📄 যা দ্বারা মহর জায়েয তা দ্বারা খুলার বিনিময় জায়েয
শাফেয়ি মাযহাব মতে, সমগ্র মোহর, বা তার অংশ বিশেষ বা অন্য কোনো সম্পদের বিনিময়ে খুলা জায়েয, চাই তা মোহরের চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক, অথবা বস্তু হোক, ঋণ হোক কিংবা সুযোগ সুবিধা হোক। এর বিধি হলো, "যা দ্বারাই মোহর দেয়া জায়েয হবে, তা দ্বারাই খুলার বিনিময় দেয়া জায়েয।” কেননা আল্লাহ অনির্দিষ্টভাবেই বলেছেন:
ফَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ.
"স্ত্রী মুক্তিপণ হিসেবে যা কিছুই দিক, তাতে তাদের দু'জনের কোনো দোষ হবেনা।" আর যেহেতু খুলা একটি ভোগ্য দ্রব্য ভিত্তিক চুক্তি, তাই বিয়ের সাথে তার সাদৃশ্য রয়েছে। তাই খুলার বিনিময়ের সাথেও মোহরের সাদৃশ্য থাকা স্বাভাবিক। খুলার বিনিময় এমন জিনিস হওয়া শর্ত, যা সম্পদ ও জ্ঞাত। সেই সাথে অন্য সকল বিনিময়ে যেসব শর্ত থাকে, এতেও সেসব শর্ত থাকা চাই, যেমন হস্তান্তরের সামর্থ্য থাকা এবং মালিকানার স্থিতি ইত্যাদি। কেননা খুলা একটা বিনিময় চুক্তি। তাই ওটা ক্রয় বিক্রয় ও মোহরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বিশুদ্ধ খুলাতে এগুলোও বিশুদ্ধভাবে বিদ্যমান। পক্ষান্তরে অশুদ্ধ খুলাতে বিনিময় জ্ঞাত হওয়া শর্ত নয়। সুতরাং কোনো স্বামী যদি কোনো অজ্ঞাত জিনিসের বিনিময়ে স্ত্রীর সাথে খুলা করে। যেমন অনির্দিষ্ট কোনো বস্ত্র, অথবা "এই জন্তুর পিঠে যে মাল রয়েছে", অথবা কোনো অবৈধ শর্তে খুলা করে, তবে বায়েন তালাক হবে এবং স্ত্রী মোহরে মিসল পাবে। অবৈধ শর্তের উদাহরণ: স্ত্রী গর্ভবতী থাকাকালে তার ভরণ পোষণ করা হবে না, কিংবা বাসস্থান দেয়া হবেনা, অথবা মেয়াদের জন্য এক হাজার টাকা দেয়ার বিনিময়ে খুলা করা ইত্যাদি।
খুলা দ্বারা দম্পতির মধ্যে বিচ্ছেদ সংঘটিত হওয়ার কারণ হলো, খুলা বিয়ে ভঙ্গ অথবা তালাক ছাড়া তৃতীয় কিছু নয়। যদি তা বিয়ে ভঙ্গ হয়, তবে যেহেতু বিনিময় (অর্থাৎ মোহর) অশুদ্ধ হলে বিয়ে অশুদ্ধ হয়না, তাই বিয়ে ভঙ্গ হওয়াও অশুদ্ধ হবেনা। আর যদি তালাক হয়, তবে তালাক কোনো বিনিময় ছাড়াও সংঘটিত হয়। আর যে জিনিস বিনিময় ছাড়াও অর্জিত হয়, তা বিনিময় অশুদ্ধ হলেও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। যেমন বিয়ে। বরঞ্চ বিয়ে আরো উত্তমভাবে সম্পন্ন হয়। তালাক বিনিময় ছাড়াই সংঘটিত হয় এজন্য যে, তালাক অত্যন্ত শক্তিশালী। তা আপনা থেকেই কার্যকরী হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবেই হয়।
