📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সন্তানের প্রতি বাপের চেয়ে মায়ের অধিকার বেশি

📄 সন্তানের প্রতি বাপের চেয়ে মায়ের অধিকার বেশি


সন্তান মা বাবার কোলে লালিত পালিত হয়ে যে শিক্ষা পায় সেটাই হলো শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। কেননা মা বাবার লালন পালনের ফলে সন্তানের একাধারে দৈহিক গঠন, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং মানসিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি এমন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয় যে, তা তার গোটা জীবনের ভিত্তি বিনির্মাণে কার্যকর অবদান রাখে। এ কারণেই যখন এমন কিছু ঘটে, যার ফলে মা বাবার মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি হয়ে যায়, অথচ তাদের সন্তান রয়েছে, তখন সেই সন্তানের লালন পালনে বাবার চেয়ে মায়ের অধিকার বেশি। এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম ঘটবে কেবল তখনই, যখন এই অগ্রাধিকার লাভে মা কোনো বাধার সম্মুখিন হবে। (যেমন সন্তান পালনের অপরিহার্য শর্তাবলীর অনুপস্থিতি) অথবা সন্তানের মধ্যে এমন কোনো বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব, যা তাকে বাবা ও মায়ের যে কোনো একজনকে বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দেয়। (যথা কোনো মহিলার সেবার মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া।) মায়ের অগ্রাধিকারের কারণ হলো, সন্তান পালন ও দুধ পান করানোর ব্যাপারে মাকেই অভিভাবকত্ব অর্পণ করা হয়েছে। কারণ সন্তানের পালন ও প্রশিক্ষণে মা সর্বাধিক দক্ষতা ও ক্ষমতার অধিকারিণী। আর এ কাজে যে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার প্রয়োজন তা মায়ের মধ্যে যতো বেশি থাকে, পুরুষের মধ্যে ততোটা থাকেনা। তাছাড়া এর জন্য তার হাতে যতো সময় থাকে, পুরুষের হাতে ততোটা থাকেনা। এসব কারণে শিশুর কল্যাণের স্বার্থেই মাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত:
জনৈকা মহিলা বললো, হে রসূলুল্লাহ সা., আমার এই ছেলের জন্য আমার পেট ছিলো বাসস্থান, আমার কোল ছিলো দুর্গ আর আমার স্তন ছিলো খাদ্য ও পানীয়ের ভাণ্ডার। অথচ তার বাবা তাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তুমি যদি বিয়ে না করো, তবে তুমিই তাকে রাখার বেশি হকদার।” -আহমদ, আবু দাউদ, বায়হাকি, হাকেম।
ইমাম মালেক মুয়াত্তায় বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাবের একজন আনসারী স্ত্রী ছিলো। তার পেট থেকে তার ছেলে আসেম জন্মগ্রহণ করেন। পরে উমরের সাথে ঐ স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এই সময় একদিন উমর রা. কুবাতে এলেন। দেখলেন, তার ছেলে আসেম মসজিদের চত্বরে খেলছে। অমনি তার বাহু ধরে তুলে নিজের জন্তুর পিঠের ওপর বসালেন। এ সময় ছেলের নানী দেখে উমর রা.-এর সাথে ঝগড়া শুরু করে দিলো এবং উভয়ে আবু বকরের নিকট নালিশ নিয়ে গেলেন। উমর রা. বললেন, আমার ছেলে। আর মহিলা বললো, আমার ছেলে। আবু বকর রা. ফায়সালা দিলেন, ওকে ওর নানীর সাথে যেতে দাও। এরপর উমর রা. আর নিজের দাবির পুনরাবৃত্তি করলেননা। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, আবু বকর রা. বললেন, মা হচ্ছে সবচেয়ে স্নেহশীলা, মমতাময়ী, সহানুভূতিশীলা, ভালো মন্দ উপলব্ধিকারিণী। তাই সে যতোদিন বিয়ে না করবে ততোদিন সেই সন্তান পালনে অগ্রগণ্য। আবু বকরের এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, মায়ের অধিকতর স্নেহময়ী ও মমতাময়ী হওয়াই তার অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান পালনের অগ্রগণ্যতার মূল কারণ। (প্রথমে উমর রা. আবু বকরের এই মতের বিরোধী থাকলেও পরে এই মত মেনে নিয়েছেন এমনকি নিজের খেলাফতকালেও তদনুয়ায়ী ফতোয়া ও বিচারিক রায় দিয়েছেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর ব্যাপারে তাদের দু'জনের এই মতে সাহাবীরাও একমত।)

