📄 হায়েযধারীর ইদ্দত
হায়েযধারীর ইদ্দত তিন হায়েয পর্যন্ত। কেননা আল্লাহ বলেছেন: "তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীরা তিন হায়েয পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।" আয়াতে যে قروء 'কুরু' শব্দটি রয়েছে। তা 'কুরউন'-এর বহুবচন, অর্থাৎ হায়েয। (যদিও এর অর্থ নিয়ে মতভেদ রয়েছে) কিন্তু ইবনুল কাইয়েমের মতে, এর অর্থ হায়েযই অগ্রগণ্য। কুরআন ও হাদিসের কোথাও এটি পবিত্রতা অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। তাই এর যে অর্থটি সুপরিচিত, সেটা গ্রহণ করাই উত্তম বরং অপরিহার্য। কেননা রসূলুল্লাহ সা. ইস্তিহাজা রোগিণীকে বলেছিলেন: "তোমার হায়েযের দিনগুলোতে নামায পড়োনা।" রসূলুল্লাহ সা. আল্লাহর ভাষাই ব্যবহার করতেন এবং তার জাতির ভাষায়ই কুরআন নাযিল হয়েছে। কাজেই তিনি যখন তার হাদিসের কোনো এক জায়গায় কোনো দ্ব্যর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করে তার দুই অর্থের একটি বুঝান, তখন তার অন্যান্য হাদিসেও সেই শব্দ দ্বারা ঐ অর্থটাই গ্রহণ করতে হবে। যতোক্ষণ তার কোনো হাদিসেই অন্য কোনো অর্থ বুঝিয়েছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়না, এরূপ ক্ষেত্রে ঐ শব্দটি কুরআনের ভাষায় পরিণত হবে যদিও কুরআন ব্যতিত অন্য কোনো ভাষায় ঐ শব্দের অন্য কোনো অর্থ থেকেও থাকে। যখন প্রমাণিত হলো যে, শরিয়তের ভাষায় 'কুরউন' শব্দের অর্থ হায়েয, তখন জানা গেলো যে, এটাই শরিয়তের ভাষা। কাজেই শরিয়তের সর্বত্র এই শব্দের ঐ অর্থই গ্রহণ করা হবে। আয়াতের পরবর্তী বাক্যে আল্লাহর উক্তি :
وَلَا يَحِلُّ لَهُنَّ أَن يَكْتُمْنَ مَا خَلَقَ اللَّهُ فِي أَرْحَامِهِن
"স্ত্রীদের জন্য বৈধ নয় যে, তাদের জরায়ুতে আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তা তারা গোপন করবে।” অধিকাংশ মুফাসসিরের নিকট এ জিনিসটা হলো হায়েয ও ভ্রূণ। বস্তুত জরায়ুতে যে ভ্রূণ সৃষ্ট হয় তা হচ্ছে আকৃতি বিশিষ্ট হায়েয। প্রাচীন ও সাম্প্রতিককালের মনিষীগণ এ কথাই বলেছেন। কেউ বলেননি যে, এটা 'তুর' বা পবিত্রাবস্থা। তাছাড়া মহান আল্লাহ সূরা তালাকের ৪নং আয়াতে বলেছেন:
وَاللَّى يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِنْ نِسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلْثَةُ أَشْهُرٍ وَالَّتِي لَمْ يَعِضُنَ ، وأولاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مِنْ أَمْرِ يُسْراه
অর্থ: তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের হায়েয হওয়ারর আর সম্ভাবনা নেই, তাদের ব্যাপারে তোমাদের সন্দেহ থাকলে তাদের ইদ্দত তিন মাস। আর এখনো যাদের হায়েয হয়নি, তাদেরও ইদ্দত তিন মাস। আর গর্ভবতীদের ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত।” (তালাক: ৪)
কাজেই দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ এক এক হায়েযের বাবদ এক এক মাস নির্ধারণ করেছেন এবং হায়েয না হওয়ার উপর বিধি ঝুলন্ত রেখেছেন, হায়েয ও পবিত্রাবস্থা উভয়টি না হওয়ার উপর নয়। অন্যত্র বলেছেন:
فَطَلِقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِن
"তাদের ইদ্দতের জন্য তাদেরকে তালাক দাও।” অর্থাৎ তাদের ইদ্দতকে সামনে রেখে, ইদ্দতের মধ্যে নয়। বস্তুত যে ইদ্দতের জন্য স্ত্রীদেরকে তালাক দেয়া হয়, তা যখন তালাকের পরে তাদের সামনে আসে, তখন তালাকের পর যেটা আসে, সেটা হায়েয ছাড়া অন্য কিছু নয়। একজন পবিত্র নারী পবিত্রাবস্থার মুখোমুখি হয়না। বরং পবিত্রাবস্থার মধ্যেই থাকে। সে যে পবিত্রাবস্থায় রয়েছে, সেটার পরই সে হায়েযের মুখোমুখি হয়।
📄 'কুরু' তথা হায়েয ও পবিত্রবস্থায় উভয়টি দ্বারা ইদ্দত পালনের নূন্যতম সময়
