📄 রোগিণীর খুলা
মৃত্যুমুখি রোগিণীর খুলা যে বৈধ, সে ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই। সে সুস্থের মতই স্বামীর সাথে খুলা করতে পারে। তবে কী পরিমাণ বিনিময় স্বামীকে দিতে পারবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারণ স্বামীর মন রক্ষা করতে গিয়ে উত্তরাধিকারীদের ক্ষতিসাধন করা থেকে তাকে বিরতে থাকতে হবে। ইমাম মালেক বলেছেন, এই বিনিময়টা স্ত্রীর পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে স্বামীর প্রাপ্য উত্তরাধিকারের চেয়ে বেশি হতে পারবেনা। বেশি হলে তা ফেরত দিতে হবে এবং তালাক কার্যকর হবে। আর স্বামী সুস্থ থাকা অবস্থায় উভয়ের মধ্যে কোনো উত্তরাধিকার লেনদেন হবেনা। হাম্বলীদের মত মালেকীদের মতোই। উত্তরাধিকারের চেয়ে বেশি বিনিময় দিলে তা বাতিল হবে। শাফেয়ি বলেছেন, মহরে মিসলের সমপরিমাণ বিনিময় দিয়ে খুলা করলে জায়েয হবে। তার চেয়ে বেশি দিলে উত্তরাধিকারের এক তৃতীয়াংশ থেকে দিতে হবে এবং তা ঐচ্ছিক দান গণ্য হবে। হানাফিগণ স্ত্রীর মালিকানাধীন সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশের বেশি বিনিময় না দেয়ার শর্তে খুলা জায়েয বলেছেন। তাদের মতে, এটা ঐচ্ছিক দান গণ্য হবে। মৃত্যুমুখি ব্যক্তির রোগশয্যা থেকে দান ওসিয়ত গণ্য হয়ে থাকে। আর ওসিয়ত কোনো তৃতীয় ব্যক্তির জন্য করলে তা এক তৃতীয়াংশ থেকেই করতে হবে। নচেত কার্যকর হবেনা। খুলার কারণে স্বামী তৃতীয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়। তারা বলেন, ইদ্দতকালে খুলাকারী রোগিণী যদি মারা যায়, তবে নিম্নোক্ত জিনিসগুলোর মধ্যে যেটি ন্যূনতম, তা তার স্বামীর প্রাপ্য হয়: খুলার বদলা বা বিনিময়, স্ত্রীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ এবং স্ত্রীর কাছ থেকে প্রাপ্য স্বামীর মোট উত্তরাধিকার। কেননা স্ত্রীর মৃত্যুমুখি অসুস্থতার সময়ে স্বামীর প্রতি প্রায়ই অনুরক্ত হয়ে যায় এবং তার জন্য মোটা অংকের অর্থ খুলার বিনিময় হিসেবে দিতে রাজি হয়, যা তার পাওনা উত্তরাধিকারের চেয়ে বেশি। কাজেই স্ত্রীর উত্তরাধিকারীদের পাওনা রক্ষার ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বনের খাতিরে এবং স্বামীর মন রক্ষার উদ্দেশ্যে আমরা বলেছি যে, স্ত্রী যদি ইদ্দতের মধ্যে মারা যায় তাহলে স্বামী উক্ত তিনটির মধ্যে যেটি সর্বনিম্নে, তা পাবে। আর যদি ঐ রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করে এবং মারা না যায়, তাহলে নির্ধারিত বিনিময়ের পুরোটাই স্বামী পাবে। কেননা তার ঐ কাজটা যে মরণব্যাধির সময়ে হয়নি, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু সে যদি ইদ্দত শেষ হবার পর মারা যায়, তাহলে স্বামী উভয়ের সম্মতিতে নির্ধারিত খুলার বিনিময় পাবে। কিন্তু শর্ত এই যে, তা যেন তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশের বেশি না হয়। কেননা এটা ওসিয়তের সমপর্যায়ের।
