📄 খুলা কী?
ইসলাম যে খুলা'র অনুমতি দিয়েছে, তা حَلَّ 'খালায়া' শব্দ থেকে গৃহীত, যা দেহ থেকে পোশাক খুলে নেয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেহেতু কুরআনের বক্তব্য অনুসারে নারী পুরুষের পোশাক এবং পুরুষ নারীর পোশাক, যেমন আল্লাহ বলেন: ﴿هُنَّ لِبَاسٌ لَكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَهُنَّ﴾
"তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।" (বাকারা: ১৮৭)
তাই বৈবাহিক বন্ধন ছিন্ন করাকে খুলা নাম দেয়া হয়েছে। এর আরেক নাম মুক্তিপণ। কেননা স্ত্রী তার স্বামীকে কিছু সামগ্রী দিয়ে তার কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করে। ফকিহগণ এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে: "খুলা হচ্ছে পুরুষ কর্তৃক কোনো জিনিস পাওয়ার বিনিময়ে নিজের স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া।" এর ভিত্তি হলো, বুখারি ও নাসায়ীতে ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত এ হাদিস: "ছাবিত বিন কায়েসের স্ত্রী রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এসে বললো: হে রসূলুল্লাহ! আমি আমার স্বামীর ধর্ম ও চরিত্রকে অপসন্দ করিনা। কিন্তু ইসলামের মধ্যে আমি আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অসদাচরণকে ঘৃণা করি।
(অর্থাৎ সে স্বামীর দ্বীনদারী ও চারিত্রিক ত্রুটির জন্য তাকে ত্যাগ করতে চায়নি। সে স্বামীকে তার (স্ত্রীর) আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদ্ব্যবহার না করার জন্য ত্যাগ করতে চেয়েছে। যেহেতু স্বামীর এই আচরণ তার অপসন্দ, তাই এই অপসন্দের কারণে সে স্বামীর অধিকার দিতে অসমর্থ হতে পারে। এই আশংকা থেকেই বিচ্ছেদ চায়।)
রসূল সা. বললেন: তুমি কি তাকে তার দেয়া বাগানটি ফেরত দেবে? সে বললো: হাঁ। তখন রসূল সা. তার স্বামীকে বললেন: তুমি বাগানটি গ্রহণ করো আর ওকে তালাক দাও।
📄 খুলায় ব্যবহৃত শব্দাবলি
ফকিহদের মতে, খুলা' অবশ্যই খুলা' শব্দ বা এ দ্বারা গঠিত শব্দ দ্বারা কার্যকর হতে হবে। খুলা'র সমার্থক অন্য কোনো শব্দও ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন মুক্তিপণ কিংবা অব্যাহতি লাভ ইত্যাদি। খুলা' বা খুলা'র সমার্থক শব্দের পরিবর্তে অন্য কোনো শব্দ যদি ব্যবহার করা হয়, যথা স্বামী বললো, "এত টাকার বিনিময়ে তোমাকে তালাক দিলাম" এবং স্ত্রী তা গ্রহণ করলো তাহলে এটা হবে অর্থের বিনিময়ে তালাক, খুলা' হবেনা।
তবে ইবনুল কাইয়েম বলেছেন: "চুক্তির বাস্তবতা ও উদ্দেশ্যের দিকে দৃষ্টি দিলে যে শব্দ দ্বারাই বলা হোক, খুলা' দ্বারা বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান বুঝাবে, চাই তা তালাক শব্দ দ্বারাই বলা হোক না কেন।" ইমাম আহমদের শিষ্যগণ, ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে আব্বাসের মতও অনুরূপ। এরপর ইবনে তাইমিয়া পুনরায় বলেন: “যারা চুক্তির কার্যকারিতার ব্যাপারে শব্দকে গুরুত্ব দেয়, তারা তালাক শব্দ দ্বারা দেয়া খুলা'কে তালাকে রূপান্তরিত করেন।" ইবনে কাইয়েম এই মতটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বলেন: "ফিকহ ও তার মূলনীতি অধ্যয়ন করলে জানা যায়, চুক্তির ক্ষেত্রে তার বাস্তব রূপটাই বিবেচ্য, তার শব্দ ও বাহ্যিক রূপ নয়। এর একটা প্রমাণ হলো, রসূলুল্লাহ সা. সাবেত বিন কায়েসকে আদেশ দিলেন যেন তার স্ত্রীকে খুলা'র জন্য তালাক দেয়। এতদসত্ত্বেও তার স্ত্রীকে এক হায়েয অবধি ইদ্দত পালন করতে বললেন। এ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, খুলা তালাক শব্দ দ্বারা সংঘটিত হলেও তা আসলে বৈবাহিক বন্ধনের অবসান। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা এর উপর মুক্তিপণের বিধান নির্ভরশীল করেছেন এজন্যই যে, এটা মুক্তিপণ। আর মুক্তিপণ যে বিশেষ কোনো শব্দের সাথে নির্দিষ্ট নয় এবং আল্লাহ এর জন্য বিশেষ কোনো শব্দ নির্দিষ্ট করেননি। আর মুক্তিপণের বিনিময়ে অর্জিত তালাক শর্তযুক্ত তালাক, শর্তহীন তালাক নয়। অনুরূপ, তালাকের প্রত্যাহারযোগ্যতা এবং পবিত্রতার তিন মেয়াদ অবধি ইদ্দত পালন বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। (যাদুল মায়াদ, ৪/২৭)
📄 খুলার বিনিময়
আগেই বলা হয়েছে, খুলা হলো, অর্থের বিনিময়ে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটানো। সুতরাং খুলা শব্দ দ্বারা যে চুক্তি বুঝায়, বিনিময় তার একটা মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং যেখানে কোনো বিনিময় নেই, সেখানে কোনো খুলাও নেই। স্বামী যদি স্ত্রীকে শুধু "তোমার সাথে খুলা' করলাম" বলেই চুপ থাকে এবং বিনিময়ের উল্লেখ না করে, তাহলে সেটা খুলা' হবেনা। আর যদি সে তালাকের নিয়ত করে, তবে সেটা রজয়ি তালাক হবে। আর আদৌ কোনো নিয়ত না থাকলে কিছুই হবেনা। কেন না এটা ইংগিতবাচক শব্দ, যার জন্য নিয়ত অপরিহার্য।
📄 যা দ্বারা মহর জায়েয তা দ্বারা খুলার বিনিময় জায়েয
শাফেয়ি মাযহাব মতে, সমগ্র মোহর, বা তার অংশ বিশেষ বা অন্য কোনো সম্পদের বিনিময়ে খুলা জায়েয, চাই তা মোহরের চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক, অথবা বস্তু হোক, ঋণ হোক কিংবা সুযোগ সুবিধা হোক। এর বিধি হলো, "যা দ্বারাই মোহর দেয়া জায়েয হবে, তা দ্বারাই খুলার বিনিময় দেয়া জায়েয।” কেননা আল্লাহ অনির্দিষ্টভাবেই বলেছেন:
ফَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا فِيمَا افْتَدَتْ بِهِ.
