📄 হুদূদ কার্যকর করা ওয়াজিব
শরিয়ত নির্ধারিত হুদুদ বা শাস্তি কার্যকরকরণে মানুষের প্রভূত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কেননা হুদুদ অপরাধ প্রতিহত করে, দুষ্ট লোকদের দমন করে, লোকদেরকে হারাম ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনের, সম্মানের, সম্পদের, সুনামের, স্বাধীনতার ও মর্যাদার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “পৃথিবীতে একটি হদ আল্লাহ রির্ধারিত দণ্ড কার্যকর হওয়া পৃথিবীবাসীর উপর চল্লিশ দিন ব্যাপী বৃষ্টিপাত হওয়ার চেয়ে কল্যাণকর।" আর হুদুদের বাস্তবায়ন বন্ধ রাখে এমন যে কোনো কর্মকাণ্ড আল্লাহর বিধানকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার সমার্থক এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শামিল। কেননা এর অর্থ দাঁড়ায় অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করা ও দুর্বৃত্তপনার প্রসার ঘটানো।
আহমদ, আবু দাউদ ও হাকেম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “যার সুপারিশ আল্লাহর নির্ধারিত কোনো শাস্তির বাস্তবায়নে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, সে আল্লাহর কর্তৃত্বের প্রতিরোধকারী।" অনেক সময় এমন হয় যে, মানুষ দুর্বৃত্ত কর্তৃক সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে এবং তার উপর কার্যকর হওয়া শাস্তিটাই শুধু দেখতে পায়। সেটা দেখে সে মর্মাহত হয় এবং তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। এ সম্পর্কেই কুরআন বলে যে, এটা ঈমানের পরিপন্থী কাজ। কারণ অপরাধমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং ব্যক্তি ও সমাজকে উচ্চতর কৃষ্টি ও সুদৃঢ় নৈতিক মানে উন্নীত করা ঈমানের দাবি। আল্লাহ বলেন:
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِلٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذُكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ
"ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারীর প্রত্যেককে একশত কষাঘাত করবে। আল্লাহর বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবান্বিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও। মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” (আন-নূর: ২)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সমাজের প্রতি দয়া ব্যক্তির প্রতি দয়ার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
📄 হুদূদের ব্যাপারে সুপারিশ করা
কোনো হল্ কার্যকরিকরণের বিপক্ষে সুপারিশ করা বা কোনো হুদকে অকার্যকর করার জন্য কোনো কাজ করা হারাম। কেননা এতে এমন একটা উপকারিতাকে বিনষ্ট করা হবে, যা সুনির্দিষ্ট বলে প্রমাণিত ও পরীক্ষিত। অপরাধ করতে আসকারা দেয়া হবে এবং অপরাধীকে তার অপরাধের পরিণতি ভোগ করা থেকে রেহাই দেয়ার প্রতি সম্মতি জানানো হবে। সুপারিশের এই অবৈধতা কার্যকর হবে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট শাসকের দরবারে পৌঁছে যাওয়ার পর। কেননা সুপারিশ তখন শাসককে তার প্রদান কর্তব্য থেকে বিরত রাখবে এবং শাস্তিকে অকার্যকর করার পথ খুলে দেবে। (উল্লেখ, শাসকের নিকট অভিযোগ পৌঁছে যাওয়যার পর হদ কার্যকর করা তার উপর ওয়াজিব হয়ে যায় মর্মে আলেমদের ও মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (এজমা) রয়েছে বলে ইবনে আব্দুল বার দাবি করেছেন।) পক্ষান্তরে শাসকের নিকট (বা আদালতে) অভিযোগ দায়ের হওয়ার আগে অপরাধীকে আড়াল করা এবং শাসকের নিকট সুপারিশ করা দূষণীয় নয়।
আবু দাউদ, নাসায়ী ও হাকেম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “অপরাধগুলোকে তোমরা নিজেদের মধ্যে ক্ষমা করে দাও। কেননা আমার নিকট যেটা পৌঁছে যাবে, তার শাস্তি অবধারিত।" আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ ও হাকেম বর্ণনা করেছেন: যে লোকটি সাফওয়ান বিন উমা ইয়ার চাদর চুরি করেছিল, রসূলূল্লাহ সা. যখন তার হাত কাটার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সাফওয়ান তার পক্ষে সুপারিশ করলো, তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তুমি ওকে আমার কাছে ধরে আনার আগে কেন এই সুপারিশটা করলেনা?
