📄 মদ কাকে বলে?
মদ হচ্ছে সেসব সুপরিচিত তরল পানীয়, যা এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, কোনো কোনো ফল বা শস্যকে মাদকে পরিণত করে এবং তাতে নেশা বা মাতলামির এমন উপাদান সৃষ্টি করে, যার দরুন বুদ্ধি লোপ পায়। আর এই রূপান্তর ঘটে এমন কিছু জীবন্ত প্রাণীর মাধ্যমে, মাদকতা সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় উপাদান সৃষ্টিতে যেগুলোর উপস্থিতি জরুরি গণ্য হয়ে থাকে। একে 'খাম' বা মদ বলা হয় এজন্য যে, এটা বিবেকবুদ্ধিকে ঢেকে দেয়। ('খাম' শব্দের আভিধানিক অর্থ ঢেকে দেয়া।) অর্থাৎ মদ তার বুদ্ধি ও উপলব্ধি ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এটা হচ্ছে চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে মদের সংজ্ঞা।
মাদকতা, মাতলামি বা নেশা সৃষ্টি করে এমন প্রত্যেক জিনিসই মদ হিসেবে পরিগণিত। কোন্ বস্তু থেকে তা তৈরি হয়েছে, সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। যা কিছুই নেশা জন্মায়, তা শরিয়তের দৃষ্টিতে মদ এবং মদের হুকুম বা বিধির আওতাধীন, চাই তা আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম, জব বা অন্য কোনো জিনিস দ্বারা করা হোক। কেননা এসবই নিষিদ্ধ মদ। এর ক্ষতিকর প্রভাব সর্বব্যাপী। আর এটি আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখে এবং মানুষে মানুষে শত্রুতা ও হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।
সমান বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বস্তুগুলোতে শরিয়ত কোনো পার্থক্য করেনা। মাদকতা বা মাতলামি আনয়নকারী দুটি পানীয়ের একটিকে হালাল ও অপরটিকে হারাম যেমন করেনা, তেমনি এ ধরনের দু'টি পানীয়ের একটির স্বল্প পরিমাণকে বৈধ ও অপরটিরও স্বল্প পরিমাণকে নিষিদ্ধ করেনা। এ বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর বাণী সুস্পষ্ট ও অকাট্য। কোনো ধরনের সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ রাখেনা। নিম্নে কয়েকটি বাণীর উদ্ধৃতি দেয়া গেলো:
১. ইবনে উমর থেকে আহমদ ও আবু দাউদ বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: প্রত্যেক নেশাকর দ্রব্য মদ এবং প্রত্যেক মদ হারাম।
২. বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রসূলুল্লাহ সা.-এর মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেছেন: "হে জনতা, শুনে নাও, মদ হারাম হওয়ার বিধি অবতীর্ণ হয়েছে। আর এই মদ পাঁচটি জিনিস থেকে তৈরি হয়ে থাকে: আঙ্গুর, খেজুর, মধু, গম ও যব। আর যা বুদ্ধিকে অকার্যকর করে দেয়, সেটাই মদ।" আমীরুল মুমিনীন উমর রা.-এর ঘোষণা শাশ্বত ও চূড়ান্ত। কেননা তিনি শরিয়ত ও ভাষা উভয়টির ব্যাপারেই অধিকতর বিজ্ঞ। তিনি যে মত পোষণ করতেন, কোনো সাহাবী সে বিষয়ে তার বিরুদ্ধাচরণ করেছেন এমন কথা শোনা যায়নি।
