📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মদ নিষিদ্ধকরণে পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপ

📄 মদ নিষিদ্ধকরণে পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপ


রসূলুল্লাহ সা. মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পূর্বে লোকেরা ব্যাপকভাবে মদপান করতো। হিজরতের পর মদ ও জুয়া উভয়টি সম্পর্কে মুসলমানদের জিজ্ঞাসা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলো। কেননা তারা এই দুটি জিনিসের অনেক কুফল প্রত্যক্ষ করতো। তখন আল্লাহ তা'য়ালা নাযিল করলেন: يَسْتَلُونَكَ عَنِ الْخَيْرِ وَالْمَيْسِرِ ، قُلْ فِيْهِمَا إِثْرٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَ وَاثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَّفْعِهِمَا অর্থ: "তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বলো: এ দু'টি জিনিসে বিরাট পাপও রয়েছে, অনেক উপকারিতাও রয়েছে। তবে এ দু'টি জিনিসের পাপ তাদের উপকারিতার চেয়ে অধিক।" (সূরা আল বাকারা, ২১৯)
অর্থাৎ মদ ও জুয়ার গুনাহ অনেক বড়। কেননা উভয়ের দ্বারা বিপুল ধর্মীয় ও বস্তুগত ক্ষতি সাধিত হয়। এ দু'টিতে মানুষের কিছু উপকারও সাধিত হয়। এই উপকারিতা বস্তুগত এবং তা হচ্ছে: মদের ব্যবসায়ে বিপুল মুনাফা, আর জুয়ায় বিনা পরিশ্রমে অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এ দু'টিতে যে গুনাহ হয়, তা তাদের উপকারিতার চেয়ে বড়। এভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এ দু'টি জিনিসের নিষিদ্ধ হওয়ার দিকটি অধিকতর প্রবল। তবে সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষিত হয়নি। এর কিছুদিন পর নামাযের মধ্যে মদপান হারাম ঘোষণা করে আয়াত নাযিল হয়। মদের প্রতি জনগণের তীব্র আসক্তি থাকায় ও তারা একে তাদের জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলায় মদকে এভাবে ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ করতে হয়েছে। আল্লাহ বলেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلوةَ وَانْتُمْ سُكَرَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ অর্থ: "হে মুমিনগণ, তোমরা যখন মাতাল থাকো, তখন নামাযের নিকটবর্তী হয়োনা যতক্ষণ না বুঝতে পারো তোমরা কি বলছো।" (আন নিসা: আয়াত ৪৩)
এ আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ হলো, এক ব্যক্তি মদ খেয়ে মাতাল থাকা অবস্থায় নামায পড়ছিল এবং সে সূরা কাফিরুন বিকৃতভাবে এভাবে পড়েছিল: "বলো হে কাফেরগণ তোমরা যার পূজা করো, আমিও তার পূজা করি।" আসলে সূরায় রয়েছে "তোমরা যার পূজা করো, আমি তার পূজা করিনা।"
এটা ছিলো মদ নিষিদ্ধকরণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। এরা কিছুদিন পর চূড়ান্তভাবে মদকে হারাম ঘোষণা করে নাযিল হলো: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَنُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلُوةِ ، فَهَلْ أَنْتُمْ منتهون Ο অর্থ : হে মুমিনগণ। মদ, জুয়া, আস্তানা ও ভাগ্যনির্ধারক শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া আর কিছু নয়। অতএব, তোমারা এগুলো বর্জন করো, যাতে তোমরা কল্যাণ লাভ করো। শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে কেবল শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে ও নামায থেকে বিরত রাখতে চায়। অতএব তোমরা কি এখনো (মদ ও জুয়া) বর্জন করবে?” (মায়েদা : ৯০-৯১)
