📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 লালন পালনের মেয়াদ সমাপ্তিতে বালক বালিকার স্বাধীনতা

📄 লালন পালনের মেয়াদ সমাপ্তিতে বালক বালিকার স্বাধীনতা


শিশুর যখন সাত বছর বয়স হবে কিংবা ভালোমন্দ বুঝবার বয়স হবে এবং অন্যের কাছে ললিত পালিত হওয়ার মেয়াদ অতিক্রান্ত হবে। তখন তার বাবা ও পালনকারিণী যদি একমত হয় যে, তাদের যে কোনো একজনের কাছে তার থাকা উচিত, তাহলে এই ঐকমত্য অনুসারে কাজ করা হবে। আর যদি তারা দ্বিমত পোষণ করে ও বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের যে কোনো একজনকে গ্রহণে শিশুকে স্বাধীনতা দেয়া হবে। সে তাদের দু'জনের মধ্য থেকে যাকে কাছাই করবে সেই তার জন্য অগ্রগণ্য হবে। (শিশুকে স্বাধীনতা দেয়ার জন্য দু'টো শর্ত রয়েছে: ১ বিতর্ককারীরা সবাই লালন পালনের অধিকারী হবে। ২ শিশুটি যেন অসুস্থ মস্তিষ্ক বা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী না হয়। যদি অসুস্থ মস্তিষ্ক হয়, তাহলে মাই তার তত্ত্বাবধায়ক হবার ব্যাপারে অগ্রগণ্য হবে, চাই শিশু তখন প্রাপ্তবয়স্কই থাক না কেন। কেননা এমতাবস্থায় প্রাপ্তবয়স্ক হলেও সে শিশুর মাতা। আর শিশুর প্রতি মাই অধিকতর স্নেহময়ী।)
আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেছেন: জনৈক মহিলা রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এলো এবং বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমার এই ছেলের জন্য আমার পেট ছিলো বাসস্থান, আমার কোলই ছিলো নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং আমার স্তনই ছিলো খাদ্য ও পানীয়ের ভাণ্ডার। অথচ তার বাবা তাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়। রসূলুল্লাহ সা. ছেলেটিকে বললেন: "এই যে তোমার বাবা, আর এই যে তোমার মা। যাকে চাও তার হাত ধরো।" ছেলেটি তার মায়ের হাত ধরলো। অতপর মহিলা ছেলেকে নিয়ে চলে গেলো।" -আবু দাউদ।
উমর রা. আলী রা. ও শুরাইহ এই বিধি অনুসারেই ফায়সালা করেছেন। এটাই শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবের মত। ছেলে যদি উভয়কে নির্বাচন করে কিংবা কাউকেই নির্বাচন না করে, তাহলে তাদের একজনকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হবে। আবু হানিফা বলেছেন: পিতার অধিকার অগ্রগণ্য। ছেলেকে স্বাধীনতা দেয়া জায়েয নেই। কেননা তার কোনো মতামত নেই এবং সে নিজের ভালোমন্দ বোঝেনা। এমনও হতে পারে যে, সে যার কাছে অবাধে খেলা করতে পারবে, যে তাকে শিষ্টাচার শেখাবেনা এবং যেমন খুশি তেমন চলতে দেবে, তাকেই নির্বাচন করবে। এর ফলে সে বখাটে হয়ে যাবে। তাছাড়া যেহেতু সে বয়োপ্রাপ্ত নয়, তাই তাকে স্বাধীনতা দেয়া যায়না। যেমন সাত বছরের কম বয়স্ক শিশুকে স্বাধীনতা দেয়া হয়নি। ইমাম মালেকের মতে, শিশুর দাঁত পড়া পর্যন্ত তার উপর মায়ের অধিকার বেশি। এ বিধি ছেলে শিশুর বেলায় প্রযোজ্য। মেয়ে