বর্তমানে মিশরে ১৯৪৬ সালের আইন চালু হওয়ার পর আদালতে যে ব্যবস্থা চলছে, তা হলো, স্বামী খুলার বিনিময় ও স্ত্রীর পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ এই দুটির যেটি ন্যূনতম, সেটি পায়, চাই স্ত্রী ইদ্দতের মধ্যে মারা যাক বা ইদ্দতের পরে মারা যাক। কেননা এই আইন উত্তরাধিকারী ও অনুত্তরাধিকারী উভয়ের জন্য ওসিয়ত বৈধ করেছে। এ আইনে অনূর্ধ এক তৃতীয়াংশের মধ্য থেকে ওসিয়ত কার্যকর হবে এবং তা কারো অনুমতি সাপেক্ষ হবেনা। এ কারণে স্বামীর প্রাপ্য বিনিময়ের চেয়ে বেশি দিয়ে স্বামীর প্রতি অনুরাগ প্রদর্শন করতে স্ত্রীকে বাধা দেয়ার ও বিরত রাখার প্রয়োজন পড়েনা।
📄 খুলা কি তালাক না বিচ্ছেদ
অধিকাংশ আলেমের মতে, খুলা বায়েন তালাক। কেননা ইতিপূর্বে আমরা একটা হাদিস উল্লেখ করেছি, যাতে রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "বাগানটা নিয়ে নাও এবং ওকে তালাক দাও।” আর যেহেতু বিচ্ছেদে স্বামী আর কোনো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়না, অথচ খুলাতে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, তাই এটা বিচ্ছেদ নয়।
আবার আহমদ, দাউদ, ইবনে আব্বাস, উসমান ও ইবনে উমর রা. প্রমুখের মতে, এটা বিচ্ছেদ, তালাক নয়। কেননা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, তালাক দু'বার। তারপর খুলার বিবরণ দিয়ে বলেছেন: "এরপর যদি সে স্ত্রীকে পুনরায় তালাক দেয়, তাহলে ঐ স্ত্রীর অতপর অন্য স্বামীর সাথে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তার জন্য হালাল হবেনা।" (বাকারা: ২৩০) সুতরাং খুলা যদি তালাক হতো, তাহলে যে তালাকের পর অন্য স্বামীকে বিয়ে না করলে স্ত্রী হালাল হয়না, তা চতুর্থ তালাক হতো।
এ সকল ফকিহ বলেন, দু'পক্ষের সম্মতিক্রমে বিচ্ছেদ সংঘটিত হয় যেমন, 'ইকালা'র মাধ্যমে ক্রয় বিক্রয় বাতিল করা যায়।
ইবনুল কাইয়েম বলেন, খুলা যে তালাক নয় তার প্রমাণ হলো, আল্লাহ তায়ালা সহবাসের পর দেয়া তিনের কম তালাকের জন্য তিনটে বিধি নির্ধারণ করেছেন, যার প্রত্যেকটাই খুলার পরিপন্থী : প্রথমত: স্বামী তা প্রত্যাহার করার ক্ষমতা রাখে। দ্বিতীয়ত: তা তিন তালাকের একটি বলে পরিগণিত হয়। কাজেই তিনটে সম্পূর্ণ হবার পর অন্য স্বামীর সাথে সহবাস না করা পর্যন্ত সে আর হালাল হয়না। তৃতীয়ত: এতে তিন হায়েযকে ইদ্দত গণ্য করা হয়।
কুরআন সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত যে, খুলা প্রত্যাহারের কোনো অবকাশ নেই। আর সুন্নাহ ও সাহাবিগণের বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, এর ইদ্দত মাত্র এক হায়েয। তালাক হলে ইদ্দত হতো তিন হায়েয। কুরআন হাদিস থেকে এও জানা গেছে যে, দুই তালাকের পর এবং তারপর তৃতীয় তালাক হওয়ার পরও খুলা জায়েয। এ থেকে স্পষ্ট যে, খুলা তালাক নয়। এই মতভেদের ফলাফল তালাকের ইদ্দত দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়। যারা খুলাকে তালাক মনে করে, তারা একে একটা বায়েন তালাক গণ্য করে। আর যারা একে শুধুই বিচ্ছেদ মনে করেন তারা একে বায়েন তালাক গণ্য করেন। যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে দুই তালাক দেয়, তারপর খুলা করে, তারপর তাকে বিয়ে করতে চায়, তার জন্য এটা জায়েয। এজন্য অন্য স্বামীকে বিয়ে করার প্রয়োজন সেই। কেননা এখানে তালাক মাত্র দুটো হয়েছে। আর খুলা তো তালাক নয়। যারা খুলাকে তালাক গণ্য করে, তাদের মতে, অন্য স্বামীর ঘর না করা পর্যন্ত তাকে আর বিয়ে করা জায়েয নয়। সেখানে সে খুলা দ্বারা তিন তালাক পূর্ণ করেছে।
📄 খুলাকারিণিকে কি তালাক দেয়া যায়?
