📄 সন্দেহ কত প্রকার ও কি কি?
হানাফি ও শাফেয়িগণ সন্দেহ সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে তাদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র মতামত রয়েছে। এই মতামতের সার সংক্ষেপ নিম্নরূপ:
শাফেয়িদের মতানুসারে সন্দেহ তিন প্রকারের:
১. সঙ্গমের স্থান নিয়ে সন্দেহ: যথা স্বামী কর্তৃক ঋতুবতী বা রোযাদার স্ত্রীর সাথে সহবাস করা বা স্ত্রীর মলদ্বারে সহবাস করা। এখানে সহবাসের নিষিদ্ধ স্থান নিয়ে সন্দেহ বিদ্যমান। কেননা স্ত্রী স্বামীর কর্তৃত্বাধীন এবং তার সাথে সহবাস করার অধিকার তার রয়েছে। যদিও ঋতুবতী ও রোযাদার স্ত্রীর সাথে ও স্ত্রীর মলদ্বারে সহবাস বৈধ নয়। তথাপি স্ত্রীর উপর তার অধিকার ও কর্তৃত্ব এক ধরনের সন্দেহের সৃষ্টি করে। এই সন্দেহই হদ রহিত করার দাবি জানায়; চাই সহবাসকারী কাজটিকে হালাল বা হারাম, যা-ই বিশ্বাস করুক না কেন। কেননা এই ধারণা ও বিশ্বাস সন্দেহের কারণ নয়। সন্দেহের কারণ হলো, সঙ্গমের স্থান এবং তার উপর সঙ্গমকারীর আইনী কর্তৃত্ব।
২. সঙ্গমকারীর ধারণা ভিত্তিক সন্দেহ: যেমন এক ব্যক্তি বাসর ঘরে পাওয়া মহিলাকে স্ত্রী ভেবে সঙ্গম করলো এবং পরে প্রমাণিত হলো যে, সে তার স্ত্রী নয়। এখানে সন্দেহের ভিত্তি সঙ্গমকারীর এরূপ ধারণা ও বিশ্বাস যে, সে কোনো হারাম কাজ করছেনা। এই সন্দেহ হদ রহিত করে। কিন্তু সঙ্গমকারী যদি মহিলাকে নিজের জন্য নিষিদ্ধ জেনেও সঙ্গম করে, তাহলে এটা সন্দেহ হিসেবে গণ্য হবেনা।
৩. ফকিহদের মতভেদজনিত সন্দেহ: সঙ্গমটি বৈধ না অবৈধ এ ব্যাপারে সন্দেহ। আর এ সন্দেহের ভিত্তি ফকিহদের মতভেদ। ফকিহরা যেসব বিষয়ের জায়েয ও নাজায়েয হওয়া নিয়ে মতভেদ পোষণ করেন, সেসব মতভেদ ঐসব বিষয়ে সন্দেহের সৃষ্টি করে, যা হদকে রহিত করে। যেমন আবু হানিফা ওলি ব্যতীত বিয়ে এবং মালেক সাক্ষী ব্যতীত বিয়ে জায়েয মনে করেন। অথচ অধিকাংশ আলেমগণ তা জায়েয মনে করেননা। এ ধরনের বিয়ের বিশুদ্ধতা নিয়ে মতভেদ থাকায় এ ধরনের বিয়ের পর সঙ্গম করলে তাতে হদ কার্যকর হবেনা। কেননা মতভেদ যে সন্দেহ সৃষ্টি করে, তা হদকে রহিত করে। এমনকি সঙ্গমকারী সঙ্গমকে অবৈধ মনে করলেও হদ কার্যকর হবেনা। কেননা যতক্ষণ ফকিহগণ এটা নিয়ে মতভেদে লিপ্ত থাকবেন, ততক্ষণ সঙ্গমকারীর ধারণা বিশ্বাসের কোনো কার্যকারিতা থাকবেনা।
হানাফিদের মতে সন্দেহ দু'প্রকারের।
১. সহবাস নিয়ে সন্দেহ: সহবাস নিয়ে যার সন্দেহ রয়েছে, এটা শুধু তারই জন্য সন্দেহ বিবেচিত হবে। যার সহবাস নিয়ে সন্দেহ নেই, তার কাছে সন্দেহ বিবেচিত হবেনা। যে ব্যক্তি সহবাস হালাল না হারাম- উভয় ব্যাপারেই সন্দেহ পোষণ করে, অথচ সেখানে এমন কোনো শ্রবণযোগ্য প্রমাণ নেই, যা হালাল সাব্যস্ত করে। তার জন্য এই সন্দেহ সন্দেহরূপেই বিবেচিত হবে। যেমন অর্থের বিনিময়ে স্ত্রীকে তিন তালাক বা বায়েন তালাক দেয়ার পর ইদ্দতের মধ্যে তার সাথে সহবাস করা। এখানে সহবাসের হালাল বা হারাম হওয়া নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টির কারণ হলো, তালাকের কারণে বিয়ে অবসান ঘটলেও এই দিক দিয়ে বিয়ে বহাল রয়েছে যে, তালাকপ্রাপ্তার গর্ভে সন্তান থাকলে তা ঐ স্বামীর সন্তান হিসেবেই গণ্য হবে। এ ধরনের সহবাস হারাম এবং হদযোগ্য ব্যভিচার। তবে সহবাসকারী যদি দাবি করে যে, তার সন্দেহ ছিলো এবং সে কাজটাকে হালাল মনে করেছিল, তাহলে এটা ব্যভিচার গণ্য হবেনা। কেননা সে তার ধারণাকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এটা যদিও প্রকৃতপক্ষে