📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সংজ্ঞা

📄 সংজ্ঞা


লি'আন লা'ন বা লা'নত শব্দ থেকে উদগত। কেননা লি'আনকারী পঞ্চমবারে এভাবে শপথ করে: “সে (স্বামী) যদি মিথ্যা বলে থাকে, তবে তার উপর আল্লাহর লা'নত।” কারো কারো মতে, লি'আন শব্দের অর্থ হলো দূর করে দেয়া বা বিতাড়িত করা। পরস্পরকে অভিসম্পাতকারী স্বামী ও স্ত্রীকে 'লি'আনকারী' বা 'বিতাড়নকারী' নামে আখ্যায়িত করার প্রথম কারণ এই যে, লি'আনের ফলে উভয়ের পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়া বা বিতাড়িত হওয়া অনিবার্য হয়ে যায়। আর দ্বিতীয় কারণ এই যে, তাদের দু'জনের একজন যে মিথ্যাবাদী, তা অবধারিত সত্য। আর মিথ্যাবাদী মাত্রই অভিশপ্ত বা লা'নতপ্রাপ্ত। কেউ কেউ বলেন: এর আরো একটা কারণ এই যে, তারা উভয়ে উভয়কে চিরদিনের জন্য নিজেদের উপর নিষিদ্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে পরস্পর থেকে বিতাড়িত হয় ও বিতাড়িত করে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 লি'আনের স্বরূপ

📄 লি'আনের স্বরূপ


স্বামী যখন স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ তুলবে, তখন সে প্রথমে চারবার শপথ করে বলবে, সে সত্য বলছে। আর পঞ্চমবার বলবে: সে যদি মিথ্যা অভিযোগ করে থাকে তবে তার উপর আল্লাহর লা'নত বা অভিশাপ।' এরপর স্ত্রী তার অভিযোগ অস্বীকার করতে চাইলে প্রথমে চারবার বলবে: "আল্লাহর কসম, সে (তার স্বামী) মিথ্যাবাদী। আর পঞ্চমবারে বলবে, "সে (স্বামী) যে অভিযোগ করেছে, তা যদি সত্য হয় তবে তার (স্ত্রীর) উপর আল্লাহর গযব হোক।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 লি'আন সম্পর্কে শরিয়তের বিধান