৩. জাবের রা. থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন: ইয়ামান থেকে এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞাসা করলো তাদের দেশে এক ধরনের পানীয় পান করা হয়, তা হারাম না হালাল? রসূলুল্লাহ সা. তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: পানীয় বস্তুটি মাতাল করে কি? সে বললো: "হাঁ”। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: “প্রত্যেক নেশাকর জিনিসই হারাম।" ".... নেশাকর জিনিস পানকারীকে দোযখবাসীর পুজ পান করাতে আল্লাহ বদ্ধপরিকর।"
৪. নুমান বিন বশীর থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আঙ্গুর থেকেও মদ তৈরি হয়, খেজুর থেকেও মদ তৈরি হয়, মধু থেকেও মদ তৈরি হয়, যব থেকেও মদ তৈরি হয়, গম থেকেও মদ তৈরি হয়।" (আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ)
৫. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত: "প্রত্যেক নেশাকর জিনিস হারাম। যে পানীয়ের ষোল রতল মাতাল করে, তার হাতের তালু পরিমাণও হারাম।"
৬. আহমদ, বুখারি ও মুসলিম আবু মূসা আশয়ারি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বললেন: হে রসূলুল্লাহ, আমরা ইয়ামানে দুটো পানীয় তৈরি করতাম। এর একটি হলো, মধুকে জ্বাল দিয়ে ঘন করে তৈরি করা নেশাকর বিতা এবং অপরটি গোশত ও যব একত্রে জ্বাল দিয়ে ঘন করে তৈরি করা নেশাকর দ্রব্য মিযার। এ দুটো সম্পর্কে আমাদেরকে ফতোয়া দিন। আবু মূসা আশয়ারি বলেন: রসূলুল্লাহ সা. সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক কথা বলার ব্যাপারে আল্লাহ প্রদত্ত অসাধারণ দক্ষতার অধিকারী ছিলেন। তিনি সংক্ষিপ্তভাবে শুধু বললেন: "সকল নেশাকর জিনিস হারাম।"
৭. আলী রা. বলেছেন, রসূলুল্লাহ সা. যবের নির্যাস পান করতে নিষেধ করেছেন। -আবু দাউদ ও নাসায়ী।
এটি সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও অধিকাংশ ফকিহের অভিমত। কিন্তু ইতিপূর্বে যেসব দলিল প্রমাণ উদ্ধৃত করেছি, এটা তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আঞ্চলিক ফকিহগণ, আহলে হাদিস এবং ইমাম আবু হানিফার শিষ্য ইমাম মুহাম্মদের মতেরও বিপরীত। তবে এ মত অনুসারেই ফতোয়া দেয়া হয়। ইরাকের ফকিহগণ, ইবরাহিম নাখয়ি, সুফিয়ান ছাওরি, ইবনে আবি লায়লা, শুরাইক, ইবনে শাবরুমা, কুফার অবশিষ্ট সকল ফকিহ, বসরার ফকিহদের অধিকাংশ ও আবু হানিফা বলেন: আঙ্গুরের নির্যাস থেকে তৈরি মদ কম হোক বেশি হোক হারাম। আঙ্গুর ব্যতীত অন্য যে কোনো ফল বা শস্যের নির্যাস যদি বেশি খেলে মাদকতা আনে, তবে বেশি পরিমাণ খাওয়া হারাম। আর কম খেলে যদি মাদকতা না আনে, তবে কম খাওয়া হালাল। ইবনে রুশদ তাঁর গ্রন্থ "বিদায়াতুল মুজতাহিদে" বলেন:
"হেজাযের অধিকাংশ ফকিহ এবং অধিকাংশ মুহাদ্দিস বলেন: নেশা বা মাদকতা আনে এমন যে কোনো নির্যাস, কম হোক বেশি হোক, হারাম। আর ইবরাহিম নাখয়ি, সুফিয়ান ছাওরি, ইবনে আবিলায়লা, শুরাইক, ইবনে শাবরুমা, আবু হানিফা, কুফার অন্য সকল ফকিহ এবং বসরার অধিকাংশ আলেম বলেছেন: মাতালকারী যত নির্যাস আছে, তার ভেতরের শুধু মাতালকারী উপাদানটাই হারাম, নির্যাস নয়। তাদের এ মতভেদ হাদিস ও যুক্তির বিপরীত।
