📄 মাদকদ্রব্যসমূহ
এ পর্যন্ত যা কিছু উল্লেখ করা হলো, তা ছিলো খাম্ বা মদ নামক পানীয় সম্পর্কে আল্লাহর বিধান। কিন্তু যে সকল বস্তু পানীয় নয়, অথচ মদের মতোই বুদ্ধির বিলুপ্তি ঘটায়, যেমন ভাং, গাঁজা, আফিম ইত্যাদি, সে সকল বস্তুও সম্পূর্ণরূপে হারাম। কেননা তা নেশাকর ও মাতালকারী। ইতিপূর্বে আমরা মুসলিম থেকে বর্ণিত হাদিস উদ্ধৃত করেছি যে, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "সকল মাদকদ্রব্য মদ এবং সকল মদ হারাম।"
মিশরের মুফতি শেখ আবদুল মজীদ সালিমকে (রহ.) মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত শরিয়তের বিধান জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। প্রশ্নগুলো ছিলো নিম্নরূপ: ১. মাদকদ্রব্য সেবন করা জায়েয কিনা? ২. মাদক দ্রব্যের ব্যবসা করা ও তাকে বাণিজ্যিক মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা জায়েয কিনা? ৩. ভাং ও আফিম বিক্রি করা ও তা থেকে মাদকদ্রব্য তৈরি করা, তার চাষ করা, সেবন করা ও ব্যবসা করা জায়েয কিনা? ৪. মাদকদ্রব্য বিক্রয় থেকে অর্জিত মুনাফা হালাল না হারাম? এর জবাবে তিনি বলেন :
📄 মাদক সেবন
১. এসব মাদকদ্রব্য সেবন সন্দেহাতীতভাবে হারাম। কেননা এগুলো সেবনে শরীরের ক্ষতি হয় ও বিবেকবুদ্ধি বিকৃত হয়। কাজেই শরিয়ত যেখানে এর চেয়ে কম ক্ষতিকর জিনিস মদকে হারাম করেছে, সেখানে এগুলোকে সে হালাল করবে, এটা সম্পূর্ণ অসম্ভব। এজন্য কোনো কোনো হানাফি আলেম বলেছেন: “ভাং ও আফিমকে যে হালাল বলে বিশ্বাস করে, সে কাফের ও বেদাতী।” এ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এর হারাম হওয়ার বিষয়টা তাদের নিকট সুস্পষ্ট ও অকাট্য। তাছাড়া যেহেতু এ জাতীয় মাদকগুলোর বেশির ভাগ বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন ও নিষ্ক্রিয় করে দেয় এবং যারা এগুলো সেবন করে তারা এতে এত আনন্দ ও মজা পায় যে, আজীবন এর নেশায় মত্ত ও এর প্রতি আসক্ত থাকে, তাই এগুলোও মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে ও রসূলুল্লাহ সা. হাদিসে যে মদ ও নেশাকর দ্রব্য হারাম ঘোষণা করেছেন, তার আওতায় পড়ে। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া তাঁর “আসিয়াসাতুল্ শরইয়াহ” (ইসলামের রাজনীতি) নামক গ্রন্থে এ বিষয়ে যা বলেছেন, তার সার সংক্ষেপ নিম্নরূপ:
'হাশিশ' (গাঁজা, ভাং ইত্যাদি) হারাম। মদখোরের ন্যায় এগুলোর সেবনকারীর উপরও শরয়ি শাস্তি কার্যকর করতে হবে। এগুলো মদের চেয়েও নিকৃষ্ট ও জঘন্য। কারণ এর প্রভাবে বিবেকবুদ্ধি ও স্বভাব চরিত্র বিকৃত ও বিনষ্ট হয়ে যায়। এমনকি তা মানুষকে হিজড়া ও কাপুরুষে পরিণত করে। তাছাড়া এগুলোও মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখে। আল্লাহ ও রসূল যে মদ ও নেশাকর বস্তু হারাম করেছেন, এগুলো তার অন্তর্ভুক্ত। আবু মূসা আশয়ারি রা. বলেছিলেন: হে রসূলুল্লাহ, আমরা ইয়ামানে অবস্থানকালে দু'রকমের পানীয় তৈরি করতাম। একটির নাম 'বিত্যু', যা মধুকে নিভৃত স্থানে রেখে দিয়ে গাঢ় ও জমাট করে তৈরি করা হয়। আর অপরটি 'মিযার', যা যব ও গম থেকে নির্যাস বের করে নিভৃত স্থানে রেখে দিয়ে গাঢ় ও জমাট করে তৈরি করা হয়। রসূলুল্লাহ সা. অল্প শব্দে ব্যাপক অর্থবোধক কথা বলার অসাধারণ যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। তিনি আমার প্রশ্নের জবাবে শুধু সংক্ষেপে বললেন: “প্রত্যেক নেশাকর জিনিস হারাম।” -বুখারি ও মুসলিম।
