📄 হুদূদকৃত গুনাহের কাফফারা
অধিকাংশ আলেমের মতে, যখন অপরাধীর উপর হুদুদ কার্যকর করা হবে, তখন তা তার কৃত গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে এবং আখেরাতে তাকে আর শাস্তি দেয়া হবেনা। কেননা উবাদা ইবনে সামেত থেকে বুখারি বর্ণনা করেন : আমরা একটা বৈঠকে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে ছিলাম। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন : তোমরা আমার সাথে প্রতীজ্ঞাবদ্ধ হবে যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবেনা, ব্যভিচার করবেনা, চুরি করবেনা এবং ন্যাসঙ্গতভাবে ব্যতীত আল্লাহর নিষিদ্ধকৃত প্রাণ বধ করবেনা। যে ব্যক্তি এ প্রতীজ্ঞা পালন করবে, তার প্রতিদান সে আল্লাহর কাছে পাবে। আর যে ব্যক্তি এসব গুনাহের কোনো একটিতে লিপ্ত হবে এবং তার শাস্তি ভোগ করবে, সেটা তার জন্য কাফফারা (গুনাহ মোচনকারী) হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এসব গুনাহের কোনো একটিতে লিপ্ত হবে এবং আল্লাহ তা আড়াল করে রাখবেন (অর্থাৎ বিচার ও শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন) তার বিষয় টা আল্লাহর বিবেচনাধীন। তিনি চাইলে তাকে মাফ করবেন, নচেত শাস্তি দেবেন।"
হদ কার্যকরকরণ একদিকে গুনাহর কাফফারা অপরদিকে একই সাথে তা অন্যদের জন্য হুঁশিয়ারিও। এটা একাধারে পাপ মোচনকারীও, পাপ থেকে সতর্ককারীও।
📄 দারুল হারবে হদ বাস্তবায়ন
আলেমদের একটি গোষ্ঠীর মতে, হুদুদ যেমন দারুল ইসলামে (ইসলামী রাষ্ট্রে) বাস্তবায়ন করা যায়, তেমনি তা দারুল হারবেও (অমুসলিম শাসিত রাষ্ট্রেও) করা যাবে। কেননা হুদুদ বাস্তবায়নের নির্দেশ সর্বব্যাপী ও সর্বাত্মক, কোনো দেশ বিশেষের জন্য নির্দিষ্ট নয়। ইমাম মালেক ও লাইস বিন সা'দ এই মতের প্রবক্তা। পক্ষান্তরে আবু হানিফা প্রমুখ বলেন: “কোনো সেনাপতি যখন কোনো দারুল হারবে (অমুসলিম দেশে) আক্রমণ পরিচালনা করে, তখন তার সেনাবাহিনীর কোনো সদস্যের উপর 'হদ' প্রয়োগ করবেনা। তবে সে মিশর, সিরিয়া, ইরাক ও অনুরূপ দেশের (মুসলিম) সেনাপতি হলে তার সেনাবাহিনীতে হুদুদ কার্যকর করবে।" ইমাম আবু হানিফার যুক্তি হলো, দারুল হারবে হুদুদ কার্যকর করা হলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি কুফরির পথ অবলম্বনে প্ররোচিত হতে পার। এই মতটিই অগ্রগণ্য। কেননা আল্লাহর শাস্তি যুদ্ধ বিগ্রহের সময় কার্যকর করতে আল্লাহ নিজেই নিষেধ করেছেন। কেননা এর ফলে অধিকতর খারাপ ঘটনা ঘটতে পারে। আহমদ, ইসহাক ও আওযায়ি প্রমুখ ইমাম বলেছেন, শত্রুর ভূমিতে হুদদ কার্যকর করা হবেনা। এর উপর সাহাবীগণ একমত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে আবু মাহজান সাকাফীর ঘটনা উল্লেখযোগ্য। তিনি মদপানে এত বেশি অভ্যস্ত ছিলেন যে, মদপান না করে বেশিক্ষণ থাকতেই পারতেননা। কাদেসিয়ার যুদ্ধে তিনি মদপান করে বসলেন। ফলে সেনাপতি সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস তাকে গ্রেফতার করলেন এবং তার হাত পা রশি দিয়ে বেঁধে রাখার আদেশ দিলেন। যখন উভয়পক্ষ মুখোমুখি হলো, তখন আবু মাহজান বিলাপ করে বলতে লাগলেন : "ঘোড়াগুলো বর্শাসহ দাবড়ানো হবে, আর আমি রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকবো, এর চেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার আর কি থাকতে পারে?" অতপর সা'দের স্ত্রীকে বললেন : আমাকে ছেড়ে দিন। আপনাকে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আল্লাহ যদি আমাকে যুদ্ধের ময়দান থেকে সহিসালামাতে ফিরিয়ে আনেন, তবে এখানেই ফিরে আসবো এবং পুনরায় রশির বাঁধনে পা ঢুকাবো। আর যদি নিহত হই, তবে তো আপনারা আমার কবল থেকে মুক্ত হয়েই গেলেন।” সা'দের স্ত্রী তাঁর বাঁধন খুলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আবু মাহজান সা'দের 'বালকা' একটা ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে পড়লো, একটা বর্শা নিলেন এবং যুদ্ধের ময়দানে ছুটে গেলেন। ময়দানে তিনি এমন শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিলেন, যা দেখে শুধু