📄 লি'আনের শর্ত
লি'আনে শাসকের বা তার প্রতিনিধির উপস্থিতির ন্যায় স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াও শর্ত। এটি ফকিহদের সর্বসম্মত মত।
📄 সাক্ষী পাওয়ার পর লি'আন চলবে কিনা?
স্বামী যদি ব্যভিচারের উপর সাক্ষী হাজির করে, তাহলে আবু হানিফা ও দাউদের মত লি'আন জায়েয হবেনা। কেননা লি'আন সাক্ষীর বিকল্প। কারণ আল্লাহ বলেছেন: "যারা তাদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনে, অথচ তারা ছাড়া আর কোনো সাক্ষী থাকে না....।" ইমাম মালেক ও শাফেয়ির মতে লি'আন চলবে। কেননা বিছানা দ্বারা সন্তানের বংশ পরিচয়ের স্বত্বসিদ্ধতার উপর সাক্ষীর কোনো প্রভাব পড়েনা।
📄 লি'আন কি সাক্ষী না শপথ?
ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও অধিকাংশ আলেমের মতানুসারে লি'আন হচ্ছে শপথ, যদিও শাহাদাত বা সাক্ষ্য নামে আখ্যায়িত হয়। কেননা নিজের পক্ষে কেউ সাক্ষ্য দেয়না। ইবনে আব্বাসের যে হাদিস ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে, কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে, রসূল সা. বলেছেন: "মহিলা যদি কসম না খেতো, তবে আমার ও তার অবস্থা অন্য রকম হতো।"
আবু হানিফা ও তার শিষ্যদের মতে, এটা সাক্ষ্য। তারা প্রমাণ দর্শান কুরআনের এ উক্তি থেকে: "তাহলে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্যই তাদের একজনের সাক্ষ্য।" আর ইবনে আব্বাসের হাদিসেও রয়েছে: "এরপর হিলাল এসে সাক্ষ্য দিলো, তারপর মহিলাও দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলো।” যারা বলেন এটা শপথ, তাদের মতে, যে কোনো স্বামী স্ত্রীর মধ্যে লি'আন বৈধ, চাই তারা স্বাধীন হোক বা দাসদাসী হোক, অথবা তাদের একজন স্বাধীন অথবা দাস বা দাসী হোক এবং তারা উভয়ে সৎ কিংবা অসৎ হোক অথবা যে কোনো একজন সৎ বা অসৎ হোক। আর যারা বলেন যে, এটা সাক্ষ্য, তাদের মতে, উভয়ে সাক্ষ্য দেয়ার যোগ্য তথা স্বাধীন মুসলিম না হলে লি'আন বৈধ হবেনা। দাসদাসী স্বামী স্ত্রী কিংবা যারা ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেয়ার শাস্তি পেয়েছে, তাদের লি'আন বৈধ নয়। একজন সাক্ষ্য দেয়ার যোগ্য এবং অপরজন অযোগ্য হলেও তাদের লি'আন বৈধ নয়।
ইবনুল কাইয়েম বলেছেন: প্রকৃত ব্যাপার হলো, লি'আন একাধারে সাক্ষ্য ও শপথ দুটোই। শপথ দ্বারা ও বারবার উচ্চারণ দ্বারা সাক্ষ্যকে যেমন জোরদার করা হয়েছে, তেমনি পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ ও সাক্ষ্যের শব্দ ব্যবহার দ্বারা শপথকে শক্তিশালী করা হয়েছে। কারণ পরিস্থিতিই এখানে জিনিসটিকে শক্তিশালী করার দাবি জানায়। এ কারণে এতে দশ ধরনের শক্তি বৃদ্ধিকারী উপাদান বিদ্যমান:
১. 'সাক্ষ্য দান' শব্দের উল্লেখ।
২. আল্লাহর নামে কসম খাওয়া।
৩. ৩ ও ১ ব্যবহার এবং "সত্য বলেছে” বা “মিথ্যা বলেছে” (صدق وكذب) এই ক্রিয়াবাচক পদ ব্যবহারের পরিবর্তে صادق وكاذب 'সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী' এই বিশেষণ ব্যবহার দ্বারা কসমের পরবর্তী বাক্যকে জোরদার করা হয়েছে।