আয়েশা রা. থেকে আহমদ, মুসলিম ও নাসায়ী বর্ণনা করেছেন: বনু মাখজুম গোত্রের জনৈক মহিলা মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিস ধার নিয়ে অস্বীকার করতো। রসূলূল্লাহ সা. তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। তার পরিবারের লোকেরা উসামা বিন যায়দের কাছে এলো এবং তার সাথে কথা বললো। তদনুযায়ী উসামা রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট ঐ মহিলার পক্ষে সুপারিশ করলো। রসূলূল্লাহ সা. তাকে বললেন: হে উসামা আমি দেখতে চাইনা যে, তুমি আল্লাহর নির্ধারিত কোনো শাস্তির ব্যাপারে সুপারিশ করো।" এরপর রসূলুল্লাহ সা. দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়ে বললেন: তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে শুধু এজন্য যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর কোনো দুর্বল ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে শাস্তি দিত। আল্লাহর কসম, মুহাম্মদের মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরি করতো, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।” অতপর বনু মাখদুম গোত্রের মহিলাটির হাত কেটে দেয়া হলো।
📄 সন্দেহ দেখা দিলে হদ রহিত হবে
হদ এমন একটা শাস্তি, যা অপরাধীর শরীর ও সুনামের ক্ষতিসাধন করে। কারো সম্মান ও মর্যাদার ক্ষতি করা বা তাকে কষ্ট দেয়া কেবলমাত্র সঙ্গত কারণে ব্যতীত জায়েয নয়। সংশয়বিহীন ও অকাট্য প্রমাণ দ্বারা অপরাধ প্রমাণিত না হলে সঙ্গত কারণে শাস্তি হয়েছে বলা যায়না। কাজেই সন্দেহ সংশয় দেখা দিলে শাস্তি কার্যকর করার জন্য যে সুনিশ্চিত সন্দেহাতীত ভিত্তি প্রয়োজন, তা আর বিদ্যমান থাকেনা। এ কারণেই অপবাদ ও সন্দেহ-সংশয় ধর্তব্য নয় এবং বিবেচনায়ও আসবেনা। কেননা এটা বিভ্রান্তিকর। ইবনে মাজাহ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমরা যতক্ষণ অপরাধগুলো দমন করতে পারো, ততক্ষণ করতে থাকো।" আর তিরমিযি আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: মুসলমানদের উপর থেকে শাস্তি যতটা পারো রহিত করো। তাকে অব্যাহতি দেয়ার সুযোগ থাকলে অব্যাহতি দাও। কেননা শাসকের জন্য ভুলক্রমে শাস্তি দেয়ার চেয়ে ভুলক্রমে মাফ করা উত্তম।”
📄 সন্দেহ কত প্রকার ও কি কি?
হানাফি ও শাফেয়িগণ সন্দেহ সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে তাদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র মতামত রয়েছে। এই মতামতের সার সংক্ষেপ নিম্নরূপ:
শাফেয়িদের মতানুসারে সন্দেহ তিন প্রকারের:
১. সঙ্গমের স্থান নিয়ে সন্দেহ: যথা স্বামী কর্তৃক ঋতুবতী বা রোযাদার স্ত্রীর সাথে সহবাস করা বা স্ত্রীর মলদ্বারে সহবাস করা। এখানে সহবাসের নিষিদ্ধ স্থান নিয়ে সন্দেহ বিদ্যমান। কেননা স্ত্রী স্বামীর কর্তৃত্বাধীন এবং তার সাথে সহবাস করার অধিকার তার রয়েছে। যদিও ঋতুবতী ও রোযাদার স্ত্রীর সাথে ও স্ত্রীর মলদ্বারে সহবাস বৈধ নয়। তথাপি স্ত্রীর উপর তার অধিকার ও কর্তৃত্ব এক ধরনের সন্দেহের সৃষ্টি করে। এই সন্দেহই হদ রহিত করার দাবি জানায়; চাই সহবাসকারী কাজটিকে হালাল বা হারাম, যা-ই বিশ্বাস করুক না কেন। কেননা এই ধারণা ও বিশ্বাস সন্দেহের কারণ নয়। সন্দেহের কারণ হলো, সঙ্গমের স্থান এবং তার উপর সঙ্গমকারীর আইনী কর্তৃত্ব।
২. সঙ্গমকারীর ধারণা ভিত্তিক সন্দেহ: যেমন এক ব্যক্তি বাসর ঘরে পাওয়া মহিলাকে স্ত্রী ভেবে সঙ্গম করলো এবং পরে প্রমাণিত হলো যে, সে তার স্ত্রী নয়। এখানে সন্দেহের ভিত্তি সঙ্গমকারীর এরূপ ধারণা ও বিশ্বাস যে, সে কোনো হারাম কাজ করছেনা। এই সন্দেহ হদ রহিত করে। কিন্তু সঙ্গমকারী যদি মহিলাকে নিজের জন্য নিষিদ্ধ জেনেও সঙ্গম করে, তাহলে এটা সন্দেহ হিসেবে গণ্য হবেনা।
