📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সন্তান পালনের মেয়াদ পূর্ণি

📄 সন্তান পালনের মেয়াদ পূর্ণি


সন্তান লালনের মেয়াদ পূর্ণ হবে তখনই, যখন শিশু মহিলাদের সেবা যত্নের মুখাপেক্ষী থাকবেনা, তার মধ্যে স্বাতন্ত্র্যের চেতনা ও ভালো মন্দ বাছবিচারের ক্ষমতা তৈরি হবে এবং শিশু একা একাই নিজের অত্যাবশ্যকীয় কাজ সমাধা করতে পারবে, যেমন একা একা খাওয়া, একা একা কাপড় পরা এবং একা একাই নিজেকে পরিষ্কার করা ইত্যাদি। এসব কাজের ক্ষমতা কখন তৈরি হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যায়না। তাই সন্তান পালনের মেয়াদও কখন পূর্ণ হবে বলা যায়না। প্রকৃতপক্ষে শিশুর ভালো মন্দ বাছবিছারের ক্ষমতা হওয়া ও মহিলাদের সেবা যত্নের অবসান ঘটাই এই মেয়াদপূর্তির সীমা নির্ধারক। শিশু যখন ভালো মন্দ বাছবিচারে সক্ষম হবে, নারীর সেবা যত্নের মুখাপেক্ষী থাকবেনা এবং একা একা নিজের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে পারবে, তখনই তার লালন পালনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। হানাফি মাযহাবের ফতোয়া হলো, বালকের বয়স যখন সাত বছর এবং বালিকার বয়স নয় বছর পূর্ণ হবে তখনই তার লালন পালনের মেয়াদ সমাপ্ত হবে। বালিকার ক্ষেত্রে তারা দু'বছর বাড়ানো সমীচীন মনে করেছেন এজন্য যেন সে তার পালনকারিণীর কাছ থেকে নারীসুলভ জীবন যাপনের নিয়মাবলী রপ্ত করে নেয়ার সুযোগ পায়। ১৯২৯ সালের মিশরীরা আইনের ২৫ নং আইনের ২০ নং ধারায় সন্তান পালনের বয়স নির্ধারণ নিম্নোক্ত ভাবে করা হয়েছে:
"মহিলাদের দ্বারা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে শিশু পালনের মেয়াদ আদালত সাত থেকে নয় বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়ে শিশুর মেয়াদ নয় থেকে এগারো পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটাই শিশুর স্বার্থের দাবি।" কাজেই শিশুর কিসে ভালো হবে, তা নির্ধারণের ভার আদালতের উপরই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এই আইনের এই ধারাটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: "এখন পর্যন্ত যে কার্যধারা চালু রয়েছে, তা হলো সন্তান পালনের অধিকার ছেলে শিশুর বেলায় সাত বছর বয়সে এবং মেয়ে শিশুর বেলায় নয় বছর বয়সে শেষ হয়।” আসলে এটাই সেই বয়স, যার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত হয় যে, এ বয়স পর্যন্ত ছেলে শিশু ও মেয়ে শিশু কোনো না কোনো পালনকারিণীর মুখাপেক্ষী থাকে।
এ বয়স পর্যন্ত মহিলা পালনকারিণীর পরিবর্তে কোনো পুরুষ পালনকারীর নিকট ছেলে শিশু ও মেয়ে শিশু সোপর্দ করা উভয়ের জন্য বিপজ্জনক হয়ে থাকে, বিশেষত যখন তাদের বাবা তাদের মা ব্যতিত অন্য কোনা মহিলাকে বিয়ে করে। তাই এ সময়ে সন্তানদেরকে কেড়ে নেয়ার বিরুদ্ধে মহিলাদেরকে অত্যধিক অভিযোগ করতে দেয়া যায়। হানাফি মযহাবের নীতি নির্ধারণী কথা হলো, ছেলে শিশু যখন মহিলা পালনকারিণীর সেবার মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে এবং মেয়ে শিশু যখন যৌবনে উপনীত হবে তখনই তাদেরকে তাদের পিতার হাতে সমর্পণ করা হবে। কিন্তু শিশু কত বছর বয়সে। এই মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত হবে তা নির্ধারণে ফকিহগণ নানাবিধ মত অবলম্বন করেছেন। কারো মতে, মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত হয় সাত বছর বয়সে, কারো মতে নয় বছর বয়সে আবার কেউ বলেন, যৌবনে উপনীত হয় নয় বছর বয়সে, কেউ বলেন, এগারো বছর বয়সে।