শিশু সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ির মত হলো, ছেলে শিশুর মতোই তাকে স্বাধীনতা দেয়া হবে। আবু হানিফা বলেছেন, মেয়ে শিশুর যৌবন লাভ করা বা বিয়ে হওয়া পর্যন্ত তার উপর মায়ের হক বেশি। ইমাম মালেক বলেন, বিয়ে হওয়া ও স্বামীর বাসর ঘরে যাওয়া পর্যন্ত তার উপর মায়ের অধিকার বেশি। হাম্বলিদের মতে মেয়ে শিশুর বয়স নয় বছর হওয়া পর্যন্ত তার উপর বাবার অধিকার বেশি এবং তাকে কোনো স্বাধীনতা দেয়া হবেনা। মা ও বাবার কোনো একজনের অগ্রগণ্যতা বা দু'জনের একজনকে নির্বাচনে শিশুর স্বাধীনতার ব্যাপারে শরিয়তে আদৌ কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। আলেমগণও একমত যে, দু'জনের কোনো একজনকে শরিয়তে শর্তহীনভাবে নির্ধারিত করা হয়নি। বরঞ্চ দু'জনের মধ্যে যেজন অত্যাধিক কড়া কিংবা উদাসীন, তাকে সৎ ন্যায়পরায়ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জনের উপর অগ্রাধিকার দেয়া হবেনা। শিশু রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকিতে সক্ষম হওয়াটাই এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়। বাবা যদি সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীন ও অবহেলা প্রবণ অথবা অসমর্থ হয়, কিংবা তার সামর্থ্য সন্তোষজনক না হয় এবং মা তার বিপরীত হয়, তাহলে মাই সন্তান পালনে অগ্রগণ্য হবে বলে ইবনুল কাইয়েম মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, দু'জনের মধ্যে যাকেই আমরা অগ্রাধিকার দেই, চাই সন্তানকে স্বাধীনতা দেয়ার মাধ্যমে হোক বা লটারির মাধ্যমে হোক, বা আর কোনোভাবে হোক, সেটা সন্তানের স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত হয় এমনভাবেই দিতে হবে। মা যদি বাবার চেয়ে ভালো রক্ষক ও ভালো তত্ত্বাবধায়ক হয়, তাহলে তাকে বাবার উপর অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এ রকম ক্ষেত্রে লটারি বা শিশুকে নির্বাচনের স্বাধীনতা দেয়ার প্রতি ভ্রুক্ষেপই করা হবেনা। কেননা শিশুর বুদ্ধি দুর্বল ও অসম্পূর্ণ এবং সে খেলাধুলা করা অথবা নিষ্ক্রিয় থাকাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। আর এ ব্যাপারে তাকে যে সাহায্য করে, স্বভাবতই সে তাকেই নির্বাচন করবে। তাই শিশু কাকে নির্বাচন করলো বা করলোনা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করা যাবেনা। মা বাবার মধ্যে যেজন তার জন্য অধিকতর কল্যাণজনক ও উপকারী, তার কাছেই তার থাকা প্রয়োজন। শরিয়ত এ ছাড়া অন্য কিছু বরদাশত করতে পারেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ছেলেমেয়েকে সাত বছর বয়সেই নামাযের আদেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামায না পড়লে প্রহার করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।" আর অপরদিকে আল্লাহ বলেছেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ .
অর্থ : হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও পরিবার পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার কাষ্ঠ হবে মানুষ ও পাথর। (সূরা আত তাহরীম: আয়াত ৬) ইমাম হাসান বসরি বলেছেন, তোমরা ছেলেমেদেরকে জ্ঞান শিক্ষা দাও, শিষ্টাচার শিক্ষা দাও এবং ইসলামী বিধান শিক্ষা দাও।"
সুতরাং যে মা শিশুকে মক্তবে পাঠায় ও কুরআন শেখায়, সে মা এমন বাবার চেয়ে অগ্রগণ্য, যে শিশুকে অধিকাংশ সময় খেলাধুলা ও সমবয়সীদের সাথে মেলামেশায় সাহায্য করে। এ ব্যাপারে কোনো লটারি বা শিশুকে নির্বাচনের ক্ষমতা দেয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। মায়ের পরিবর্তে বাবা যদি এ রকম হয়, তাহলে তার বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। পিতামাতার মধ্য থেকে যেজন সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ ও তার রসূলের হুকুম অমান্য করবে, তার ওপর সেই জন অগ্রাধিকার পাবে, যে আল্লাহ ও তার রসূলের হুকুম মান্য করে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: একবার কোনো পিতামাতা তাদের সন্তানের ব্যাপারে শাসকের নিকট পাল্টাপাল্টি দাবি জানালো। শাসক সন্তানকে স্বাধীনতা দিলেন। সে তার বাপকে নির্বাচন করলো। তখন তার মা শাসককে বললেন, আপনি ওকে জিজ্ঞাসা করুন, কী কারণে বাবাকে নির্বাচন করেছে। শাসক জিজ্ঞাসা করলেন। জবাবে সন্তান বললো, আমার মা আমাকে প্রতিদিন মক্তবে পাঠায়, সেখানে শিক্ষক আমাকে প্রহার করে। আর আমার বাবা আমাকে ছেলেদের সাথে খেলতে দেন। একথা শুনে শাসক মায়ের পক্ষে রায় দিলেন এবং বললেন, তোমারই সন্তানের প্রতি অগ্রাধিকার রয়েছে। ইবনে তাইমিয়া আরো বলেছেন, পিতামাতার মধ্য থেকে যেজন সন্তানকে ইসলামী শিক্ষা দেয়া পরিত্যাগ করবে, সে পাপী এবং সে সন্তানের অভিভাবক হওয়ার কোনো অধিকার তার নেই। শুধু বাবা মা নয়, সকল দায়িত্বশীলের বেলাই একথা প্রযোজ্য। তাকে অভিভাবকত্ব ত্যাগ করে এমন কাউকে অভিভাবক নিয়োগ করতে হবে, যে ইসলামী আদর্শ নীতিমালা অনুযায়ী তার সন্তানদেরকে পরিচালনা করবে। কেননা সাধ্যমত আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য করাই সকলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 শিশু কখন পিতা মাতা উভয়ের কাছে পালাক্রমে থাকবে

📄 শিশু কখন পিতা মাতা উভয়ের কাছে পালাক্রমে থাকবে


শাফেয়ি আলেমগণ বলেছেন, সন্তান যদি ছেলে হয় এবং সে মাকে নির্বাচন করে, তবে সে রাতের বেলা মার কাছে থাকবে এবং বাবা তাকে দিনের বেলায় বিদ্যালয়ে কিংবা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাবে। কেননা মূল লক্ষ্য হলো সন্তানের ভাগ্য উন্নয়ন আর যদি বাবাকে নির্বাচন করে, তাহলে সে দিনরাত সব সময় বাবার কাছে থাকবে। তবে তাকে তার মার কাছে বেড়াতে যেতে বা সাক্ষাত করতে যেতে বাধা দেয়া চলবেনা। কেননা বাধা দেয়ার অর্থ হবে মায়ের অবাধ্য হতে ও রক্তের বন্ধন ছিন্ন করতে প্ররোচনা দান। ছেলে যদি অসুস্থ হয় তবে তর পরিচর্যায় মায়ের অধিকারই বেশি। কেননা রোগের কারণে সে সম্পূর্ণ শিশুর মতো একজন তত্ত্বাবধায়কের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। আর