নু'মান ইবনে বশীর রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "গম থেকেও মদ তৈরি হয়, যব থেকেও মদ তৈরি হয়, কিশমিশ থেকেও মদ তৈরি হয়, খোরমা থেকেও মদ তৈরি হয় এবং মধু থেকেও মদ তৈরি হয়। যা কিছুই মানুষকে মাতাল করে, তা পান করতে আমি নিষেধ করি।" -আবু দাউদ।
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "প্রত্যেক নেশাকর জিনিসই মদ এবং প্রত্যেক মদই হারাম।"-মুসলিম।
আয়েশা রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "প্রত্যেক নেশাকর বস্তু হারাম। যে জিনিস বেশি পরিমাণে সেবন করলে মানুষ মাতাল হয়, সে জিনিসের স্বল্প পরিমাণও হারাম।" (তিরমিঝি)
জাবের রা. থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি রসূল সা.কে জিজ্ঞাসা করলো, তাদের অঞ্চলে 'মিযার' নামক এক ধরনের পানীয় আছে, যা ভুট্টা থেকে তৈরি হয়। ওটা পান করা যাবে কিনা? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: ওটা কি নেশাকর? লোকটি বললো: হাঁ। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: নেশাকর জিনিস মাত্রই হারাম। যে ব্যক্তি নেশাকর জিনিস পান করে, আল্লাহ তাকে "তায়নাতুল খাবাল" (বিষাক্ত পানীয়) পান করাতে বদ্ধপরিকর। লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো: হে রসূলুল্লাহ, এই বিষাক্ত পানীয় কী? তিনি বললেন: “দোযখবাসীর ঘাম।” (মুসলিম)
ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "বিবেকবুদ্ধিকে নিষ্ক্রিয় ও মানুষকে মাতাল করে এমন প্রত্যেক জিনিস হারাম।"-আবু দাউদ।
এ বিষয়ে বহু হাদিস রয়েছে। রসূলুল্লাহ সা. তাঁর স্বভাবসুলভ সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক বাণী দ্বারা যাবতীয় নেশাকর ও বুদ্ধি লোপকারী বস্তুকে হারাম হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছেন এবং এগুলোর মধ্যে কোনো শ্রেণীভেদ করেননি, চাই তা খাদ্য বস্তু হোক বা পানীয় হোক। তাছাড়া মদ কখনো শক্ত খাবারের সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয়, আবার গাঁজা, আফিম ইত্যাদিকেও তরল করে পান করা হয়। এভাবে মদ খাদ্য ও পানীয় উভয়ের রূপ ধারণ করতে পারে এবং আফিম, গাঁজাও খাদ্য ও পানীয়ে রূপান্তরিত হতে পারে। এগুলোর আকৃতি যে রকমই হোক, সর্বাবস্থায় তা হারাম। রসূল সা. ও ইমামদের যুগের পরে এগুলো তৈরি হয়েছে বলে নেশাকর বস্তু সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা. সাধারণভাবে যেসব উক্তি করেছেন, তার আওতার বাইরে যেতে পারেনা। রসূলুল্লাহ সা.-এর পরে বহু নেশাকর বস্তু ও পানীয় তৈরি হয়েছে এবং সেগুলোর সবই কুরআন ও সুন্নাহতে বিদ্যমান নেশাকর বস্তু সংক্রান্ত বক্তব্যের আওতাধীন।"