মোহর মিসল দেয়ার বাধ্যবাধকতার কারণ হলো, এক বিনিময় বাতিল হলে অন্য বিনিময় ফিরে পাওয়া যায়। কিন্তু বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর স্ত্রী আর ফিরে পাওয়া যায়না। কাজেই তার পরিবর্তে অন্য কিছু ফেরত দেয়া অনিবার্য। আর আমরা যার উল্লেখ করেছি, তার সাথে এমন জিনিসকে কিয়াস কর যায়, যা তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কেননা যে জিনিস কোনো জিনিসের অংশ নয়, তা অজ্ঞাত থাকলে কোনো ক্ষতি নেই। মোহর তেমনি একটি জিনিস। এর একটি উদাহরণ হলো, কেউ তার স্ত্রীকে তার (স্ত্রীর) মুঠোয় যা আছে, তার বিনিময়ে খুলা করার প্রস্তাব দিলো, অথচ স্বামী ঐ জিনিসটি কি জানেনা। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর ওপর মোহরে মিসলের বিনিময়ে বায়েন তালাক কার্যকর হবে। আর যদি তার মুঠোয় কিছুই না থেকে থাকে, তাহলে কারো মতে, রজয়ি তালাক হবে, আবার কেউ বলেন, মোহরে মিসলের বিনিময়ে বায়েন তালাক হবে। মালেকীদের মতে, অনিশ্চিত বস্তুর বিনিময়ে খুলা জায়েয, যেমন অমুক গাভীর পেটে যে বাছুর আছে তার বিনিময়ে। পরে পেটের বাছুর মারা গেলে স্বামী কিছুই পাবেনা। স্ত্রীর উপর বায়েন তালাক কার্যকর হবে।
অনুরূপ অনির্দিষ্ট কোনো জিনিসের বিনিময়ে, যে ফল বা ফসল এখনো কাটার যোগ্য হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়নি তার বিনিময়ে এবং সন্তানের প্রতিপালনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দানের বিনিময়েও খুলা করা জায়েয। এক্ষেত্রে প্রতিপালনের অধিকার স্বামীর উপর অর্পিত হবে। আর কেউ কোনো হারাম জিনিস, যথা মদ বা জ্ঞাত চোরাই মালের বিনিময়ে খুলা করলে স্বামী কিছুই পাবেনা। এক্ষেত্রে স্ত্রীর উপর বায়েন তালাক পড়বে, মদ ফেলে দিতে হবে এবং চোরাই মাল তার মালিকের নিকট ফেরত পাঠাতে হবে। এর বিনিময়ে অন্য কিছু দিতে স্ত্রী বাধ্য থাকবেনা। বিনিময়ের জিনিসটি যে হারাম, তা স্বামীর জানা থাকাই যথেষ্ট। স্ত্রী জানুক বা না জানুক, কিছুই এসে যায়না। তবে জিনিসটি যে হারাম তা যদি স্ত্রী জানে কিন্তু স্বামী জানেনা, তাহলে স্বামী খুলা গ্রহণ করতে বাধ্য নয়।
📄 স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া জিনিসের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু দিয়ে খুলা করা
অধিকাংশ ফকিহ্র মতে, খুলার বিনিময়ে স্বামীর কাছ থেকে ইতিপূর্বে স্ত্রীকে যা কিছু দিয়েছিল তার চেয়ে বেশি জিনিস আদায় করতে পারবে। কেননা আল্লাহ বলেছেনঃ فَلاَ يَحِلُّ لَهٗ اَنْ يَّاْخُذَ مِمَّآ اٰتٰـهُنَّ شَيْـًٔا “স্ত্রী মুক্তিপণ হিসেবে যা কিছুই দেয়, তার ভিত্তিতে খুলা করা দম্পতির জন্য বৈধ।” (আল বাকারা, ২২৯) এখানে ‘যা কিছু’ শব্দ ব্যাপক অর্থবোধক। কম বা বেশি যাই হোক এর আওতাভুক্ত। বায়হাক্বি আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণনা করেন : “আমার বোন জনৈকা আনসারী স্ত্রী ছিলো। একদিন উভয়ে রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এলো। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তোমার স্বামীর দেয়া বাগানটা কি তাকে ফেরত দেবে? সে বললো: জি। আরো কিছু বেশি দেবো। অতঃপর সে তার বাগান ও অতিরিক্ত কিছু দিলো। (হাদিস বিশারদগণ এ হাদিসকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন)