এ ধরনের পরিস্থিতিতে তার পরিচর্যায় মায়েরই অগ্রাধিকার। আর সন্তান যদি মেয়ে হয় এবং সে দু'জনের একজনকে নির্বাচন করে, তবে সে যাকে নির্বাচন করেছে তার কাছে দিনরাত থাকবে। তবে অপরজনকে তার সাথে দেখা করতে বাধা দেয়া যাবেনা। তবে সেই সাক্ষাতকার বেশি দীর্ঘস্থায়ী না হওয়া চাই। কেননা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটলে তাদের দুজনের একজন অপরজনের কাছে দীর্ঘ সময় কাটাবেনা। আর যদি মেয়ে অসুস্থ হয়, তবে মা তার নিজ বাড়িতে নিয়ে তার পরিচর্যা করতে অগ্রাধিকার পাবে। আর যদি পিতামাতার কোনো একজন অসুস্থ হয় এবং সন্তান অন্যের কাছে থাকে, তাহলে তাকে তার পরিচর্যা ও মৃত্যুর সময় তার কাছে থাকতে বাধা দেয়া যাবেনা। আর যদি শিশু পিতামাতার একজনকে নির্বাচন করে এবং তাকে তার নিকট অর্পণ করা হয়, অতপর সে অন্যজনকে বাছাই করে, তাহলে শিশুকে তার নিকট স্থানান্তরিত করতে হবে। আর তার নিকট হস্তান্তরের পর সে যদি পুনরায় প্রথমজনকে নির্বাচন করে, তবে তাকে তার কাছেই ফেরত পাঠাতে হবে। কেননা নির্বাচনটা তার স্বাধীন মতানুসারেই হতে হবে। আবার মা বাবার কোনো একজনের নিকট অবস্থানকারী শিশু এক এক সময়ে এক একজনের নিকট থাকা পছন্দ করতে পারে। এমতাবস্থায় তার খাদ্যপানীয় সরবরাহ করার সময় যেমন তার ইচ্ছাকে অনুসরণ করা হয়, তেমনি তার এ ইচ্ছারও অনুসরণ করা হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 শিশুকে স্থানান্তর করা

📄 শিশুকে স্থানান্তর করা


পিতামাতার কোনো একজন যখন কোনো প্রয়োজনে সফরে যায় এবং অপরজন বাড়িতে থাকে, তখন যিনি বাড়িতে আছেন তারই সন্তানকে নিজের কাছে রাখার অগ্রাধিকার। কেননা শিশু সন্তানকে নিয়ে সফরে যাওয়া তার জন্য ক্ষতিকর, বিশেষত সে যদি দুগ্ধপোষ্য হয়। এভাবে শর্তহীনভাবেই এটির উল্লেখ করতে হয়েছে। হজ্জের সফরকে এ থেকে বাদ দেয়া হয়নি। আর যদি তাদের একজন এক শহর থেকে অন্য শহরে বসবাসের জন্য স্থানান্তরিত হয় এবং সেই শহর ও সেখানে যাওয়ার পথ অথবা এর কোনো একটি বিপদসংকুল হয়, তাহলে যেজন স্থিতিশীল রয়েছে, সে ঐ শিশু পালনের অগ্রাধিকারী। আর যদি সেই শহর ও সেখানে যাতায়াতের পথ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ হয়, তাহলে আহমদ থেকে বর্ণিত দু'টি মতের একটি হলো, পালনের অধিকার বাবার, যাতে সে শিশুকে শিক্ষাদীক্ষা দিতে পারে। এটা মালেক ও শাফেয়িদেরও মত এবং শুরাইহ এই মতেই ফায়সালা করেছেন। অপর মতটি হলো, মায়ের অধিকার অগ্রগণ্য। এখানে তৃতীয় আরো একটি মতও রয়েছে। সেটি হলো, স্থানান্তরিত হওয়া ব্যক্তি যদি বাবা হয়, তাহলে মায়ের অধিকার অগ্রগণ্য। আর যদি মা হয় তবে দেখতে হবে যে শহরে সে স্থানান্তরিত হচ্ছে, মূল বিয়ে সেখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল কিনা। যদি হয়, তবে মায়ের অধিকার অগ্রগণ্য। অন্যথায় বাবার অধিকার অগ্রগণ্য। আর আবু হানিফার মত এটাই। আবু হানিফার আরো একটা মত বর্ণিত হয়েছে। সেটি এই যে, মা যদি শহর থেকে গ্রামে স্থানান্তরিত হয়, তবে বাবার অগ্রাধিকার। আর যদি এক শহর থেকে অন্য শহরে হয়, তবে