📄 পলাতকের তালাক
পলায়নকারীর তালাক বলা হয় সেই বায়েন তালাককে, যা কোনো ব্যক্তি নিজের মৃত্যুশয্যা থেকে স্ত্রীকে তার সন্তুষ্টি ছাড়া দেয়, অতপর সে ইদ্দতে থাকা অবস্থায় স্বামী মারা যায়। এ অবস্থায় উক্ত স্বামীকে পলায়নকারী বলা হয়। কেননা সে তার উত্তাধিকার থেকে পলায়ন করে। এজন্য ইমাম মালেক বলেছেন: স্বামী যদি স্ত্রীর ইদ্দতের পরে এবং অন্য স্বামীকে বিয়ে করার পরও মারা যায়, তবুও এ স্ত্রী তার উত্তরাধিকারী হবে। কেননা সে স্ত্রীকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছিল এবং তার এই অন্যায় ইচ্ছার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবেই স্ত্রীকে উত্তরাধিকার দেয়া হবে।
আবু হানিফা ও মুহাম্মদের মতে এক্ষেত্রে ইদ্দতের বিধি পাল্টে যাবে। তার ইদ্দত হবে তালাকের ইদ্দত ও বৈধব্যের ইদ্দতের মধ্যে যেটি দীর্ঘতর সেটি, যাতে স্ত্রী স্বামীর সেই উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, যা স্বামী তালাক দেয়ার মাধ্যমে না দিয়ে পালাতে চেয়েছিল। আবু ইউসুফের মতে, স্ত্রী এক্ষেত্রে তালাকের ইদ্দত পালন করবে। শাফেয়ির মতে, স্ত্রী উত্তরাধিকার পাবেনা যেমন সুস্থাবস্থায় বায়েন তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী পায়না। তার যুক্তি হলো, মৃত্যুর পূর্বে তালাক দেয়ার মাধ্যমে দাম্পত্য বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে। কাজেই উত্তরাধিকার লাভের কারণ দূর হয়ে গেছে। পালাতে চেয়েছিল এই ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা শরিয়তের বিধিসমূহ প্রকাশ্য কার্যকারণের সাথে সংশ্লিষ্ট, গোপন নিয়তের সাথে নয়। তবে এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, স্বামী যদি তার রুগ্নাবস্থায় স্ত্রীকে বায়েন তালাক দেয়। অতপর স্ত্রী মারা যায়, তাহলে স্বামী মৃত স্ত্রীর উত্তরাধিকার পাবেনা।
📄 মাস থেকে হায়েযের হিসাব ইদ্দতের রূপান্তর
স্ত্রী যখন অপ্রাপ্তবয়স্কা হওয়ার কারণে কিংবা বার্ধক্যজনিত হায়েয বন্ধ হওয়ার বয়সে উপনীত হওয়ার কারণে মাস হিসাবে ইদ্দত গণনা শুরু করে, অতপর মাসিক স্রাব শুরু হয়ে যায়, তখন তার জন্য হায়েযের হিসাবে ইদ্দতের রূপান্তর অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেননা মাসগুলো হায়েযের বিকল্প। মূল হায়েয যখন বন্ধ হয়নি, তখন বিকল্প দিয়ে ইদ্দত পালন জায়েয হবেনা। আর যদি মাসের হিসাবে ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, তারপর হায়েয শুরু হয়। তাহলে পুনরায় হায়েয ও পবিত্রতার সমন্বয়ে ইদ্দত গণনা করা জরুরি হবেনা। কেননা এটা সংঘটিত হয়েছে ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর হয়েছে। আর যদি মাস কিংবা হায়েয ও পবিত্রতাবস্থার সমন্বয়ে ইদ্দত গণনা শুরু করে, তারপর সে টের পায় যে, স্বামী দ্বারা সে গর্ভবতী, তাহলে ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত মেয়াদে রূপান্তরিত হবে। কেননা সন্তান প্রসবই হলো নিশ্চিতভাবে জরায়ু অবমুক্ত হওয়ার অকাট্য প্রমাণ।
📄 ইদ্দতের সমাপ্তি
স্ত্রী যদি গর্ভবতী হয়, তাহলে তার ইদ্দত সন্তান প্রসবের মধ্যদিয়েই সমাপ্ত হবে। আর যদি ইদ্দত মাসভিত্তিক হয়, তাহলে তা হিসাব করা হবে বিচ্ছেদ বা স্বামীর মৃত্যুর সময় থেকে, যাতে হয় তিন মাস, নয়তো চার মাস দশ দিন পূর্ণ হয়। আর যদি ইদ্দত জায়েয ভিত্তিক হয় তবে তা তিন হায়েযে সমাপ্ত হবে এবং তা স্ত্রী নিজেই নির্ধারণ করবে।
ইমাম মালেক ও শাফেয়ির মতে, তালাক যদি মাসের মাঝখানে সংঘটিত হয়, তবে সেই মাসের বাকি অংশ ও পরবর্তী দু'মাস চন্দ্র মাস হিসাবে ইদ্দত পালন করতে হবে। তারপর এক মাস পুরো ত্রিশ দিন পালন করতে হবে। আবু হানিফার মতে, প্রথম মাসের অবশিষ্টাংশ ও চতুর্থ মাস প্রথম থেকে যা ছুটে গেছে, সে হিসাবে পালন করবে, চাই সম্পূর্ণভাবে হোক বা অসম্পূর্ণভাবে হোক।
📄 স্বামীর বাড়িতে থেকেই ইদ্দত পালন করতে হবে
ইদ্দত পালনকারীর জন্য ইদ্দত শেষ হওয়া অবধি স্বামীর বাড়িতে অবস্থান করা জরুরি। সেখান থেকে বের হওয়া তার জন্য হালাল নয়। স্বামীর জন্যও তাকে বের করে দেয়া বৈধ নয়। স্বামীর বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও অবস্থান করার সময় যদি তাকে তালাক দেয়া হয় অথবা বিচ্ছেদ সংঘটিত হয়, তাহলে এ সংবাদ জানামাত্রই তার স্বামীর বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করা ওয়াজিব। কেননা আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ .
অর্থ: হে নবী, (আপনি উম্মতকে বলুন), তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিতে চাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিও এবং ইদ্দত গণনা করো। তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ থেকে বের করে দিওনা এবং তারাও যেন বের না হয়। অবশ্য তারা যদি কোনো স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয় তাহলে ভিন্ন কথা। এ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। যে কেউ আল্লাহর বিধান লংঘন করে, সে তো নিজের উপরই অত্যাচার করে। (সূরা তালাক : আয়াত ১)
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, স্পষ্ট অশ্লীলতার অর্থ হচ্ছে স্বামীর পরিবার জানতে পারে এমন অশ্লীলতা। পরিবার যখন এটা জানতে পারে তখন তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া জায়েয হবে।
আবু সাঈদ খুদরির বোন ফুরাইয়া থেকে বর্ণিত, তিনি রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে এলেন এবং বনু খুদরা গোত্রে তার নিজ পরিবারে (বাপের বাড়িতে) ফিরে যাবেন কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। কেননা তার স্বামী তার কয়েকজন পলাতক গোলামকে খুঁজতে বেরিয়ে ছিলেন। তারা যখন (মদিনা থেকে ছয় মাইল দূরবর্তী) কাদুমের উপকণ্ঠে পৌঁছলো, তখন তিনি (স্বামী) তাদের নাগাল পেলেন। কিন্তু তারা তাকে হত্যা করে ফেললো। ফুরাইয়া রসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞাসা করলো, আমি কি আমার বাপের বাড়ি ফিরে যাবো? কেননা আমার স্বামী আমাকে তার মালিকানাধীন কোনো বাড়িতে রেখে যাননি, আর আমার জন্য কোনো খোরপোষ রেখে যাননি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, হ্যাঁ। ফুরাইয়া বলেন, আমি তৎক্ষণাত রওনা হলাম। কিন্তু হুজরা বা মসজিদের মধ্যে থাকতেই তিনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি উপস্থিত হলাম। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তুমি কি যেন বলছিলে? তখন আমি আমার স্বামীর ঘটনা তার সামনে খুলে বললাম। তিনি বললেন, ইদ্দত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নিজের স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়িতেই অবস্থান করতে থাকো। অতপর আমি সেখানে চার মাস দশ দিন ইদ্দতকাল কাটালাম। যখন উসমান রা. খলিফা হলেন, তখন আমার কাছে দূত পাঠিয়ে সেই ঘটনা জানতে চাইলেন। আমি তাকে পুরো ঘটনা জানালাম। তিনি উক্ত ফায়সালা অনুসরণ করলেন ও বহাল রাখলেন।” (আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, তিরমিযি। তিরমিযি বলেন, উমর রা. বিধবা মহিলাদের মরু অঞ্চল থেকে ফেরত পাঠিয়ে দিতেন এবং হজ্জ করতে দিতেননা।) তবে বেদুঈন বিধবা মহিলার পরিবারের লোকেরা যদি যাযাবর হয়, তবে সে তার পরিবারের লোকদের সাথে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যেতে পারবে।
আয়েশা, ইবনে আব্বাস, জাবের, হাসান, আতা ও আলীর মতে, স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত কাটানো জরুরি নয়। আয়েশা রা. ইদ্দতকালে বিধবাকে স্বামীর বাড়ি থেকে বেরুবার পক্ষে ফতোয়া দিতেন। তিনি নিজেও তার বোন উম্মে কুলসুমের স্বামী তালহা বিন উবাইদুল্লাহ নিহত হওয়ার পর তার সাথে মক্কায় ওমরা করতে গিয়েছিলেন। ইবনে আব্বাস বলেছেন, আল্লাহ তো বলেছেন, বিধবাকে চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে। তার স্বামীর বাড়িতে বসেই ইদ্দত পালন করতে হবে তাতো বলেননি। সে যেখানে ইচ্ছে ইদ্দত পালন করতে পারবে। আবু দাউদ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, এ আয়াত বিধবাকে স্বামীর পরিবারের সাথে থাকার বিধান রহিত করেছে। স্ত্রীর ওসিয়ত সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করেছে। সে ইচ্ছে করলে স্বামীর বাড়ি থেকে বেরুতে পারবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
فَإِنْ خَرَجْنَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُم فِي مَا فَعَلْنَ فِي أَنْفُسِهِنَّ .
"তারা (বিধবা স্ত্রীরা) যদি বের হয়, তবে তারা নিজেদের ব্যাপারে যা করেছে, তাতে তাদের কোনো গুনাহ নেই।" (সূরা বাকারা: আয়াত ২৪) আতা বলেন, এরপর উত্তরাধিকারের বিধান এলো এবং স্বামীর বাড়িতে বসবাসের বিধান রহিত করলো। সে যেখানে ইচ্ছা ইদ্দত পালন করতে পারবে।