📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 এই শাস্তিগুলোর যৌক্তিকতা

📄 এই শাস্তিগুলোর যৌক্তিকতা


এই শাস্তিগুলো একদিকে যেমন জনস্বার্থকে সংরক্ষণ করে, অন্যদিকে তেমনি জননিরাপত্তাও নিশ্চিত করে। তাই এগুলো অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত শাস্তি।
প্রথমে ব্যভিচারের কথা ধরা যাক। ব্যভিচার সর্বাপেক্ষা অশ্লীল ও জঘন্যতম অপরাধগুলোর অন্যতম। এটা নৈতিকতা, মহত্ত্ব ও সম্ভ্রমের উপর একটা আগ্রাসন। পরিবার ব্যবস্থাকে ধ্বংসকারী এবং এমন বহু অন্যায় ও অপকর্মের প্রচলনকারী, যা ব্যক্তি ও সমাজের মহৎ উপাদানগুলোকে বিনষ্ট করে। এতদসত্ত্বেও ইসলাম এ অপরাধের সত্যতা প্রমাণে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করেছে। এজন্য এমন সব শর্ত আরোপ করেছে যে, তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। ব্যভিচারের শাস্তি দ্বারা প্রধানত ভীতির সৃষ্টি করা, সাবধান করা ও প্রতিহত করাই লক্ষ্য।
সতী সাধ্বী ও বিবাহিত নারী ও পুরুষের প্রতি ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ আরোপ এমন একটি মারাত্মক অপরাধ, যা পরিবারের বন্ধন ছিন্ন করে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ ও বিচ্ছেদ ঘটায় এবং পরিবারের স্তম্ভগুলো ধ্বসিয়ে দেয়। অথচ পরিবার হলো সমাজের ভিত্তি। এটি সুস্থ থাকলে সমাজ সুস্থ থাকবে, আর এটি বিনষ্ট ও বিকৃত হলে সমাজও বিনষ্ট হতে বাধ্য। এ অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিকে আশিটি কষাঘাতের শাস্তি তখনই দেয়া হয়, যখন সে তার আরোপিত অভিযাগের পক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে ব্যর্থ হয়। সুতরাং এটি সর্বোচ্চ মাত্রার প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচায়ক এবং সমাজের সার্বিক স্বার্থ ও কল্যাণের রক্ষক। এ শাস্তি মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে কলুষিত হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং তার সুনাম ও সুখ্যাতি অক্ষুণ্ণ রাখে।
আর চুরি হলো, মানুষের ধনসম্পদের উপর পরিচালিত আগ্রাসন এবং তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার নামান্তর। অথচ ধনসম্পদ মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। কাজেই এ অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তির হাত কাটার উদ্দেশ্য হলো, অন্যদেরকে চুরি থেকে বিরত রাখা। এভাবে সবাই নিজ নিজ ধনসম্পদ সম্পর্কে নিশ্চিত থাকতে পারবে। যেসব দেশে এ আইনকে কেবল সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং শরিয়ত ও আইন অমান্যকারীদের হাত থেকে ধনসম্পদকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বলবৎ রয়েছে, সেসব দেশ এর সুফল প্রকাশ পেয়েছে। করাদণ্ড চুরির মতো অপরাধের মাত্রা কমাতে কোনো অবদান না রাখার পরিস্থিতিতে (অধুনালুপ্ত) সোভিয়েট ইউনিয়নে চুরির শাস্তি কঠোরতর করা হয়েছে। সেখানে চোরকে গুলি করে হত্যা করার মাধ্যমে চোরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। আর যারা দেশে সহিংসতা, সন্ত্রাস, নাশকতা ও অরাজকতা ছড়ায়, দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধায়, শান্তি ও শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে এবং প্রতিষ্ঠিত সরকারকে বলপ্রয়োগে উৎখাতের চেষ্টা চালায়, তাদের ন্যূনতম শাস্তি হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা অথবা দেশ থেকে বিতাড়িত করা। মদ ও মাদক সেবন সেবনকারীর মস্তিষ্কে সুস্থ বুদ্ধির স্বাভাবিকতা বিনষ্ট করে। আর এটা বিনষ্ট হওয়া মাত্রই মানুষ যাবতীয় অশ্লীল ও নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ কাজ করতে আরম্ভ করে দেয়। তাই শরিয়তের শাস্তি কষাঘাত একদিকে যেমন তাকে এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি থেকে রক্ষা করবে, অপরদিকে তেমনি তা অন্যদের এ ধরনের অপরাধ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহী করে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হুদূদ কার্যকর করা ওয়াজিব

