📄 শপথ ও সংজ্ঞা
আরবী মূল শব্দটি হলো 'হুযানাহ' যার আভিধানিক অর্থ কোলে নেয়া বা দু'হাতে জাপটে ধরা। 'হাযানাত তায়িরু বায়যাহু' অর্থ পাখিটি তার ডিম দুই বাহুর নিচে সংরক্ষণ করলো। অনুরূপ, কোনো মহিলা কর্তৃক সন্তানকে বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরাকে 'হাযানা' বলা হয়।
ফকিহগণ এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এমন: অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু বা এমন অবুঝ ব্যক্তির লালন পালন যে ভালো বা মন্দ বাছবিচার করতে অক্ষম, আত্মনির্ভরশীল নয়, নিজের যাতে কল্যাণ হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে অক্ষম, ক্ষতিকর ও কষ্টকর জিনিস থেকে আত্মরক্ষা করার অযোগ্য, নিজের শারীরিক মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণের দায়িত্ব বহনে অপারগ এবং নিজের জীবনের উন্নতি ও অগ্রগতি সাধনের দায়িত্ব গ্রহণে অক্ষম। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, তাকে পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ওয়াজিব। কেননা এ ব্যাপারে অবহেলা তার ধ্বংসের কারণ হতে বাধ্য।
📄 সন্তান পালন একটা যৌথ অধিকার
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু যেহেতু এমন একজন অভিভাবকের মুখাপেক্ষী যে তাদের লালন পালন, রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্বশীল হবে, তাই লালিত পালিত হওয়া তার একটা অধিকার। (প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান পিতা বা মাতার যে কোনো একজনের নিকট থাকতে পারে। ছেলে হলে ইচ্ছা করলে একাও থাকতে পারবে। তবে পিতা বা মাতার সাথে থাকা এবং একাকী না থাকা মুstahab। যুবতী মেয়ে হলে একাকী থাকতে পারবেনা। পিতা এবং পিতা না থাকলে অভিভাবক বা আত্মীয় স্বজন তাকে একাকী থাকতে বাধা দিতে পারবে। কেননা একাকী থাকা তার ও তার পরিবারের মানসম্ভ্রমের জন্য নিরাপদ নয়।) লালন পালনের অধিকার মায়েরও রয়েছে। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তুমি (মা) সন্তান পালনে অগ্রাধিকারী।"
লালিত পালিত হওয়া যখন অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের অধিকার, তখন মা ছাড়া আর কেউ যদি পালন করার উপযুক্ত না থাকে, তবে মাকে এই দায়িত্ব নিতে বাধ্য করা হবে, যাতে জ্ঞান ও শিষ্টাচার অর্জনের অধিকার থেকে শিশু বঞ্চিত না হয়। তবে বিকল্প কেউ যদি থাকে, যেমন যদি দাদী থাকে, সে তাকে রাখতেও চায় এবং মা রাখতে অনিচ্ছুক হয়, তাহলে মা লালন পালনের অধিকার ছেড়ে দেয়ার কারণে তা তার উপর থেকে রহিত হবে। কেননা লালন পালনের অধিকার মূলত মায়েরই। কিছু শরয়ী আদালত থেকে এর সমর্থক রায় জারি হতে দেখা গেছে। জার্জার আদালতের রায়ে ১৩/৭/১৯৩৩ তারিখে বলা হয়:
"পালিত ও পালনকারিণী উভয়ের অধিকার রয়েছে লালন পালনে। তবে পালনকারিণীর অধিকারের চেয়ে পালিতের অধিকার প্রবলতর। পালনকারিণী একতরফাভাবে পালনের অধিকার ত্যাগ করলেই শিশুর লালিত পালিত হওয়ার অধিকার পরিত্যক্ত হয়না।"
আল ইয়াতের আদালত ১৯২৮ সালের ৭ই অক্টোবর এক রায়ে বলেন: "মা ছাড়া অন্য কেউ যদি দুগ্ধপোষ্য শিশুর লালন পালনের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে, তথাপি এই দুগ্ধপোষ্য শিশুর লালন পালনে মায়ের অধিকার রহিত হবেনা, বরঞ্চ ওটা তার হাতে বহাল থাকবে। যতদিন শিশু দুধের উপর নির্ভরশীল থাকবে, ততদিন মায়ের এ অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবেনা। কেননা শিশুকে তার মার লালন পালন থেকে বঞ্চিত করে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো অবকাশ নেই। কারণ মা অন্য সবার চেয়ে তার প্রতি স্নেহশীলা এবং তার সেবায় অধিকতর সহনশীলা।" -ড. ইউসুফ মূসা মুসলিম পারিবারিক আইন।
📄 সন্তানের প্রতি বাপের চেয়ে মায়ের অধিকার বেশি
