📄 লি'আনকারী স্বামী স্ত্রীর বিচ্ছেদ
স্বামী স্ত্রী উভয়ে যখন লি'আন করে, তখন তাদের মাঝে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ সংঘটিত হয়। কোনো অবস্থায়ই তাদের এই বিচ্ছেদের অবসান ঘটেনা। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: লি'আনকারী স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সংঘটিত হওয়ার পর তারা আর কখনো একত্রিত হতে পারবেনা। আলী ও ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন: লি'আনকারী স্বামী স্ত্রী আর কখনো একত্রিত হবেনা- এ সুন্নতই প্রচলিত হয়ে আসছে। -দার কুতনি।
তাছাড়া যেহেতু তাদের মধ্যে এমন ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে গেছে, যা তাদের উভয়ের মধ্যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ অনিবার্য করে তুলেছে এবং পারস্পরিক মমত্ব, ভালোবাসা ও শান্তি, যা দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত, তা ধ্বংস হয়ে গেছে, তাই শরিয়ত তাদের উভয়কে চিরবিচ্ছেদের শাস্তি দিয়েছে। স্বামী যদি পরবর্তীতে নিজেকে মিত্যাবাদী বলে স্বীকারোক্তি দেয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশের মতে, তাদের মধ্যে আর কখনো মিলন হতে পারবেনা। ইতিপূর্বে উদ্ধৃত হাদিসগুলোও এর সমর্থক। আবু হানিফা বলেন: সে যদি মিথ্যা বলেছে বলে স্বীকার করে, তাহলে তাকে অপবাদের শাস্তি হিসেবে বেত্রদণ্ড দেয়া হবে। তবে নতুন করে ঐ স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারবে। আবু হানিফার যুক্তি হলো, সে যখন নিজেকে মিথ্যুক বলে স্বীকার করেছে, তখন লি'আন বাতিল হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় সে সন্তানের পিতা হিসেবেও স্বীকৃত হবে এবং স্ত্রীকেও তার নিকট ফেরত দেয়া হবে। কেননা নিষিদ্ধ হওয়ার মূল কারণ ছিলো দু'জনের একজন সত্যবাদী ও অপরজন মিথ্যাবাদী বলে নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে একটা অজ্ঞতার সৃষ্টি হওয়া। কিন্তু যখন প্রকৃত ব্যাপার জানা গেলো, তখন আর কেউ কারো জন্য নিষিদ্ধ রইলনা।
📄 বিচ্ছেদ কখন সূচিত হবে?
ইমাম মালেকের মতে, স্বামী স্ত্রী যে মুহূর্তে পরস্পরের প্রতি লি'আন সম্পন্ন করবে, সেই মুহূর্তেই বিচ্ছেদ ঘটে যাবে। শাফেয়ির মতে, স্বামী লি'আন সম্পন্ন করা মাত্রই বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। কিন্তু আবু হানিফা আহমদ ও সাওরির মতে, যখন শাসক বিচ্ছেদের ফায়সালা করবেন তখনই বিচ্ছেদ ঘটবে, তার আগে নয়।
📄 লি'আনজনিত বিচ্ছেদ তালাক না বিয়ের বিযুক্তি
অধিকাংশ আলেমের মতে, লি'আন দ্বারা সংঘটিত বিচ্ছেদ তালাক নয়, বরং বিয়ের বিলুপ্তি। আবু হানিফার মতে, ওটা বায়েন তালাক। কেননা এর উৎপত্তি পুরুষের দিক থেকে হয়েছে। এটা স্ত্রীর দিক থেকে হওয়া অকল্পনীয়। এ ধরনের যে কোনো বিচ্ছেদ তালাকই হয়ে থাকে, বিয়ের বিলুপ্তি নয়। এখানে যে বিচ্ছেদ হয়, তা নপুংসকের বিচ্ছেদের মতো। যখন তা শাসকের সিদ্ধান্তক্রমে হয়।