হেজাযী ফকিহগণ তাদের মত দুই উপায়ে সঠিক প্রমাণ করেন: এ সংক্রান্ত হাদিস উদ্ধৃত করে এবং সকল নির্যাসকে মদ নামকরণ করে। হেজাযীগণ যে প্রসিদ্ধতম হাদিসের বরাত দেন, তা হলো, মালেক বর্ণিত আয়েশা রা.-এর এ হাদিস: রসূলুল্লাহ সা.কে মধুর নির্যাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: "যে পানীয় মাদকতা সৃষ্টি করে তা হারাম।" (বুখারি) ইয়াহিয়া ইবনে মাঈন বলেছেন: নেশাকর দ্রব্য নিষিদ্ধ ঘোষণায় যতগুলো হাদিস বর্ণিত হয়েছে, তন্মধ্যে এটাই বিশুদ্ধতম হাদিস। মুসলিম ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "প্রত্যেক নেশাকর দ্রব্য মদ এবং প্রত্যেক মদ হারাম।"
বুখারি ও মুসলিম বর্ণিত উল্লিখিত হাদিস দুটি সহীহ। প্রথমোক্তটির উপর সবাই একমত। কিন্তু দ্বিতীয়টিকে শুধু মুসলিম সহীহ বলে রায় দিয়েছেন। আর তিরমিযি, আবু দাউদ ও নাসায়ী জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে জিনিস বেশি খেলে মানুষ মাতাল হয়, তা কম খাওয়াও হারাম।" এ হাদিসের বক্তব্য নিয়ে মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে।
তাদের দ্বিতীয় যে যুক্তি তা হলো, যাবতীয় নির্যাসই মদ নামে আখ্যায়িত হয়। এ যুক্তির যথার্থতা প্রমাণে দু'টি পন্থা অবলম্বন করা হয়। একটি হলো, নামকে তার ধাতুগত রূপান্তরের আলোকে সঠিক প্রতিপন্ন করা। আর অন্যটি জনশ্রুতির আলোকে সঠিক প্রতিপন্ন করা। ধাতুগত রূপান্তরের পন্থাটি হলো, অভিধানবিদদের নিকট আরবীতে "খাম্র” (মদ) কে "খাম্র” নামে আখ্যায়িত করার একমাত্র কারণ এই যে, তা বিবেকবুদ্ধিকে 'খাম', করে অর্থাৎ ঢেকে ফেলে বা আবৃত করে। এই ব্যাখ্যা অনুসারে এমন প্রত্যেক বস্তুকে 'খাম' বা মদ বলা যাবে, যা বিবেক বুদ্ধিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। 'খাম' নামকরণের এই পদ্ধতি সম্পর্কে উসুলে ফিকহ (ফিকহ শাস্ত্রের মূলনীতি) শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞদের মতভেদ রয়েছে। দ্বিতীয় পন্থাটি, যা জনশ্রুতির আলোকে গৃহিত হয়, সে ব্যাপারে বলা হয়েছে: যদিও আভিধানিক অর্থের বিবেচনায় নির্যাসকে 'খাম' বা মদ বলা যায় না, তবে শরয়ি পরিভাষা হিসেবে নির্যাসকে 'খাম' বা মদ বলা যায়। ইতিপূর্বে ইবনে উমারের যে হাদিস উদ্ধৃত করা হয়েছে তা দ্বারা এবং আবু হুরায়রার বর্ণিত এ হাদিস দ্বারা এ ব্যাপারে প্রমাণ দর্শানো হয়েছে। আবু হুরায়রা বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "মদ তৈরি হয় দু'টি গাছ থেকে আঙ্গুর ও খেজুরের গাছ।” আর হেজাযের ফকিহদের সমস্ত নির্যাস হারাম হওয়া সম্পর্কে সর্বোত্তম প্রমাণ হিসেবে ইবনে উমরের এই হাদিসও উদ্ধৃত করা হয়: "আঙ্গুর থেকে মদ হয়, মধু থেকেও মদ হয়, কিশমিস থেকেও মদ হয়, গম থেকেও মদ হয়। যে জিনিস খেলে নেশা হয়, তা খেতে আমি তোমাদের নিষেধ করছি।" পক্ষান্তরে কুফার ফকিহগণ সূরা নাহলের ৬৭ নং আয়াতের আক্ষরিক মর্ম থেকেই প্রমাণ দর্শান। আয়াতটি হলো:
وَمِنْ تَمَرَتِ النَّخِيلِ وَالْأَعْنَابِ تَتَّخِذُونَ مِنْهُ سَكَرًا وَرِزْقًا حَسَنًا ، إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ "খেজুর ও আঙ্গুর ফলকে তোমরা নেশা ও উত্তম জীবিকার উৎস হিসেবে গ্রহণ করছো।”