৩. ফকিহদের মতভেদজনিত সন্দেহ: সঙ্গমটি বৈধ না অবৈধ এ ব্যাপারে সন্দেহ। আর এ সন্দেহের ভিত্তি ফকিহদের মতভেদ। ফকিহরা যেসব বিষয়ের জায়েয ও নাজায়েয হওয়া নিয়ে মতভেদ পোষণ করেন, সেসব মতভেদ ঐসব বিষয়ে সন্দেহের সৃষ্টি করে, যা হদকে রহিত করে। যেমন আবু হানিফা ওলি ব্যতীত বিয়ে এবং মালেক সাক্ষী ব্যতীত বিয়ে জায়েয মনে করেন। অথচ অধিকাংশ আলেমগণ তা জায়েয মনে করেননা। এ ধরনের বিয়ের বিশুদ্ধতা নিয়ে মতভেদ থাকায় এ ধরনের বিয়ের পর সঙ্গম করলে তাতে হদ কার্যকর হবেনা। কেননা মতভেদ যে সন্দেহ সৃষ্টি করে, তা হদকে রহিত করে। এমনকি সঙ্গমকারী সঙ্গমকে অবৈধ মনে করলেও হদ কার্যকর হবেনা। কেননা যতক্ষণ ফকিহগণ এটা নিয়ে মতভেদে লিপ্ত থাকবেন, ততক্ষণ সঙ্গমকারীর ধারণা বিশ্বাসের কোনো কার্যকারিতা থাকবেনা।
হানাফিদের মতে সন্দেহ দু'প্রকারের।
১. সহবাস নিয়ে সন্দেহ: সহবাস নিয়ে যার সন্দেহ রয়েছে, এটা শুধু তারই জন্য সন্দেহ বিবেচিত হবে। যার সহবাস নিয়ে সন্দেহ নেই, তার কাছে সন্দেহ বিবেচিত হবেনা। যে ব্যক্তি সহবাস হালাল না হারাম- উভয় ব্যাপারেই সন্দেহ পোষণ করে, অথচ সেখানে এমন কোনো শ্রবণযোগ্য প্রমাণ নেই, যা হালাল সাব্যস্ত করে। তার জন্য এই সন্দেহ সন্দেহরূপেই বিবেচিত হবে। যেমন অর্থের বিনিময়ে স্ত্রীকে তিন তালাক বা বায়েন তালাক দেয়ার পর ইদ্দতের মধ্যে তার সাথে সহবাস করা। এখানে সহবাসের হালাল বা হারাম হওয়া নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টির কারণ হলো, তালাকের কারণে বিয়ে অবসান ঘটলেও এই দিক দিয়ে বিয়ে বহাল রয়েছে যে, তালাকপ্রাপ্তার গর্ভে সন্তান থাকলে তা ঐ স্বামীর সন্তান হিসেবেই গণ্য হবে। এ ধরনের সহবাস হারাম এবং হদযোগ্য ব্যভিচার। তবে সহবাসকারী যদি দাবি করে যে, তার সন্দেহ ছিলো এবং সে কাজটাকে হালাল মনে করেছিল, তাহলে এটা ব্যভিচার গণ্য হবেনা। কেননা সে তার ধারণাকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এটা যদিও প্রকৃতপক্ষে প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবার যোগ্য নয়, তথাপি সে যখন একে প্রমাণ মনে করেছে, তখন তার জন্য এ সন্দেহ 'হদ' মওকুফকারী সাব্যস্ত হবে এমন অপরাধের জন্য, যা সন্দেহ দ্বারা মওকুফ হয়। সহবাস নিয়ে সন্দেহ গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্ত হলো, কাজটি হারাম বলে আদৌ কোনো প্রমাণ যেন না থাকে এবং সহবাসকারী যেন কাজটাকে হালাল বলে বিশ্বাস করে। হারাম হওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ থেকে থাকলে বা সহবাসকারী সহবাসকে বৈধ বলে বিশ্বাস না করলে আদৌ কোনো সন্দেহ থাকবেনা। আর যখন প্রমাণিত হবে যে, সহবাসকারী সহবাসের হারাম হওয়া সম্পর্কে অবহিত ছিলো, তাহলে তার উপর হদ কার্যকরি করা অপরিহার্য হয়ে পড়বে।
২. যার সাথে সহবাস করা হয়েছে তাকে নিয়ে সন্দেহ: এ সন্দেহের ভিত্তি হচ্ছে, যে নারীর সাথে সহবাস করা হয়েছে, তার সম্পর্কে শরিয়তের বিধান নিয়ে সন্দেহ। সুতরাং এ সন্দেহের গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য শর্ত হলো, শরিয়তের কোনো বিধান থেকেই এ সন্দেহের সূত্রপাত হওয়া। যখন এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে যা উক্ত নারীর নিষিদ্ধ হওয়াকে বাতিল সাব্যস্ত করে, তখন এ সন্দেহ বাস্তবতায় পরিণত হবে। (অর্থাৎ হদ কার্যকর হবেনা।) এখানে সহবাসকারীর ধারণার কোনো মূল নেই। সে এ কাজ হারাম বা হালাল যা-ই ধারণা করুক, তাতে কোনোই পার্থক্য হয়না। কেননা শরয়ী প্রমাণ দ্বারাই সন্দেহ সত্য প্রমাণিত হয়েছে, তার জানা বা না জানার দ্বারা নয়।