ইমাম ইবনে তাইমিয়া তার ফতোয়া সংকলনেও একাধিকবার এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন, যার সংক্ষিপ্ত সার নিম্নরূপ: "এই অভিশপ্ত ভাং-এর সেবনকারীরা ও একে হালাল সাব্যস্তকারীরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর বান্দাদের ক্রোধের উদ্রেককারী এবং আল্লাহর আযাব তাদের জন্য অবধারিত। এটি মানুষের ধর্ম, চরিত্র, বিবেকবুদ্ধি ও স্বভাব প্রকৃতিকে বিকৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মেজাযকে এত খারাপ ও খিটখিটে করে দেয় যে, অনেকেই বদ্ধ পাগলে পর্যন্ত পরিণত হয়। এসব মাদকদ্রব্য সেবনকারীরা ইতরামি ও পাশবিকতার এত নিম্ন স্তরে নেমে যায় যে, মদখোররাও তাদের কাছে হার মানে। কাজেই এগুলো মদের চেয়েও বিপজ্জনক। তাই এগুলোকে হারাম করা অধিকতর যৌক্তিক ও সমীচীন। এসব মাদক সেবন যে হারাম, সে ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা হয়েছে। যে ব্যক্তি একে হালাল বলে বিশ্বাস করবে, তাকে তওবা করার আদেশ দেয়া হবে। তওবা করলে অব্যাহতি পাবে, নচেত মুরতাদ ঘোষণা করা হবে। তার জানাযাও পড়া হবেনা এবং মুসলমানদের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবেনা। আর একথাও মনে রাখতে হবে যে, মদ সংক্রান্ত বিধি অনুযায়ী এসব মাদকের স্বল্প পরিমাণও হারাম।"
তাঁর শিষ্য বিশিষ্ট ইমাম ইবনুল কাইয়েমও তাঁর পদাংক অনুসরণ করে নিজ গ্রন্থ 'যাদুল মায়াদে' বলেন: "প্রত্যেক নেশাকর জিনিসই খাম বা মদের আওতাধীন। চাই তা তরল হোক বা কঠিন হোক, নির্যাস হোক বা রান্না করা হোক। হাশিশ তথা ভাং, গাঁজা ইদ্যাদিও এর অন্তর্ভুক্ত। কেননা রসূলুল্লাহ সা.-এর সুস্পষ্ট ও অকাট্য উক্তির আলোকে এগুলোর সবই মদ। কেননা তিনি বলেছেন: "প্রত্যেক মাতালকারী বস্তু হারাম।" আর রসূলুল্লাহ সা.-এর কথার তাৎপর্য ও মর্ম যারা সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করেছেন, সেই সাহাবীগণও এ ব্যাপারে একমত যে, মদ তাকেই বলে, যা নেশা জন্মায় ও বিবেকবুদ্ধি লোপ করে। তাছাড়া, রসূলুল্লাহ সা.-এর উক্তি দ্বারা যদি যাবতীয় নেশাকর দ্রব্য নাও বুঝাতো, তথাপি স্বচ্ছ যুক্তির বিচারেই সকল প্রকারের ও সকল শ্রেণীর নেশাকর দ্রব্যের বিধান একই হতো। সর্বদিক দিয়ে সমান ও সমকক্ষ কয়েকটি জিনিসের মধ্যে বিনা কারণে ও বিনা যুক্তিতে পার্থক্য ও বৈষম্য সৃষ্টি করার কোনোই অবকাশ নেই।”
বুলুগুল মুরাম গ্রন্থের টীকা "সুবুলুস্ সালাম"-এর লেখক বলেন: "যে জিনিস নেশা ও মাতলামির সৃষ্টি করে, তা পানীয় না হলেও হারাম।" হাফেয ইবনে হাজার বলেছেন: "যে ব্যক্তি বলে যে, ভাং বা আফিম তো মাতাল করেনা বরং অসাড় করে, সে একজন হঠকারী ব্যক্তি। কেননা মদ দ্বারা যে ধরনের নেশা ও মাতলামির সৃষ্টি হয়, এগুলো দ্বারাও তাই সৃষ্টি হয়।” বিশিষ্ট চিকিৎসক ইবনুল বইতার বলেছেন: মিশরে যে ভাং পাওয়া যায় তা অত্যধিক নেশাকর। মানুষ এর এক দিরহাম বা দুই দিরহাম পরিমাণ সেবন করলেই মাতাল হয়ে যায়। ভাং এর অপকারিতা অনেক। কোনো কোনো আলেম-এর একশো বিশটা ধর্মীয় ও বৈষয়িক অপকারিতা গণনা করে তুলে ধরেছেন। এর সব ক'টি অপকারিতা আফিমেও রয়েছে। তবে আফিমের অপকারিতা আরো বেশি।