এখানে সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ তায়ালা জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্যনির্ধারক শরগুলোকে মদের সাথে আতত্ত্ব বা সংযোজন করেছেন এবং সবকটি জিনিস সম্পর্কে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন যে, যেহেতু এগুলো:
১. নোংরা ও অপবিত্র কাজ,
২. শয়তানের কাজ, তার প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র,
৩. উল্লিখিত কারণে মুমিনদের জন্য এগুলো বর্জন করা অবশ্য কর্তব্য, যাতে মানুষ কল্যাণ ও সফলতা অর্জন করতে পারে।
৪. মদপান ও জুয়া খেলায় প্ররোচনা দেয়ার পেছনে শয়তানের উদ্দেশ্য হলো, মুমিনদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করা এবং এটা হলো এর পার্থিব ক্ষতি।
৫. এর পেছনে শয়তানের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো মুমিনদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখা ও নামায থেকে উদাসীন করা। আর এটা হচ্ছে এর পরকালীন ক্ষতি।
৬. এসবের দাবি হলো, এ জিনিসগুলো সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা। বস্তুত মদ সংক্রান্ত বিধির ব্যাপারে এটি সর্বশেষ নাযিল হওয়া আয়াত এবং এ আয়াত মদকে চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
আব্দ বিন হুমাইদ আতা থেকে বর্ণনা করেছেন: মদ নিষিদ্ধ করলে প্রথম নাযিল হয় সূরা বাকারার ২১৯ নং আয়াত; "তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বলো: এ দুটি জিনিসে বিরাট পাপও রয়েছে। অনেক উপকারও রয়েছে। তবে এ দুটি জিনিসের পাপ তাদের উপকারের চেয়ে অধিক।" এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর কতক লোক বললো:
"মদে কিছু উপকার যখন আছে, তখন সেজন্যই আমরা মদপান করবো।" অন্যেরা বললো : "ওতে কোনো উপকার নেই। ওতে কেবল পাপ রয়েছে।” তারপর নাযিল হলো সূরা নিসার ৪৩ নং আয়াত: “হে মুমিনগণ! মদ মাতাল অবস্থায় তোমরা নামাযের নিকটবর্তী হয়োনা যতক্ষণ না তোমরা যা বলো তা বুঝতে পারো।" এবার কতক লোক বললো, "আমরা মদপান করে বাড়িতে বসে থাকবো।" অন্যরা বললো: "যে জিনিস আমাদেরকে মুসলমানদের সাথে জামাতে নামায পড়তে দেয়না তাতে কোনো কল্যাণ নেই।” এবার সূরা মায়েদার ৯০-৯১ নং আয়াত নাযিল হলো “হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, আস্তানা ও ভাগ্যনির্ধারক শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ... অতএব তোমরা কি এখনো এগুলো বর্জন করবেনা?” এ আয়াতের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে এগুলো নিষেধ করা হলো। ফলে মুসলমানগণ মদ পান সম্পূর্ণরূপে বর্জন করলো। এই চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা নাযিল হয় আহযাব যুদ্ধের পর। যখন উক্ত আয়াতের শেষাংশ "অতএব তোমরা কি এখনো এগুলো বর্জন করবেনা" উমর রা. শুনলেন, তখন তিনি বুঝলেন এটা "তোমরা বর্জনকরো" বলার চেয়ে অনেক বেশি কঠোর হুমকিসূচক। তাই তিনি তৎক্ষণাত বললেন: “আমরা বর্জন করলাম।” আর রসূলুল্লাহ সা. একজন ঘোষক পাঠিয়ে মদিনার ওলিগলিতে ঘোষণা করিয়ে দিলেন যে, "শুনে নাও, মদ হারাম হয়ে গেছে।” তৎক্ষণাত মদের মটকাগুলো ভেঙ্গে ফেলা হলো এবং মদিনার ওলিগলিতে মদের সয়লাব বয়ে গেলো।
