📄 স্বামীর বাড়িতে থেকেই ইদ্দত পালন করতে হবে
ইদ্দত পালনকারীর জন্য ইদ্দত শেষ হওয়া অবধি স্বামীর বাড়িতে অবস্থান করা জরুরি। সেখান থেকে বের হওয়া তার জন্য হালাল নয়। স্বামীর জন্যও তাকে বের করে দেয়া বৈধ নয়। স্বামীর বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও অবস্থান করার সময় যদি তাকে তালাক দেয়া হয় অথবা বিচ্ছেদ সংঘটিত হয়, তাহলে এ সংবাদ জানামাত্রই তার স্বামীর বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব। কেননা আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ .
অর্থ: হে নবী, (আপনি উম্মতকে বলুন), তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিতে চাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিও এবং ইদ্দত গণনা করো। তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ থেকে বের করে দিওনা এবং তারাও যেন বের না হয়। অবশ্য তারা যদি কোনো স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয় তাহলে ভিন্ন কথা। এ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। যে কেউ আল্লাহর বিধান লংঘন করে, সে তো নিজের উপরই অত্যাচার করে। (সূরা তালাক : আয়াত ১)
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, স্পষ্ট অশ্লীলতার অর্থ হচ্ছে স্বামীর পরিবার জানতে পারে এমন অশ্লীলতা। পরিবার যখন এটা জানতে পারে তখন তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া জায়েয হবে।
আবু সাঈদ খুদরির বোন ফুরাইয়া থেকে বর্ণিত, তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এলেন এবং বনু খুদরা গোত্রে তার নিজ পরিবারে (বাপের বাড়িতে) ফিরে যাবেন কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। কেননা তার স্বামী তার কয়েকজন পলাতক গোলামকে খুঁজতে বেরিয়ে ছিলেন। তারা যখন (মদিনা থেকে ছয় মাইল দূরবর্তী) কাদুমের উপকণ্ঠে পৌঁছলো, তখন তিনি (স্বামী) তাদের নাগাল পেলেন। কিন্তু তারা তাকে হত্যা করে ফেললো। ফুরাইয়া রসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞাসা করলো, আমি কি আমার বাপের বাড়ি ফিরে যাবো? কেননা আমার স্বামী আমাকে তার মালিকানাধীন কোনো বাড়িতে রেখে যাননি, আর আমার জন্য কোনো খোরপোষ রেখে যাননি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, হ্যাঁ। ফুরাইয়া বলেন, আমি তৎক্ষণাত রওনা হলাম। কিন্তু হুজরা বা মসজিদের মধ্যে থাকতেই তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি উপস্থিত হলাম। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তুমি কি যেন বলছিলে? তখন আমি আমার স্বামীর ঘটনা তার সামনে খুলে বললাম। তিনি বললেন, ইদ্দত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নিজের স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়িতেই অবস্থান করতে থাকো। অতপর আমি সেখানে চার মাস দশ দিন ইদ্দতকাল কাটালাম। যখন উসমান রা. খলিফা হলেন, তখন আমার কাছে দূত পাঠিয়ে সেই ঘটনা জানতে চাইলেন। আমি তাকে পুরো ঘটনা জানালাম। তিনি উক্ত ফায়সালা অনুসরণ করলেন ও বহাল রাখলেন।” (আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযি। তিরমিযি বলেন, উমর রা. বিধবা মহিলাদের মরু অঞ্চল থেকে ফেরত পাঠিয়ে দিতেন এবং হজ্জ করতে দিতেননা।) তবে বেদুঈন বিধবা মহিলার পরিবারের লোকেরা যদি যাযাবর হয়, তবে সে তার পরিবারের লোকদের সাথে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যেতে পারবে।
আয়েশা, ইবনে আব্বাস, জাবের, হাসান, আতা ও আলীর মতে, স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত কাটানো জরুরি নয়। আয়েশা রা. ইদ্দতকালে বিধবাকে স্বামীর বাড়ি থেকে বেরুবার পক্ষে ফতোয়া দিতেন। তিনি নিজেও তার বোন উম্মে কুলসুমের স্বামী তালহা বিন উবাইদুল্লাহ নিহত হওয়ার পর তার সাথে মক্কায় ওমরা করতে গিয়েছিলেন। ইবনে আব্বাস বলেছেন, আল্লাহ তো বলেছেন, বিধবাকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে। তার স্বামীর বাড়িতে বসেই ইদ্দত পালন করতে হবে তাতো বলেননি। সে যেখানে ইচ্ছে ইদ্দত পালন করতে পারবে। আবু দাউদ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, এ আয়াত বিধবাকে স্বামীর পরিবারের সাথে থাকার বিধান রহিত করেছে। স্ত্রীর ওসিয়ত সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছে। সে ইচ্ছে করলে স্বামীর বাড়ি থেকে বেরুতে পারবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
فَإِنْ خَرَجْنَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُم فِي مَا فَعَلْنَ فِي أَنْفُسِهِنَّ .