এছাড়া এই মর্মে বর্ণিত আরো কিছু হাদিস দ্বারা ও কেয়াস দ্বারাও তারা অনুরূপ যুক্তি প্রদর্শন করেন। আয়াত দ্বারা যুক্তি প্রদর্শন করেন এভাবে যে, মূলতঃ নেশাই হারাম। বস্তু যদি হারাম হতো, তাহলে আল্লাহ তাকে 'উত্তম জীবিকা' আখ্যায়িত করতেন না। ওদিকে যে সকল হাদিস দ্বারা এ ব্যাপারে প্রমাণ দর্শানো হয়, সেগুলোর মধ্য হতে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হাদিস হলো: ইবনে আব্বাস বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "মদ নিষিদ্ধ হয়েছে তার মূল উপাদানের কারণে, আর মাতলামী নিষিদ্ধ হয়েছে অন্য কারণে।” বস্তুতঃ এ হাদিসের বক্তব্য সুস্পষ্ট। এর ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়। তবে হেজাযবাসী এ হাদিসকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। আবু বুরদা বিন নাযার থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আমি তোমাদেরকে মদ পান করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন পান করতে পারো, তবে সাবধান মাতাল হয়োনা।" -তাহাবি।
ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন: "প্রথমে যখন নির্যাসকে হারাম করা হয়, তখন তোমাদের মতো আমিও তা প্রত্যক্ষ করেছি। পরে যখন তা আবার হালাল করা হয়, তখন তাও প্রত্যক্ষ করেছি এবং মনে রেখেছি। কিন্তু শেষেরটা তোমরা ভুলে গিয়েছ।” আবু মূসা আশয়ারী বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. আমাকে ও মুয়াযকে যখন ইয়ামানে পাঠালেন, তখন আমরা বললাম: হে রসূলুল্লাহ, ইয়ামানে দু'ধরনের পানীয় আছে, একটি গম দিয়ে ও অপরটি যব দিয়ে তৈরি করা হয়। আমরা কোন্টা পান করবো: রসূলুল্লাহ সা. বললেন: পান করো, মাতাল হয়োনা। -তাহাবি।
কিন্তু যুক্তির নিরীখে যে প্রমাণ দর্শানো হয়, তা হলো: কুরআন স্পষ্টভাবে মদ হারামকরণের যে কারণ উল্লেখ করেছে, তা হলো আল্লাহর স্মরণ থেকে ফিরিয়ে রাখা এবং শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করা। যেমন আল্লাহ বলেন: إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَنُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلوة : ج অর্থ: শয়তান তো মদ ও জুয়ার ভেতর দিয়ে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষই সৃষ্টি করতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখতে চায়।” (সূরা মায়েদা: প্রাগুক্ত)
এই কারণটা কেবল যতটুকু পান করলে নেশার সৃষ্টি হয়, ততটুকুতে বিদ্যমান, তার কমে নয়। সুতরাং যে পরিমাণ পান করলে মানুষ মাতাল হয়, ততটুকু পান করাই হারাম। তবে যে মদ সম্পর্কে ইজমা হয়েছে যে, কম বা বেশি যাই পান করা হোক, তা হারাম, সেটি এ বিধির ব্যতিক্রম। বস্তুতঃ এ জাতীয় কেয়াসকে কুরআন ও সুন্নাহর বাণীর আওতাভুক্ত গণ্য করা হয়। কেননা এ কেয়াসের কারণটা শরিয়ত নিজেই জানিয়ে দিয়েছে।
