📄 হুদের ক্ষেত্রে অপরাধীকে আড়াল করার বৈধতা
অপরাধ ও পাপাচারে লিপ্তদের অপরাধমূলক কার্যকলাপ গোপন করা কখনো কখনো তাদের জন্য খুবই উপকারী চিকিৎসা সাব্যস্ত হয়ে থাকে। গোপন করার ফলে কখনো কখনো তারা অপরাধ করার পরও স্বউদ্যোগে খালেস তওবা করে এবং নতুন করে পরিপূর্ণ জীবন যাপন শুরু করে। এ কারণে ইসলাম অপরাধীদের আড়াল করা ও তাদের অপরাধের কথা ফাঁস করে দেয়ার জন্য তাড়াহুড়া না করার নির্দেশ দিয়েছে।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব বলেন, আমি শুনেছি, বনু আসলাম গোত্রের হাযযাল নামক এক ব্যক্তি, সূরা নূরের ব্যভিচারের শাস্তি ২নং আয়াত নাযিল হওয়ার আগে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে জনৈক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ দায়ের করলো। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললো, ওহে হাযযাল, তোমার চাদরের নিচে যদি তাকে লুকিয়ে রাখতে, তাহলে তোমার জন্য ভালো হতো। হাযযালের পৌত্র ইয়াযীদ পরবর্তীকালে তার দাদার এই উক্তি সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ইবনে আব্বাস থেকে ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। আর যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দোষ ফাঁস করবে, আল্লাহ তার দোষ ফাঁস করে দেবেন, এমনকি তাকে তার পরিবারের সামনেই অপমানিত করবেন।” বস্তুতঃ দোষ আড়াল করে রাখা যখন মুস্তাহাব, তখন সেই দোষ সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়াটাও বাঞ্ছনীয় হওয়ার কথা নয়। এটা মাকরূহ তানযিহী। অবশ্য এই আড়াল করাটা সেই ব্যক্তির বেলায় প্রযোজ্য, যে ব্যভিচারে অভ্যস্ত নয় এবং নিজে তা প্রকাশ করেনা। কিন্তু পরিস্থিতি যখন এতদূর গড়ায় যে, সে নিজেই তার গোপনীয়তা রক্ষায় সচেষ্ট নয়, বরং তা প্রকাশ ও ফাঁস করে, তখন তার সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়া না দেয়ার চেয়ে ভালো। কেননা শরিয়তের অভিপ্রায় হলো পৃথিবীকে পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র করা। অপরাধী ও পাপাচারীরা যখন তা থেকে তওবা করে এবং তার জন্য তাদেরকে তিরস্কার ও শাস্তি দেয়া হয়, তখন পাপাচার থেকে পৃথিবীকে পবিত্রকরণের প্রক্রিয়া চালু ও কার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু যখন ব্যভিচারীর এতটা ধৃষ্টতা প্রকাশ পায় যে, ব্যভিচার করেও তা গোপন করার পরোয়া করেনা, বরং তা প্রকাশিত হওয়াতেও কুণ্ঠিত হয়না, তখন পৃথিবীকে তওবার মাধ্যমে পাপাচারমুক্ত করার আর কোনো নিশ্চয়তা থাকেনা। কাজেই এ ধরনের ধৃষ্টতা ও বেপরোয়াভাব যার মধ্যে দেখা যাবে, তার পাপাচার দূর করার জন্য দ্বিতীয় উপায় অবলম্বন করার আর কোনো বিকল্প থাকবেনা। এই দ্বিতীয় উপায়টি হলো হুদুদ বা শাস্তি। পক্ষান্তরে যে বক্তি অতি সংগোপনে ও অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে ব্যভিচার করে এবং প্রতিবার করার পর অনুতপ্ত হয় সে এক বা একাধিকবার করলেও তা প্রত্যক্ষকারী কর্তৃক লুকিয়ে রাখা মুস্তাহাব।
📄 মুসলমানের নিজের দোষ নিজে লুকানো
বরং প্রত্যেক মুসলমানের নিজের দোষ লুকিয়ে রাখা এবং তা শাসকের নিকট স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রকাশ করে শাস্তি ভোগ করা ও অপমানিত হওয়া থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। ইমাম মালেক মুয়াত্তার বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : হে মানব সকল, এখন সময় এসেছে যেন তোমরা আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাকো। যে কেউ এই নিকৃষ্ট অপরাধের কোনোটিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে, সে যেন আল্লাহর গোপনীয়তার সুযোগ গ্রহণ করে, নিজেকে লুকিয়ে রাখে। তবে যার অপরাধ আমাদের সামনে প্রকাশিত হবে, আমরা তার উপর আল্লাহর কিতাবকে কার্যকরি করবো।"
📄 হুদূদকৃত গুনাহের কাফফারা