পক্ষান্তরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতে, সাত বছর বয়সের পর ছেলে শিশুর এবং নয় বছর বয়সের পর মেয়ে শিশুর স্বার্থ কিভাবে রক্ষিত হবে, সেটা বিবেচনা করার এখতিয়ার আদালতের নিকট অর্পণ করা মঙ্গলজনক। আদালত যদি মনে করে, এ বয়সের পরও তাদের মহিলা পালনকারিণীর অধীন থাকা কল্যাণকর, তাহলে ছেলে শিশুকে আরো দু'বছর বাড়িয়ে নয় বছর পর্যন্ত এবং মেয়ে শিশুকে আরো দু'বছরে বাড়িয়ে এগারো বছর পর্যন্ত মহিলা পালনকারিণীর নিকট রাখার ফায়সালা দিতে পারে। আর যদি আদালত তাদের জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা কল্যাণকর মনে করে, তবে উভয়কে কোনো পুরুষ অভিভাবকের নিকট সোপর্দ করতে পারে।” মুসলিম পরিবার আইনের ১৭৫ নং ধারায় রয়েছে যে, পালনকারিণী নারী হলে আদালতও সেক্ষেত্রে অনুরূপ দু'বছর করে সম্প্রসারিত করতে পারে। আদালত ছেলে ও মেয়ে উভয়কে মা বা নানীর কাছে পনেরো বছর বয়স পর্যন্ত থাকার অনুমতিও দিতে পারে। তবে আমাদের মতে, ২৯ সালের ২৫ নং আইনের ২০ নং ধারা অনুসরণ করাই কল্যাণকর, যা এখনো বলবৎ রয়েছে। -ড. মুহাম্মদ ইউসুফ মূসা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মুসাদানের আইন

📄 মুসাদানের আইন


ড. মুহাম্মদ ইউসুফ মূসা উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৩২ সালের ৩৪ নং আইন জারি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সুদানের ইসলামী আদালতে এই বিধি চালু ছিলো যে, ছেলে শিশুর লালন পালনের সর্বশেষ বয়স সাত বছর এবং মেয়ে শিশুর বয়স নয় বছর। পরে ১৯৩২ সালের আইনের প্রথম ধারায় বলা হলো: "আদালত ছেলে শিশুকে সাত বছর থেকে যৌবন পর্যন্ত এবং মেয়ে শিশুকে নয় বছর থেকে স্বামীর বাসর হওয়া পর্যন্ত মহিলা পালনকারিণীর কাছে লালিত পালিত হওয়ার অনুমতি দিতে পারে, যদি জানা যায় যে, তাতেই তার মঙ্গল নিশ্চিত। তবে পালনকারিণীর নিকট পালিত হওয়ার সময়ে পিতা ও অন্য সকল গুরুজন তাকে বিদ্যা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিতে পারে।" তারপর দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে: “ছেলে শিশুর সাত বছর ও মেয়ে শিশুর নয় বছর বয়সের পর লালন পালনের জন্য কোনো মজুরি দিতে হবেনা।” তৃতীয় ধারায় রয়েছে: "পিতা যদি মেয়েকে লালন পালনের দায়িত্ব থেকে পালনকারিণীকে অব্যাহতি দেয়ার উদ্দেশ্যে বিয়ে দেয়, তবে স্বামীর বাসরে যাওয়া মাত্রই লালন পালনের দায়িত্ব রহিত হবেনা, যতোক্ষণ পালনকারিণী লালন পালনে সক্ষম থাকবে।"
১৯৪২ সালে খারতুম থেকে প্রকাশিত বিধিমালায় যা পাওয়া যায়, তার সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে:
১. ৩৪ নং শরয়ী বিধি বালকের লালন পালনের বয়স যৌবন প্রাপ্তি পর্যন্ত এবং বালিকার লালন পালনের বয়স বাসরে যাওয়া পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এটা আবু হানিফার মতের পরিপন্থী। এটা মালেকি মাযহাবের মতো।
এটা একটা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যা অতিক্রম করতে নিম্নোক্ত ব্যবস্থাবলী নেয়া আবশ্যক:
১. আদালত কেবল তখনই লালন পালনের মেয়াদ সম্প্রসারিত করবে, যখন পালনকারিণী আদালতের নিকট পালিত শিশুকে তার নিকট রাখার অনুমতি প্রার্থনা করবে। অনুমতি প্রার্থনার সাথে এটাও উল্লেখ করবে যে, এতেই শিশুর কল্যাণ নিহিত রয়েছে সেই সাথে প্রত্যাশিত কল্যাণের বিবরণও দেবে। অথবা একই কারণে সে যে শিশুকে পালন করছে, তাকে তার পিতৃপক্ষীয় আত্মীয়ের নিকট সোপর্দ করতে অস্বীকার করবে। পিতৃপক্ষীয় আত্মীয় যখন পালিত শিশুকে তার পালনকারিণীর নিকট রাখতে সম্মত হবেনা, তখন পালনকারিণীকে তার প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে বলা হবে, অথবা আদালত স্বয়ং উক্ত বালক বা বালিকার স্বার্থ ও কল্যাণ কিসে নিহিত, তা তদন্ত করবে। পালনকারিণী যদি প্রমাণাদি উপস্থাপন না করে, অথবা উপস্থাপন করে কিন্তু তা সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়না, আর আদালতের নিকটও স্পষ্ট হয়না যে, শিশুকে তার পালনকারিণীর কাছে রাখা কল্যাণকর, তাহলে পালনকারিণী দাবি জানালে আদালত পিতৃপক্ষীয় আত্মীয়ের কাছ থেকে এই মর্মে শপথ নেবে যে, শিশুকে পালনকারিণীর কাছে রেখে দিলে তার কল্যাণ নিশ্চিত হবেনা সে যদি এভাবে শপথ করে, তাহলে আদালত শিশুকে তার নিকট সমর্পণের ফায়সালা করবে। আর যদি শপথ করতে অস্বীকার করে, তাহলে তার আবেদন অগ্রাহ্য করবে।
২. যদি পালনকারিণী শিশুকে তার পিতৃপক্ষীয় আত্মীয়ের নিকট সমর্পণের বিরোধিতা না করে, অথবা আদৌ আদালতে হাজির না হয়, তাহলে ইমাম আবু হানিফার মাযহাবের বিধি অনুসরণ করা আদালতের কর্তব্য। এই বিধি অনুযায়ী লালন পালনের বয়স সীমা অতিক্রান্ত শিশুকে উপযুক্ত বিবেচিত পিতৃপক্ষীয় আত্মীয়ের নিকট সমর্পণ করা হবে এবং এটা শিশুর স্বার্থের চাহিদা হিসেবেই করা উচিত একথা প্রমাণ করার প্রয়োজন হবেনা।
৩. পালনকারিণী যদি শিশুকে পিতৃপক্ষীয় আত্মীয়ের নিকট হস্তান্তরের সময় অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সে আদালতের রায়ের বিরোধিতা করতে পারবে এবং শিশুকে তার নিকট রাখার দাবি জানাতে পারবে। সেরূপ ক্ষেত্রে যে পালনকারিণী উপস্থিত থাকে, তার সাথে আদালত যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করে, অবিকল সেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
৪. আদালত যদি শিশুর কল্যাণের খাতিরে তাকে মহিলাদের মধ্যে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, অতপর কোনো কারণে কল্যাণের পথ পরিবধির্ত হয়ে যায় এবং কিসে তার কল্যাণ হবে, তা নিয়ে পুনরায় বিতর্ক দেখা দেয়, তাহলে পালনকারিণীর কাছে থাকায় শিশুর কোনো কল্যাণ নেই এই মর্মে নিশ্চিত হওয়ার পর আদালত শিশুকে তার কাছ থেকে নিয়ে পিতৃপক্ষীয় আত্মীয়ের নিকট হস্তান্তর করার অনুমতি দেবে। (ড. মুহাম্মদ ইউসুফ মূসা: মুসলিম পারিবারিক আইন পৃ. ৫১৬)

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 লালন পালনের মেয়াদ সমাপ্তিতে বালক বালিকার স্বাধীনতা

📄 লালন পালনের মেয়াদ সমাপ্তিতে বালক বালিকার স্বাধীনতা