শাফেয়ি মাযহাবের মতে, একজন স্বাধীন মহিলা হায়েয ও পবিত্রাবস্থা উভয়ের সম্মিলনে ন্যূনতম যে মেয়াদ ইদ্দত পালন করতে পারে, তা হচ্ছে বত্রিশ দিন এক ঘণ্টা। সেটি এভাবে যে, স্বামী পবিত্রাবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেবে এবং তালাকের পর পবিত্রাবস্থার এক ঘণ্টা সময় অবশিষ্ট থাকবে। সেই এক ঘণ্টা হবে পবিত্রবস্থা। তারপর একদিন হায়েয হবে, তারপর পনেরো দিন পবিত্র থাকবে। এটা তার দ্বিতীয় পবিত্রাবস্থা। তারপর পুনরায় একদিন হায়েয হবে। অতপর পনেরো দিন পবিত্র থাকবে। এটা তার তৃতীয় পবিত্রাবস্থা। এরপর যখন সে তৃতীয় হায়েযে প্রবেশ করবে, তখন তার ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে।
পক্ষান্তরে আবু হানিফার মতে, ন্যূনতম মেয়াদ ষাট দিন। আর তাঁর দুই শিষ্যের নিকট ঊনচল্লিশ দিন। ইমাম আবু হানিফার মতানুসারে সে দশ দিনব্যাপী হায়েয দিয়ে ইদ্দত পালন শুরু করবে, যা হায়েযের সর্বাধিক মেয়াদ। তারপর পনেরো দিনের পবিত্রতা, পুনরায় দশ দিনের হায়েয, অতপর পুনরায় পনেরো দিনের পবিত্রতা। অতপর তৃতীয় হায়েয, যার মেয়াদ দশ দিন। এভাবে মোট ইদ্দত দাঁড়ালো ষাট দিন। এই মেয়াদ যখন শেষ হলো এবং স্ত্রী দাবি করলো যে, তার ইদ্দত শেষ হয়েছে, তখন সে অন্য স্বামীর জন্য হালাল হবে।
পক্ষান্তরে আবু হানিফার শিষ্যদ্বয় প্রত্যেক হায়েয বাবদ তিন দিন গণনা করেন, যা তার, ন্যূনতম মেয়াদ, আর তিন হায়েযের মধ্যবর্তী দুটি পবিত্রাবস্থার প্রত্যেকটির জন্য পনেরো দিন গণনা করেন। এভাবে মোট ইদ্দত দাঁড়ায় ৩৯ দিন।
📄 ঋতুবতীর (যার হায়েয এখনো হয়নি) ইদ্দত
স্ত্রী যদি অঋতুবতী হয় তবে তার ইদ্দt তিন মাস। এটা অপ্রাপ্তবয়স্কা বালিকা এবং মাসিক স্রাবের বয়স পেরিয়ে যাওয়া বৃদ্ধা উভয়ের বেলায় প্রযোজ্য, চাই তার আদৌ মাসিক স্রাব না হয়ে থাকুক, অথবা মাসিক স্রাব হওয়ার পর বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকুক। এর প্রমাণ ইতিপূর্বে উল্লিখিত সূরা তালাকের ৪ নং আয়াত দ্রষ্টব্য।
ইবনে আবি হাশেম তার তাফসীরে উল্লেখ করেছেন যে, উবাই বিন কা'ব বলেন: আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ, কুরআনে আল্লাহ অপ্রাপ্তবয়স্কা, বৃদ্ধা ও গর্ভবতী মহিলাদের ইদ্দত সম্পর্কে কিছু না বলায় মদিনার কিছু লোক নানা কথা বলে। তখন আল্লাহ সূরা তালাকের ৪নং আয়াত নাযিল করলেন। ঐ আয়াতে বলা হয়েছে, গর্ভবতী মহিলার ইদ্দত তার সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যখন প্রসব করবে, তখন তার ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে।
জারিরের বর্ণনার ভাষা এরকম: "আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ, মহিলাদের ইদ্দত সম্পর্কে সূরা বাকারার আয়াত নাযিল হওয়ার পর মদিনার কিছু লোক বললো: কুরআনে কিছু সংখ্যক মহিলার ইদ্দত উল্লেখ করা হয়নি। তারা হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্কা, হায়েযের বয়স পেরিয়ে যাওয়া বৃদ্ধা এবং গর্ভবতী নারীগণ। তখন আল্লাহ সূরা তালাকের ৪নং আয়াত নাযিল করলেন।
📄 ঋতুবতী মহিলার যখন ঋতু হয় না তখন কী করবে?
পবিত্রাবস্থায় বিরাজমান মহিলা যখন তালাকপ্রাপ্ত হয় অথচ সে যথানিয়মে হায়েয দেখতে পায় না এবং তার কারণও তার জানা নেই। তখন সে এক বছর ইদ্দত পালন করবে। প্রথমে নয় মাস অপেক্ষা করবে, যাতে তার জরায়ু ভ্রূণমুক্ত আছে কিনা জানতে পারে। কেননা এটাই প্রধানতঃ গর্ভের মেয়াদ। এর মধ্যে যখন গর্ভ প্রকাশ পেলনা, তখন তার জরায়ু ভ্রূণমুক্ত আছে এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো। এরপর সে মাসিক স্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া বৃদ্ধা মহিলাদের ইদ্দত তিন মাস পালন করবে। এটা ছিলো উমর রা.-এর ফায়সালা। ইমাম শাফেয়ি বলেছেন: এটা ছিলো মুহাজির ও আনসারদের মাঝে উমর রা.-এর ফায়সালা। কেউ এটা অস্বীকার করেছে বলে আমাদের জানা নেই।