📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মাস থেকে হায়েযের হিসাব ইদ্দতের রূপান্তর

📄 মাস থেকে হায়েযের হিসাব ইদ্দতের রূপান্তর


স্ত্রী যখন অপ্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার কারণে কিংবা বার্ধক্যজনিত হায়েয বন্ধ হওয়ার বয়সে উপনীত হওয়ার কারণে মাস হিসাবে ইদ্দত গণনা শুরু করে, অতপর মাসিক স্রাব শুরু হয়ে যায়, তখন তার জন্য হায়েযের হিসাবে ইদ্দতের রূপান্তর অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেননা মাসগুলো হায়েযের বিকল্প। মূল হায়েয যখন বন্ধ হয়নি, তখন বিকল্প দিয়ে ইদ্দত পালন জায়েয হবেনা। আর যদি মাসের হিসাবে ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, তারপর হায়েয শুরু হয়। তাহলে পুনরায় হায়েয ও পবিত্রতার সমন্বয়ে ইদ্দত গণনা করা জরুরি হবেনা। কেননা এটা সংঘটিত হয়েছে ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর হয়েছে। আর যদি মাস কিংবা হায়েয ও পবিত্রতাবস্থার সমন্বয়ে ইদ্দত গণনা শুরু করে, তারপর সে টের পায় যে, স্বামী দ্বারা সে গর্ভবতী, তাহলে ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত মেয়াদে রূপান্তরিত হবে। কেননা সন্তান প্রসবই হলো নিশ্চিতভাবে জরায়ু অবমুক্ত হওয়ার অকাট্য প্রমাণ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইদ্দতের সমাপ্তি

📄 ইদ্দতের সমাপ্তি


স্ত্রী যদি গর্ভবতী হয়, তাহলে তার ইদ্দত সন্তান প্রসবের মধ্যদিয়েই সমাপ্ত হবে। আর যদি ইদ্দত মাসভিত্তিক হয়, তাহলে তা হিসাব করা হবে বিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর সময় থেকে, যাতে হয় তিন মাস, নয়তো চার মাস দশ দিন পূর্ণ হয়। আর যদি ইদ্দত জায়েয ভিত্তিক হয় তবে তা তিন হায়েযে সমাপ্ত হবে এবং তা স্ত্রী নিজেই নির্ধারণ করবে।
ইমাম মালেক ও শাফেয়ির মতে, তালাক যদি মাসের মাঝখানে সংঘটিত হয়, তবে সেই মাসের বাকি অংশ ও পরবর্তী দু'মাস চন্দ্র মাস হিসাবে ইদ্দত পালন করতে হবে। তারপর এক মাস পুরো ত্রিশ দিন পালন করতে হবে। আবু হানিফার মতে, প্রথম মাসের অবশিষ্টাংশ ও চতুর্থ মাস প্রথম থেকে যা ছুটে গেছে, সে হিসাবে পালন করবে, চাই সম্পূর্ণভাবে হোক বা অসম্পূর্ণভাবে হোক।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 স্বামীর বাড়িতে থেকেই ইদ্দত পালন করতে হবে