পক্ষান্তরে যারা প্রথমোক্ত মত অবলম্বন করেছেন, তাদের প্রমাণ হলো, চিরস্থায়ীভাবে পরস্পরের জন্য নিষিদ্ধ হওয়া। এর ফলে স্ত্রীকে সেসব মহিলার সমকক্ষ গণ্য করা হয়েছে, যারা চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ। তারা মনে করেন, লি'আন দ্বারা যে বিয়ে বিলুপ্তি ঘটে, তা স্ত্রীকে ইদ্দতকালে স্বামীর কাছ থেকে বাসস্থান ও খোরপোষ লাভের অধিকার দেয়না। কেননা এ দুটো অধিকার পাওয়া যায় তালাকের ইদ্দতকালে, বিয়ে বিলুপ্তির ইদ্দতকালে নয়। এর সমর্থনে রয়েছে ইবনে আব্বাসের বর্ণিত হাদিস: রসূলুল্লাহ সা. একটি লি'আনের ঘটনায় ঘোষণা করলেন, স্ত্রী কোনো খোরপোষ ও আবাসিক সুবিধা পাবেনা। কেননা তালাক বা মৃত্যুজনিত কারণ ছাড়াই তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটছে। (আহমদ, আবু দাউদ)
📄 সন্তানকে মায়ের নিকট অর্পণ ও মায়ের সাথে যুক্তকরণ
স্বামী যখন তার সন্তানকে অস্বীকার করে এবং তাকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়েই লি'আন সংঘটিত হয়, তখন সেই সন্তানের বংশ পরিচিতি পিতার সাথে সংযুক্ত হয়না। তার কাছ থেকে সন্তানের খোরপোষও প্রাপ্য হয়না। উভয়ের মধ্যে উত্তরাধিকারের লেনদেনও রহিত হয় এবং ঐ সন্তানকে মায়ের নিকট অর্পণ ও তার সাথে যুক্ত করা হয়। মা এই সন্তানের এবং সন্তান মায়ের উত্তরাধিকারী হয়। কেননা আমর বিন শুয়াইব তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, লি'আনকারী দম্পতির সন্তান সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা. ফায়সালা করেছেন যে, সে তার মায়ের উত্তরাধিকারী হবে এবং মা তার উত্তরাধিকারী হবে। আর যে ব্যক্তি ঐ সন্তানের জন্য তার মাকে ব্যভিচারের অপবাদ দেবে, তাকে আশি বেত্রাঘাত করা হবে। -আহমদ। এ হাদিসের সমর্থনে রয়েছে সেসব প্রমাণ, যাতে বলা হয় যে, বিছানা যার, সন্তান তার। কিন্তু স্বামী কর্তৃক সন্তানকে অস্বীকার করার কারণে এখানে বিছানার জোর খাটছেনা। তবে যে ব্যক্তি স্ত্রীকে ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত করবে, সে অপবাদকারী গণ্য হবে এবং আশি ঘা বেত্রাঘাত তার প্রাপ্য হবে। কেননা লি'আন বিবাহিত মহিলাদের আওতাভুক্ত। এখানে মহিলার বিরুদ্ধে ব্যভিচারের কোনো প্রমাণ নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি তার সন্তানের কারণে তাকে ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত করবে, সে অবশ্যই “হদ্দুল কাযাফ” বা অপবাদের শাস্তি পাবে। যে ব্যক্তি স্ত্রীকে আর যে ব্যক্তি সন্তানকে অভিযুক্ত করবে, তারা উভয়ে সমান। এ হচ্ছে স্বামীর সাথে সম্পৃক্ত বিধান। কিন্তু আল্লাহ সকল মানুষ সম্পর্কে যে সাধারণ বিধান দিয়েছেন, তদনুসারে সন্তানকে সতর্কতাবশতঃ ঐ স্বামীর সন্তান হিসেবে গণ্য করা হবে। তাই সে তাকে যাকাত দিতে পারবেনা, আর সে তাকে হত্যা করলে তার উপর কিসাস বলবত হবে না। তার সাথে তার সন্তানদের বিয়ে নিষিদ্ধ থাকবে। তাদের উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক সাক্ষ্য প্রদান বৈধ হবেনা। সন্তানকে বংশ পরিচয়বিহীন গণ্য করা হবেনা এবং অন্য কেউ তার পিতৃত্ব দাবি করতে পারবেনা। আর স্বামী যদি স্বীকার করে সে মিথ্যা বলেছে, তাহলে সন্তানের পিতৃত্ব তার পক্ষে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সন্তানের উপর লি'আনের কোনো প্রভাবই পড়বেনা।