📄 লি'আন সম্পর্কে শরিয়তের বিধান


স্বামী যদি স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আরোপ করে এবং স্ত্রী তা স্বীকার না করে, আর স্বামী অভিযোগে অনঢ় থাকে, তাহলে আল্লাহ ঐ দম্পতির জন্য লি'আনের বিধান করেছেন। (নবম হিজরীর শাবান মাসে, মতান্তরে যে বছর রসূলুল্লাহ সা. ইন্তিকাল করেন, সেই বছর এই বিধান নাযিল হয়।)
বুখারি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন: (ইসলামে সর্বপ্রথম লি'আনকারী) হিলাল বিন উমাইয়া রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট অভিযোগ করেন যে, তার স্ত্রী শুরাইক বিন সাহমার সাথে ব্যাভিচার করেছে। রসূলুল্লাহ সা. তৎক্ষণাত বললেন হয় তোমাকে সাক্ষী পেশ করতে হবে, নচেত তোমার পিঠে (মিথ্যা অপবাদের জন্য ৮০ ঘা বেত্রাঘাত শাস্তি কার্যকর হবে। হিলাল বললেন: হে রসূলুল্লাহ, আমাদের কেউ যখন স্বচোক্ষে তার স্ত্রীর দেহের উপর অন্য পুরুষকে দেখতে পায়, তখনও কি সে সাক্ষী খুঁজতে ঘুরে বেড়াবে? রসূলুল্লাহ সা. জবাবে একই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন: “হয় সাক্ষী আনো, নচেত তোমার পিঠে শাস্তি কার্যকর হবে।”
হিলাল বললেন: "যে আল্লাহ আপনাকে সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম, আমি সত্য বলছি। আমি নিশ্চিত, আল্লাহ ওহি নাযিল করে আমার পিঠকে শাস্তি থেকে বাঁচাবেনই।” পরক্ষণেই জিবরীল নাযিল হলেন এবং আল্লাহর বাণী রসূলুল্লাহ সা.-এর উপর নাযিল করলেন:
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُمْ شُهَدَاء إِلَّا أَنْفُسُهُمْ فَشَادَةً أَحَدِهِمْ أَرْبَعُ شهدت بِاللَّهِ لا إِنَّهُ لَمِنَ الصَّدِقِينَ وَالْخَامِسَةُ أَنْ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَيْهِ إِنْ كَانَ مِنَ الْكَذِبِينَ وَيَدْرَوْا عَنْهَا الْعَذَابَ أَنْ تَشْمَدَ أَرْبَعَ شَمَاتِ بِاللَّهِ لَا إِنَّهُ لَمِنَ الْكَذِبِينَ وَالْخَامِسَةَ أَنْ غَضَبَ اللَّهِ عَلَيْهَا إِنْ كَانَ مِنَ الصَّدِقِينَ
অর্থ: যারা তাদের স্ত্রীদের নামে ব্যভিচারের অভিযোগ তোলে এবং তাদের কাছে তারা নিজেরা ছাড়া আর কোনো সাক্ষী থাকেনা, তাদের একজনই এ বলে চারটি সাক্ষ্য দেবে: আল্লাহর কসম, সে সত্য বলছে। আর পঞ্চমবারে বলবে : সে মিথ্যা বলে থাকলে তার উপর আল্লাহর লা'নত হোক। স্ত্রী শাস্তি থেকে অব্যাহতি পাবে যদি চারবার এই বলে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহর কসম সে (স্বামী) মিথ্যাবাদী। আর পঞ্চমবারে বলে যে, সে (স্বামী) সত্য বলে থাকলে তার (স্ত্রীর) উপর আল্লাহর গযব হোক।" (সূরা নূর: আয়াত ৬-৯)
অতপর রসূলুল্লাহ সা. মহিলার দিকে ফিরলেন। তখন হিলাল এসে সাক্ষ্য দিলো। রসূলুল্লাহ সা. তখনো বলছিলেন: "তোমাদের একজন অবশ্যই মিথ্যাবাদী। কেউ কি তওবা করতে চাও?” তখন মহিলা সাক্ষ্য দিলো। পঞ্চম সাক্ষ্যের সময় হলে লোকেরা তাকে থামালো এবং বললো: এবার কিন্তু ফায়সালা অনিবার্য হয়ে যাবে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন: এ সময় মহিলাটি ইতস্তত করলো ও পিছু হটলো। তা দেখে আমরা মনে করলাম, সে বোধ হয় কসম খাওয়া থেকে বিরত থাকতে চাইছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে বললো: আমি আমার গোত্রের মুখে কলংক লেপন করবোনা। অতপর সে কসম খেয়ে যথারীতি সাক্ষ্য দিলো। (অর্থাৎ শুধু ইতস্তত করলেই তা দ্বারা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাবেনা।)
রসূলুল্লাহ সা. বললেন: "তোমরা এই মহিলার দিকে নজর রেখো। সে যদি এমন সন্তানের জন্ম দেয়, যার চোখের পলক সুরমার মতো কালো রং এর, নিতম্ব মোটাসোটা এবং পায়ের ঘোড়ালি মাংসল হয়, তাহলে বুঝতে হবে ঐ সন্তান সুরাইকের।" যখন সে সন্তান প্রসব করলো, তখন সে রকমই হলো। (যে রকম রসূলুল্লাহ সা. বলেছিলেন অর্থাৎ বুঝা গেলো, মহিলা গর্ভবতী ছিলো।)
তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: আল্লাহর কিতাবে যদি বিধান না দেয়া হতো, তবে আমার ও এই মহিলার একটা বিশেষ অবস্থা হতো।" (অর্থাৎ লি'আন যে ব্যভিচারের শাস্তি রহিত করে, কুরআনে এই বিধান দেয়া না হলে রসূলুল্লাহ সা. তার উপর ব্যভিচারের শাস্তি কার্যকর করতেন)।
"বিদায়াতুল মুজতাহিদ" এর গ্রন্থকার বলেন: স্বাভাবিক অবস্থায় বংশ পরিচয় নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে বিছানাই স্থির রয়েছে। কিন্তু যখন কোনো বিকৃতি নিশ্চিত হয়, তখন বংশ পরিচয় নির্ধারণের জন্য বিছানাকে মানদণ্ড হিসেবে অগ্রাহ্য করার একটা উপায় খুঁজে পাওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। সেই উপায়টাই লি'আন। বস্তুত কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস- সব কিছুর আলোকেই লি'আন একটা প্রতিষ্ঠিত ও প্রামাণ্য ব্যবস্থা। সার্বিকভাবে এ নিয়ে মতভেদ নেই।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 লি'আন কখন করতে হয়?

📄 লি'আন কখন করতে হয়?


দুই অবস্থায় লি'আন জরুরি হয়ে থাকে:
১. যখন স্বামী স্ত্রীকে ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত করবে এবং তার অভিযোগের পক্ষে স্বামী নিজে ছাড়া প্রয়োজনীয় চারজন সাক্ষী না থাকবে।
২. যখন স্বামী স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানকে নিজের ঔরসজাত বলে স্বীকার করবেনা।
প্রথম অবস্থায় লি'আন তখনই বিধিসম্মত হবে যখন স্বামী স্ত্রী ব্যভিচার করেছে মর্মে নিশ্চিত হবে। যেমন, তাকে ব্যভিচার করতে দেখেছে, অথবা স্ত্রী ব্যভিচার করেছে বলে স্বীকার করেছে এবং স্বামীর মনে এর সত্যতা সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে। এরূপ ক্ষেত্রে লি'আন না করে শুধু তালাক দেয়াই উত্তম। কিন্তু ব্যভিচারের ব্যাপারে নিশ্চিত না হলে স্ত্রীকে ব্যভিচারের দায়ে অভিযুক্ত করা জায়েয নয়। গর্ভ অস্বীকার করলে লি'আন জায়েয হবে তখনই, যখন স্বামী দাবি করবে যে, বিয়ের পর সে একবারও স্ত্রীসঙ্গম করেনি, অথবা এই মর্মে দাবি করবে যে, স্ত্রী সংগমের পর ছয় মাসের পূর্বে কিংবা এক বছরের চেয়ে বেশি সময় পরে সন্তান প্রসব করেছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00