মায়ের অগ্রাধিকার। আর এই সমস্ত মতামতের কোনোটির পক্ষেই তেমন কোনো সন্তোষজনক প্রমাণ নেই। কাজেই যা করলে শিশুর কল্যাণ অধিকতর নিশ্চিত হবে, সেটা করাই সঠিক এবং সতর্কতামূলক। দেখতে হবে, স্থানান্তরিত হওয়া ও না হওয়ার মধ্যে কোন্টি বেশি উপকারী। যেটি শিশুর জন্য বেশি উপকারী ও নিরাপত্তামূলক হবে, সেটাই করা হবে। আর এসব ব্যবস্থা তখনই প্রযোজ্য, যখন মা ও বাবার একজন স্থানান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করতে ও সন্তানকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে ইচ্ছুক হয়না। যে ব্যক্তি এরূপ করতে ইচ্ছুক হবে তার কাছে শিশুকে অর্পণ করা হবেনা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 আদালতের রায়সমূহ

📄 আদালতের রায়সমূহ


শিশুর লালন পালনের সাথে সংশ্লিষ্ট মামলায় ইসলামী আদালতের বহু রায় রয়েছে যা গণনা করা দুঃসাধ্য। এসব রায়ের মধ্যে বহু সংখ্যক রায় এমন রয়েছে, যা থেকে বিভিন্ন বিধি ও মূলনীতি বেরিয়ে এসেছে। এ ধরনের কিছু রায় এখানে তুলে দিচ্ছি:
প্রথম রায়: কারমুয রাজ্যের নিম্ন আদালত থেকে ১৯৩২ সালে ঘোষিত এ রায় ১৯৩৩ সালে আলেকজান্দ্রিয়ার নিম্ন আদালত থেকে ঘোষিত রায় দ্বারা সমর্থিত হয়। এ রায় মায়ের অনুপস্থিতির অজুহাতে বাবা কর্তৃক তার শিশু মেয়েকে নিজে লালন পালনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। এই শিশু মেয়ের বাবা ও মা যে শহরে বাস করতো এবং যে শহরে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল, সেই শহর থেকে স্ত্রী অনেক দূরে অবস্থিত একটি শহরে বাস করা আরম্ভ করে। মায়ের এত দূরে অবস্থান যেহেতু তার সন্তান পালনের অধিকার রহিত করে, তাই পিতা শিশু মেয়েটির লালন পালনের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। আদালত তার রায়ে ফিকহ শাস্ত্রের এই বিধির বরাত দেয় যে, স্বামী-স্ত্রীতে বিচ্ছেদ ঘটার আগে ও পরে সন্তান পালনে মায়ের অগ্রাধিকার রয়েছে। এমনকি স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর অবাধ্যতাও তার সন্তান পালনের অধিকার রহিত করেনা। স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক বন্ধন যতক্ষণ বহাল থাকে, ততক্ষণ বাবা সন্তান পালনের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করতে চাইলে প্রথমে তার পক্ষ থেকে অবাধ্য স্ত্রীকে তার আনুগত্যে ফিরে আসার নোটিশ দিতে হবে। নোটিশ দিয়েই একতরফাভাবে শিশু সন্তানের পালনের আবেদন জানালে সে অত্যাচারী সাব্যস্ত হবে এবং তার আবেদন গ্রহণ করা হবেনা। কেননা এতে মা সন্তান পালন ও তত্ত্বাবধানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এই রায় থেকে মূলনীতি জানা গেলো: শিশুর মা যখন শিশু সন্তানকে নিয়ে দূরবর্তী স্থানে স্থানান্তরিত হয়ে যায়, তখন বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা পর্যন্ত বাবার তার কাছ থেকে সন্তানকে ছিনিয়ে নেয়ার অধিকার নেই। কেননা বাবার তখনো মায়ের উপর বৈবাহিক কর্তৃত্ব এবং তাকে আনুগত্যে ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা রয়েছে। সেই ক্ষমতাবলে সে স্ত্রীকে নিজের কর্তৃত্বে ফিরিয়ে এনে সন্তানকে নিজের তত্ত্বাবধানে রাখতে পারে। ইদ্দত পালনরতা স্ত্রীর বেলায়ও একথা প্রযোজ্য। কেননা তাকে ইদ্দতকালে স্বামীগৃহে থাকার ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব।"
