📄 সংজ্ঞা
যিহার শব্দটা 'যাহরুন' (পিঠ) থেকে এসেছে। যিহার হলো: স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে একথা বলা: "আনতি আলাইয়া কাযাহরি উম্মী" (তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো) ফাতহুল বারীতে বলা হয়েছে: শরীরের অন্যান্য অংগ বাদ দিয়ে কেবল পিঠের উল্লেখ করার কারণ এই যে, প্রধানত পিঠের উপরই মানুষ আরোহণ করে। আর নারীর উপরই পুরুষ আরোহণ করে থাকে। তাই স্ত্রীকে পিঠের সাথে তুলনা করা হয়েছে। জাহেলি যুগে কেউ যিহার করলে তাকে তালাক গণ্য করা হতো। ইসলাম এই প্রথা বাতিল করে দিয়েছে। তবে স্বামী কাফফারা না দেয়া পর্যন্ত স্ত্রী স্বামীর জন্য যিহারের কারণে নিষিদ্ধ থাকবে। স্বামী যদি তালাকের নিয়তে যিহার করে, তবুও তা যিহারই হবে। আর যিহারের নিয়তে তালাক দিলে তা তালাকই হবে। কেউ যদি স্ত্রীকে বলে: "তুমি আমার নিকট আমার মায়ের পিঠের মতো" এবং এ দ্বারা তালাক বুঝায়, তবে তা তালাক হবে না। সেটা যিহারই হবে, যা দ্বারা স্ত্রী তালাক হয়না।
ইবনুল কাইয়েম বলেছেন: "এর কারণ হলো। জাহেলি যুগে যিহার তালাকেরই সমার্থক ছিলো। তাই তা রহিত করা হয়েছে। কাজেই যে জিনিস বাতিল হয়েছে, তা আর পুনর্বহাল হবেনা। সাহাবি আওস বিন সামেত যিহার করে তালাকের নিয়ত করলেও তার উপর যিহারের বিধিই কার্যকর হয়েছিল, তালাকের নয়। তাছাড়া যিহারের বিধান খুবই স্পষ্ট। কাজেই আল্লাহ তার বিধান দ্বারা যে প্রথা বাতিল করলেন, তার জন্য যিহারকে ইংগিতরূপে গ্রহণ করার প্রশ্নই উঠেনা। আল্লাহর বিধানই অগ্রগণ্য এবং আল্লাহর আদেশই শিরোধার্য।"
আলেমগণ ঐকমত্য সহকারের যিহারকে হারাম গণ্য করেছেন। তাই যিহার জায়েয নয়। কেননা আল্লাহ বলেন:
الَّذِينَ يُظْهِرُونَ مِنْكُمْ مِنْ نِسَائِهِمْ مَا هُنَّ أَمْهَتِهِمْ وَإِنْ أَمْمْتَهُمْ إِلَّا الَّتِي وَلَدْنَهُمْ وَانَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنْكَرًا مِنَ الْقَوْلِ وَزُورًا ، وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُو غَفُورٌ .
অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীকে মায়ের সদৃশ বলে, ঐ স্ত্রীরা তাদের মা নয়। তাদের মা তো তারাই, যারা তাদেরকে প্রসব করেছে। তারা একটা অন্যায় ও মিথ্যা কথা বলে। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও উদার। (সূরা মুজাদালা: আয়াত ২)
এর শানে নুযূল হলো, আওফ বিন সামেত সংক্রান্ত হাদিস। তিনি তার স্ত্রী খাওলা বিনতে মালেকের সাথে যিহার করলেন। ইনি সেই মহিলা, যিনি এই যিহারের বিষয়ে রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে তর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছিলেন। আর আল্লাহ সাত আসমানের উপর থেকে তার অভিযোগ শুনছিলেন। খাওলা বললেন: হে রসূলুল্লাহ, আওফ বিন সামেত আমাকে বিয়ে করে। তখন আমি যুবতী ও আকর্ষণীয় ছিলাম। পরে যখন আমার বয়স বেশি হলো এবং আমার পেট মোটা হলো, তখন সে আমাকে তার মায়ের মতো বানিয়েছে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: "তোমার ব্যাপারে আঃ কাছে কোনো নির্দেশ নেই।” খাওলা বললো: "হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট অভিযোগ পেশ করছি।" কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে, খাওলা বললো: আমার কতকগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে রয়েছে। তাদেরকে যদি আওস নিয়ে নেয়, তবে ওরা ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি আমি নিয়ে নেই, তবে তারা ক্ষুধায় জর্জরিত হবে।” এর অনতিবিলম্বে এ প্রসঙ্গে সূরা মুজাদালার প্রথম অংশ নাযিল হয়। আয়েশা রা. বলেছেন: আল্লাহর প্রশংসা, যিনি সকল আওয়ায শুনবার মতো সর্বব্যাপী শ্রবণশক্তির অধিকারী। রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট অভিযোগ নিয়ে খাওলা এসেছিল। আমি ঘরের ভেতরে ছিলাম। তার কথার কিছু কিছু অংশ আমি শুনতে পাইনি। পরক্ষণে আল্লাহ নাযিল করলেন:
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرَه
অর্থ: আল্লাহ সেই মহিলার কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে বিতর্ক করছিল এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছিল। আল্লাহ তোমাদের দু'জনের বাক্যালাপ শুনছিলেন। আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। (সূরা মুজাদালা: আয়াত ১)
