📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 লি'আন কি সাক্ষী না শপথ?

📄 লি'আন কি সাক্ষী না শপথ?


ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও অধিকাংশ আলেমের মতানুসারে লি'আন হচ্ছে শপথ, যদিও শাহাদাত বা সাক্ষ্য নামে আখ্যায়িত হয়। কেননা নিজের পক্ষে কেউ সাক্ষ্য দেয়না। ইবনে আব্বাসের যে হাদিস ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে, কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে, রসূল সা. বলেছেন: "মহিলা যদি কসম না খেতো, তবে আমার ও তার অবস্থা অন্য রকম হতো।"
আবু হানিফা ও তার শিষ্যদের মতে, এটা সাক্ষ্য। তারা প্রমাণ দর্শান কুরআনের এ উক্তি থেকে: "তাহলে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্যই তাদের একজনের সাক্ষ্য।" আর ইবনে আব্বাসের হাদিসেও রয়েছে: "এরপর হিলাল এসে সাক্ষ্য দিলো, তারপর মহিলাও দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলো।” যারা বলেন এটা শপথ, তাদের মতে, যে কোনো স্বামী স্ত্রীর মধ্যে লি'আন বৈধ, চাই তারা স্বাধীন হোক বা দাসদাসী হোক, অথবা তাদের একজন স্বাধীন অথবা দাস বা দাসী হোক এবং তারা উভয়ে সৎ কিংবা অসৎ হোক অথবা যে কোনো একজন সৎ বা অসৎ হোক। আর যারা বলেন যে, এটা সাক্ষ্য, তাদের মতে, উভয়ে সাক্ষ্য দেয়ার যোগ্য তথা স্বাধীন মুসলিম না হলে লি'আন বৈধ হবেনা। দাসদাসী স্বামী স্ত্রী কিংবা যারা ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তি পেয়েছে, তাদের লি'আন বৈধ নয়। একজন সাক্ষ্য দেয়ার যোগ্য এবং অপরজন অযোগ্য হলেও তাদের লি'আন বৈধ নয়।
ইবনুল কাইয়েম বলেছেন: প্রকৃত ব্যাপার হলো, লি'আন একাধারে সাক্ষ্য ও শপথ দুটোই। শপথ দ্বারা ও বারবার উচ্চারণ দ্বারা সাক্ষ্যকে যেমন জোরদার করা হয়েছে, তেমনি পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ ও সাক্ষ্যের শব্দ ব্যবহার দ্বারা শপথকে শক্তিশালী করা হয়েছে। কারণ পরিস্থিতিই এখানে জিনিসটিকে শক্তিশালী করার দাবি জানায়। এ কারণে এতে দশ ধরনের শক্তি বৃদ্ধিকারী উপাদান বিদ্যমান:
১. 'সাক্ষ্য দান' শব্দের উল্লেখ।
২. আল্লাহর নামে কসম খাওয়া।
৩. ৩ ও ১ ব্যবহার এবং "সত্য বলেছে” বা “মিথ্যা বলেছে” (صدق وكذب) এই ক্রিয়াবাচক পদ ব্যবহারের পরিবর্তে صادق وكاذب 'সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী' এই বিশেষণ ব্যবহার দ্বারা কসমের পরবর্তী বাক্যকে জোরদার করা হয়েছে।
৪. চারবার শপথের পুনরাবৃত্তি।
৫. পঞ্চমবারে স্বামীর নিজের উপর এই বলে বদদোয়া করা যে, সে মিথ্যুক হলে তার উপর অভিশাপ হোক।
৬. পঞ্চমবারে স্বামী কর্তৃক এই মর্মে ঘোষণা করা যে, এটা আল্লাহর আযাবকে অনিবার্য করে তোলে এবং দুনিয়ার আযাব আখেরাতের আযাবের চেয়ে অনেক কম কষ্টকর।
৭. স্বামীর লি'আন স্ত্রীর শাস্তি অথবা বন্দিদশা অনিবার্য করে তোলে এবং স্ত্রীর লি'আন তার (স্ত্রীর) শাস্তি রহিত করে, এ কথা উভয়কে অবহিত করা।
৮. লি'আন স্বামী স্ত্রীর যে কোনো একজনের শাস্তি অবধারিত করে, চাই তা ইহকালে হোক কিংবা পরকালে হোক।
৯. লি'আনকারী স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে এবং তাদের সংসার ধ্বংস হয়ে যায়।
১০. এই বিচ্ছেদ আজীবন স্থায়ী হয় এবং উভয়ে পরস্পরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
লি'আনের এই শোচনীয় পরিণতির কারণেই শপথকে সাক্ষ্যের সাথে এবং সাক্ষ্যকে শপথের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। আর লি'আনকারী স্বামীকে একজন সাক্ষীতে পর্যবসিত করা হয়েছে। এরপর স্ত্রী যদি লি'আন থেকে পিছু হটে, তাহলে স্বামীর সাক্ষ্য কার্যকর হবে, স্বীর উপর ব্যভিচারের নির্দিষ্ট শাস্তি কার্যকর হবে এবং স্বামীর সাক্ষ্য ফলপ্রসূ হবে। আর স্বামীর শপথের অনিবার্য ফল হলো, স্বামীর উপর থেকে শাস্তি রহিত হওয়া এবং স্ত্রীর উপর তা আরোপিত হওয়া। আর যদি স্ত্রী লি'আন করে এবং স্বামীর লি'আনের বিরুদ্ধে নিজের পক্ষ থেকে পাল্টা লি'আন করে, তাহলে স্বামীর লি'আন তার নিজের উপর থেকে শাস্তি রহিত করে কিন্তু স্ত্রীর উপর শাস্তি আরোপ করেনা। এক্ষেত্রে স্বামীর লি'আন তার জন্য একাধারে সাক্ষ্য ও শপথ দুইই, স্ত্রীর জন্য নয়। কেননা লি'আন যদি কেবলমাত্র শপথ হয়, তাহলে কেবল স্বামীর শপথে স্ত্রীকে শাস্তি দেয়া যায়না। আর যদি তা সাক্ষ্য হয়, তবে একা স্বামীর সাক্ষ্যে স্ত্রীকে শাস্তি দেয়া যায়না। সুতরাং এই সাথে যদি স্ত্রীর পিছু হটা যুক্ত হয়, তাহলে স্বামীর জোরদার অভিযোগ ও স্ত্রীর পিছু হটার কারণে স্বামীর সাক্ষ্য ও শপথ জোরদার হয়। এতে করে স্বামীর সত্যতার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই স্বামীর উপর থেকে শাস্তি রহিত করা হয় এবং স্ত্রীর উপর তা অবধারিত হয়। এটা উৎকৃষ্টতম ফায়সালা। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন:
وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ
"আল্লাহর চেয়ে উৎকৃষ্ট ফায়সালাদাতা আর কে আছে বিশ্বাসীদের জন্য?" (মায়েদা : ৫০) এ থেকে এটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, লি'আন শপথ বটে। তবে সাক্ষ্যের অর্থবহ এবং সাক্ষ্যও বটে, তবে শপথের অর্থবহ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অন্ধ ও বোবার লি'আন

