📄 মাদক দ্বারা অর্জিত মুনাফা
এ আলোচনা থেকে জানা গেলো, মাদক বিক্রয় করা হারাম। আর বিক্রয় করা যখন হারাম, তখন তার মূল্যও হারাম হবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ
"তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করোনা।" (নিসা: ২৯) অর্থাৎ একজন আরেকজনের সম্পদ অন্যায়ভাবে নিওনা ও ভোগ করোনা। অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ নেয়ার দু'টো পন্থা রয়েছে:
১. যুলুম, চুরি, বিশ্বাসঘাতকতা, জবরদখল এবং অন্যায় পন্থায় অন্যের সম্পদ হস্তগত করা।
২. নিষিদ্ধ ও বেআইনী পন্থায় যথা জুয়ার মাধ্যমে কিংবা অবৈধ চুক্তি যথা সুদের মাধ্যমে এবং আল্লাহ যেসব জিনিস দ্বারা উপকৃত হওয়া হারাম করেছেন, তা বিক্রয় করার মাধ্যমে উপার্জন হারাম, চাই স্বেচ্ছায় ও সানন্দে হোক না কেন। দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ যে সকল জিনিস দ্বারা উপকৃত হওয়া হারাম করেছেন, সে সকল জিনিসের বিক্রয় মূল্যও একাধিক হাদিসে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আল্লাহ যখন কোনো জিনিসকে হারাম করেন, তখন তার মূল্যও হারাম করেন।" -ইবনে আব্বাস থেকে ইবনে আবি শায়বা বর্ণিত।
যাদুল মায়াদে বলা হয়েছে: অধিকাংশ ফকিহর মত হলো, মদ বানাবে এমন ব্যক্তির নিকট আঙ্গুর বিক্রয় করা হলে তার মূল্য ভোগ করা হারাম। কিন্তু আঙ্গুর খাবে এমন ব্যক্তির নিকট আঙ্গুর বিক্রয় করা হলে তা হালাল। অনুরূপ, যখন এমন কোনো ব্যক্তির নিকট বিক্রয় করা হয় যে কোনো মুসলমানের ওপর তা দিয়ে আক্রমণ করবে, তখন সেই অস্ত্রের বিক্রয়মূল্য ভোগ করা হারাম। আর যখন তা আল্লাহর পথে জিহাদকারীর নিকট বিক্রয় করা হয়, তখন তার বিক্রয় মূল্য হালাল। অনুরূপ, যখন রেশমী কাপড় যার তা পরা হারাম তার কাছে বিক্রয় করা হয়, তখন তার বিক্রয় মূল্য ভোগ করা হারাম। আর যার রেশমী কাপড় পরা হালাল তার কাছে বিক্রয় করা হলে বিক্রয় মূল্য ভোগ করা হালাল। আর যেসব বস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া হালাল, তা যদি কেউ আল্লাহর নাফরমানীর কাজে ব্যবহার করতে চায় এবং তার কাছে ঐ বস্তু বিক্রয় করা হয়, তবে অধিকাংশ ফকিহর মতানুসারে তার বিক্রয় মূল্য ভোগ করা হারাম। আর যে জিনিস দ্বারা উপকৃত হওয়া হারাম যেমন মাদকদ্রব্য, তার বিক্রয় মূল্য ভোগ করা তো হারাম হবেই। আর যেহেতু এই মাদক দ্রব্যের বিক্রয় মূল্য হারাম, তাই তা ইবাদতের কাজে যথা সদকায় ও হজ্জে খরচ করা হলে তা কবুল হবেনা এবং খরচকারী তার জন্য সওয়াব পাবেনা।
মুসলিম আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: "রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত গ্রহণ করেননা। আর আল্লাহ রসূলদেরকে যে আদেশ দিয়েছেন, মুমিনদেরকেও সেই আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
يَأَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا طَ
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَتِ مَا رَزَقْنَكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِنْ كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ
"হে রসূলগণ, তোমরা হালাল খাও ও সৎ কাজ করো।" তিনি আরো বলেছেন: “হে মুমিনগণ, তোমাদেরকে আমি যে পবিত্র জীবিকা দিয়েছি তা খাও এবং আল্লাহর শোকর করো, যদি তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করো।" এরপর রসূলুল্লাহ সা. এক ব্যক্তির বিবরণ দেন, যে দীর্ঘ সফরে শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে আল্লাহর নিকট হাত তুলে দোয়া করে : হে আমার রব, হে আমার রব, অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারাই হৃষ্টপুষ্ট হয়। এমতাবস্থায় কিভাবে তার দোয়া কবুল হবে?"
মুসনাদে আহমদে ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "মহান আল্লাহর কসম, কোনো বান্দা হারাম মাল উপার্জন করে তা থেকে ব্যয় করলে তাতে বরকত পাবে না, তা থেকে সদকা করলে তা কবুল হবেনা, আর তা উত্তরাধিকারস্বরূপ রেখে গেলে তা হবে তার দোযখের পাথেয়। আল্লাহ হারাম সম্পত্তি দ্বারা গুনাহ মোচন করেননা, তবে হালাল সম্পত্তি দ্বারা গুনাহ মোচন করেন। একটা নাপাক জিনিস আরেকটা নাপাক জিনিসকে বিলুপ্ত করেনা।"
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি হারাম মাল উপার্জনের পর তা সদকা করে, সে তা দ্বারা কোনো সওয়াব পাবেনা, বরং তার দায় ও শাস্তি তার উপর বর্তাবে।” -জামেউল উলূম।
কাসেম বিন মুখায়মারা বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো গুনাহর কাজ দ্বারা অর্থ উপার্জন করলো, অতপর তা দ্বারা রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করলো, কিংবা সদকা করলো বা আল্লাহর পথে দান করলো, তা একত্রিত করা হবে, অতপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।" -জামেউল উলূম।
ইমাম নববীর সংকলিত চল্লিশ হাদিসের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী কারী এ হাদিস উদ্ধৃত করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “যখন কোনো ব্যক্তি হারাম অর্থ দ্বারা হজ্জ করতে বের হয়, অতপর বাহনে আরোহণ করে বলে “লাব্বাইকা”। (তোমার দরবারে আমি হাজির) তখন আকাশ থেকে একজন ফেরেশতা তাকে বলে : তোমার কোনো লাব্বাইকা গ্রহণ করা হবেনা। তোমার হজ্জ তোমাকেই ফেরত দেয়া হলো।" এ হাদিসগুলো সামষ্টিকভাবে প্রমাণ করে যে, হারাম অপবিত্র মাল দ্বারা সম্পাদিত কোনো হজ্জ, সদকা বা অন্য কোনো ইবাদত আল্লাহ কবুল করেননা। এ কারণে কোনো কোনো হানাফি আলেম বলেন, হারাম মাল হজ্জে ব্যয় করাও হারাম।
আমাদের এ আলোচনার সার সংক্ষেপ হলো : ১. আফিম, কোকেন ও ভাং ইত্যাকার মাদক সেবন করা সম্পূর্ণ হারাম। ২. এগুলো দ্বারা ব্যবসা করা এবং এগুলোকে লাভজনক পেশায় খাটানো হারাম। ৩. আফিম, ভাং ইত্যাদির চাষ করা ও তা থেকে নেশাকর উপাদান বের করে তা সেবন করা বা তা দ্বারা ব্যবসা করা হারাম। ৪. এসব জিনিস দ্বারা ব্যবসা করে যে মুনাফা হয়, তা হারাম ও অপবিত্র এবং এগুলোকে সৎ কাজে ব্যয় করা শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং হারামও।