"তারা (বিধবা স্ত্রীরা) যদি বের হয়, তবে তারা নিজেদের ব্যাপারে যা করেছে, তাতে তাদের কোনো গুনাহ নেই।" (সূরা বাকারা: আয়াত ২৪) আতা বলেন, এরপর উত্তরাধিকারের বিধান এলো এবং স্বামীর বাড়িতে বসবাসের বিধান রহিত করলো। সে যেখানে ইচ্ছা ইদ্দত পালন করতে পারবে।
📄 ইদ্দতকালে মহিলার বের হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ
ফকিহগণ ইদ্দতকালে মহিলাদের স্বামীর বাড়ি থেকে বের হওয়া সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। হানাফিদের মত হলো, তালাকপ্রাপ্ত মহিলা, চাই রজয়ি হোক বা বায়েন হোক, নিজ বাড়ি থেকে রাতে বা দিনে কখনো বের হতে পারবেনা। তবে বিধবা দিনে ও রাতের কিছু অংশে বের হতে পারবে। তবে নিজের বাড়িতে ছাড়া আর কোথাও রাত্র যাপন করতে পারবেনা। দু'জনের মধ্যে পার্থক্য হলো, তালাকপ্রাপ্ত মহিলার খোরপোষ তার স্বামীর সম্পত্তি থেকেই আসে। কাজেই স্ত্রী থাকা অবস্থার মতোই সে বাড়ি থেকে বের হতে পারবেনা। পক্ষান্তরে বিধবার খোরপোষ নেই। কাজেই সে নিজের অবস্থা ভালো করার জন্য দিনের বেলা বের হতে পারবে। আর বিচ্ছেদ ঘটার সময় তাকে যে ঘরে থাকতে দেয়া হয়, সেই ঘরেই তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে। আর যদি মৃত ব্যক্তির বাড়ি থেকে স্ত্রীর প্রাপ্ত অংশ তার বসবাসের জন্য যথেষ্ট না হয়, কিংবা উত্তরাধিকারীরা তাকে তাদের অংশ থেকে বের করে দেয়, তাহলে সে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে পারবে। কেননা এটা একটা ওযর। নিজের বাড়িতে অবস্থান করা একটা ইবাদত। কিন্তু ওজর থাকলে ইবাদত রহিত হয়ে যায়। আর যদি ভাড়া বাড়িতে থাকে এবং ভাড়া অধিক হওয়ায় সেখানে থাকতে অসমর্থ হয়, তাহলে সে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ার বাড়িতে স্থানান্তরিত হতে পারবে।
ফকিহদের এ কথা থেকে প্রমাণিত হয়, বাসস্থানের ভাড়া বহন করার দায়িত্ব ইদ্দত পালনকারী স্ত্রীর। যদি সে তা বহন করতে অক্ষম হয়, তবেই তা থেকে সে অব্যাহতি পাবে। এজন্যই তারা বলেছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত স্ত্রীর অংশ যদি তার বসবাসের জন্য যথেষ্ট হয়, তবেই সে সেখানে বসবাস করবে। কেননা তাদের মতে, বিধবা গর্ভবতী হোক বা না হোক, তার কোনো বাসস্থান প্রাপ্য নেই। সে যে বাড়িতে থাকা অবস্থায় স্বামী মারা গেছে, সেই বাড়িতেই দিনরাত অবস্থান করা তার কর্তব্য। হাম্বলিদের মতে, গর্ভবতী না হলে সে বাসস্থান পায়না। গর্ভবতী হলে এক বর্ণনা অনুযায়ী পায়, অন্য বর্ণনা অনুযায়ী পায়না। শাফেয়ি থেকেও দু'রকমের মতামত পাওয়া যায়। মালেকী মাযহাব অনুসারে সর্বাবস্থায় বাসস্থান তার অবশ্য প্রাপ্য। উত্তরাধিকারীরা যদি তার জন্য বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করে তাহলে তো ভালো। নচেত বাসা ভাড়া করতে হলে ভাড়া তাকেই বহন করতে হবে। হাম্বলিদের মতে, ইদ্দত পালনকারিণী তালাকপ্রাপ্ত হোক বা বিধবা হোক, দিনের বেলা বের হতে পারবে।
ইবনে কুদামা বলেছেন, ইদ্দত পালনকারিণী তালাকপ্রাপ্ত হোক বা বিধবা হোক, দিনের বেলা প্রয়োজনে বের হতে পারবে। জাবের রা. বলেছেন: “আমার খালাকে তিন তালাক দেয়া হয়েছিল। তিনি তার খেজুর গাছ থেকে ফল কাটতে বের হলেন। এক ব্যক্তি তাকে দেখে বের হতে নিষেধ করলো। তিনি বিষয়টি রসূলুল্লাহ সা. কে জানালেন। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন, বের হও, খেজুর কাটো। হয়তো তুমি তা থেকে সদকা করবে বা অন্য কোনো ভালো কাজ করবে।” -নাসায়ী, আবু দাউদ।