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সন্তান পালনের অধিকারে অগ্রগণ্যতার ধারাবাহিকতা

📄 সন্তান পালনের অধিকারে অগ্রগণ্যতার ধারাবাহিকতা


যেহেতু সন্তান পালনের অধিকার প্রাথমিকভাবে মায়ের জন্যই নির্ধারিত, সেহেতু মায়ের পক্ষীয় আত্মীয়রা পিতৃপক্ষের আত্মীয়দের চেয়ে এ ব্যাপারে অগ্রগণ্য। সন্তান পালনের অধিকার যারা পর্যায়ক্রমে পাবে, তাদের ধারাক্রম নিম্নরূপ: প্রথমে মা, মা যদি কোনো কারণ (যথা শর্তের অবর্তমানে) অপারগ হয়, তাহলে নানী, নানীর মা ইত্যাদি যত ঊর্ধ্বে যাক। তাতেও বাধা দেখা দিলে বাপের মার নিকট অধিকার হস্তান্তরিত হবে। তারপর হস্তান্তরিত হবে আপন বোনের নিকট, তারপর মা শরিক সৎ বোনের নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ বোনের নিকট, তারপর আপন বোনের মেয়ের নিকট, তারপর মা শরিক সৎ বোনের মেয়ের নিকট, তারপর আপন খালার নিকট, তারপর মা শরিক সৎ খালার নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ খালার নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ বোনের মেয়ের নিকট, তারপর আপন ভাই এর মেয়ের নিকট, তারপর মা শরিক সৎ ভায়ের মেয়ের নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ ভাই এর মেয়ের নিকট, তারপর আপন ফুফুর নিকট, তারপর মা শরিক সৎ ফুফুর নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ ফুফুর নিকট, তারপর মা শরিক সৎ খালার নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ খালার নিকট, তারপর মায়ের ফুফুর নিকট, তারপর পিতার ফুফুর নিকট হস্তান্তরিত হবে। তবে সর্বক্ষেত্রে আপন ফুফু ও আপন খালা ইত্যাদি অগ্রগণ্য হবে।
অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের যখন এসব মাহরাম আত্মীয়দের কেউ ভাগ্যে জুটবেনা, কিংবা জুটলেও তারা কেউ সন্তান পালনের যোগ্য প্রমাণিত হবেনা, তখন লালন পালনের অধিকারটা হস্তান্তরিত হবে পিতৃপক্ষীয় মাহরাম পুরুষ আত্মীয়দের নিকট উত্তরাধিকার আইনের অগ্রাধিকার ধারাবাহিকতা অনুসারে। লালন পালনের অধিকার প্রথমে হস্তান্তরিত হবে পিতার নিকট, তারপর পিতার পিতার নিকট, যত ঊর্ধ্বে যাক না কেন। তারপর আপন ভাই-এর নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ ভাই-এর নিকট, তারপর আপন ভাই-এর ছেলের নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ ভাই-এর ছেলের নিকট, তারপর আপন চাচার নিকট, তারপর পিতার শরিক সৎ চাচার নিকট, তারপর পিতার আপন চাচার নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ চাচার, তারপর পিতার পিতা শরিক সৎ বাবার নিকট। পৈতৃক পুরুষ মাহরাম আত্মীয়দের মধ্য থেকে যদি কাউকে না পাওয়া যায়, অথবা পাওয়া যায় কিন্তু সন্তান পালনের যোগ্য না পাওয়া যায়, তাহলে পৈতৃক আত্মীয় ব্যতীত অন্য যে কোনো মাহরাম পুরুষের নিকট হস্তান্তরিত হবে। ফলে এ অধিকার এক পর্যায়ে মাতা শরীক সৎ দাদা, তারপর মাতা শরীক সৎ ভাই, তারপর মাতা শরীক সৎ ভাই এর ছেলে, তারপর মাতা শরিক সৎ চাচা, তারপর আপন মামা, তারপর পিতা শরিক মামার নিকট হস্তান্তরিত হবে। যদি দেখা যায়, শিশুর কোনো আত্মীয়ই অবশিষ্ট নেই। তবে আদালত তার লালন পালনের দায়িত্ব পালনে সক্ষম একজন পালনকারী মহিলা নিযুক্ত করবে। সন্তান পালনের ধারাবাহিকতা এভাবে নির্ধারণ করার কারণ হলো, সন্তান পালন একটা অতি জরুরি কাজ। এ কাজে সন্তানের আত্মীয়রাই অগ্রাধিকার প্রাপ্ত। তন্মধ্যে কতক আত্মীয়ের চেয়ে কতক আত্মীয় অধিকতর অগ্রগণ্য। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কেননা শিশুর স্বার্থেই তাদের নিয়োগই অগ্রগণ্য। তাদেরকে না পাওয়া গেলে অথবা লালন পালনের শর্ত তাদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকলে এ দায়িত্ব পর্যায়ক্রমে ঘনিষ্ঠতম আত্মীয়দের উপর অর্পিত হবে। আর যদি আদৌ কোনো আত্মীয় না থাকে, তাহলে উপযুক্ত পালনকারী নিযুক্ত করার দায়িত্ব অর্পিত হবে বিচারকের উপর।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 শিশু সন্তান পালনের শর্তাবলি