খুলাকারিণীকে অতপর আর কোনো তালাক দেয়া যাবেনা, চাই তালাককে আমরা তালাক বা বিচ্ছেদ, যাই গণ্য করি। উভয়টি স্ত্রীকে তার স্বামীর নিকট পরস্ত্রী বানিয়ে দেয়। আর পরস্ত্রীর উপর তো তালাক পড়তে পারেনা। কিন্তু আবু হানিফা বলেন, খুলাকারিণীর উপরও তালাক পড়তে পারে। এ কারণে তার মতে, খুলা দ্বারা বিচ্ছেদ হওয়ার পরও ঐ স্ত্রীর বোনকে বিয়ে করা জায়েয নয়।
📄 খুলা কারিণীর ইদ্দত
সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত, খুলার ইদ্দত এক হায়েয। সাবেতের ঘটনায় রসূল সা. তাকে বললেন: “তোমার কাছে তোমার স্ত্রীর যা প্রাপ্য, তা তুমি নিয়ে নাও এবং ওকে মুক্ত করে দাও।” সাবেত বললেন, ঠিক আছে। অতপর রসূল সা. তার স্ত্রীকে এক হায়েয ইদ্দত পালনের পর বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার আদেশ দিলেন। (নাসায়ী)
এটা উসমান, ইবনে আব্বাস, আহমদ, ইসহাক বিন রাহওয়াই ও ইবনে তাইমিয়ার মত। ইবনে তাইমিয়া বলেন: “যে ব্যক্তি এ বক্তব্য নিয়ে চিন্তা করবে, সে দেখতে পাবে, এটাই শরিয়ত সম্মত। কেননা ইদ্দত করা হয়েছে তিন হায়েয, যাতে প্রত্যাহারের জন্য দীর্ঘ সময় পাওয়া যায়। স্বামী চিন্তাভাবনা করে ইদ্দতের মধ্যে প্রত্যাহার করতে পারবে। যদি প্রত্যাহার না হয়, তবে এর উদ্দেশ্য জরায়ুকে ভ্রূণ থেকে মুক্ত করা। সে ক্ষেত্রে একটা হায়েযই ইদ্দত হিসেবে যথেষ্ট।"
ইবনুল কাইয়েম বলেছেন: এটা আমীরুল মুমিনীন উসমান, আবদুল্লাহ ইবনে উমর, রুবাঈ বিনতে মুয়াওয়ায ও তার চাচা, যিনি একজন বিশিষ্ট সাহাবি, এদের সকলের মত। এই চারজন সাহাবির সাথে কেউ ভিন্নমত পোষণ করেছেন বলে জানা যায়না। যেমন নাফে থেকে বর্ণিত, তিনি শুনেছেন রুবাঈ বিন মুওয়ায আব্দুল্লাহ ইবনে উমরকে জানিয়েছেন, তিনি অর্থাৎ রুবাঈ উসমান বিন আফফানের আমলে স্বামীর কাছ থেকে খুলা করেছিলেন। এরপর তার চাচা উসমান রা.-এর নিকট এলেন। তাকে বললেন: মুওয়াবেযের মেয়ে আজ তার স্বামীর কাছ থেকে খুলা করেছে। সে কি স্বামীর বাড়ি থেকে চলে আসবে? উসমান (রা) বললেন: অবশ্যই চলে আসবে। উপরন্তু তাদের কেউ কারো উত্তরাধিকারী হবেনা এবং স্ত্রীর ইদ্দতও পালন করতে হবেনা। তবে একটা হায়েয অতিবাহিত না করে সে বিয়ে করতে পারবেনা। কেননা তার গর্ভে সন্তান থাকতে পারে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. এরপর বললেন: উসমান রা. আমাদের সবার চেয়ে উত্তম ও সবার চেয়ে জ্ঞানী। "আন নাসেখ ওয়াল মানসুখ" নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, এটা সাহাবিদের সর্বসম্মত মত। কিন্তু অধিকাংশ আলেমের মতে, খুলাকারিণী যদি হায়েযের বয়সী হয় তবে তার ইদ্দত তিন হায়েয।