মুজাহিদ বর্ণনা করেছেন, উহুদের দিন বহু লোক শহীদ হলো। তাদের স্ত্রীরা রসূল সা.-এর কাছে এলো এবং বললো : “হে রসূল, রাতে আমাদের নিঃসঙ্গতা অনুভূত হয়। আমরা কি একজন অপরজনের কাছে রাত কাটাবো? ভোর হওয়া মাত্রই আবার নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাবো।” রসূলুল্লাহ সা. বললেন: একজন অপরজনের কাছে গিয়ে কথাবার্তা বলতে থাকো। তারপর যখন ঘুম আসবে, তখন প্রত্যেকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেয়ো।"
বস্তুত নিজের বাড়িতে ছাড়া অন্যত্র রাত্র যাপন করা স্ত্রীর জন্য জায়েয নেই। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া রাতের বের হওয়াও জায়েয নেই। কেননা রাত যাবতীয় অনাচারের সময়। দিন তেমন নয়। দিন প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করা এবং জীবিকা উপার্জন করার সময়।
📄 ইদ্দতপালনকারীর শোক
ইদ্দতকালে মৃত স্বামীর জন্য শোক পালন করা বিধবা মহিলার জন্য ওয়াজিব। এ ব্যাপারে ফকিহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। বায়েন তালাকপ্রাপ্ত মহিলা সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। হানাফিদের মতে, তারও শোক পালন করা ওয়াজিব। অন্যরা বলেন, তার কোনো শোক পালন করার প্রয়োজন নেই। শোকের তাৎপর্য পরবর্তীতে বর্ণনা করা হয়েছে।
📄 ইদ্দতপালনকারীর খোরাকপোষ
ফকিহগণ সর্বসম্মতভাবে বলেছেন যে, রজয়ি তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী খোরপোষ ও বাসস্থানের হকদার। বায়েন তালাকপ্রাপ্ত সম্পর্কে তাদের মতভেদ রয়েছে বটে। আবু হানিফা বলেছেন, রজয়ি তালাকপ্রাপ্তের ন্যায় সেও খোরপোষ ও বাসস্থানের হকদার। কেননা স্বামীর বাড়িতে ইদ্দতকাল কাটানো তার উপর ওয়াজিব। কাজেই এই অধিকার আদায় করার সে হকদার। তাই খোরপোষ তার অবশ্য প্রাপ্য। তালাক দেয়ার সময় থেকেই খোরপোষ তার ন্যায্য প্রাপ্য ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। এটা কোনো পারস্পরিক সম্মতির উপরও নির্ভরশীল থাকবেনা। আদালতের ফায়সালার উপরও নয়। এই ঋণ শুধু দুই উপায়ে রহিত হবে, পরিশোধ করা অথবা পাওনাদার কর্তৃক মাফ করে দেয়া। ইমাম আহমদ বলেছেন, সে কোনো খোরপোষ পাবেনা, বাসস্থানও পাবেনা। কেননা ফাতেমা বিনতে কায়েসকে যখন তার স্বামী বায়েন তালাক দিলো, তখন রসূলুল্লাহ সা. ফাতেমাকে বললেন, স্বামীর কাছে তুমি কোনো খোরপোষ পাবেনা।” ইমাম শাফেয়ি ও মালেক বলেছেন, সর্বাবস্থায় স্ত্রী বাসস্থান পাওয়ার হকদার। তবে গর্ভবতী না হলে সে বাসস্থান পাবেনা। কেননা আয়েশা ও ইবনুল মুসাইয়াব ফাতেমা বিনতে কায়সের হাদিস গ্রহণ করেনি। ইমাম মালেক বলেছেন, ইবনে শিহাবকে আমি বলতে শুনেছি, বায়েন তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী ইদ্দত না ফুরানো পর্যন্ত নিজের বাসস্থান থেকে বের হতে পারবেনা এবং গর্ভবতী না হলে খোরপোষও পাবেনা। সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাকে খোরপোষ দিতে হবে। ইমাম মালেক বলেছেন, এটা আমাদের মত।