শিশুর যখন সাত বছর বয়স হবে কিংবা ভালোমন্দ বুঝবার বয়স হবে এবং অন্যের কাছে ললিত পালিত হওয়ার মেয়াদ অতিক্রান্ত হবে। তখন তার বাবা ও পালনকারিণী যদি একমত হয় যে, তাদের যে কোনো একজনের কাছে তার থাকা উচিত, তাহলে এই ঐকমত্য অনুসারে কাজ করা হবে। আর যদি তারা দ্বিমত পোষণ করে ও বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের যে কোনো একজনকে গ্রহণে শিশুকে স্বাধীনতা দেয়া হবে। সে তাদের দু'জনের মধ্য থেকে যাকে কাছাই করবে সেই তার জন্য অগ্রগণ্য হবে। (শিশুকে স্বাধীনতা দেয়ার জন্য দু'টো শর্ত রয়েছে: ১ বিতর্ককারীরা সবাই লালন পালনের অধিকারী হবে। ২ শিশুটি যেন অসুস্থ মস্তিষ্ক বা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী না হয়। যদি অসুস্থ মস্তিষ্ক হয়, তাহলে মাই তার তত্ত্বাবধায়ক হবার ব্যাপারে অগ্রগণ্য হবে, চাই শিশু তখন প্রাপ্তবয়স্কই থাক না কেন। কেননা এমতাবস্থায় প্রাপ্তবয়স্ক হলেও সে শিশুর মাতা। আর শিশুর প্রতি মাই অধিকতর স্নেহময়ী।)
আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেছেন: জনৈক মহিলা রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এলো এবং বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমার এই ছেলের জন্য আমার পেট ছিলো বাসস্থান, আমার কোলই ছিলো নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং আমার স্তনই ছিলো খাদ্য ও পানীয়ের ভাণ্ডার। অথচ তার বাবা তাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়। রসূলুল্লাহ সা. ছেলেটিকে বললেন: "এই যে তোমার বাবা, আর এই যে তোমার মা। যাকে চাও তার হাত ধরো।" ছেলেটি তার মায়ের হাত ধরলো। অতপর মহিলা ছেলেকে নিয়ে চলে গেলো।" -আবু দাউদ।
উমর রা. আলী রা. ও শুরাইহ এই বিধি অনুসারেই ফায়সালা করেছেন। এটাই শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবের মত। ছেলে যদি উভয়কে নির্বাচন করে কিংবা কাউকেই নির্বাচন না করে, তাহলে তাদের একজনকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হবে। আবু হানিফা বলেছেন: পিতার অধিকার অগ্রগণ্য। ছেলেকে স্বাধীনতা দেয়া জায়েয নেই। কেননা তার কোনো মতামত নেই এবং সে নিজের ভালোমন্দ বোঝেনা। এমনও হতে পারে যে, সে যার কাছে অবাধে খেলা করতে পারবে, যে তাকে শিষ্টাচার শেখাবেনা এবং যেমন খুশি তেমন চলতে দেবে, তাকেই নির্বাচন করবে। এর ফলে সে বখাটে হয়ে যাবে। তাছাড়া যেহেতু সে বয়োপ্রাপ্ত নয়, তাই তাকে স্বাধীনতা দেয়া যায়না। যেমন সাত বছরের কম বয়স্ক শিশুকে স্বাধীনতা দেয়া হয়নি। ইমাম মালেকের মতে, শিশুর দাঁত পড়া পর্যন্ত তার উপর মায়ের অধিকার বেশি। এ বিধি ছেলে শিশুর বেলায় প্রযোজ্য। মেয়ে শিশু সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ির মত হলো, ছেলে শিশুর মতোই তাকে স্বাধীনতা দেয়া হবে। আবু হানিফা বলেছেন, মেয়ে শিশুর যৌবন লাভ করা বা বিয়ে হওয়া পর্যন্ত তার উপর মায়ের হক বেশি। ইমাম মালেক বলেন, বিয়ে হওয়া ও স্বামীর বাসর ঘরে যাওয়া পর্যন্ত তার উপর মায়ের অধিকার বেশি। হাম্বলিদের মতে মেয়ে শিশুর বয়স নয় বছর হওয়া পর্যন্ত তার উপর বাবার অধিকার বেশি এবং তাকে কোনো স্বাধীনতা দেয়া হবেনা। মা ও বাবার কোনো একজনের অগ্রগণ্যতা বা দু'জনের একজনকে নির্বাচনে শিশুর স্বাধীনতার ব্যাপারে শরিয়তে আদৌ কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। আলেমগণও একমত যে, দু'জনের কোনো একজনকে শরিয়তে শর্তহীনভাবে নির্ধারিত করা হয়নি। বরঞ্চ দু'জনের মধ্যে যেজন অত্যাধিক কড়া কিংবা উদাসীন, তাকে সৎ ন্যায়পরায়ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জনের উপর অগ্রাধিকার দেয়া হবেনা। শিশু রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকিতে সক্ষম হওয়াটাই এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়। বাবা যদি সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীন ও অবহেলা প্রবণ অথবা অসমর্থ হয়, কিংবা তার সামর্থ্য সন্তোষজনক না হয় এবং মা তার বিপরীত হয়, তাহলে মাই সন্তান পালনে অগ্রগণ্য হবে বলে ইবনুল কাইয়েম মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, দু'জনের মধ্যে যাকেই আমরা অগ্রাধিকার দেই, চাই সন্তানকে স্বাধীনতা দেয়ার মাধ্যমে হোক বা লটারির মাধ্যমে হোক, বা আর কোনোভাবে হোক, সেটা সন্তানের স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত হয় এমনভাবেই দিতে হবে। মা যদি বাবার চেয়ে ভালো রক্ষক ও ভালো তত্ত্বাবধায়ক হয়, তাহলে তাকে বাবার উপর অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এ রকম ক্ষেত্রে লটারি বা শিশুকে নির্বাচনের স্বাধীনতা দেয়ার প্রতি ভ্রুক্ষেপই করা হবেনা। কেননা শিশুর বুদ্ধি দুর্বল ও অসম্পূর্ণ এবং সে খেলাধুলা করা অথবা নিষ্ক্রিয় থাকাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। আর এ ব্যাপারে তাকে যে সাহায্য করে, স্বভাবতই সে তাকেই নির্বাচন করবে। তাই শিশু কাকে নির্বাচন করলো বা করলোনা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করা যাবেনা। মা বাবার মধ্যে যেজন তার জন্য অধিকতর কল্যাণজনক ও উপকারী, তার কাছেই তার থাকা প্রয়োজন। শরিয়ত এ ছাড়া অন্য কিছু বরদাশত করতে পারেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ছেলেমেয়েকে সাত বছর বয়সেই নামাযের আদেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামায না পড়লে প্রহার করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।" আর অপরদিকে আল্লাহ বলেছেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ .
অর্থ : হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও পরিবার পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার কাষ্ঠ হবে মানুষ ও পাথর। (সূরা আত তাহরীম: আয়াত ৬) ইমাম হাসান বসরি বলেছেন, তোমরা ছেলেমেদেরকে জ্ঞান শিক্ষা দাও, শিষ্টাচার শিক্ষা দাও এবং ইসলামী বিধান শিক্ষা দাও।"
সুতরাং যে মা শিশুকে মক্তবে পাঠায় ও কুরআন শেখায়, সে মা এমন বাবার চেয়ে অগ্রগণ্য, যে শিশুকে অধিকাংশ সময় খেলাধুলা ও সমবয়সীদের সাথে মেলামেশায় সাহায্য করে। এ ব্যাপারে কোনো লটারি বা শিশুকে নির্বাচনের ক্ষমতা দেয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। মায়ের পরিবর্তে বাবা যদি এ রকম হয়, তাহলে তার বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। পিতামাতার মধ্য থেকে যেজন সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ ও তার রসূলের হুকুম অমান্য করবে, তার ওপর সেই জন অগ্রাধিকার পাবে, যে আল্লাহ ও তার রসূলের হুকুম মান্য করে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: একবার কোনো পিতামাতা তাদের সন্তানের ব্যাপারে শাসকের নিকট পাল্টাপাল্টি দাবি জানালো। শাসক সন্তানকে স্বাধীনতা দিলেন। সে তার বাপকে নির্বাচন করলো। তখন তার মা শাসককে বললেন, আপনি