📄 শিশু সন্তান পালনের শর্তাবলি


শিশু সন্তানের পালনকারিণীর মধ্যে পালনের যোগ্যতা ও ক্ষমতা থাকা অত্যাবশ্যক। আর এই যোগ্যতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে পারলে। এই শর্তগুলো পূরণ করতে অসমর্থ হলে সন্তান পালনের দায়িত্ব রহিত হবে। এই শর্তগুলো হলো:
১. সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া : এ কারণে পাগল ও অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তি শিশুর লালন পালনের দায়িত্ব পাবে না। কেননা এই দু'ব্যক্তি নিজের ব্যবস্থাপনাই সুষ্ঠুভাবে করতে পারেনা। তাই তাদের উপর অন্যের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করা যেতে পারেনা। যে ব্যক্তি নিজে যে জিনিস অর্জন করতে পারেনি, সে জিনিস সে অন্যকে কিভাবে দেবে?
২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া: কেননা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু যদি ভালো মন্দ বাছবিচারের ক্ষমতা অর্জন করেও থাকে, তথাপি সে একজন অভিবাবক, পালক ও তত্ত্বাবধায়কের মুখাপেক্ষী, কাজেই সে অন্যের তত্ত্বাবধায়ক বা অভিভাবক হতে পারে না।
৩. লালন পালনের যোগ্যতা ও ক্ষমতা: এ শর্তের কারণে কোনো অন্ধ, দুর্বল দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন, সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত, অথবা এমন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যা তাকে তার দায়িত্ব পালনে অক্ষম করে দেয়, কিংবা এত অধিক বয়স্ক ব্যক্তি যে নিজের জন্যই অন্যের তত্ত্বাবধানের মুখাপেক্ষী, সন্তান পালনের দায়িত্ব পাবেনা। অনুরূপ, এমন মহিলাকেও এ দায়িত্ব অর্পণ করা যাবেনা, যে নিজের সাংসারিক কর্মকাণ্ডের প্রতি উদাসীন এবং প্রায়ই বাড়ির বাইরে অবস্থান করে, আর এই উদাসিনতার কারণে শিশুর ক্ষতি হওয়া অথবা তার অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশংকা থাকে। এমন কোনো মহিলাকেও এ দায়িত্বে নিয়োগ করা যায়না, যে কোনো সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে বসবাস করে, কিংবা শিশুকে ঘৃণা করে এমন ব্যক্তির সাথে বসবাস করে। এ ধরনের ব্যক্তি শিশুর আত্মীয় হলেও গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা এ ধরনের ব্যক্তির উপস্থিতিতে শিশু পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধান ও তদারকী এবং সুস্থ পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হতে বাধ্য।
৪. সৎ চরিত্র ও বিশ্বস্ততা: কেননা একজন পাপিষ্ঠ মহিলা শিশুর জন্য বিপজ্জনক। শিশুর লালন পালনের দায়িত্ব পালনে তাকে বিশ্বাস করা যায়না। এমনও হতে পারে যে, শিশু তার পালনকারিণীর নিয়মেই গড়ে উঠবে এবং তার মতোই কুচরিত্রের অধিকারী হবে। ইবনুল কাইয়ে এই শর্তের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন: "শাফেয়ী ও আহমদের শিষ্যগণ শিশুর পালনকারিণীর জন্য সততা ও ন্যায়পরায়ণতার শর্ত আরোপ করা সত্ত্বেও বিশুদ্ধ মতানুসারে এটা আদৌ শর্ত নয়। শর্ত হলেও সর্বশেষ পন্থা হিসেবেই হতে পারে। সাধারণভাবে যদি এই শর্ত আরোপ করা হতো, তাহলে বিশ্বের প্রায় সমস্ত শিশু পালনকারিণীর অভাবে মারা যেতো, জনগণ তাদেরকে নিয়ে হিমশিম খেতো, তাদের দুঃখ দুর্দশা মারাত্মক আকার ধারণ করতো এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শুরু করে কেয়ামত পর্যন্ত পাপিষ্ঠ লোকদের শিশু সন্তানদের তদারকী করতে কেউ এগিয়ে