কাযী বলেছেন: আমার নিকট প্রতীয়মান হচ্ছে, অবশ্য প্রকৃত সত্য আল্লাহই জানেন, যদিও রসূলুল্লাহ সা.-এর উক্তি "প্রত্যেক নেশাকর দ্রব্য হারাম” দ্বারা নেশাকর দ্রব্য মাত্রই হারাম। না বুঝিয়ে যে পরিমাণ সেবন করলে মাতলামি বা মাদকতার সৃষ্টি হয়, তা বুঝানোর অবকাশ রয়েছে, কিন্তু বাহ্যতঃ এ ধারণাই প্রবলতর যে, এ দ্বারা নেশাকর বা মাদক দ্রব্য মাত্রকেই হারাম করা হয়েছে, মাতলামি সৃষ্টি করে এমন পরিমাণকে নয়। কারণ অধিক পরিমাণে সুনিশ্চিত ক্ষতি নিহিত থাকা সত্ত্বেও এমন হওয়া অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ ও তার রসূল মাতাল হওয়ার উপায় ও পন্থাকে রোধ করার ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করার লক্ষ্যে মাতলামি সৃষ্টিকারী বস্তুর কম বা বেশি উভয় পরিমাণকে নিষিদ্ধ করে থাকতে পারেন। তাছাড়া শরিয়তের বিধান থেকে তো সর্বসম্মতভাবে প্রমাণিত যে, শরিয়ত মদকে পুরোপুরিভাবেই নিষেধ করেছে, বেশি পরিমাণকে নয়। তাই মদের কারণটি অর্থাৎ মাতলামি বা মাদকতা বা নেশা যে জিনিসেই পাওয়া যাবে, তা মদ বলেই গণ্য হবে। যারা এ ক্ষেত্রে পরিমাণ কম বা বেশি হওয়াতে পার্থক্য আছে বলে মনে করেন, পার্থক্যের স্বপক্ষে প্রমাণ উপস্থিত করার দায়িত্ব তাদের উপরই বর্তায়। এমনকি যারা এ হাদিসকে সহীহ বলে স্বীকার করেননা, "যে জিনিস বেশি সেবন করলে মানুষ মাতাল হয়, তার কম পরিমাণও হারাম" তাদের এ অস্বীকৃতি সত্ত্বেও উপরোক্ত বক্তব্য অপরিবর্তনীয় থাকবে। কারণ এটি বিতর্কিত হলেও ওহির বাণী হিসেবেই উপস্থাপিত, আর ওহির বাণীকে কেবল মানবীয় কেয়াস বা যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে বিতর্কিত মনে করাও অগ্রাহ্য করা বৈধ নয়।
তাছাড়া শরিয়ত স্বয়ং সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, মদে ক্ষতি ও উপকারিতা উভয়ই রয়েছে। আল্লাহ বলেছেন: "তুমি বলো, মদে ও জুয়ায় বিরাট গুনাহ রয়েছে, আবার মানুষের জন্য উপকারিতাও রয়েছে।" যুক্তি ও কেয়াসের দাবি ছিলো উপকারিতা লাভের জন্য ক্ষতিকে দূরীভূত করা কাম্য হলে মদের স্বল্প পরিমাণকে বৈধ ও বেশি পরিমাণকে অবৈধ করা যেতে পারে। কিন্তু শরিয়ত যখন মদের উপকারিতার বিধানের চেয়ে ক্ষতির বিধানকে অগ্রগণ্য করেছে এবং তার পরিমাণ কম হোক বা বেশি হোক, নিষিদ্ধ করেছে, তখন মদ হারামকরণের এই কারণ যে বস্তুতেই পাওয়া যাবে, তাতেই এই বিধি বলবত হবে। অর্থাৎ কম বেশি নির্বিশেষে হারাম হবে। তবে যখন শরিয়তসম্মত কোনো পার্থক্য প্রমাণিত হবে, তখন এই বিধির ব্যতিক্রম ঘটবে।
ফকিহগণ এ ব্যাপারেও একমত হয়েছেন যে, নির্যাস সেবন করা ততক্ষণ হালাল, যতক্ষণ তাতে মদের ন্যায় তীব্র মাদকতা না জন্মে। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তোমরা নির্যাস পান করো। তবে জেনে রাখো, প্রত্যেক নেশাকর জিনিস হারাম।" তা ছাড়া জানা গেছে, রসূলুল্লাহ সা. নির্যাস পান করতেন, কিন্তু দ্বিতীয় দিন বা তৃতীয় দিন তা ঢেলে ফেলতেন। এ থেকে দু'টো বিষয়ে ফকিহদের মতভেদ হয়েছে: প্রথমতঃ কোন্ কোন্ পাত্রে নির্যাস সংরক্ষণ করা যাবে, সে সম্পর্কে, দ্বিতীয়তঃ পাকা ও কাঁচা খেজুরের নির্যাস এবং খোরমা ও কিসমিসের নির্যাস সম্পর্কে।