কাতাদাহ বলেন: আল্লাহ সূরা মায়েদায় মদ হারাম করেছেন আহযাব যুদ্ধের পর। এই যুদ্ধ চতুর্থ বা পঞ্চম হিজরীতে সংঘটিত হয়। ইবনে ইসহাক বলেন: চতুর্থ হিজরীতে বনু নযীর অভিযানের সময় মদ নিষিদ্ধ হয়। দিময়াতী বলেন: ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার বছর মদ নিষিদ্ধ হয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মদ নিষিদ্ধকরণে ইসলামের কঠোরতা

📄 মদ নিষিদ্ধকরণে ইসলামের কঠোরতা


মদের প্রতি নিষেধাজ্ঞা ইসলামের নীতি ও আদর্শের সাথে সর্বোতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা ইসলামের সকল নীতি ও আদর্শের লক্ষ্য হচ্ছে দেহ, মন ও বুদ্ধির দিক দিয়ে দৃঢ় ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা। অথচ মদ যে ব্যক্তিত্বকে দুর্বল করে দেয় এবং বুদ্ধিমত্তাকে বিনষ্ট করে দেয়, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। জনৈক কবি বলেন: "আমি মদপান করলাম। এর ফলে আমার বুদ্ধি বিভ্রম ঘটলো। মদ এভাবেই বুদ্ধিতে বিকল ও বিভ্রান্ত করে দেয়।” আর যখন বুদ্ধি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তখন মানুষ একটা নিকৃষ্ট পশুতে পরিণত হয় এবং তার দ্বারা অগণিত অপকর্ম সংঘটিত হয়। হত্যা, যুদ্ধ, ব্যভিচার, গোপন তথ্য ফাঁস ও দেশের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি মদ পানের কয়েকটি কুফল। মদপানের এ কুফল মানুষের নিজ ব্যক্তি সত্তার উপর এবং তার বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশিদের উপর সমভাবে প্রভাব বিস্তার করে। আলী রা. থেকে বর্ণিত: একদিন তিনি তার চাচা হামযার সাথে ছিলেন। আলির দু'টো বৃদ্ধ উটনী ছিলো। তার ইচ্ছা ছিলো, সুগন্ধীযুক্ত উদ্ভিদ ইযখির সংগ্রহ করে উটনীদের উপর বহন করে জনৈক ইহুদী স্বর্ণকারকে সাথে নিয়ে অন্যান্য স্বর্ণকারদের নিকট নিয়ে বিক্রি করবেন। যাতে এর বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে তিনি ফাতেমার ওয়ালিমা সম্পাদন করতে পারেন। এ সময় তার চাচা হামযা কতিপয় আনসারের সাথে মদপান করছিলেন। তার সাথে জনৈক গায়িকা গান গাইছিল। (পর্দা ও মদ সংক্রান্ত বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে)। ঐ গায়িকা এমন একটা গান গাইল, যা দ্বারা সে হামযাকে উটনী দু'টি যবাই করে উভয় উটনীর দেহের মজাদার অংশগুলো খেতে উদ্বুদ্ধ করলো। গানটি শোনামাত্র হামযা ঝাপিয়ে পড়লো, উটনী দুটি যবাই করে তাদের চুট কেটে নিলেন ও কলিজা বের করে নিলেন। আলী যখন এ কাণ্ড দেখলেন, তখন এত মর্মাহত হলেন যে, চোখের পানি সংবরণ করতে পারলেননা এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট হামযার নামে অভিযোগ দায়ের করলেন। রসূলুল্লাহ সা. হামযার