আসতোনা। অথচ তারা সংখ্যায় বিপুল। বস্তুত ইসলামে পিতামাতার কোনো একজনের পাপাচারের দরুন তার সন্তানকে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া খুবই জটিল ও দুর্বিহ কাজ এবং সকল মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে ও সকল যুগে এর বিপরীত রীতি চালু রয়েছে। শিশু পালনে সততার এই শর্ত আরোপ বিয়ের অভিভাবকত্বে সততার শর্ত আরোপের মতোই। এই অভিভাবকত্ব শহরে ও গ্রামে সর্বত্র সর্বযুগে চালু রয়েছে। অথচ অনেক অভিভাবকই অসৎ ও পাপিষ্ঠ। আর মানব সমাজে পাপাচার তো রয়েছেই। রসূলুল্লাহ সা. কিংবা কোনো সাহাবী কোনো পাপাচারী বা ফাসেককে তার সন্তান পালন থেকে বিংবা তার অভিভাবকত্বাধীন মেয়ে বিয়ে দেয়া থেকে বিরত রাখেননি। সমাজে প্রচলিত রীতিপ্রথাও সাক্ষ্য দেয় যে, কোনো মানুষ ফাসেক হলেও সে তার মেয়ের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকে এবং সাধারণত তাকে বিপথগামী হতে দেয়না। বরঞ্চ তার যাতে কল্যাণ হয় সেজন্যই উদগ্রীব ও সচেষ্ট থাকে। এর বিপরীত কিছু ঘটলেও কদাচিত ঘটে থাকে। শরিয়ত এক্ষেত্রে মানুষের স্বভাবগত চেতনা ও প্রেরণার উপরই নির্ভর করে। ফাসেককে যদি শরিয়ত সন্তান পালন ও বিয়ের অভিভাবকত্ব থেকে বঞ্চিত করতো, তাহলে এ বিষয়টার উল্লেখ ও তদনুযায়ী কাজ করাকে শরিয়ত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতো। নিজের পাপাচার যদি সন্তান পালনের পরিপন্থী হতো, তাহলে ব্যভিচারী মদখোর ও কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে তার সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতো এবং তাদের লালন পালনের জন্য অন্য কাউকে নিয়োগ করতো।"
৫. মুসলমান হওয়া এ শর্তের ফলে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর লালন পালনকারিণী কাছের হলেও তার লালন পালন বৈধ হবেনা। কেননা সন্তান পালনও এক ধরনের অভিভাবকত্ব। আল্লাহ কোনো কাফেরকে কোনো মুমিনের অভিভাবক করেননি। সূরা নিসার ১৪১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন: وَلَن يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَفِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلاً . "আল্লাহ কখনো কাফেরদেরকে মুমিনদের উপর কর্তৃত্ব দেবেনা।"
অভিভাবকত্ব সম্পত্তির অভিভাবকত্ব ও বিয়ের অভিভাবকত্বের মতোই। তাছাড়া শিশুর ধর্মীয় পরিচিতি পালনকারিণীর ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার আশংকাও উড়িয়ে দেয়া যায়না। কেননা সে যে তাকে নিজের ধর্মে দীক্ষিত করতে উদগ্রীব হবে, এটাই স্বাভাবিক। আর একবার তার ধর্মে দীক্ষিত করে ফেললে পরবর্তী সময়ে শিশুর পক্ষে ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন করা দুস্কর হয়ে পড়বে। শিশুর জন্য এর চেয়ে ক্ষতিকর আর কিছু হতে পারেনা। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "প্রত্যেক শিশুই ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীতে তার পিতামাতা তাকে ইহুদী, খৃস্টান কিংবা অগ্নিউপাসকে পরিণত করে।"
পক্ষান্তরে হানাফি, মালেকিদের মধ্য থেকে ইবনুল কাসেম ও আবু সাওরের মত হলো, শিশু মুসলমান হলেও কাফের মহিলা তার পালনকারিণী হতে পারে। কেননা শিশুর পালন তাকে দুধ খাওয়ানো ও সেবা যত্ন করার চেয়ে বেশি কিছু নয়। এ দুটোই যে কোনো কাফের মহিলা কর্তৃক সম্পাদন বৈধ।
