📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 আদালতের রায়সমূহ

📄 আদালতের রায়সমূহ


শিশুর লালন পালনের সাথে সংশ্লিষ্ট মামলায় ইসলামী আদালতের বহু রায় রয়েছে যা গণনা করা দুঃসাধ্য। এসব রায়ের মধ্যে বহু সংখ্যক রায় এমন রয়েছে, যা থেকে বিভিন্ন বিধি ও মূলনীতি বেরিয়ে এসেছে। এ ধরনের কিছু রায় এখানে তুলে দিচ্ছি:
প্রথম রায়: কারমুয রাজ্যের নিম্ন আদালত থেকে ১৯৩২ সালে ঘোষিত এ রায় ১৯৩৩ সালে আলেকজান্দ্রিয়ার নিম্ন আদালত থেকে ঘোষিত রায় দ্বারা সমর্থিত হয়। এ রায় মায়ের অনুপস্থিতির অজুহাতে বাবা কর্তৃক তার শিশু মেয়েকে নিজে লালন পালনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। এই শিশু মেয়ের বাবা ও মা যে শহরে বাস করতো এবং যে শহরে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল, সেই শহর থেকে স্ত্রী অনেক দূরে অবস্থিত একটি শহরে বাস করা আরম্ভ করে। মায়ের এত দূরে অবস্থান যেহেতু তার সন্তান পালনের অধিকার রহিত করে, তাই পিতা শিশু মেয়েটির লালন পালনের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। আদালত তার রায়ে ফিকহ শাস্ত্রের এই বিধির বরাত দেয় যে, স্বামী-স্ত্রীতে বিচ্ছেদ ঘটার আগে ও পরে সন্তান পালনে মায়ের অগ্রাধিকার রয়েছে। এমনকি স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর অবাধ্যতাও তার সন্তান পালনের অধিকার রহিত করেনা। স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক বন্ধন যতক্ষণ বহাল থাকে, ততক্ষণ বাবা সন্তান পালনের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করতে চাইলে প্রথমে তার পক্ষ থেকে অবাধ্য স্ত্রীকে তার আনুগত্যে ফিরে আসার নোটিশ দিতে হবে। নোটিশ দিয়েই একতরফাভাবে শিশু সন্তানের পালনের আবেদন জানালে সে অত্যাচারী সাব্যস্ত হবে এবং তার আবেদন গ্রহণ করা হবেনা। কেননা এতে মা সন্তান পালন ও তত্ত্বাবধানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এই রায় থেকে মূলনীতি জানা গেলো: শিশুর মা যখন শিশু সন্তানকে নিয়ে দূরবর্তী স্থানে স্থানান্তরিত হয়ে যায়, তখন বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা পর্যন্ত বাবার তার কাছ থেকে সন্তানকে ছিনিয়ে নেয়ার অধিকার নেই। কেননা বাবার তখনো মায়ের উপর বৈবাহিক কর্তৃত্ব এবং তাকে আনুগত্যে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা রয়েছে। সেই ক্ষমতাবলে সে স্ত্রীকে নিজের কর্তৃত্বে ফিরিয়ে এনে সন্তানকে নিজের তত্ত্বাবধানে রাখতে পারে। ইদ্দত পালনরতা স্ত্রীর বেলায়ও একথা প্রযোজ্য। কেননা তাকে ইদ্দতকালে স্বামীগৃহে থাকার ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব।"
দ্বিতীয় রায়: প্রথমে ১৯৩১ সালের মে মাসে বেবা রাজ্যের নিম্ন আদালত থেকে জারিকৃত ও পরে ১৯৩১ সালের জুলাইতে বনু সুয়াইদের উচ্চতর আদালত থেকে আপিলক্রমে সমর্থিত এই রায় থেকে যে মূলনীতিটি প্রতিষ্ঠিত হয় তা হলো: "যতক্ষণ পর্যন্ত সন্তানের মা তার নিজ শহরে বাস করে এবং সেই শহর ও তার কাছ থেকে দূরে অবস্থানকারী বাবার শহরের মাঝে এত বেশি ব্যবধান থাকেনা যে, বাবা সন্তানকে দেখতে যেতে ও দেখে রাতের আগে নিজ শহরে ফিরে আসতে পারেনা, ততক্ষণ বাবার এ অজুহাত গ্রহণ করা হবেনা যে, সে সন্তানের মা ও পালনকারিণীর শহরে গিয়ে সন্তানকে দেখে রাতের আগে নিজের শহরে ফিরে আসতে পারেনা এবং তাকে ঐ অজুহাতের ভিত্তিতে সন্তান পালনের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করার অনুমতি দেয়া হবেনা, চাই বাবার ঐ শহর থেকে দূরে অবস্থান করা ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত হোক।" কেননা এ ক্ষেত্রে কোনো অবস্থায়ই মায়ের কোনো দোষ নেই।
এই মামলার ঘটনাবলীর বিবরণ এই যে, বাদি বিবাদিনীকে বিবাদিনীর নিজ শহর বনু মাজারে বিয়ে করে, অতপর বৈবাহিক বন্ধন বহাল থাকা অবস্থায় তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্মে। ঐ শহরেই স্ত্রীকে তালাক দেয়া হয় এবং সন্তান প্রসবের মাধ্যমে ইদ্দত সমাপ্ত হয়। এরপর বিবাদিনী বেবা নগরের আদালত থেকে ১৯৩০ সালের ২৯ অক্টোবর এই মর্মে ডিগ্রি লাভ করে যে, কন্যা সন্তানটিকে সে-ই লালন-পালন করবে। এ সময়ে বাদি বনু মাজার শহরে বসবাস করতো। পরে বাদি আসিযুত নগরীতে বদলি হওয়ায় উক্ত ডিগ্রির অবসান ঘটে এবং সেখানে সে আদালতে কন্যাকে নিজে লালন পালনের অনুমতি প্রার্থনা করে। এ সময় কন্যার বয়স দু'বছর আট মাসের বেশি ছিলনা।
তৃতীয় রায়: দামিনপুরের আদালত থেকে ১৯২৭ সালের ২৫ অক্টোবর এ রায় ঘোষিত হয় এবং এর বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা হয়নি। এ রায়ে ঘোষণা করা হয় যে, শরিয়তের বিধান মতে, মা ব্যতীত অন্য কোনো পালনকারিণীর জন্য সন্তানের বাবার শহর থেকে অন্য শহরে সন্তানকে স্থানান্তরিত করা বাবার অনুমতি ব্যতিরেকে বৈধ নয়। তবে কোনো কোনো ফকিহের মতে, এ দ্বারা এত দূরে অবস্থিত স্থানে স্থানান্তর করা বুঝানো হয়েছে, যেখানে সন্তানকে দেখতে গিয়ে রাতের আগে নিজ বাড়িতে ফেরা বাবার পক্ষে সম্ভব নয়। এর চেয়ে নিকটবর্তী স্থানে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে মা ও মা ব্যতীত অন্য মহিলার পার্থক্য নেই। বস্তুত আদালতের যেসব রায়কে ফিক্‌হী ভাষ্যসমূহের বাস্তব প্রতিফলন গণ্য করা হয়, সেগুলো সম্পর্কে অবহিত হওয়া সকলের কর্তব্য। কেননা এগুলোতে বাস্তব জীবনে অনেক সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে। জীবনের বাস্তবতার আলোকেই আদালত এসব ফিক্‌হী ভাষ্যের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00