📄 অন্ধ ও বোবার লি'আন


অন্ধের লি'আন সর্বসম্মতভাবে বৈধ। কিন্তু বোবার লি'আন নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক ও শাফেয়ির মতে, বোবার পক্ষ থেকে বুঝিয়ে দেয়া হলে বোবার লি'আন বৈধ। আবু হানিফা বলেন: বৈধ নয়। কেননা বোবা সাক্ষ্য দানের যোগ্য নয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 লি'আন কে প্রথমে করবে?

📄 লি'আন কে প্রথমে করবে?


আলেমদের সর্বসম্মত মত হলো, লি'আনে স্ত্রীর আগে পুরুষের সাক্ষ্য দেয়া সুন্নত। কিন্তু এটা ওয়াজিব কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। শাফেয়ি প্রমুখের মতে, এটা ওয়াজিব। স্বামীর আগে স্ত্রী লি'আন করলে তা গৃহিত হবেনা। তার যুক্তি এই যে, শরিয়তে লি'আনের প্রচলন হয়েছেই পুরুষের উপর থেকে শাস্তি রহিত করার জন্য। স্ত্রীকে দিয়ে এটা শুরু হলে যা রহিত হয়, তা রহিত হবার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। আবু হানিফা ও মালেকের মতে, স্ত্রীকে দিয়ে শুরু করা হলে তা শুদ্ধ ও গৃহিত হবে। তাদের যুক্তি এই যে, আল্লাহ কুরআনে স্বামী ও স্ত্রীর লি'আনকো, (এবং) দ্বারা যুক্ত করেছেন, যা ধারাবাহিকতার দাবি করেনা, বরং দু'জনেরই লি'আন করতে হবে এটাই শুধু বুঝায়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 লি'আন থেকে নিবৃত্ত থাকা বা পিছু হটা