ওকে জিজ্ঞাসা করুন, কী কারণে বাবাকে নির্বাচন করেছে। শাসক জিজ্ঞাসা করলেন। জবাবে সন্তান বললো, আমার মা আমাকে প্রতিদিন মক্তবে পাঠায়, সেখানে শিক্ষক আমাকে প্রহার করে। আর আমার বাবা আমাকে ছেলেদের সাথে খেলতে দেন। একথা শুনে শাসক মায়ের পক্ষে রায় দিলেন এবং বললেন, তোমারই সন্তানের প্রতি অগ্রাধিকার রয়েছে। ইবনে তাইমিয়া আরো বলেছেন, পিতামাতার মধ্য থেকে যেজন সন্তানকে ইসলামী শিক্ষা দেয়া পরিত্যাগ করবে, সে পাপী এবং সে সন্তানের অভিভাবক হওয়ার কোনো অধিকার তার নেই। শুধু বাবা মা নয়, সকল দায়িত্বশীলের বেলাই একথা প্রযোজ্য। তাকে অভিভাবকত্ব ত্যাগ করে এমন কাউকে অভিভাবক নিয়োগ করতে হবে, যে ইসলামী আদর্শ নীতিমালা অনুযায়ী তার সন্তানদেরকে পরিচালনা করবে। কেননা সাধ্যমত আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য করাই সকলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 শিশু কখন পিতা মাতা উভয়ের কাছে পালাক্রমে থাকবে

📄 শিশু কখন পিতা মাতা উভয়ের কাছে পালাক্রমে থাকবে


শাফেয়ি আলেমগণ বলেছেন, সন্তান যদি ছেলে হয় এবং সে মাকে নির্বাচন করে, তবে সে রাতের বেলা মার কাছে থাকবে এবং বাবা তাকে দিনের বেলায় বিদ্যালয়ে কিংবা কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাবে। কেননা মূল লক্ষ্য হলো সন্তানের ভাগ্য উন্নয়ন আর যদি বাবাকে নির্বাচন করে, তাহলে সে দিনরাত সব সময় বাবার কাছে থাকবে। তবে তাকে তার মার কাছে বেড়াতে যেতে বা সাক্ষাত করতে যেতে বাধা দেয়া চলবেনা। কেননা বাধা দেয়ার অর্থ হবে মায়ের অবাধ্য হতে ও রক্তের বন্ধন ছিন্ন করতে প্ররোচনা দান। ছেলে যদি অসুস্থ হয় তবে তর পরিচর্যায় মায়ের অধিকারই বেশি। কেননা রোগের কারণে সে সম্পূর্ণ শিশুর মতো একজন তত্ত্বাবধায়কের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। আর এ ধরনের পরিস্থিতিতে তার পরিচর্যায় মায়েরই অগ্রাধিকার। আর সন্তান যদি মেয়ে হয় এবং সে দু'জনের একজনকে নির্বাচন করে, তবে সে যাকে নির্বাচন করেছে তার কাছে দিনরাত থাকবে। তবে অপরজনকে তার সাথে দেখা করতে বাধা দেয়া যাবেনা। তবে সেই সাক্ষাতকার বেশি দীর্ঘস্থায়ী না হওয়া চাই। কেননা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটলে তাদের দুজনের একজন অপরজনের কাছে দীর্ঘ সময় কাটাবেনা। আর যদি মেয়ে অসুস্থ হয়, তবে মা তার নিজ বাড়িতে নিয়ে তার পরিচর্যা করতে অগ্রাধিকার পাবে। আর যদি পিতামাতার কোনো একজন অসুস্থ হয় এবং সন্তান অন্যের কাছে থাকে, তাহলে তাকে তার পরিচর্যা ও মৃত্যুর সময় তার কাছে থাকতে বাধা দেয়া যাবেনা। আর যদি শিশু পিতামাতার একজনকে নির্বাচন করে এবং তাকে তার নিকট অর্পণ করা হয়, অতপর সে অন্যজনকে বাছাই করে, তাহলে শিশুকে তার নিকট স্থানান্তরিত করতে হবে। আর তার নিকট হস্তান্তরের পর সে যদি পুনরায় প্রথমজনকে নির্বাচন করে, তবে তাকে তার কাছেই ফেরত পাঠাতে হবে। কেননা নির্বাচনটা তার স্বাধীন মতানুসারেই হতে হবে। আবার মা বাবার কোনো একজনের নিকট অবস্থানকারী শিশু এক এক সময়ে এক একজনের নিকট থাকা পছন্দ করতে পারে। এমতাবস্থায় তার খাদ্যপানীয় সরবরাহ করার সময় যেমন তার ইচ্ছাকে অনুসরণ করা হয়, তেমনি তার এ ইচ্ছারও অনুসরণ করা হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00