📄 স্বামীর বাড়িতে থেকেই ইদ্দত পালন করতে হবে


ইদ্দত পালনকারীর জন্য ইদ্দত শেষ হওয়া অবধি স্বামীর বাড়িতে অবস্থান করা জরুরি। সেখান থেকে বের হওয়া তার জন্য হালাল নয়। স্বামীর জন্যও তাকে বের করে দেয়া বৈধ নয়। স্বামীর বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও অবস্থান করার সময় যদি তাকে তালাক দেয়া হয় অথবা বিচ্ছেদ সংঘটিত হয়, তাহলে এ সংবাদ জানামাত্রই তার স্বামীর বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব। কেননা আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ .
অর্থ: হে নবী, (আপনি উম্মতকে বলুন), তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিতে চাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিও এবং ইদ্দত গণনা করো। তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ থেকে বের করে দিওনা এবং তারাও যেন বের না হয়। অবশ্য তারা যদি কোনো স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয় তাহলে ভিন্ন কথা। এ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। যে কেউ আল্লাহর বিধান লংঘন করে, সে তো নিজের উপরই অত্যাচার করে। (সূরা তালাক : আয়াত ১)
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, স্পষ্ট অশ্লীলতার অর্থ হচ্ছে স্বামীর পরিবার জানতে পারে এমন অশ্লীলতা। পরিবার যখন এটা জানতে পারে তখন তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া জায়েয হবে।
আবু সাঈদ খুদরির বোন ফুরাইয়া থেকে বর্ণিত, তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এলেন এবং বনু খুদরা গোত্রে তার নিজ পরিবারে (বাপের বাড়িতে) ফিরে যাবেন কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। কেননা তার স্বামী তার কয়েকজন পলাতক গোলামকে খুঁজতে বেরিয়ে ছিলেন। তারা যখন (মদিনা থেকে ছয় মাইল দূরবর্তী) কাদুমের উপকণ্ঠে পৌঁছলো, তখন তিনি (স্বামী) তাদের নাগাল পেলেন। কিন্তু তারা তাকে হত্যা করে ফেললো। ফুরাইয়া রসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞাসা করলো, আমি কি আমার বাপের বাড়ি ফিরে যাবো? কেননা আমার স্বামী আমাকে তার মালিকানাধীন কোনো বাড়িতে রেখে যাননি, আর আমার জন্য কোনো খোরপোষ রেখে যাননি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, হ্যাঁ। ফুরাইয়া বলেন, আমি তৎক্ষণাত রওনা হলাম। কিন্তু হুজরা বা মসজিদের মধ্যে থাকতেই তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি উপস্থিত হলাম। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তুমি কি যেন বলছিলে? তখন আমি আমার স্বামীর ঘটনা তার সামনে খুলে বললাম। তিনি বললেন, ইদ্দত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নিজের স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়িতেই অবস্থান করতে থাকো। অতপর আমি সেখানে চার মাস দশ দিন ইদ্দতকাল কাটালাম। যখন উসমান রা. খলিফা হলেন, তখন আমার কাছে দূত পাঠিয়ে সেই ঘটনা জানতে চাইলেন। আমি তাকে পুরো ঘটনা জানালাম। তিনি উক্ত ফায়সালা অনুসরণ করলেন ও বহাল রাখলেন।” (আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযি। তিরমিযি বলেন, উমর রা. বিধবা মহিলাদের মরু অঞ্চল থেকে ফেরত পাঠিয়ে দিতেন এবং হজ্জ করতে দিতেননা।) তবে বেদুঈন বিধবা মহিলার পরিবারের লোকেরা যদি যাযাবর হয়, তবে সে তার পরিবারের লোকদের সাথে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যেতে পারবে।
আয়েশা, ইবনে আব্বাস, জাবের, হাসান, আতা ও আলীর মতে, স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত কাটানো জরুরি নয়। আয়েশা রা. ইদ্দতকালে বিধবাকে স্বামীর বাড়ি থেকে বেরুবার পক্ষে ফতোয়া দিতেন। তিনি নিজেও তার বোন উম্মে কুলসুমের স্বামী তালহা বিন উবাইদুল্লাহ নিহত হওয়ার পর তার সাথে মক্কায় ওমরা করতে গিয়েছিলেন। ইবনে আব্বাস বলেছেন, আল্লাহ তো বলেছেন, বিধবাকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে। তার স্বামীর বাড়িতে বসেই ইদ্দত পালন করতে হবে তাতো বলেননি। সে যেখানে ইচ্ছে ইদ্দত পালন করতে পারবে। আবু দাউদ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, এ আয়াত বিধবাকে স্বামীর পরিবারের সাথে থাকার বিধান রহিত করেছে। স্ত্রীর ওসিয়ত সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছে। সে ইচ্ছে করলে স্বামীর বাড়ি থেকে বেরুতে পারবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
فَإِنْ خَرَجْنَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُم فِي مَا فَعَلْنَ فِي أَنْفُسِهِنَّ .
"তারা (বিধবা স্ত্রীরা) যদি বের হয়, তবে তারা নিজেদের ব্যাপারে যা করেছে, তাতে তাদের কোনো গুনাহ নেই।" (সূরা বাকারা: আয়াত ২৪) আতা বলেন, এরপর উত্তরাধিকারের বিধান এলো এবং স্বামীর বাড়িতে বসবাসের বিধান রহিত করলো। সে যেখানে ইচ্ছা ইদ্দত পালন করতে পারবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইদ্দতকালে মহিলার বের হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ

📄 ইদ্দতকালে মহিলার বের হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ


ফকিহগণ ইদ্দতকালে মহিলাদের স্বামীর বাড়ি থেকে বের হওয়া সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। হানাফিদের মত হলো, তালাকপ্রাপ্ত মহিলা, চাই রজয়ি হোক বা বায়েন হোক, নিজ বাড়ি থেকে রাতে বা দিনে কখনো বের হতে পারবেনা। তবে বিধবা দিনে ও রাতের কিছু অংশে বের হতে পারবে। তবে নিজের বাড়িতে ছাড়া আর কোথাও রাত্র যাপন করতে পারবেনা। দু'জনের মধ্যে পার্থক্য হলো, তালাকপ্রাপ্ত মহিলার খোরপোষ তার স্বামীর সম্পত্তি থেকেই আসে। কাজেই স্ত্রী থাকা অবস্থার মতোই সে বাড়ি থেকে বের হতে পারবেনা। পক্ষান্তরে বিধবার খোরপোষ নেই। কাজেই সে নিজের অবস্থা ভালো করার জন্য দিনের বেলা বের হতে পারবে। আর বিচ্ছেদ ঘটার সময় তাকে যে ঘরে থাকতে দেয়া হয়, সেই ঘরেই তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে। আর যদি মৃত ব্যক্তির বাড়ি থেকে স্ত্রীর প্রাপ্ত অংশ তার বসবাসের জন্য যথেষ্ট না হয়, কিংবা উত্তরাধিকারীরা তাকে তাদের অংশ থেকে বের করে দেয়, তাহলে সে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে পারবে। কেননা এটা একটা ওযর। নিজের বাড়িতে অবস্থান করা একটা ইবাদত। কিন্তু ওজর থাকলে ইবাদত রহিত হয়ে যায়। আর যদি ভাড়া বাড়িতে থাকে এবং ভাড়া অধিক হওয়ায় সেখানে থাকতে অসমর্থ হয়, তাহলে সে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ার বাড়িতে স্থানান্তরিত হতে পারবে।
ফকিহদের এ কথা থেকে প্রমাণিত হয়, বাসস্থানের ভাড়া বহন করার দায়িত্ব ইদ্দত পালনকারী স্ত্রীর। যদি সে তা বহন করতে অক্ষম হয়, তবেই তা থেকে সে অব্যাহতি পাবে। এজন্যই তারা বলেছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত স্ত্রীর অংশ যদি তার বসবাসের জন্য যথেষ্ট হয়, তবেই সে সেখানে বসবাস করবে। কেননা তাদের মতে, বিধবা গর্ভবতী হোক বা না হোক, তার কোনো বাসস্থান প্রাপ্য নেই। সে যে বাড়িতে থাকা অবস্থায় স্বামী মারা গেছে, সেই বাড়িতেই দিনরাত অবস্থান করা তার কর্তব্য। হাম্বলিদের মতে, গর্ভবতী না হলে সে বাসস্থান পায়না। গর্ভবতী হলে এক বর্ণনা অনুযায়ী পায়, অন্য বর্ণনা অনুযায়ী পায়না। শাফেয়ি থেকেও দু'রকমের মতামত পাওয়া যায়। মালেকী মাযহাব অনুসারে সর্বাবস্থায় বাসস্থান তার অবশ্য প্রাপ্য। উত্তরাধিকারীরা যদি তার জন্য বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করে তাহলে তো ভালো। নচেত বাসা ভাড়া করতে হলে ভাড়া তাকেই বহন করতে হবে। হাম্বলিদের মতে, ইদ্দত পালনকারিণী তালাকপ্রাপ্ত হোক বা বিধবা হোক, দিনের বেলা বের হতে পারবে।
ইবনে কুদামা বলেছেন, ইদ্দত পালনকারিণী তালাকপ্রাপ্ত হোক বা বিধবা হোক, দিনের বেলা প্রয়োজনে বের হতে পারবে। জাবের রা. বলেছেন: “আমার খালাকে তিন তালাক দেয়া হয়েছিল। তিনি তার খেজুর গাছ থেকে ফল কাটতে বের হলেন। এক ব্যক্তি তাকে দেখে বের হতে নিষেধ করলো। তিনি বিষয়টি রসূলুল্লাহ সা. কে জানালেন। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন, বের হও, খেজুর কাটো। হয়তো তুমি তা থেকে সদকা করবে বা অন্য কোনো ভালো কাজ করবে।” -নাসায়ী, আবু দাউদ।
মুজাহিদ বর্ণনা করেছেন, উহুদের দিন বহু লোক শহীদ হলো। তাদের স্ত্রীরা রসূল সা.-এর কাছে এলো এবং বললো : “হে রসূল, রাতে আমাদের নিঃসঙ্গতা অনুভূত হয়। আমরা কি একজন অপরজনের কাছে রাত কাটাবো? ভোর হওয়া মাত্রই আবার নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাবো।” রসূলুল্লাহ সা. বললেন: একজন অপরজনের কাছে গিয়ে কথাবার্তা বলতে থাকো। তারপর যখন ঘুম আসবে, তখন প্রত্যেকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেয়ো।"
বস্তুত নিজের বাড়িতে ছাড়া অন্যত্র রাত্র যাপন করা স্ত্রীর জন্য জায়েয নেই। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া রাতের বের হওয়াও জায়েয নেই। কেননা রাত যাবতীয় অনাচারের সময়। দিন তেমন নয়। দিন প্রয়োজনীয় কাজকর্ম করা এবং জীবিকা উপার্জন করার সময়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00