📄 মদের কয়েকটি প্রসিদ্ধ শ্রেণী
বাজারে বিভিন্ন নামের মদ পাওয়া যায়। এলকোহলের মাত্রা কম বা বেশি হওয়া সাপেক্ষে এগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। যেমন ব্রান্ডি, হুইসকি, রোম, লিকের ইত্যাদি। এগুলোতে এলকোহলের মাত্রা শতকরা ৪০ থেকে ৭০ ভাগ পর্যন্ত হয়ে থাকে। অপরদিকে জিন, হল্যান্ডি, জেনেভা প্রভৃতিতে এলকোহলের মাত্রা থাকে শতকরা ৩৩ ভাগ থেকে ৪০ ভাগ পর্যন্ত। পোর্ট, শেরি, ম্যাডেরা প্রভৃতিতে ১৫ থেকে ২৫ ভাগ পর্যন্ত এলকোহল থাকে। আর ততোধিক হালকা মদ ক্লার্ট, হুক, শ্যাম্পেল, বার্গেন্ডী প্রভৃতিতে থাকে ১০ থেকে ১৫ ভাগ। আরো হাল্কা বেয়ার যথা এইল, বোর্টার, এটুট, মিডনিখ প্রভৃতিতে ২ থেকে ৯ ভাগ পর্যন্ত এলকোহল থাকে। শেষোক্ত ধরনের স্বল্প মাত্রার মদ হিসেবে বৃযা, কাসাব প্রভৃতির নামও উল্লেখযোগ্য।
📄 মদ ও সংরক্ষিত নির্যাস পান
ঝাঁজ ও ফেনাযুক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ফলের রস বা নির্যাস পান করা জায়েয। কেননা আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজায় আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমি জানতে পারলাম রসূলুল্লাহ সা. রোযা রেখেছেন। তাই আমি লাউয়ের ডুগায় সংরক্ষিত ফলের রস নিয়ে তার ইফতারির জন্য অপেক্ষায় থাকলাম। তারপর তা নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম। তখন দেখলাম, তাতে ফেনা এসে গেছে। তা দেখে রসূলুল্লাহ সা. বললেন : ওটা এই দেয়ালের উপর ছুড়ে ফেলো। কেননা এটা যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করেনা, তার পানীয়।” আহমদ বর্ণনা করেছেন, ইবনে উমর নির্যাস সম্পর্কে বললেন: এ জিনিসটাকে যতদিন তার শয়তান আক্রান্ত না করে ততদিন পান করো। জিজ্ঞাসা করা হলো: কতদিনে তাকে শয়তান আক্রান্ত করে? তিনি বললেন: তিন দিনে। মুসলিম প্রমুখ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি (ইবনে আব্বাস) রসূলুল্লাহ সা.-এর জন্য কিসমিস পানিতে ভিজাতেন। তিনি সেই পানি ঐদিন, পরের দিন ও তারপরের দিনের বিকাল পর্যন্ত পান করতেন। তারপর তা পরিচারককে পান করাতেন কিংবা ফেলে দিতেন। আবু দাউদ বলেন: পরিচারককে পান করানো অর্থ হলো, তাতে বিকৃতির লক্ষণ পরিদৃষ্ট হতো। আর এ অবস্থার সৃষ্টি হতো তিন দিনের পর। মুসলিম বর্ণনা করেন: আয়েশা রা. রসূলুল্লাহ সা.-এর জন্য সকালে ফলের নির্যাস করে রাখতেন। রাতের খাবারের পর তা পান করাতেন। যদি কিছু উদ্বৃত্ত থাকতো তবে তা ঢেলে ফেলতেন অথবা পাত্রটা খালি করতেন। তারপর রাতে পুনরায় নির্যাস তৈরি করতেন। সকাল বেলায় সকালের খাবারের পর তা পান করতেন। আর সকালে ও বিকালে মশক ধোয়া হতো। এ হাদিস ইবনে আব্বাসের হাদিসের বিরোধী নয় যে, তিনি তৃতীয় দিন বিকাল পর্যন্ত নির্যাস পান করতেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, রসূলুল্লাহর জীবনী থেকে এ কথা সুবিদিত যে, তিনি কখনো মদ পান করেননি। নবুয়্যতের আগেও নয়, পরেও নয়। তিনি কেবল এমন নির্যাস পান করতেন, যা তখনো মদে পরিণত হয়নি।