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ও তার সুযোগ্য শিষ্য ইবনুল কাইয়েম যা কিছু বলেছেন তা একদিকে যেমন যৌক্তিক, অন্যদিকে তেমনি সন্তোষজনক। আর এ আলোচনা থেকে এটাও স্পষ্ট হয়েছে যে, কুরআন ও সুন্নাহর বাণী মদের সাথে সাথে ভাংকেও যেমন যুক্ত করে, তেমনি অধিকতর ক্ষতিকর আফিমও তার অন্তর্ভুক্ত করে। এক কথায়, এমন যাবতীয় নেশাকর দ্রব্য এর আওতাভুক্ত, যার উদ্ভব ইদানিং হয়েছে, অথচ আগে কেউ চিনতোনা। এগুলোও বুদ্ধি লোপকারী ও মাদকতা আনয়নকারী হিসেবে আঙ্গুর থেকে তৈরি মদের মতোই। এগুলোতে মদের অপকারিতা তো রয়েছেই, উপরন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ অপকারিতাও রয়েছে, যা আমরা স্বচোক্ষেই দেখে থাকি। এসব বুদ্ধি বিনাশী মাদক দ্রব্যকে ইসলাম বৈধ করবে, এটা আদৌ সম্ভব নয়। যারা এর কোনো একটিকেও হালাল বলে, তারা আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে, অথবা আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতাপ্রসূত কথা বলে। এসব মাদক যখন মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে ও সামষ্টিকভাবে, বৈষয়িকভাবে, স্বাস্থ্যগতভাবে, কৃষ্টিগতভাবে ও নৈতিকভাবে, এক কথায় সর্বোতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন ইসলামি শরিয়ত এগুলোকে কিভাবে বৈধ করবে? ইসলাম তো এসেছেই মানুষকে সার্বিক কল্যাণ, অথবা ন্যূনপক্ষে আপেক্ষিক কল্যাণ উপহার দিতে এবং যাবতীয় ক্ষতিকর ও অকল্যাণকর বস্তু থেকে রক্ষা করতে ও নিরাপদ করতে।
সর্বজ্ঞ ও মহাবিজ্ঞানী আল্লাহ যখন আঙ্গুর থেকে তৈরি মদ, কম ও বেশি নির্বিশেষে এজন্য নিষিদ্ধ করেছেন যে, তা ক্ষতিকর এবং তার স্বল্প পরিমাণ পান ও বেশি পরিমাণে পানের দিকে আকৃষ্ট করে ও বেশি পরিমাণে পানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন এর চেয়েও অধিক ক্ষতিকর এবং শরীর, বুদ্ধি, ধর্ম, চরিত্র ও স্বভাব বিনষ্টকারী মাদকদ্রব্য কিভাবে বৈধ ও হালাল করে দেবেন? এ ধরনের বক্তব্য প্রদান ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ অথবা কাফের ও বিদআতী ছাড়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং এসব মাদক খাওয়া, পান করা, ঘ্রাণ নেয়া বা ইনজেকশন নেয়া যেভাবেই সেবন করা হোক সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ ব্যাপারে কোনো অস্পষ্টতা, অসচ্ছতা বা রাখঢাকের কোনোই অবকাশ নেই।
📄 মাদকদ্রব্য নিয়ে ব্যবসা করা ও তাকে বাণিজ্যিক মুনাফা অর্জনের হাতিয়াররূপে গ্রহণ
রসূলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণিত বহু সংখ্যক হাদিসে মদ বিক্রয় হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। তন্মধ্যে বুখারি ও মুসলিমে জাবের রা. থেকে বর্ণিত এ হাদিসটি উল্লেখযোগ্য:
"আল্লাহ তায়ালা মদ, মৃত জন্তু, শুকর ও মূর্তি বিক্রয় হারাম করেছেন।" এই মর্মেও বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে যে, যেসব বস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া আল্লাহ হারাম করেছেন, সেসব বস্তুর বিক্রয় করা ও তার মূল্য ভোগ করাও হারাম। প্রথম প্রশ্নের জবাব থেকে জানা গেছে, শরিয়তের দৃষ্টিতে 'মদ' নামটি এসব মাদকদ্রব্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং যেখানে মদ বেচাকেনা হারাম করা হয়েছে, সেখানে ঐ একই নিষেধাজ্ঞা দ্বারা মাদকদ্রব্য বিক্রয়ও হারাম