সন্তান মা বাবার কোলে লালিত পালিত হয়ে যে শিক্ষা পায় সেটাই হলো শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। কেননা মা বাবার লালন পালনের ফলে সন্তানের একাধারে দৈহিক গঠন, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং মানসিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি এমন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয় যে, তা তার গোটা জীবনের ভিত্তি বিনির্মাণে কার্যকর অবদান রাখে। এ কারণেই যখন এমন কিছু ঘটে, যার ফলে মা বাবার মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি হয়ে যায়, অথচ তাদের সন্তান রয়েছে, তখন সেই সন্তানের লালন পালনে বাবার চেয়ে মায়ের অধিকার বেশি। এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম ঘটবে কেবল তখনই, যখন এই অগ্রাধিকার লাভে মা কোনো বাধার সম্মুখিন হবে। (যেমন সন্তান পালনের অপরিহার্য শর্তাবলীর অনুপস্থিতি) অথবা সন্তানের মধ্যে এমন কোনো বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব, যা তাকে বাবা ও মায়ের যে কোনো একজনকে বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দেয়। (যথা কোনো মহিলার সেবার মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়া।) মায়ের অগ্রাধিকারের কারণ হলো, সন্তান পালন ও দুধ পান করানোর ব্যাপারে মাকেই অভিভাবকত্ব অর্পণ করা হয়েছে। কারণ সন্তানের পালন ও প্রশিক্ষণে মা সর্বাধিক দক্ষতা ও ক্ষমতার অধিকারিণী। আর এ কাজে যে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার প্রয়োজন তা মায়ের মধ্যে যতো বেশি থাকে, পুরুষের মধ্যে ততোটা থাকেনা। তাছাড়া এর জন্য তার হাতে যতো সময় থাকে, পুরুষের হাতে ততোটা থাকেনা। এসব কারণে শিশুর কল্যাণের স্বার্থেই মাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত:
জনৈকা মহিলা বললো, হে রসূলুল্লাহ সা., আমার এই ছেলের জন্য আমার পেট ছিলো বাসস্থান, আমার কোল ছিলো দুর্গ আর আমার স্তন ছিলো খাদ্য ও পানীয়ের ভাণ্ডার। অথচ তার বাবা তাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তুমি যদি বিয়ে না করো, তবে তুমিই তাকে রাখার বেশি হকদার।” -আহমদ, আবু দাউদ, বায়হাকি, হাকেম।
ইমাম মালেক মুয়াত্তায় বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাবের একজন আনসারী স্ত্রী ছিলো। তার পেট থেকে তার ছেলে আসেম জন্মগ্রহণ করেন। পরে উমরের সাথে ঐ স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এই সময় একদিন উমর রা. কুবাতে এলেন। দেখলেন, তার ছেলে আসেম মসজিদের চত্বরে খেলছে। অমনি তার বাহু ধরে তুলে নিজের জন্তুর পিঠের ওপর বসালেন। এ সময় ছেলের নানী দেখে উমর রা.-এর সাথে ঝগড়া শুরু করে দিলো এবং উভয়ে আবু বকরের নিকট নালিশ নিয়ে গেলেন। উমর রা. বললেন, আমার ছেলে। আর মহিলা বললো, আমার ছেলে। আবু বকর রা. ফায়সালা দিলেন, ওকে ওর নানীর সাথে যেতে দাও। এরপর উমর রা. আর নিজের দাবির পুনরাবৃত্তি করলেননা। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, আবু বকর রা. বললেন, মা হচ্ছে সবচেয়ে স্নেহশীলা, মমতাময়ী, সহানুভূতিশীলা, ভালো মন্দ উপলব্ধিকারিণী। তাই সে যতোদিন বিয়ে না করবে ততোদিন সেই সন্তান পালনে অগ্রগণ্য। আবু বকরের এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, মায়ের অধিকতর স্নেহময়ী ও মমতাময়ী হওয়াই তার অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান পালনের অগ্রগণ্যতার মূল কারণ। (প্রথমে উমর রা. আবু বকরের এই মতের বিরোধী থাকলেও পরে এই মত মেনে নিয়েছেন এমনকি নিজের খেলাফতকালেও তদনুয়ায়ী ফতোয়া ও বিচারিক রায় দিয়েছেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর ব্যাপারে তাদের দু'জনের এই মতে সাহাবীরাও একমত।)