কিছু সংখ্যক আলেমের মতে, স্বামী স্ত্রীকে যা কিছু দিয়েছিল তার চেয়ে বেশি আদায় করা তার জন্য বৈধ নয়। কেননা দার কুতনিতে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে: “আবূ যুবাইর বললেন: আমি ওকে (স্ত্রীকে) একটা বাগান মোহর হিসেবে দিয়েছিলাম। রসূলুল্লাহ সা. তার স্ত্রীকে বললেন: তোমাকে যে বাগানটি সে দিয়েছিল তা কি তুমি তাকে ফেরত দেবে? সে বললো: হ্যাঁ, আরো বেশি দেবো। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: বেশি দিতে হবেনা। তবে ওর বাগানটা দিয়ে দাও। মহিলা বললো: ঠিক আছে। এই বিধিতে মতভেদের মূল কারণ হলো, একজন বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদিস দ্বারা কুরআনের ব্যাপক অর্থবোধক শব্দকে নির্দিষ্ট বা সীমিত অর্থবোধক করা যাবে কিনা তা নিয়ে মতবিরোধ। যিনি মনে করেন যাবে, তিনি এই হাদিসের আলোকে বলেন, বেশি নেয়া যাবেনা। আর যিনি মনে করেন যাবেনা, তার মতে, বেশি নেয়া জায়েয। “বিদায়াতুল মুজতাহিদ” গ্রন্থে বলা হয়েছে: “যিনি খুলার বিনিময়কে অন্য সমস্ত লেনদেনের বিনিময়ের মতোই মনে করেন, তিনি মনে করেন, বিনিময়ের পরিমাণটা দু’পক্ষের সম্মতিক্রমে স্থির হবে। আর যিনি হাদিসটিকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেন, তার মতে একটুও বেশি নেয়া বৈধ নয়। তার দৃষ্টিতে এটা হবে অবৈধভাবে অন্যের মাল গ্রহণ।
📄 বিনা কারণে খুলা
খুলা শুধু তখনই জায়েয, যখন কোনো সংগত কারণে তার দাবি জানাবে। যেমন স্বামীর মধ্যে কোনো দৈহিক খুঁত থাকা, চারিত্রিক দোষ থাকা, স্ত্রীকে তার হক বা অধিকার না দেয়া, স্ত্রীর মনে এমন আশঙ্কার সৃষ্টি হওয়া যে, সে হয়তো আল্লাহর সীমা রক্ষা করতে তথা আল্লাহর বিধান অনুসারে দাম্পত্য জীবন যাপন করতে পারবেনা, যেমন স্বামীর সাথে যে ধরনের সদাচারের সাথে বসবাস করা তার কর্তব্য, তা পারবেনা, যেমনটি আয়াতে থেকে জানা যাচ্ছে। এ ধরনের কোনো কারণ না থাকলে খুলা নিষিদ্ধ। কেননা আহমদ ও নাসায়ী আবূ হুরায়রা থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন: “কত্রিমভাবে খুলা গ্রহণকারী মহিলারা মুনাফিক।” আলেমগণ বিনা কারণে খুলা গ্রহণ করাকে মাকরূহ বলেছেন।
📄 স্বামী স্ত্রীর সম্মতিক্রমে খুলা
স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতেই খুলা হওয়া উচিত। কিন্তু স্বামী সম্মত না হলে আদালত তাকে বাধ্য করতে পারবে। কেননা সাবেত ও তার স্ত্রী যখন রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে তাদের বিরোধ মিমাংসার জন্য গিয়েছিলেন, তখন রসূল সা. সাবেতকে বাগান গ্রহণপূর্বক তালাক দিতে বাধ্য করেছিলেন।