দ্বিতীয় রায়: প্রথমে ১৯৩১ সালের মে মাসে বেবা রাজ্যের নিম্ন আদালত থেকে জারিকৃত ও পরে ১৯৩১ সালের জুলাইতে বনু সুয়াইদের উচ্চতর আদালত থেকে আপিলক্রমে সমর্থিত এই রায় থেকে যে মূলনীতিটি প্রতিষ্ঠিত হয় তা হলো: "যতক্ষণ পর্যন্ত সন্তানের মা তার নিজ শহরে বাস করে এবং সেই শহর ও তার কাছ থেকে দূরে অবস্থানকারী বাবার শহরের মাঝে এত বেশি ব্যবধান থাকেনা যে, বাবা সন্তানকে দেখতে যেতে ও দেখে রাতের আগে নিজ শহরে ফিরে আসতে পারেনা, ততক্ষণ বাবার এ অজুহাত গ্রহণ করা হবেনা যে, সে সন্তানের মা ও পালনকারিণীর শহরে গিয়ে সন্তানকে দেখে রাতের আগে নিজের শহরে ফিরে আসতে পারেনা এবং তাকে ঐ অজুহাতের ভিত্তিতে সন্তান পালনের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করার অনুমতি দেয়া হবেনা, চাই বাবার ঐ শহর থেকে দূরে অবস্থান করা ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত হোক।" কেননা এ ক্ষেত্রে কোনো অবস্থায়ই মায়ের কোনো দোষ নেই।
এই মামলার ঘটনাবলীর বিবরণ এই যে, বাদি বিবাদিনীকে বিবাদিনীর নিজ শহর বনু মাজারে বিয়ে করে, অতপর বৈবাহিক বন্ধন বহাল থাকা অবস্থায় তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্মে। ঐ শহরেই স্ত্রীকে তালাক দেয়া হয় এবং সন্তান প্রসবের মাধ্যমে ইদ্দত সমাপ্ত হয়। এরপর বিবাদিনী বেবা নগরের আদালত থেকে ১৯৩০ সালের ২৯ অক্টোবর এই মর্মে ডিগ্রি লাভ করে যে, কন্যা সন্তানটিকে সে-ই লালন-পালন করবে। এ সময়ে বাদি বনু মাজার শহরে বসবাস করতো। পরে বাদি আসিযুত নগরীতে বদলি হওয়ায় উক্ত ডিগ্রির অবসান ঘটে এবং সেখানে সে আদালতে কন্যাকে নিজে লালন পালনের অনুমতি প্রার্থনা করে। এ সময় কন্যার বয়স দু'বছর আট মাসের বেশি ছিলনা।
তৃতীয় রায়: দামিনপুরের আদালত থেকে ১৯২৭ সালের ২৫ অক্টোবর এ রায় ঘোষিত হয় এবং এর বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা হয়নি। এ রায়ে ঘোষণা করা হয় যে, শরিয়তের বিধান মতে, মা ব্যতীত অন্য কোনো পালনকারিণীর জন্য সন্তানের বাবার শহর থেকে অন্য শহরে সন্তানকে স্থানান্তরিত করা বাবার অনুমতি ব্যতিরেকে বৈধ নয়। তবে কোনো কোনো ফকিহের মতে, এ দ্বারা এত দূরে অবস্থিত স্থানে স্থানান্তর করা বুঝানো হয়েছে, যেখানে সন্তানকে দেখতে গিয়ে রাতের আগে নিজ বাড়িতে ফেরা বাবার পক্ষে সম্ভব নয়। এর চেয়ে নিকটবর্তী স্থানে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে মা ও মা ব্যতীত অন্য মহিলার পার্থক্য নেই। বস্তুত আদালতের যেসব রায়কে ফিক্‌হী ভাষ্যসমূহের বাস্তব প্রতিফলন গণ্য করা হয়, সেগুলো সম্পর্কে অবহিত হওয়া সকলের কর্তব্য। কেননা এগুলোতে বাস্তব জীবনে অনেক সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে। জীবনের বাস্তবতার আলোকেই আদালত এসব ফিক্‌হী ভাষ্যের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00