📄 লি'আন থেকে নিবৃত্ত থাকা বা পিছু হটা


লি'আন থেকে স্বামী অথবা স্ত্রী যে কোনো একজন পিছু হটতে পারে। স্বামী যদি পিছু হটে, তবে তার উপর "ইদ্দুল কাযাফ" তথা অপবাদের শাস্তি আরোপিত হবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন: "যারা তাদের স্ত্রীদের উপর ব্যভিচারের অভিযোগ আরোপ করে, অথচ তারা নিজেরা ছাড়া আর কোনো সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের একজনের সাক্ষ্যই হবে আল্লাহর নামে শপথপূর্বক চারবার এই বলে সাক্ষ্য দেয়া যে, সে যা বলছে সত্য বলছে।" (সূরা নূর, আয়াত ৬) এ থেকে প্রমাণিত হলো যে, সে যখন শপথপূর্বক চারবার অনুরূপ সাক্ষ্য দিলনা, তখন সে অপবাদ দেয়ার ব্যাপারে একজন তৃতীয় ব্যক্তির মতো। ইতিপূর্বে রসূল সা.-এর এ হাদিস উদ্ধৃত করা হয়েছে: হয় সাক্ষী আনো, নয়তো তোমার পিঠে শাস্তি পড়বে। (অর্থাৎ অপবাদের শাস্তি ৮০ ঘা বেত) এ হচ্ছে তিন ইমামের মাযহাব। কিন্তু আবু হানিফা বলেন: স্বামীকে অপবাদের শাস্তি দেয়া হবেনা, তবে যতোক্ষণ সে লি'আন না করে অথবা নিজেকে মিথ্যুক না বলে, ততোক্ষণ তাকে আটক রাখা হবে। নিজেকে মিথ্যুক বলে স্বীকার করলে তাকে অপবাদের শাস্তি দেয়া হবে। আর স্ত্রী যখন লি'আন থেকে পিছু হটে, তখন মালেক ও শাফেয়ির মতানুসারে তার ওপর ব্যভিচারের শাস্তি কার্যকর করা হবে। আবু হানিফা বলেন: শুধু পিছু হটলেই ব্যভিচারের শাস্তি দেয়া যাবেনা, বরং তাকে বন্দী করা হবে, যতোক্ষণ লি'আন কিংবা স্বামীর অভিযোগ সত্য বলে স্বীকার- এই দুটোর একটা না করবে। যদি স্বীকার করে, তবে ব্যাভিচারের শাস্তি দেয়া হবে।
আবু হানিফার প্রমাণ হলো, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তিনটি অপরাধের যে কোনো একটা করা ব্যতীত কোনো মুসলমানের রক্তপাত হালাল নয়: "বিয়ের পর ব্যভিচার, ঈমানের পর কুফরী, হত্যার দায়ে দোষী হওয়া ব্যতিত কাউকে হত্যা করা।" তাছাড়া নিছক কসম খেতে অস্বীকার করার কারণে রক্তপাত করা শরিয়তে অনুমোদন করেনা। যেহেতু বহু সংখ্যক ফকিহ শপথ করতে অস্বীকার করার কারণে কাউকে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা জরুরি মনে করেননা। তাই ঐ কারণে রক্তপাতের তো প্রশ্নই উঠেনা।
ইবনে রুশদ বলেন: মোটকথা, শরিয়তে রক্তপাতের মূলনীতির ভিত্তি হলো, অকাট্য প্রমাণ অথবা স্বীকারোক্তি ব্যতিত কারো রক্তপাত বৈধ নয়। কাজেই এই বিধিতে আবু হানিফাই সঠিক মত দিয়েছেন এবং আল বুরহান গ্রন্থে এই বিধিতে আবু হানিফার মতের শক্তিমত্তার প্রতি ইমাম শাফেয়িও স্বীকৃতি দিয়েছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00