কাছে এলেন। তাঁর সাথে ছিলো আলী ও যায়দ বিন হারেসা। তিনি তার উপর রাগান্বিত হলেন এবং তাকে তিরস্কার করতে লাগলেন। হামযা তখন মাতাল ছিলেন। তার চোখ লাল বর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি রসূলুল্লাহ সা. ও তার সাথিদের দিকে তাকিয়ে বললেন: "তোমরা তো আমার পিতার দাস ছাড়া কিছু নও।” রসূলূল্লাহ সা. বুঝতে পারলেন যে, হামযা মাতাল, তখন পেছন ফিরে সাথিদের নিয়ে চলে গেলেন। মদ এভাবেই পানকারীর মাথা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে এবং বোধশক্তি ছিনিয়ে নেয়। এজন্য ইসলাম একে "উম্মুল খাবায়েস” অর্থাৎ সকল নোংরামির জননী নামে আখ্যায়িত করেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, মদ হলো সমস্ত নোংরা কাজের জননী।" আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বলেন: "মদ হচ্ছে সকল অশ্লীলতার জননী এবং মদ পান নিকৃষ্টতম কবীরা গুনাহ। যে ব্যক্তি মদপান করে সে নামায ত্যাগ করে এবং নিজের মা, খালা ও ফুফুকে পর্যন্ত ধর্ষণ করে।"
মদকে সকল নোংরামীর জননী আখ্যায়িত করার পর ইসলাম তার প্রতি নিষেধাজ্ঞাকেও কঠোরতর করেছে। মদ পানকারীকে ও এর সাথে সম্পর্ক রাখে এমন প্রত্যেককে অভিসম্পাত দিয়েছে এবং তাকে ঈমান বহির্ভূত ঘোষণা করেছে। আনাস রা. থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ সা. মদের সাথে সংশ্লিষ্ট দশ ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন: মদ প্রস্তুতকারী, গ্রহণকারী, পানকারী, বহনকারী, যার নিকট বহন করে নেয়া হয়, যে পান করায়, যে বিক্রি করে, যে এর বিক্রয়লব্ধ অর্থ ভোগ করে, যার জন্য মদ ক্রয় করা হয় এবং যে ক্রয় করে।” (ইবনে মাজাহ, তিরমিযি) আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত: রসূলূল্লাহ সা. বলেন: "ব্যভিচারকারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করেনা, মদখোর মুমিন অবস্থায় মদ পান করেনা, চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করেনা।" -আহমদ, বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি।
(এ হাদিসের ব্যাখ্যা এই যে, মদ পানকারী, ব্যভিচারকারী ও চোর এসব অপকর্ম যখন করে, তখন তার মধ্যে যথার্থ ঈমান থাকেনা। কেননা ঈমান এসব কাজকে হারাম ও নিষিদ্ধ এবং এগুলোকে আল্লাহর আযাব ও ক্রোধের কারণ বলে বিশ্বাস করার নাম। এসব কাজকে আল্লাহর আযাব ও ক্রোধের কারণ বলে বিশ্বাস করলে তা তাকে এগুলো থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করতো। কেউ কেউ বলেন, ঈমান এ ধরনের কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির কাছ থেকে চলে যায় এবং যতক্ষণ ঐ গুনাহে লিপ্ত থাকে ততক্ষণ তার কাছ থেকে দূরে থাকে। পরে তওবা করলে ফিরে আসে। কেউ কেউ বলেন: এ দ্বারা পূর্ণাঙ্গ ঈমান বুঝানো হয়েছে। তবে প্রথম মতটাই অধিকতর বিশুদ্ধ বলে ইমাম গাজ্জালী অভিমত ব্যক্ত করেছেন।)
দুনিয়ায় মদ পানকারীর জন্য এই শাস্তিও নির্ধারিত হয়েছে যে, সে আখেরোতের পবিত্র মদ পান করতে পারবে না। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি দুনিয়ায় মদপান করে এবং তওবা করে না, সে আখেরাতে মদপান করতে পারবেনা। এমনকি বেহেশতে গেলেওনা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 খৃষ্ট ধর্মে মদের নিষেধাজ্ঞা