প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবার যোগ্য নয়, তথাপি সে যখন একে প্রমাণ মনে করেছে, তখন তার জন্য এ সন্দেহ 'হদ' মওকুফকারী সাব্যস্ত হবে এমন অপরাধের জন্য, যা সন্দেহ দ্বারা মওকুফ হয়। সহবাস নিয়ে সন্দেহ গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত হলো, কাজটি হারাম বলে আদৌ কোনো প্রমাণ যেন না থাকে এবং সহবাসকারী যেন কাজটাকে হালাল বলে বিশ্বাস করে। হারাম হওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ থেকে থাকলে বা সহবাসকারী সহবাসকে বৈধ বলে বিশ্বাস না করলে আদৌ কোনো সন্দেহ থাকবেনা। আর যখন প্রমাণিত হবে যে, সহবাসকারী সহবাসের হারাম হওয়া সম্পর্কে অবহিত ছিলো, তাহলে তার উপর হদ কার্যকরি করা অপরিহার্য হয়ে পড়বে।
২. যার সাথে সহবাস করা হয়েছে তাকে নিয়ে সন্দেহ: এ সন্দেহের ভিত্তি হচ্ছে, যে নারীর সাথে সহবাস করা হয়েছে, তার সম্পর্কে শরিয়তের বিধান নিয়ে সন্দেহ। সুতরাং এ সন্দেহের গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য শর্ত হলো, শরিয়তের কোনো বিধান থেকেই এ সন্দেহের সূত্রপাত হওয়া। যখন এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে যা উক্ত নারীর নিষিদ্ধ হওয়াকে বাতিল সাব্যস্ত করে, তখন এ সন্দেহ বাস্তবতায় পরিণত হবে। (অর্থাৎ হদ কার্যকর হবেনা।) এখানে সহবাসকারীর ধারণার কোনো মূল নেই। সে এ কাজ হারাম বা হালাল যা-ই ধারণা করুক, তাতে কোনোই পার্থক্য হয়না। কেননা শরয়ী প্রমাণ দ্বারাই সন্দেহ সত্য প্রমাণিত হয়েছে, তার জানা বা না জানার দ্বারা নয়।
📄 হদ কার্যকর করার ক্ষমতা ও দায়িত্ব কার?
ফকিহগণ একমত যে, শাসক বা তার প্রতিনিধিই হদ কার্যকরি করার ক্ষমতা ও অধিকার রাখে। নাগরিকগণ নিজ নিজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ কাজ করার অধিকার ও ক্ষমতা রাখেনা।
তাহাবি মুসলিম বিন ইয়াসার থেকে বর্ণনা করেছেন: জনৈক সাহাবী বলতেন: “যাকাত, হুদুদ, কর খাজনা ও জুমার নামায শাসকের হাতে ন্যস্ত।" তাহাবি বলেন: কোনো সাহাবী তার এই উক্তির বিরোধিতা করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। বায়হাকি বর্ণনা করেন, মদিনাবাসী বলতেন: "শাসক ব্যতীত অন্য কারো হুদুদ কার্যকর করার অধিকার নেই। তবে দাসদাসীর উপর ব্যভিচারের হদ কার্যকর করার ক্ষমতা মনিবের রয়েছে।" শাফেয়িসহ প্রাচীন মনীষীদের একটি দলের মত হলো, মনিব তার দাসদাসীর উপর হদ কার্যকর করবে। তাদের প্রমাণ এই যে, আলী রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা.-এর জনৈক গৃহ পরিচারিকা একটি সন্তান প্রসব করলো। রসূলুল্লাহ সা. আমাকে তার উপর হদ কার্যকর করার আদেশ দিলেন। আমি তার নিকট গেলাম। দেখলাম, তার রক্তস্রাব বন্ধ হয়নি। অতপর আমি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট ফিরে গিয়ে ব্যাপারটা অবহিত করলাম। তিনি বললেন: তার রক্তস্রাব যখন বন্ধ হবে, তখন তার উপর হদ কার্যকর করো। তোমরা তোমাদের দাসদাসীদের উপর হুদুদ কার্যকর করো।" (আহমদ, আবু দাউদ, মুসলিম, বায়হাকি ও হাকেম)
কিন্তু ইমাম আবু হানিফার মতে, মনিব নিজে কার্যকরি করবেনা। বরং শাসকের নিকট অভিযোগ পৌঁছাবে।
📄 হুদের ক্ষেত্রে অপরাধীকে আড়াল করার বৈধতা
