তু কয়টি বেত্রাঘাত, সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হানাফি ও মালেকিদের মতে আশিটি, শাফেয়িদের মতে চল্লিশটি এবং ইমাম আহমদের এক মতে আশিটি ও অপর মতে চল্লিশটি। ইমাম মালেক, সাওরি, আবু হানিফা ও তার শিষ্যগণ আশিটির পক্ষে। এই মতের উপর সাহাবীদেরও ইজমা বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্ণিত আছে যে, উমর রা. মদ পানের শাস্তি সম্পর্কে জনগণের সাথে (অর্থাৎ সাহাবীদের সাথে) পরামর্শ করলেন। আবদুর রহমান বিন আওফ বললেন: সবচেয়ে হালকা শাস্তিটা এর জন্য নির্ধারণ করুন। সেটি হচ্ছে আশিটি বেত্রাঘাত। তখন উমর রা. আশি বেত্রাঘাত চালু করলেন এবং সিরিয়ায় খালেদ ও আবু উবায়দাকেও এটাই লিখে পাঠালেন।
পরামর্শের সময় আলী রা. বললেন: মানুষ যখন মাতাল হয়, তখন প্রলাপ বকে। আর যখন প্রলাপ বকে, তখন মিথ্যা বলে। কাজেই তাকে মিথ্যাবাদীর (অর্থাৎ ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ আরোপকারীর) শাস্তি দাও, যা সর্বনিম্ন। অর্থাৎ আশিটি বেত্রাঘাত। আর দ্বিতীয় মতটি অর্থাৎ চল্লিশটি বেত্রাঘাত হাম্বলি মাযহাবের একাংশের ও শাফেয়ি মাযহাবের অভিমত। কেননা আলী রা. ওলিদ বিন উকবাকে চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেছিলেন। তারপর বলেছিলেন: রসূলুল্লাহ চল্লিশটি, আবু বকর চল্লিশটি এবং উমর রা. আশিটি বেত্রাঘাত করেছেন। এর সবই সুন্নত। তবে আমি চল্লিশটিকে অধিক পসন্দ করি। -মুসলিম।
আনাস রা.-বলেছেন: এক ব্যক্তি মদ পান করলে তাকে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট আনা হলো। তিনি তাকে চল্লিশটির মতো জুতা পিটুনি দিলেন। পরে আবার মদ দান করলে তাকে আবু বকরের নিকট আনা হলো। তিনিও রসূলুল্লাহর মতো আচরণ করলেন। তারপর উমরের নিকট আনা হলে তিনি জনগণের পরামর্শ চাইলেন। এ সময় আবদুর রহমান ইবনে আওফ বললেন: হুদুদের ন্যূনতম পরিমাণ হলো আশিটি বেত্রাঘাত, যা সর্বনিম্ন (বুখারি ও মুসলিম)। অতপর উমর রা. মদখোরটিকে বেত্রাঘাত করলেন। রসূলুল্লাহ সা.-এর কাজ শরিয়তের অকাট্য প্রমাণ। অন্যের কাজের কারণে এটা পবিত্যাগ করা জায়েয নয়। আর যে কাজ রসূলুল্লাহ সা. আবু বকর ও উমরের কাজের পরিপন্থী, তার উপর ইজমা হতে পারেনা। তাই উমর কর্তৃক প্রদত্ত বাড়তি বেত্রাঘাতকে শাসকের মনোপুত শাস্তি (তাযীর) ধরে নেয়া হবে। (অর্থাৎ প্রকৃত শরয়ি শাস্তি বা হদ চল্লিশটি। যেখানে শান্তি বাড়িয়ে দেয়া কল্যাণকর মনে হবে, সেখানে বাড়ানো জায়েয।) এই মতটি অগ্রগণ্য মনে করা যায় এই বর্ণনার ভিত্তিতে যে, উমর রা. অতি মাত্রায় মদব্যস্ত শক্তিশালী ব্যক্তিকে আশিটি এবং দুর্বল ও পদস্খলনবশত মতো পানকারী ব্যক্তিকে চল্লিশটি বেত্রাঘাত করতেন। তবে বারবার পানকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার বিধান মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। কুবাইস বিন যুয়াইব রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে মদ পান করে, তাকে বেত্রাঘাত করো। পুনরায় মদ পান করলে আবার বেত্রাঘাত করো। পুনরায় মদ পান করলে পুনরায় বেত্রাঘাত করো। পুনরায় (তৃতীয় বা চতুর্থবার) মদ পান করলে তাকে হত্যা করো। কিন্তু যখন এক ব্যক্তি মদ পান করার দায়ে পরপর তিনবার ধরা পড়লো, তখন তাকে তিনি বেত্রাঘাত করলেন এবং মৃত্যুদণ্ড রহিত করলেন। এটা ছিলো ইচ্ছাধীন ব্যাপার।
📄 মুরতাদ হওয়ার শাস্তি
মুরতাদ হওয়া এমন একটা অপরাধ, যা মুরতাদ হওয়ার পূর্বে কৃত সমস্ত সৎ কাজকে বাতিল করে দেয় এবং আখেরাতে কঠিন আযাব অবধারিত করে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ، وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَلِدُونَ "যে ব্যক্তি তার দীনকে পরিত্যাগ করে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, দুনিয়া ও আখেরাতে তার সমস্ত কাজ নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তারা দোযখের অধিবাসী হবে। সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।" (সূরা বাকারা: আয়াত ২১৭)
অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইসলাম থেকে কুফরির দিকে ফিরে যাবে, তারপর ঐ অবস্থার উপর বহাল থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত কাফের অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে, সে যত সৎকাজ করেছে, তা বাতিল ও বৃথা হয়ে যাবে এবং ইহকালে তার সুফল থেকে সে বঞ্চিত হবে। কাজেই মুসলমানদের স্বাভাবিক অধিকারসমূহ সে পাবেনা। আর সে আখেরাতের নিয়ামত থেকেও বঞ্চিত হবে। সে চিরস্থায়ীভাবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিতে নিক্ষিপ্ত হবে। এছাড়া ইসলাম মুরতাদের জন্য দুনিয়ার জীবনেও সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করেছে, যা আখেরাতের অবধারিত যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির অতিরিক্ত। এই শাস্তি হলো, তাকে হত্যা করা হবে। (কোনো মুসলমান তাকে নিজ উদ্যোগে হত্যা করলে সে হত্যার অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হবেনা। তবে শাসককে ডিঙ্গিয়ে বীরত্ব জাহির করতে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার দায়ে তাকে অন্য কোনো লঘুতর শাস্তি দিয়ে তাযীর (সর্তককরণ) কার্যকর করা হবে।)