আবু দাউদ ও নাসায়ীতে বর্ণিত আছে: "রাফে বিন সিনান যখন ইসলাম গ্রহণ করলো, তখন তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। অতপর সে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এলো এবং তার দুধ ছাড়ানো শিশুকে দেখিয়ে বললো: এ হচ্ছে আমার মেয়ে। রাফে বললো: এটা আমার মেয়ে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: হে আল্লাহ, মেয়েটিকে তুমি হেদায়েত করো।” তৎক্ষণাত মেয়েটি তার পিতার দিকে ঝুঁকে পড়লো। হানাফিরা কাফের মহিলার পালনকারিণী হওয়া জায়েয বলে রায় দিলেও শর্ত আরোপ করেছেন যেন ইসলাম থেকে ধর্মান্তরিত তথা মুরতাদ না হয়। কেননা তাদের মতে মুরতাদ অবিলম্বে গ্রেফতার হওয়ার উপযুক্ত এবং তওবা করা অথবা মৃত্যুবরণ করার পূর্ব পর্যন্ত তাকে কারাগারেই থাকতে হয়। কাজেই শিশুর লালন পালনের সুযোগ পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। আর যদি তওবা করে ও ফিরে আসে, তাহলে সে লালন পালনের অধিকার ফিরে পাবে।
৬. অবিবাহিতা হওয়া:
বিবাহিত মহিলার শিশু পালনের অধিকার থাকেনা। কেননা আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বর্ণিত হাদিসে (যা ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে) বলা হয়েছে যে, জনৈকা মহিলা বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমার ছেলের জন্য তো আমার উদরই ছিলো বাসস্থান, আমার কোলই ছিলো নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং আমার স্তনই ছিলো খাদ্য ও পানীয়ের ভাণ্ডার। অথচ তার বাবা তাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে বলে আস্ফালন করছে।” রসূলুল্লাহ সা. বললেন, যতদিন তুমি বিয়ে না করবে, ততদিন ঐ সন্তানের ওপর তোমারই অগ্রাধিকার থাকবে।” -আহমদ, আবু দাউদ, বায়হাকি, হাকেম।
তবে এ বিধি প্রযোজ্য হবে শুধু সেই মহিলার উপর যে, কোনো আত্মীয় বা দূরাত্মীয় ব্যক্তিকে বিয়ে করে। যদি মহিলা এমন পুরুষকে বিয়ে করে যে শিশুর জন্য মাহরাম, যেমন তার আপন চাচা, তাহলে তার জন্য ঐ শিশুকে পালনের অধিকার বহাল থাকবে। কেননা চাচারও শিশুকে পালন করার অধিকার রয়েছে। তদুপরি শিশুর সাথে তার এমন সম্পর্ক ও নৈকট্য বিরাজমান যা তাকে শিশুর প্রতি স্নেহমমতায় সিক্ত ও তার প্রতি যত্নশীল হতে উজ্জীবিত করে। কাজেই শিশুর অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধানে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হবে। কিন্তু যদি কোনো অনাত্মীয় বা দূরাত্মীয়ের সাথে বিয়ে হতো, তাহলে সেই স্বামী নিজেও ঐ শিশুর প্রতি স্নেহশীল ও সহানুভূতিশীল হতো না এবং স্ত্রীকেও তার যথোপযুক্ত আদর যত্ন করতে দিতনা। ফলে শিশুটি এমন সুস্থ, স্বাভাবিক ও মমতাময় পরিবেশ পেতনা, যা তার যোগ্যতা ও প্রতিভার বিকাশের সহায়ক। হাসান ও ইবনে হাযমের মতে, যে মহিলার লালন পালনের বৈধ অধিকার রয়েছে, সে বিয়ে করলেও তার সে অধিকার ক্ষুণ্ণ হবেনা।
৭. স্বাধীনতা :
যে ব্যক্তি পরাধীন, তাকে তার মনিবের কাজ কর্মেই সব সময় এতটা ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয় যে, শিশুর লালন পালনের সুযোগ ও সময় পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। ইবনুল কাইয়েম বলেছেন: স্বাধীনতার শর্ত আরোপের পক্ষে তেমন কোনো চিত্তাকর্ষক যুক্তি প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়না। তবুও তিনজন ইমাম এ শর্ত আরোপ করেছেন। ইমাম মালেক বলেছেন: কোনো স্বাধীন ব্যক্তির যদি দাসীর উদরজাত সন্তান থাকে, তাহলে ঐ দাসী যতোদিন অন্য কোথাও বিক্রি হয়ে স্থানান্তরিত না হয়, ততোদিন সন্তানের লালন পালনে তারই অগ্রাধিকার থাকবে। কিন্তু যখন হস্তান্তরিত হয়ে অন্যত্র চলে যাবে, তখন ঐ অগ্রাধিকার বাবার নিকট হস্তান্তরিত হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সন্তান পালনের মজুরি

📄 সন্তান পালনের মজুরি


সন্তান পালনের মজুরির বিধি দুধ খাওয়ানোর মজুরির বিধির মতোই। মা যতক্ষণ স্ত্রী কিংবা ইদ্দত পালনরত থাকে, ততদিন এজন্য মজুরির হকদার হয়না। কেননা তখন তো সে দাম্পত্য জীবনের অথবা ইদ্দতকালীন খোরপোষ পায়। আল্লাহ বলেছেন:
وَالْوَالِدَتِ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ ، وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ .
অর্থ: মায়েরা পুরো দুই বছর দুধ পান করাবে তাদের সন্তানদেরকে, যদি পূর্ণ মেয়াদ দুধ পান করাতে চায়। আর পিতার কর্তব্য হলো মায়েদের যথারীতি ভরণ পোষণ করা। (সূরা আল বাকারা: আয়াত ২৩৩)
এ আয়াত থেকেই প্রমাণিত হয়, স্বামীর সাথে স্ত্রীরূপে বহাল থাকাকালে ও ইদ্দতকালে সন্তান পালনের জন্য মজুরি প্রাপ্য হয়না। তবে ইদ্দতের পরে মজুরি প্রাপ্য হয়, যেমন প্রাপ্য হয় দুধ পান করানোর জন্য। আল্লাহ বলেছেন:
فَأَنْفِقُوا عَلَيْهِنَّ حَتَّى يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ ، فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ ، وَأْتَمِرُوا بَيْنَكُمْ بِمَعْرُوفٍ ، وَإِنْ تَعَاسَرْتُمْ فَسَتُرْضِعُ لَهُ أُخْرَى
অর্থ: যতোদিন তারা সন্তান প্রসব না করে, ততোদিন তাদের খোরপোষ দাও। তারপর তারা যদি তোমাদের অনুকূলে সন্তানকে দুধ পান করায় তবে তাদেরকে তাদের মজুরি দাও। এ ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে যথোচিতভাবে পরামর্শ করবে। তবে এতে যদি তোমরা কষ্ট বোধ করো, তাহলে অন্য কোনো নারী দুধ পান করাবে। (সূরা তালাক : আয়াত ৬)
মা ব্যতিত অন্য যে কোনো মহিলা সন্তান পালনে মজুরি পাওয়ার হকদার, যেমন শিশুকে দুধ পান করানোর জন্য ভাড়াকৃত ধাত্রী মজুরির হকদার হয়ে থাকে। মায়ের যদি নিজস্ব মালিকানাভুক্ত কোনো বাসস্থান না থাকে, যেখানে সে সন্তানের লালন পালন করবে, তাহলে সন্তান পালনের মজুরি ও দুধপান করানোর মজুরির মতো বাসস্থানের ব্যবস্থা করা বা ভাড়ার অর্থ প্রদান করাও পিতার দায়িত্ব। একইভাবে মার যদি কোনো ভৃত্যের প্রয়োজন হয় এবং পিতা সচ্ছল হয়, তবে ভৃত্যের মজুরি দেয়া বা ভৃত্য সরবরাহ করাও পিতার কর্তব্য। শিশুর জন্য বিশেষভাবে যে অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্র যথা খাদ্য, বস্ত্র, বিছানা, ওষুধ ইত্যাদি যা না হলে চলেইনা, সেগুলোর কথা স্বতন্ত্র। কেননা সেগুলো সর্বাবস্থায় পিতার সরবরাহ করা কর্তব্য। আর লালন পালনের মজুরি লালন পালনের কাজ যখন শুরু হবে, তখন থেকেই পিতার কাছে প্রাপ্য হবে। পরিশোধ করা বা পাওনাদার কর্তৃক অব্যাহতি দেয়া ব্যতিত এটা কখনো রহিত হবেনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00