অধিকাংশ আলেমের মতে, যখন অপরাধীর উপর হুদুদ কার্যকর করা হবে, তখন তা তার কৃত গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে এবং আখেরাতে তাকে আর শাস্তি দেয়া হবেনা। কেননা উবাদা ইবনে সামেত থেকে বুখারি বর্ণনা করেন : আমরা একটা বৈঠকে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে ছিলাম। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন : তোমরা আমার সাথে প্রতীজ্ঞাবদ্ধ হবে যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবেনা, ব্যভিচার করবেনা, চুরি করবেনা এবং ন্যাসঙ্গতভাবে ব্যতীত আল্লাহর নিষিদ্ধকৃত প্রাণ বধ করবেনা। যে ব্যক্তি এ প্রতীজ্ঞা পালন করবে, তার প্রতিদান সে আল্লাহর কাছে পাবে। আর যে ব্যক্তি এসব গুনাহের কোনো একটিতে লিপ্ত হবে এবং তার শাস্তি ভোগ করবে, সেটা তার জন্য কাফফারা (গুনাহ মোচনকারী) হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এসব গুনাহের কোনো একটিতে লিপ্ত হবে এবং আল্লাহ তা আড়াল করে রাখবেন (অর্থাৎ বিচার ও শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন) তার বিষয় টা আল্লাহর বিবেচনাধীন। তিনি চাইলে তাকে মাফ করবেন, নচেত শাস্তি দেবেন।"
হদ কার্যকরকরণ একদিকে গুনাহর কাফফারা অপরদিকে একই সাথে তা অন্যদের জন্য হুঁশিয়ারিও। এটা একাধারে পাপ মোচনকারীও, পাপ থেকে সতর্ককারীও।
📄 দারুল হারবে হদ বাস্তবায়ন
আলেমদের একটি গোষ্ঠীর মতে, হুদুদ যেমন দারুল ইসলামে (ইসলামী রাষ্ট্রে) বাস্তবায়ন করা যায়, তেমনি তা দারুল হারবেও (অমুসলিম শাসিত রাষ্ট্রেও) করা যাবে। কেননা হুদুদ বাস্তবায়নের নির্দেশ সর্বব্যাপী ও সর্বাত্মক, কোনো দেশ বিশেষের জন্য নির্দিষ্ট নয়। ইমাম মালেক ও লাইস বিন সা'দ এই মতের প্রবক্তা। পক্ষান্তরে আবু হানিফা প্রমুখ বলেন: “কোনো সেনাপতি যখন কোনো দারুল হারবে (অমুসলিম দেশে) আক্রমণ পরিচালনা করে, তখন তার সেনাবাহিনীর কোনো সদস্যের উপর 'হদ' প্রয়োগ করবেনা। তবে সে মিশর, সিরিয়া, ইরাক ও অনুরূপ দেশের (মুসলিম) সেনাপতি হলে তার সেনাবাহিনীতে হুদুদ কার্যকর করবে।" ইমাম আবু হানিফার যুক্তি হলো, দারুল হারবে হুদুদ কার্যকর করা হলে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি কুফরির পথ অবলম্বনে প্ররোচিত হতে পার। এই মতটিই অগ্রগণ্য। কেননা আল্লাহর শাস্তি যুদ্ধ বিগ্রহের সময় কার্যকর করতে আল্লাহ নিজেই নিষেধ করেছেন। কেননা এর ফলে অধিকতর খারাপ ঘটনা ঘটতে পারে। আহমদ, ইসহাক ও আওযায়ি প্রমুখ ইমাম বলেছেন, শত্রুর ভূমিতে হুদদ কার্যকর করা হবেনা। এর উপর সাহাবীগণ একমত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে আবু মাহজান সাকাফীর ঘটনা উল্লেখযোগ্য। তিনি মদপানে এত বেশি অভ্যস্ত ছিলেন যে, মদপান না করে বেশিক্ষণ থাকতেই পারতেননা। কাদেসিয়ার যুদ্ধে তিনি মদপান করে বসলেন। ফলে সেনাপতি সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস তাকে গ্রেফতার করলেন এবং তার হাত পা রশি দিয়ে বেঁধে রাখার আদেশ দিলেন। যখন উভয়পক্ষ মুখোমুখি হলো, তখন আবু মাহজান বিলাপ করে বলতে লাগলেন : "ঘোড়াগুলো বর্শাসহ দাবড়ানো হবে, আর আমি রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকবো, এর চেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার আর কি থাকতে পারে?" অতপর সা'দের স্ত্রীকে বললেন : আমাকে ছেড়ে দিন। আপনাকে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আল্লাহ যদি আমাকে যুদ্ধের ময়দান থেকে সহিসালামাতে ফিরিয়ে আনেন, তবে এখানেই ফিরে আসবো এবং পুনরায় রশির বাঁধনে পা ঢুকাবো। আর যদি নিহত হই, তবে তো আপনারা আমার কবল থেকে মুক্ত হয়েই গেলেন।” সা'দের স্ত্রী তাঁর বাঁধন খুলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আবু মাহজান সা'দের 'বালকা' একটা ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে পড়লো, একটা বর্শা নিলেন এবং যুদ্ধের ময়দানে ছুটে গেলেন। ময়দানে তিনি এমন শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিলেন, যা দেখে শুধু সা'দ নয়, গোটা মুসলিম বাহিনী হতবাক হয়ে গেলো। তারা ভাবলেন, এ হয়তো কোনো ফেরেশতা যিনি তাদের সাহায্য করতে এসেছেন। শত্রুকে পুরোপুরি পর্যুদস্ত করে তিনি পুনরায় সা'দের তাঁবুতে ফিরে গেলেন এবং নিজে পা দু'খানা পুনরায় বাঁধনে ঢুকালেন। সা'দের স্ত্রী সা'দকে আবু মাহজানের খবর জানালেন। সা'দ তৎক্ষণাত তাকে মুক্ত করে দিলেন। লড়াইতে তার অভাবনীয় কৃতিত্ব যেভাবে মুসলিম বাহিনীকে শক্তি যুগিয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে সা'দ কসম খেলেন যে, আবু মাহজানের উপর মদপানের শাস্তি কার্যকর করবেননা। এরপর আবু মাহজান আর মদপান করবেননা বলে তওবা করলেন। এখানে মদপানের হদ স্থগিত বা রহিত যেটাই করা হোক, তা একটা বৃহত্তর কল্যাণের খাতিরেই করা হয়েছিল। সেটা ছিলো সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য কল্যাণকর। অথচ তার উপর হদ কার্যকর করার ক্ষমতা সাদের ছিলো।