অপরাধ ও পাপাচারে লিপ্তদের অপরাধমূলক কার্যকলাপ গোপন করা কখনো কখনো তাদের জন্য খুবই উপকারী চিকিৎসা সাব্যস্ত হয়ে থাকে। গোপন করার ফলে কখনো কখনো তারা অপরাধ করার পরও স্বউদ্যোগে খালেস তওবা করে এবং নতুন করে পরিপূর্ণ জীবন যাপন শুরু করে। এ কারণে ইসলাম অপরাধীদের আড়াল করা ও তাদের অপরাধের কথা ফাঁস করে দেয়ার জন্য তাড়াহুড়া না করার নির্দেশ দিয়েছে।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব বলেন, আমি শুনেছি, বনু আসলাম গোত্রের হাযযাল নামক এক ব্যক্তি, সূরা নূরের ব্যভিচারের শাস্তি ২নং আয়াত নাযিল হওয়ার আগে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এসে জনৈক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ দায়ের করলো। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললো, ওহে হাযযাল, তোমার চাদরের নিচে যদি তাকে লুকিয়ে রাখতে, তাহলে তোমার জন্য ভালো হতো। হাযযালের পৌত্র ইয়াযীদ পরবর্তীকালে তার দাদার এই উক্তি সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ইবনে আব্বাস থেকে ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। আর যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের দোষ ফাঁস করবে, আল্লাহ তার দোষ ফাঁস করে দেবেন, এমনকি তাকে তার পরিবারের সামনেই অপমানিত করবেন।” বস্তুতঃ দোষ আড়াল করে রাখা যখন মুস্তাহাব, তখন সেই দোষ সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়াটাও বাঞ্ছনীয় হওয়ার কথা নয়। এটা মাকরূহ তানযিহী। অবশ্য এই আড়াল করাটা সেই ব্যক্তির বেলায় প্রযোজ্য, যে ব্যভিচারে অভ্যস্ত নয় এবং নিজে তা প্রকাশ করেনা। কিন্তু পরিস্থিতি যখন এতদূর গড়ায় যে, সে নিজেই তার গোপনীয়তা রক্ষায় সচেষ্ট নয়, বরং তা প্রকাশ ও ফাঁস করে, তখন তার সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়া না দেয়ার চেয়ে ভালো। কেননা শরিয়তের অভিপ্রায় হলো পৃথিবীকে পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র করা। অপরাধী ও পাপাচারীরা যখন তা থেকে তওবা করে এবং তার জন্য তাদেরকে তিরস্কার ও শাস্তি দেয়া হয়, তখন পাপাচার থেকে পৃথিবীকে পবিত্রকরণের প্রক্রিয়া চালু ও কার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু যখন ব্যভিচারীর এতটা ধৃষ্টতা প্রকাশ পায় যে, ব্যভিচার করেও তা গোপন করার পরোয়া করেনা, বরং তা প্রকাশিত হওয়াতেও কুণ্ঠিত হয়না, তখন পৃথিবীকে তওবার মাধ্যমে পাপাচারমুক্ত করার আর কোনো নিশ্চয়তা থাকেনা। কাজেই এ ধরনের ধৃষ্টতা ও বেপরোয়াভাব যার মধ্যে দেখা যাবে, তার পাপাচার দূর করার জন্য দ্বিতীয় উপায় অবলম্বন করার আর কোনো বিকল্প থাকবেনা। এই দ্বিতীয় উপায়টি হলো হুদুদ বা শাস্তি। পক্ষান্তরে যে বক্তি অতি সংগোপনে ও অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে ব্যভিচার করে এবং প্রতিবার করার পর অনুতপ্ত হয় সে এক বা একাধিকবার করলেও তা প্রত্যক্ষকারী কর্তৃক লুকিয়ে রাখা মুস্তাহাব।
📄 মুসলমানের নিজের দোষ নিজে লুকানো
বরং প্রত্যেক মুসলমানের নিজের দোষ লুকিয়ে রাখা এবং তা শাসকের নিকট স্বীকারোক্তির মাধ্যমে প্রকাশ করে শাস্তি ভোগ করা ও অপমানিত হওয়া থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। ইমাম মালেক মুয়াত্তার বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : হে মানব সকল, এখন সময় এসেছে যেন তোমরা আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাকো। যে কেউ এই নিকৃষ্ট অপরাধের কোনোটিতে লিপ্ত হয়ে পড়ে, সে যেন আল্লাহর গোপনীয়তার সুযোগ গ্রহণ করে, নিজেকে লুকিয়ে রাখে। তবে যার অপরাধ আমাদের সামনে প্রকাশিত হবে, আমরা তার উপর আল্লাহর কিতাবকে কার্যকরি করবো।"