📄 হুদূদ কার্যকর করা ওয়াজিব


শরিয়ত নির্ধারিত হুদুদ বা শাস্তি কার্যকরকরণে মানুষের প্রভূত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। কেননা হুদুদ অপরাধ প্রতিহত করে, দুষ্ট লোকদের দমন করে, লোকদেরকে হারাম ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনের, সম্মানের, সম্পদের, সুনামের, স্বাধীনতার ও মর্যাদার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “পৃথিবীতে একটি হদ আল্লাহ রির্ধারিত দণ্ড কার্যকর হওয়া পৃথিবীবাসীর উপর চল্লিশ দিন ব্যাপী বৃষ্টিপাত হওয়ার চেয়ে কল্যাণকর।" আর হুদুদের বাস্তবায়ন বন্ধ রাখে এমন যে কোনো কর্মকাণ্ড আল্লাহর বিধানকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার সমার্থক এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শামিল। কেননা এর অর্থ দাঁড়ায় অন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করা ও দুর্বৃত্তপনার প্রসার ঘটানো।
আহমদ, আবু দাউদ ও হাকেম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “যার সুপারিশ আল্লাহর নির্ধারিত কোনো শাস্তির বাস্তবায়নে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, সে আল্লাহর কর্তৃত্বের প্রতিরোধকারী।" অনেক সময় এমন হয় যে, মানুষ দুর্বৃত্ত কর্তৃক সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে এবং তার উপর কার্যকর হওয়া শাস্তিটাই শুধু দেখতে পায়। সেটা দেখে সে মর্মাহত হয় এবং তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। এ সম্পর্কেই কুরআন বলে যে, এটা ঈমানের পরিপন্থী কাজ। কারণ অপরাধমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং ব্যক্তি ও সমাজকে উচ্চতর কৃষ্টি ও সুদৃঢ় নৈতিক মানে উন্নীত করা ঈমানের দাবি। আল্লাহ বলেন:
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِلٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذُكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ
"ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারীর প্রত্যেককে একশত কষাঘাত করবে। আল্লাহর বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবান্বিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও। মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” (আন-নূর: ২)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সমাজের প্রতি দয়া ব্যক্তির প্রতি দয়ার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হুদূদের ব্যাপারে সুপারিশ করা