📄 খৃষ্ট ধর্মে মদের নিষেধাজ্ঞা


মদ যেমন ইসলামে হারাম, তেমনি খৃস্টধর্মেও তা হারাম। ১৯২২ সালে মিশরের খৃস্টধর্মের পাদ্রীগণ সর্বসম্মতভাবে যে ফতোয়া দেন, তা সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ: "সকল আসমানী কিতাব মানবজাতিকে নেশা জাতীয় দ্রব্য থেকে দূরে থাকার আদেশ দিয়েছে।" সিরিয়ার খৃস্টান পাদ্রীগণও পবিত্র গ্রন্থের বরাত দিয়ে সকল নেশাকর দ্রব্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বলেছেন: “মোটকথা, সার্বিকভাবে যাবতীয় নেশাকর মাদক সকল আসমানী গ্রন্থে নিষিদ্ধ, চাই তা আংগুর, জব, খোরমা, মধু, আপেল বা অন্য কিছু দিয়ে তৈরি করা হোক।” আফসুমবালীকে পল বলেছিলেন: "মদপান করে মাতাল হয়োনা। ... কেননা মাতালরা আকাশের রাজত্বের উত্তরাধিকারী হয়না।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মদের ক্ষতি

📄 মদের ক্ষতি


ড. আব্দুল ওহাব খলীল লিখিত 'আততামাদ্দুনুল ইসলামী' নামক গ্রন্থে মদের শারীরিক, মানসিক ও চারিত্রিক ক্ষতিগুলোর বিবরণ দেয়া হয়েছে। সেই সাথে এসব ক্ষতি থেকে ব্যক্তি ও সমাজের জীবনে যে সকল খারাপ প্রভাব পড়ে তারও বিবরণ দিয়েছেন। বলা হয়েছে, আমরা যদি ধর্মীয় নেতা, চিকিৎসা বিজ্ঞানী, নৈতিক বিশেষজ্ঞ, সমাজ বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের নেশাকার ও মাদকদ্রব্য সেবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করি, তবে তাদের সবাই একই জবাব দেবে: এগুলো সেবন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কেননা এতে মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়।
ধর্মীয় নেতারা বলেন: এটা হারাম। কারণ এটা সকল নোংরামির জননী। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলেন: এটা মানব জাতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে মারাত্মক হুমকি। শুধু এজন্য নয় যে, এর বিষাক্ত প্রভাব সরাসরি দেহের ক্ষতি সাধিত করে, বরং এ জন্যও যে, এর সুদূরপ্রসারী পরিণাম হচ্ছে যক্ষ্মা। তাছাড়া মদ মানব দেহকে দুর্বল করে এবং বহু সংখ্যক রোগের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। শরীরের সকল অভ্যন্তরীণ অংগ প্রতংগ বিশেষতঃ পাকস্থলীর ক্ষতি সাধিত করে। আর স্নায়ুমণ্ডলীরও মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। এজন্য এটা যদি অধিকাংশ স্নায়বিক রোগের কারণ হয়ে দেখা দেয় এবং উন্মাদ ও অবসাদ জাতীয় রোগের প্রধান কারণ হয়ে দেখা দেয় এতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আর তাও শুধু মদ পানকারীর জন্য নয়। বরং তার উত্তর পুরুষদের জন্যও।
বস্তুত মদ ও মাদক দ্রব্য নিঃসন্দেহে মানবজাতির জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ, যাবতীয় দুঃখ, দৈন্য ও দুর্ভাগ্যের কারণ এবং দারিদ্র্য ও লাঞ্ছনার জীবাণু। এই নিকৃষ্ট বস্তু যে জাতির উপর আপতিত হবে, সে জাতিকে তা ধ্বংস করে ছাড়বে। শারীরিক, আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সর্বদিক দিয়েই তাকে সর্বশান্ত করে ছাড়বে।