📄 সন্তান পালনের অধিকারে অগ্রগণ্যতার ধারাবাহিকতা
যেহেতু সন্তান পালনের অধিকার প্রাথমিকভাবে মায়ের জন্যই নির্ধারিত, সেহেতু মায়ের পক্ষীয় আত্মীয়রা পিতৃপক্ষের আত্মীয়দের চেয়ে এ ব্যাপারে অগ্রগণ্য। সন্তান পালনের অধিকার যারা পর্যায়ক্রমে পাবে, তাদের ধারাক্রম নিম্নরূপ: প্রথমে মা, মা যদি কোনো কারণ (যথা শর্তের অবর্তমানে) অপারগ হয়, তাহলে নানী, নানীর মা ইত্যাদি যত ঊর্ধ্বে যাক। তাতেও বাধা দেখা দিলে বাপের মার নিকট অধিকার হস্তান্তরিত হবে। তারপর হস্তান্তরিত হবে আপন বোনের নিকট, তারপর মা শরিক সৎ বোনের নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ বোনের নিকট, তারপর আপন বোনের মেয়ের নিকট, তারপর মা শরিক সৎ বোনের মেয়ের নিকট, তারপর আপন খালার নিকট, তারপর মা শরিক সৎ খালার নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ খালার নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ বোনের মেয়ের নিকট, তারপর আপন ভাই এর মেয়ের নিকট, তারপর মা শরিক সৎ ভায়ের মেয়ের নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ ভাই এর মেয়ের নিকট, তারপর আপন ফুফুর নিকট, তারপর মা শরিক সৎ ফুফুর নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ ফুফুর নিকট, তারপর মা শরিক সৎ খালার নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ খালার নিকট, তারপর মায়ের ফুফুর নিকট, তারপর পিতার ফুফুর নিকট হস্তান্তরিত হবে। তবে সর্বক্ষেত্রে আপন ফুফু ও আপন খালা ইত্যাদি অগ্রগণ্য হবে।
অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের যখন এসব মাহরাম আত্মীয়দের কেউ ভাগ্যে জুটবেনা, কিংবা জুটলেও তারা কেউ সন্তান পালনের যোগ্য প্রমাণিত হবেনা, তখন লালন পালনের অধিকারটা হস্তান্তরিত হবে পিতৃপক্ষীয় মাহরাম পুরুষ আত্মীয়দের নিকট উত্তরাধিকার আইনের অগ্রাধিকার ধারাবাহিকতা অনুসারে। লালন পালনের অধিকার প্রথমে হস্তান্তরিত হবে পিতার নিকট, তারপর পিতার পিতার নিকট, যত ঊর্ধ্বে যাক না কেন। তারপর আপন ভাই-এর নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ ভাই-এর নিকট, তারপর আপন ভাই-এর ছেলের নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ ভাই-এর ছেলের নিকট, তারপর আপন চাচার নিকট, তারপর পিতার শরিক সৎ চাচার নিকট, তারপর পিতার আপন চাচার নিকট, তারপর পিতা শরিক সৎ চাচার, তারপর পিতার পিতা শরিক সৎ বাবার নিকট। পৈতৃক পুরুষ মাহরাম আত্মীয়দের মধ্য থেকে যদি কাউকে না পাওয়া যায়, অথবা পাওয়া যায় কিন্তু সন্তান পালনের যোগ্য না পাওয়া যায়, তাহলে পৈতৃক আত্মীয় ব্যতীত অন্য যে কোনো মাহরাম পুরুষের নিকট হস্তান্তরিত হবে। ফলে এ অধিকার এক পর্যায়ে মাতা শরীক সৎ দাদা, তারপর মাতা শরীক সৎ ভাই, তারপর মাতা শরীক সৎ ভাই এর ছেলে, তারপর মাতা শরিক সৎ চাচা, তারপর আপন মামা, তারপর পিতা শরিক মামার নিকট হস্তান্তরিত হবে। যদি দেখা যায়, শিশুর কোনো আত্মীয়ই অবশিষ্ট নেই। তবে আদালত তার লালন পালনের দায়িত্ব পালনে সক্ষম একজন পালনকারী মহিলা নিযুক্ত করবে। সন্তান পালনের ধারাবাহিকতা এভাবে নির্ধারণ করার কারণ হলো, সন্তান পালন একটা অতি জরুরি কাজ। এ কাজে সন্তানের আত্মীয়রাই অগ্রাধিকার প্রাপ্ত। তন্মধ্যে কতক আত্মীয়ের চেয়ে কতক আত্মীয় অধিকতর অগ্রগণ্য। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কেননা শিশুর স্বার্থেই তাদের নিয়োগই অগ্রগণ্য। তাদেরকে না পাওয়া গেলে অথবা লালন পালনের শর্ত তাদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকলে এ দায়িত্ব পর্যায়ক্রমে ঘনিষ্ঠতম আত্মীয়দের উপর অর্পিত হবে। আর যদি আদৌ কোনো আত্মীয় না থাকে, তাহলে উপযুক্ত পালনকারী নিযুক্ত করার দায়িত্ব অর্পিত হবে বিচারকের উপর।