সা'দ নয়, গোটা মুসলিম বাহিনী হতবাক হয়ে গেলো। তারা ভাবলেন, এ হয়তো কোনো ফেরেশতা যিনি তাদের সাহায্য করতে এসেছেন। শত্রুকে পুরোপুরি পর্যুদস্ত করে তিনি পুনরায় সা'দের তাঁবুতে ফিরে গেলেন এবং নিজে পা দু'খানা পুনরায় বাঁধনে ঢুকালেন। সা'দের স্ত্রী সা'দকে আবু মাহজানের খবর জানালেন। সা'দ তৎক্ষণাত তাকে মুক্ত করে দিলেন। লড়াইতে তার অভাবনীয় কৃতিত্ব যেভাবে মুসলিম বাহিনীকে শক্তি যুগিয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে সা'দ কসম খেলেন যে, আবু মাহজানের উপর মদপানের শাস্তি কার্যকর করবেননা। এরপর আবু মাহজান আর মদপান করবেননা বলে তওবা করলেন। এখানে মদপানের হদ স্থগিত বা রহিত যেটাই করা হোক, তা একটা বৃহত্তর কল্যাণের খাতিরেই করা হয়েছিল। সেটা ছিলো সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য কল্যাণকর। অথচ তার উপর হদ কার্যকর করার ক্ষমতা সাদের ছিলো।
📄 মসজিদে হদ কার্যকর করা নিষিদ্ধ যাতে তা নোংরা না হয়
আবু দাউদ হাকীম বিন হিযাম রা. থেকে বর্ণনা করেছেন : "রসূলুল্লাহ সা. মসজিদে কিসাস কার্যকর করতে, কবিতা আবৃত্তি করতে এবং হদ কার্যকর করতে নিষেধ করেছেন"
📄 বিচারক কি নিজের জানা তথ্যানুযায়ী রায় দিতে পারে?
যাহেরি মাযহাব মনে করে, হুদুদ, কিসাস, রক্তপাত ব্যভিচার ও অর্থসংক্রান্ত বিরোধের ব্যাপারে নিজের জানা তথ্য অনুসারে বিচার করা বিচারকের উপর ফরয। চাই বিচারক হিসেবে নিযুক্তির আগে জানুক বা পরে জানুক। বরঞ্চ তাদের মতে, বিচারক নিজের জানা তথ্য অনুসারে যে রায় দেবে, সেটাই সবচেয়ে শক্তিশালী রায়। কেননা ওটা তার জন্য সুনির্দিষ্ট সত্য তথ্য। এরপর অপরাধীর স্বীকারোক্তি এবং তারপর সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায় দেবে। কেননা আল্লাহ বলেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ بِالْقِسْطِ عُمَدَاءَ لِلَّهِ . "হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে।" (আন নিসা: আয়াত ১৩৫)
আর রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: 'তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ কোনো অন্যায় কাজ দেখবে, সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিহত করে, তা যদি না পারে তবে যেন মুখ দিয়ে করে ...." কাজেই বিচারকের দায়িত্ব হলো ইনসাফ করা। কোনো যুলুমকারীকে তার যুলমের উপর বহাল রাখা ও শুধরে না দেয়া ইনসাফ নয়। আর বিচারক যে অন্যায়ের কথা জানে, তা নিজ হাতে শুধরে দেয়া তার উপর ফরয। প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করা তার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন না করলে বিচারক যালেমে পরিণত হবে।
কিন্তু অধিকাংশ ফকিহের মতে, নিজের জানা তথ্য অনুসারে বিচার করা বিচারকের জন্য বৈধ নয়। আবু বকর রা. বলেছেন: "আমি যদি কোনো ব্যক্তিকে কোনো অপরাধ করতে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করি, তবু আমার নিকট সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত আমি তার উপর হদ কার্যকর করবোনা। যুক্তির বিচারেও একথা সত্য যে, বিচারক অন্য যে কোনো মানুষের ন্যায় একজন সাধারণ মানুষ। তার নিকট পূর্ণ সাক্ষ্য প্রমাণ হস্তগত না হওয়া পর্যন্ত সে নিজে যা কিছুই দেখুক, তদনুযায়ী কিছু বলার অধিকার তার নেই। এমনকি বিচারক যদি কাউকে ব্যভিচার করতে দেখে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আরোপ করে, অথচ তার বিরুদ্ধে পূর্ণ সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে অসমর্থ হয়, তবে সে মিথ্যা অপবাদ আরোপকারী সাব্যস্ত হবে এবং মিথ্যা অপবাদের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য হবে। বিচারকের নিজের জানা তথ্য অনুসারে কথা বলা যখন নিষেধ, তখন তদনুসারে কাজ করাও তার উপর নিষিদ্ধ হবে। এই মতের ভিত্তি হলো আল্লাহর এই মহান বাণী: فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَذِبُونَ অর্থ: যেহেতু সাক্ষীদেরকে উপস্থিত করেনি, সে কারণে তারা আল্লাহর বিধানে মিথ্যাবাদী।" (সূরা আনূর, আয়াত-১৩)