📄 মদ যখন সিরকায় পরিণত হয়
আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, মদ যখন আপনা থেকে সির্কায় রূপান্তরিত হয়, তখন তা পান করা জায়েয। আর যখন তাকে সির্কায় রূপান্তরের ইচ্ছা করা হয়, তখন ফকিহদের তিন রকমের অভিমত পাওয়া গেছে: ১. হারাম ২. মাকরূহ ৩. মুবাহ (বৈধ)। শেষোক্ত মতটি উমর ইবনুল খাত্তাব, শাফেয়ি, আহমদ, সুফিয়ান সাওরি, ইবনুল মুবারক, আতা ইবনে আবি রাবাহ, উমর ইবনে আবদুল আযীয ও আবু হানিফার। হাদিসের সাথে কেয়াসের অর্থাৎ যুক্তির বিরোধ ও হাদিসের ব্যাখ্যা নিয়ে মতবিরোধই এই মৃতভেদের কারণ। কেননা আবু দাউদ, মুসলিম ও তিরমিযি আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন : "আবু তালহা রসূলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞাসা করলেন: কতিপয় ইয়াতিম উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু মদের মালিকানা লাভ করেছে। এমতাবস্থায় ঐ মদ কী করা হবে? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: ওটা ফেলে দাও। আবু তালহা বললেন: আমি কি মদটাকে সির্কায় পরিণত করতে পারিনা? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: না।"
এখন যে ব্যক্তি বুঝেছেন যে, এ হাদিসে হারামের পথ বন্ধ করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি এ হাদিস থেকে সির্কায় পরিণত করার ইচ্ছা করাকে মাকরূহ সাব্যস্ত করেছেন। আর যিনি দেখতে পেয়েছেন যে, কোনো কারণের উল্লেখ ব্যতিরেকেই এতে মদকে সির্কায় পরিণত করতে নিষেধ করা হয়েছে। তিনি এ দ্বারা উক্ত কাজকে হারাম সাব্যস্ত করেছেন। একইভাবে এ হাদিস থেকে এ সিদ্ধান্তেও আসা যায় যে, যারা কোনো নিষিদ্ধ বস্তু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার নিষেধাজ্ঞা ফিরে আসেনা বলে মনে করেন, তারা সির্কায় রূপান্তরিত মদকে হারাম মনে করোনা। খাত্তাবি বলেছেন : এ হাদিসে দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মদকে সির্কায় রূপান্তরের চেষ্টা করা অবৈধ। তা যদি বৈধ হতো, তবে ইয়াতিমের সম্পত্তিকে এভাবে হালাল বস্তুতে রূপান্তরিত করে সংরক্ষণ করা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাড়ানোর চেষ্টা অধিকতর মহৎ কাজে পরিগণিত হতো। কেননা ইয়াতিমের সম্পত্তি সংরক্ষণ করা ওয়াজিব। তাছাড়া রসূলুল্লাহ সা. যে কোনো সম্পত্তি বিনষ্ট করতে নিষেধ করেছেন। মদকে ফেলে দেয়া যে তা নষ্ট করারই শামিল, তা বলাই বাহুল্য। কাজেই বুঝা গেলো, মদকে কোনো রূপান্তর প্রক্রিয়ায় পবিত্র করা ও সাধারণ সম্পত্তিতে পরিণত করা সম্ভব নয়।
সির্কাকে হারাম প্রতিপন্নকরণের বিরুদ্ধে যে কেয়াস বা যুক্তি প্রদর্শন করা হয় তা হলো, শরিয়তের এ মূলনীতি সুবিদিত যে, শরিয়তের বিভিন্ন বিধান বিভিন্ন জিনিসের উপর প্রযোজ্য। মদ ও সির্কা দুটো ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। মদ সর্বসম্মতভাবে হারাম, আর সির্কা সর্বসম্মতভাবে হালাল। আর মদ যখন সির্কায় রূপান্তরিত হয়েছে, তখন তা অবশ্যই হালাল হয়েছে, চাই তা যে উপায়েই রূপান্তরিত হয়ে থাকনা কেন।