নীতিবীদরা তারা বলেন: যেহেতু সততা, শ্লীলতা, ভদ্রতা, শিষ্টতা, মহত্ত্ব ও মহানুভবতাকে সংরক্ষণ করা মানুষের দায়িত্ব, তাই এই মহৎ গুণগুলোকে বিনষ্ট করে এমন কোনো জিনিস মোটেই সেবন করা তার পক্ষে উচিত নয়। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন: সমাজের শান্তি ও শৃংখলা ব্যাহত করে এমন কোনো তৎপরতা দ্বারা সমাজকে কলুষিত করা উচিত নয়, যাতে সমাজে সর্বোচ্চ মাত্রার শান্তি ও শৃংখলা বজায় থাকে। সামাজিক শান্তি ও শৃংখলা যখনই ব্যাহত হয়, তখনই দেখা দেয় নৈরাজ্য। অপরদিকে একথাও সত্য যে, নৈরাজ্য কলহ কোন্দল ও বিভেদ সৃষ্টি করে। আর বিভেদ শত্রুদের উপকার সাধন করে। অর্থনীতিবিদগণ বলেন: মানুষ একটি টাকাও যদি সমাজের উপকারার্থে ব্যয় করে, তবে তা সমাজের ও দেশের শক্তি বৃদ্ধি করে। আর একটি টাকাও যদি সমাজের ক্ষতিকর কাজে ব্যয় হয়, তবে তা সমাজ ও দেশের সর্বনাশ ডেকে আনে। সুতরাং রকমারি মদ ও মাদক সেবনে যে কোটি কোটি টাকা অকারণে ব্যয় হয়, তা দেশের ক্ষতি সাধন করে বিরাট আকারে। তা আমাদের অর্থনীতিতে ধস নামায় এবং আমাদের মনুষ্যত্ব ও মহত্ত্বের বিপর্যয় ঘটায়।
এসব কারণে আমরা মনে করি, আমাদের বিবেক আমাদেরকে মদ পান থেকে বিরত থাকতে আদেশ দেয়। আর সরকার যদি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে ইচ্ছুক হয়, তবে সেটা যাতে বিনা পরিশ্রমে ও বিনা অর্থ ব্যয়ে পেতে পারে, সে জন্য আমরা উল্লেখ করেছি যে, সকল বৈজ্ঞানিকরা বিভাগের এর ক্ষতিকর হওয়া সম্পর্কে একমত। আর যেহেতু সরকার জনগণেরই অংশ, তাই জনগণ তাদের সরকারের নিকট স্বভাবতই প্রত্যাশা করে যে, তাদের জন্য যা কিছু অনিষ্টকর ও কষ্টদায়ক, তা দূর করবে। কেননা শাসকগণ শাসিতদের জন্য দায়ী।
মাদক সেবন থেকে জনগণকে বিরত রাখলে তারা সুস্থ, সবল, দৃঢ়চেতা ও পরিপক্ষ বুদ্ধির অধিকারী হয়ে গড়ে উঠবে। দেশের স্বাস্থ্যের মান উন্নয়নে এটা একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অনুরূপ, এটা নৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মান উন্নয়নের প্রধান অবলম্বন। কেননা মাদকসেবীদের সংখ্যা যত কমবে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষতঃ আইন মন্ত্রণালয়ের ঝক্কি ঝামেলা ততই কমবে। আদালতের আসামী ও কারাগারের কয়েদীর সংখ্যা কমতে কমতে একদিন হয়তো শূন্যের কোটায় নেমে যাবে এবং কারাগার হয়তো কয়েদী শূন্য হয়ে বিভিন্ন সামাজিক সংস্কারের কেন্দ্রে রূপান্তরিত হবে। এই হচ্ছে সভ্যতা ও কৃষ্টি। এই হচ্ছে উন্নতি ও অগ্রগতির রহস্য। আর এই হচ্ছে জাতিসমূহের উন্নতির মাপকাঠি। আর এভাবেই আমরা আমাদের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে পারি। এই সহযোগিতার জন্য ফলদায়ক কাজ করার সুযোগ অবারিত ও ময়দান সুপ্রশস্ত। আল্লাহ বলেন: وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولَهُ وَالْمُؤْمِنُونَ . অর্থ: তুমি বলো, তোমরা কাজ করে যাও। তোমাদের কাজ আল্লাহ, তার রসূল ও মুমিনগণ প্রত্যক্ষ করবেন।" (সূরা তওবা: আয়াত ১০৫)