📄 হুদূদের ব্যাপারে সুপারিশ করা


কোনো হল্ কার্যকরিকরণের বিপক্ষে সুপারিশ করা বা কোনো হুদকে অকার্যকর করার জন্য কোনো কাজ করা হারাম। কেননা এতে এমন একটা উপকারিতাকে বিনষ্ট করা হবে, যা সুনির্দিষ্ট বলে প্রমাণিত ও পরীক্ষিত। অপরাধ করতে আসকারা দেয়া হবে এবং অপরাধীকে তার অপরাধের পরিণতি ভোগ করা থেকে রেহাই দেয়ার প্রতি সম্মতি জানানো হবে। সুপারিশের এই অবৈধতা কার্যকর হবে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট শাসকের দরবারে পৌঁছে যাওয়ার পর। কেননা সুপারিশ তখন শাসককে তার প্রদান কর্তব্য থেকে বিরত রাখবে এবং শাস্তিকে অকার্যকর করার পথ খুলে দেবে। (উল্লেখ, শাসকের নিকট অভিযোগ পৌঁছে যাওয়যার পর হদ কার্যকর করা তার উপর ওয়াজিব হয়ে যায় মর্মে আলেমদের ও মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (এজমা) রয়েছে বলে ইবনে আব্দুল বার দাবি করেছেন।) পক্ষান্তরে শাসকের নিকট (বা আদালতে) অভিযোগ দায়ের হওয়ার আগে অপরাধীকে আড়াল করা এবং শাসকের নিকট সুপারিশ করা দূষণীয় নয়।
আবু দাউদ, নাসায়ী ও হাকেম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “অপরাধগুলোকে তোমরা নিজেদের মধ্যে ক্ষমা করে দাও। কেননা আমার নিকট যেটা পৌঁছে যাবে, তার শাস্তি অবধারিত।" আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ ও হাকেম বর্ণনা করেছেন: যে লোকটি সাফওয়ান বিন উমা ইয়ার চাদর চুরি করেছিল, রসূলূল্লাহ সা. যখন তার হাত কাটার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সাফওয়ান তার পক্ষে সুপারিশ করলো, তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তুমি ওকে আমার কাছে ধরে আনার আগে কেন এই সুপারিশটা করলেনা?
আয়েশা রা. থেকে আহমদ, মুসলিম ও নাসায়ী বর্ণনা করেছেন: বনু মাখজুম গোত্রের জনৈক মহিলা মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিস ধার নিয়ে অস্বীকার করতো। রসূলূল্লাহ সা. তার হাত কাটার আদেশ দিলেন। তার পরিবারের লোকেরা উসামা বিন যায়দের কাছে এলো এবং তার সাথে কথা বললো। তদনুযায়ী উসামা রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট ঐ মহিলার পক্ষে সুপারিশ করলো। রসূলূল্লাহ সা. তাকে বললেন: হে উসামা আমি দেখতে চাইনা যে, তুমি আল্লাহর নির্ধারিত কোনো শাস্তির ব্যাপারে সুপারিশ করো।" এরপর রসূলুল্লাহ সা. দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়ে বললেন: তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে শুধু এজন্য যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর কোনো দুর্বল ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে শাস্তি দিত। আল্লাহর কসম, মুহাম্মদের মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরি করতো, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।” অতপর বনু মাখদুম গোত্রের মহিলাটির হাত কেটে দেয়া হলো।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সন্দেহ দেখা দিলে হদ রহিত হবে

📄 সন্দেহ দেখা দিলে হদ রহিত হবে


হদ এমন একটা শাস্তি, যা অপরাধীর শরীর ও সুনামের ক্ষতিসাধন করে। কারো সম্মান ও মর্যাদার ক্ষতি করা বা তাকে কষ্ট দেয়া কেবলমাত্র সঙ্গত কারণে ব্যতীত জায়েয নয়। সংশয়বিহীন ও অকাট্য প্রমাণ দ্বারা অপরাধ প্রমাণিত না হলে সঙ্গত কারণে শাস্তি হয়েছে বলা যায়না। কাজেই সন্দেহ সংশয় দেখা দিলে শাস্তি কার্যকর করার জন্য যে সুনিশ্চিত সন্দেহাতীত ভিত্তি প্রয়োজন, তা আর বিদ্যমান থাকেনা। এ কারণেই অপবাদ ও সন্দেহ-সংশয় ধর্তব্য নয় এবং বিবেচনায়ও আসবেনা। কেননা এটা বিভ্রান্তিকর। ইবনে মাজাহ আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমরা যতক্ষণ অপরাধগুলো দমন করতে পারো, ততক্ষণ করতে থাকো।" আর তিরমিযি আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: মুসলমানদের উপর থেকে শাস্তি যতটা পারো রহিত করো। তাকে অব্যাহতি দেয়ার সুযোগ থাকলে অব্যাহতি দাও। কেননা শাসকের জন্য ভুলক্রমে শাস্তি দেয়ার চেয়ে ভুলক্রমে মাফ করা উত্তম।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00