বিবেচিত হবে। আর এখান থেকেই সুস্পষ্টভাবে এসব মাদক দ্রব্যের ব্যবসায় ও এই ব্যবসায়কে জীবিকা উপার্জনের উপায় বা পেশা হিসেবে গ্রহণও হারাম সাব্যস্ত হবে। উপরন্তু সব মাদক এমন সব গুনাহর কাজে প্ররোচিত করে, যার হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। কেননা কুরআন দ্বারাই তার হারাম হওয়া প্রমাণিত : وَتَعَاوَنُوا عَلَى البر والتقوى ط وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ص অর্থ: সৎ কর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সাহায্য করোনা।" (সূরা মায়েদা : আয়াত ২)
তাই অধিকাংশ ফকিহর এই অভিমত সম্পূর্ণ সঠিক যে, আঙ্গুরের রস দিয়ে মদ বানায় এমন লোকের নিকট আঙ্গুরের রস বিক্রয় করা হারাম এবং এ ধরনের বিক্রয় বাতিল। কেননা এ দ্বারা পাপ কাজে সাহায্য করা হয়।
📄 বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে মাদকের গাছের চাষ এবং সেবন বা ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে তা থেকে মাদক উৎপাদন বের করা
সেবন বা ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে মাদক উপাদান বের করার জন্য আফিম ও ভাং চাষ করা সন্দেহাতীতভাবে হারাম। এর কারণগুলো নিম্নরূপ:
১. ইবনে আব্বাস থেকে আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : যে ব্যক্তি ফল পাড়ার মৌসুমে আঙ্গুর এ উদ্দেশ্যে জমা করে রাখে যে, এ দ্বারা যে ব্যক্তি মদ বানাবে, তার কাছে তা বিক্রয় করবে, সে অবশ্যই দোযখে প্রবেশ করবে।" এ হাদিস দ্বারা প্রকারান্তরে প্রমাণিত হয় যে, মদ প্রস্তুতকারীর নিকট বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে আঙ্গুর জমা করে রাখা যখন হারাম, তখন একই উদ্দেশ্যে ভাং ও আফিম চাষ করাও হারাম।
২. এটা পাপ কাজে সহায়তার শামিল। পাপ কাজটি হলো, মাদক ব্যবসায় বা মাদক সেবন। আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, পাপ কাজে সাহায্য করাও পাপ।
৩. যে কৃষক উক্ত উদ্দেশ্যে মাদকের গাছ রোপণ করে, সে এর মাধ্যমে এই সম্মতি ব্যক্ত করে যে, জনগণ মাদক সেবন ও মাদকের ব্যবসায় লিপ্ত হোক। বস্তুত যে কোনো পাপ কাজে সম্মতি দেয়াও পাপ। এর কারণ হলো, অন্যায় কাজকে মন দিয়ে অপছন্দ ও প্রত্যাখ্যান করা প্রকৃতপক্ষে অন্যায়কে ঘৃণা করা ও অন্যায়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করারই সমার্থক, যা প্রত্যেক মুসলমানের উপর সর্বাবস্থায় ফরয। বরঞ্চ সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : "যে ব্যক্তি গুনাহর কাজকে মন দিয়ে অপছন্দ ও প্রত্যাখ্যান করেনা, তার অন্তরে একটি সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান নেই।" তাছাড়া, অন্য একটি কারণেও ভাং ও আফিমের চাষ করা গুনাহ। সেটি হলো, দেশে প্রচলিত আইনে এ কাজ নিষিদ্ধ থাকা। কেননা এ বিষয়ে মুসলমানদের ইজমা রয়েছে যে, প্রচলিত যে আইনে বা প্রশাসনিক আদেশে আল্লাহ ও তার রসূলের আদেশ লঙ্ঘিত হয়না, সে আইন ও আদেশ মান্য করা ওয়াজিব। ইমাম নববী "শাসকদের আনুগত্য” শীর্ষক অধ্যায়ে মুসলিমের ব্যাখ্যায় বলেছেন: মাদকদ্রব্য সেবন ও তার ব্যবসায় হারাম প্রমাণ করতে এই শেষোক্ত কারণটি উল্লেখযোগ্য।