মদ ও মাদক দ্রব্যের এসব ক্ষতি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই শুভবুদ্ধি সম্পন্ন কিছু দেশ মদ জাতীয় যাবতীয় নেশাকর দ্রব্য সেবন প্রতিহত করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। মদ-মাদক সেবন প্রতিরোধে সচেষ্ট দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। "তানকীহাত" (ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব) নামক গ্রন্থে সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী লিখেছেন, "মার্কিন সরকার মদ নিষিদ্ধ করেছে এবং সে দেশ থেকে তা উচ্ছেদ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। আধুনিক যাবতীয় প্রচার মাধ্যম যথা পত্রপত্রিকা, সাময়িকী, ছবি, ছায়াছবি, সভা সমাবেশ ইত্যাদির সাহায্যে এর ক্ষয়ক্ষতি প্রচার করা ও এটি পান করার প্রতি ধিক্কার দেয়ার ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে। মদ বিরোধী প্রচারণায় যুক্তরাষ্ট্র ষাট মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে। আর যেসব বই পুস্তক ও প্রচারপত্র প্রচার করেছে, তার পরিমাণ দশ বিলিয়ন পৃষ্ঠা। তারা মদ নিষিদ্ধকরণ আইন বাস্তবায়নে চৌদ্দ বছরে যে অর্থ ব্যয় করেছে, তা ২৫০ মিলিয়ন পাউণ্ডের কম নয়। এজন্য ৩০০ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড, ৫৩২৩৩৫ জনকে কারাদণ্ড, ১৬ মিলিয়ন পাউণ্ড জরিমানা এবং ৪০৪ মিলিয়ন পাউণ্ড মূল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। কিন্তু এসব কিছু মার্কিনীদের মদের আসক্তি ও জিদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি শেষ পর্যন্ত ১৯৩৩ সালে সরকার এই আইন প্রত্যাহার করতে ও সারাদেশে অবাধে মদ পান বৈধ করতে বাধ্য হয়েছে।"
বিপুল চেষ্টা সাধনা চালিয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মদ নিষিদ্ধ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
কিন্তু ইসলাম যেহেতু জনগণকে ধর্মীয় প্রেরণার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তাদের হৃদয়ে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি ঈমানের বীজ বপন করেছে এবং তাদের বিবেককে সর্বোত্তম আদর্শ ও সৎ কর্মের শিক্ষা দ্বারা উজ্জীবিত করেছে, তাই তাকে এত কিছু করতে হয়নি, এত চেষ্টা সাধনা চালাতে হয়নি। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কেবল একটি বাক্য উচ্চারিত হয়েছে এবং উচ্চারিত হওয়া মাত্রই সবার মন তা নির্বিবাদে মেনে নিয়েছে। বুখারি ও মুসলিম আনাস বিন মালেক থেকে বর্ণনা করেছেন: তোমরা যাকে আঙ্গুর বা খেজুরের নির্যাস নামে আখ্যায়িত করো, তা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো মদ ছিলোনা। এটাই আমি আবু তালহা, আবু আইয়ূব ও রসূলুল্লাহ সা.-এর অন্য কয়েকজন সাহাবীকে আমাদের বাড়িতে পরিবেশন করছিলাম। সহসা এক ব্যক্তি এসে বললো "তোমরা খবর শুনেছ কি?” আমরা বললাম: না। সে বললো "মদ হারাম করা হয়েছে।" তৎক্ষণাত একজন বললো : "হে আনাস, এসব মটকা ঢেলে ফেলো।" আনাস বলেন: "এরপর আর কেউ এ নিয়ে একটি প্রশ্নও করলোনা। আর লোকটি খবর পৌঁছানোর পর কেউ তা নিয়ে অনুসন্ধানও চালালোনা।"
ঈমান মুমিনদেরকে এভাবেই গড়ে তোলে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00