রসূলুল্লাহ সা. খাওলাকে বললেন: আওফ একটা দাস মুক্ত করুক। খাওলা বললেন: তার সে সামর্থ্য নেই। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে দু'মাস একটানা রোযা রাখুক। খাওলা বললো: 'হে রসূলুল্লাহ, সে তো অত্যধিক বুড়ো। তার রোযা রাখার সাধ্য নেই।” রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে ষাটজন দরিদ্রকে আহার করাক। খাওলা বললো: তার কাছ সদকা করার মতো কিছুই নেই। তিনি বললেন: তাকে আমি এক ঝুড়ি খেজুর দিয়ে সাহায্য করবো। খাওলা বললো: আমি আরেক ঝুড়ি দিয়ে তাকে সাহায্য করবো। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: বেশ তো। তবে তার পক্ষ হতে তুমিই ষাটজন মিসকিনকে খাইয়ে দাও এবং তোমার চাচাতো ভাইর (স্বামী) কাছে ফিরে যাও।”
হাদিস গ্রন্থাবলীতে রয়েছে, সালামা বিন সাখর বিয়ামী রমযান মাসে তার স্ত্রীর সাথে যিহার করলো। তারপর রমযান শেষ হওয়ার আগের রাতে তার সাথে সহবাস করলো। রসূলুল্লাহ সা. সালামাকে বললেন: হে সালামা, তুমিই এ অন্যায় কাজটির জন্য দায়ী। সালামা বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমি দায়ী? (দু'বার) বেশ, আমি আল্লাহর আদেশ মানতে প্রস্তুত। সুতরাং আল্লাহ আপনাকে যেমন বলেন, আমাকে আদেশ দিন।"
রসূলুল্লাহ সা. বললেন: একজন গোলামকে স্বাধীন করে দাও। সালামা বললো: আল্লাহর কসম, ঐ স্ত্রী ছাড়া আমার অধীনে এমন আর কেউ নেই, যাকে স্বাধীন করা যায়। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে একনাগাড়ে ও বিরতিহীনভাবে দু'মাস রোযা রাখো। সালামা বললো: আমি যে অপরাধটা করেছি, তাতো রোযা অবস্থায়ই করেছি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে ষাটজন মিসকিনকে এক ওয়াসাক করে খোরমা দাও। সালামা বললো: আল্লাহর কসম, আমরা একেবারেই কপর্দকহীন। আমাদের নিকট কোনো খাবার নেই। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে বনু যিররীক গোত্রের কাছে যাও। তারা তাদের যাকাত তোমাকে দেবে। তা থেকে ষাটজন মিসকিনকে এক ওয়াসাক করে খেজুর দাও। তারপর যা অবশিষ্ট থাকে, তা তুমি ও তোমার পরিবার খাও। সালামা বলেন: এরপর আমি আমার গোত্রের কাছে গেলাম। তাদেরকে বললাম : তোমাদের কাছে আমি শুধুই সংকীর্ণতা ও খারাপ মতামত পেয়েছি। আর রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট পেয়েছি উদারতা ও ভালো সিদ্ধান্ত। তিনি আমাকে তোমাদের যাকাত দেয়ার আদেশ দিয়েছেন।
📄 যিহার কি শুধু মায়ের সাথে নির্দিষ্ট?
অধিকাংশ আলেমের মত হলো, যিহার শুধু মায়ের সাথেই নির্দিষ্ট। কুরআন ও হাদিস থেকেও এটাই জানা যায়। কাজেই কেউ যদি তার স্ত্রীকে বলে : “তুমি আমার নিকট আমার মায়ের পিঠের মতো” (অর্থাৎ মায়ের মতো পবিত্র) তাহলে সেটা যিহার হবে। কিন্তু যদি বলে, “তুমি আমার নিকট আমার বোনের পিঠের মতো”, তাহলে যিহার হবেনা। হানাফিগণ, আওযায়ি, সাওরি, শাফেয়ি ও যায়দ বিন আলির মতে, মায়ের উপর কিয়াস করে সকল মাহারাম মহিলাকে যিহারের আওতাভুক্ত গণ্য করা হবে। কেননা তাদের নিকট যিহার হচ্ছে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে এমন মহিলাদের সদৃশ বা সমকক্ষ গণ্য করা, যারা তার উপর চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ, চাই রক্ত সম্পর্কের কারণে হোক, বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হোক অথবা দুধপানজনিত সম্পর্কের কারণে হোক। কারণ মূল কারণটি হলো, চিরস্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হওয়া। অবশ্য কেউ যদি নিছক সম্মান বা শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ভংগীতে স্ত্রীকে বলে : “সে আমার মা বা বোন”, তাহলে যিহার হবেনা।
📄 যিহারের শর্ত
স্বামীর মুসলমান হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ও সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া এবং স্ত্রীর বিশুদ্ধ বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করা যিহারের অপরিহার্য শর্ত।
📄 সাময়িক যিহার
স্ত্রীর সাথে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যিহার করলে তা সাময়িক যিহার। এর উদাহরণ হলো, স্ত্রীকে বলা : "রাত পর্যন্ত তুমি আমার নিকট আমার মায়ের পিঠের মতো।” তারপর এই সময় শেষ হবার আগে সহবাস করলে যিহার হবে এবং কাফফারা দিতে হবে। মালেক ও ইবনে আবি লায়লার মতে, সহবাস না করলেও কাফফারা দিতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ আলেমের মতে, সহবাস না করলে কাফফারা দেয়ার প্রয়োজন নেই। শাফেয়ি থেকে বর্ণিত দু'টি মতের একটিতে সাময়িক যিহার, যিহার নয়।