৪. চারবার শপথের পুনরাবৃত্তি।
৫. পঞ্চমবারে স্বামীর নিজের উপর এই বলে বদদোয়া করা যে, সে মিথ্যুক হলে তার উপর অভিশাপ হোক।
৬. পঞ্চমবারে স্বামী কর্তৃক এই মর্মে ঘোষণা করা যে, এটা আল্লাহর আযাবকে অনিবার্য করে তোলে এবং দুনিয়ার আযাব আখেরাতের আযাবের চেয়ে অনেক কম কষ্টকর।
৭. স্বামীর লি'আন স্ত্রীর শাস্তি অথবা বন্দিদশা অনিবার্য করে তোলে এবং স্ত্রীর লি'আন তার (স্ত্রীর) শাস্তি রহিত করে, এ কথা উভয়কে অবহিত করা।
৮. লি'আন স্বামী স্ত্রীর যে কোনো একজনের শাস্তি অবধারিত করে, চাই তা ইহকালে হোক কিংবা পরকালে হোক।
৯. লি'আনকারী স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে এবং তাদের সংসার ধ্বংস হয়ে যায়।
১০. এই বিচ্ছেদ আজীবন স্থায়ী হয় এবং উভয়ে পরস্পরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
লি'আনের এই শোচনীয় পরিণতির কারণেই শপথকে সাক্ষ্যের সাথে এবং সাক্ষ্যকে শপথের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। আর লি'আনকারী স্বামীকে একজন সাক্ষীতে পর্যবসিত করা হয়েছে। এরপর স্ত্রী যদি লি'আন থেকে পিছু হটে, তাহলে স্বামীর সাক্ষ্য কার্যকর হবে, স্বীর উপর ব্যভিচারের নির্দিষ্ট শাস্তি কার্যকর হবে এবং স্বামীর সাক্ষ্য ফলপ্রসূ হবে। আর স্বামীর শপথের অনিবার্য ফল হলো, স্বামীর উপর থেকে শাস্তি রহিত হওয়া এবং স্ত্রীর উপর তা আরোপিত হওয়া। আর যদি স্ত্রী লি'আন করে এবং স্বামীর লি'আনের বিরুদ্ধে নিজের পক্ষ থেকে পাল্টা লি'আন করে, তাহলে স্বামীর লি'আন তার নিজের উপর থেকে শাস্তি রহিত করে কিন্তু স্ত্রীর উপর শাস্তি আরোপ করেনা। এক্ষেত্রে স্বামীর লি'আন তার জন্য একাধারে সাক্ষ্য ও শপথ দুইই, স্ত্রীর জন্য নয়। কেননা লি'আন যদি কেবলমাত্র শপথ হয়, তাহলে কেবল স্বামীর শপথে স্ত্রীকে শাস্তি দেয়া যায়না। আর যদি তা সাক্ষ্য হয়, তবে একা স্বামীর সাক্ষ্যে স্ত্রীকে শাস্তি দেয়া যায়না। সুতরাং এই সাথে যদি স্ত্রীর পিছু হটা যুক্ত হয়, তাহলে স্বামীর জোরদার অভিযোগ ও স্ত্রীর পিছু হটার কারণে স্বামীর সাক্ষ্য ও শপথ জোরদার হয়। এতে করে স্বামীর সত্যতার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই স্বামীর উপর থেকে শাস্তি রহিত করা হয় এবং স্ত্রীর উপর তা অবধারিত হয়। এটা উৎকৃষ্টতম ফায়সালা। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন:
وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ
"আল্লাহর চেয়ে উৎকৃষ্ট ফায়সালাদাতা আর কে আছে বিশ্বাসীদের জন্য?" (মায়েদা : ৫০) এ থেকে এটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, লি'আন শপথ বটে। তবে সাক্ষ্যের অর্থবহ এবং সাক্ষ্যও বটে, তবে শপথের অর্থবহ।
📄 অন্ধ ও বোবার লি'আন
অন্ধের লি'আন সর্বসম্মতভাবে বৈধ। কিন্তু বোবার লি'আন নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক ও শাফেয়ির মতে, বোবার পক্ষ থেকে বুঝিয়ে দেয়া হলে বোবার লি'আন বৈধ। আবু হানিফা বলেন: বৈধ নয়। কেননা বোবা সাক্ষ্য দানের যোগ্য নয়।