"স্ত্রী মুক্তিপণ হিসেবে যা কিছুই দিক, তাতে তাদের দু'জনের কোনো দোষ হবেনা।" আর যেহেতু খুলা একটি ভোগ্য দ্রব্য ভিত্তিক চুক্তি, তাই বিয়ের সাথে তার সাদৃশ্য রয়েছে। তাই খুলার বিনিময়ের সাথেও মোহরের সাদৃশ্য থাকা স্বাভাবিক। খুলার বিনিময় এমন জিনিস হওয়া শর্ত, যা সম্পদ ও জ্ঞাত। সেই সাথে অন্য সকল বিনিময়ে যেসব শর্ত থাকে, এতেও সেসব শর্ত থাকা চাই, যেমন হস্তান্তরের সামর্থ্য থাকা এবং মালিকানার স্থিতি ইত্যাদি। কেননা খুলা একটা বিনিময় চুক্তি। তাই ওটা ক্রয় বিক্রয় ও মোহরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বিশুদ্ধ খুলাতে এগুলোও বিশুদ্ধভাবে বিদ্যমান। পক্ষান্তরে অশুদ্ধ খুলাতে বিনিময় জ্ঞাত হওয়া শর্ত নয়। সুতরাং কোনো স্বামী যদি কোনো অজ্ঞাত জিনিসের বিনিময়ে স্ত্রীর সাথে খুলা করে। যেমন অনির্দিষ্ট কোনো বস্ত্র, অথবা "এই জন্তুর পিঠে যে মাল রয়েছে", অথবা কোনো অবৈধ শর্তে খুলা করে, তবে বায়েন তালাক হবে এবং স্ত্রী মোহরে মিসল পাবে। অবৈধ শর্তের উদাহরণ: স্ত্রী গর্ভবতী থাকাকালে তার ভরণ পোষণ করা হবে না, কিংবা বাসস্থান দেয়া হবেনা, অথবা মেয়াদের জন্য এক হাজার টাকা দেয়ার বিনিময়ে খুলা করা ইত্যাদি।
খুলা দ্বারা দম্পতির মধ্যে বিচ্ছেদ সংঘটিত হওয়ার কারণ হলো, খুলা বিয়ে ভঙ্গ অথবা তালাক ছাড়া তৃতীয় কিছু নয়। যদি তা বিয়ে ভঙ্গ হয়, তবে যেহেতু বিনিময় (অর্থাৎ মোহর) অশুদ্ধ হলে বিয়ে অশুদ্ধ হয়না, তাই বিয়ে ভঙ্গ হওয়াও অশুদ্ধ হবেনা। আর যদি তালাক হয়, তবে তালাক কোনো বিনিময় ছাড়াও সংঘটিত হয়। আর যে জিনিস বিনিময় ছাড়াও অর্জিত হয়, তা বিনিময় অশুদ্ধ হলেও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। যেমন বিয়ে। বরঞ্চ বিয়ে আরো উত্তমভাবে সম্পন্ন হয়। তালাক বিনিময় ছাড়াই সংঘটিত হয় এজন্য যে, তালাক অত্যন্ত শক্তিশালী। তা আপনা থেকেই কার্যকরী হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবেই হয়।
মোহর মিসল দেয়ার বাধ্যবাধকতার কারণ হলো, এক বিনিময় বাতিল হলে অন্য বিনিময় ফিরে পাওয়া যায়। কিন্তু বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর স্ত্রী আর ফিরে পাওয়া যায়না। কাজেই তার পরিবর্তে অন্য কিছু ফেরত দেয়া অনিবার্য। আর আমরা যার উল্লেখ করেছি, তার সাথে এমন জিনিসকে কিয়াস কর যায়, যা তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কেননা যে জিনিস কোনো জিনিসের অংশ নয়, তা অজ্ঞাত থাকলে কোনো ক্ষতি নেই। মোহর তেমনি একটি জিনিস। এর একটি উদাহরণ হলো, কেউ তার স্ত্রীকে তার (স্ত্রীর) মুঠোয় যা আছে, তার বিনিময়ে খুলা করার প্রস্তাব দিলো, অথচ স্বামী ঐ জিনিসটি কি জানেনা। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর ওপর মোহরে মিসলের বিনিময়ে বায়েন তালাক কার্যকর হবে। আর যদি তার মুঠোয় কিছুই না থেকে থাকে, তাহলে কারো মতে, রজয়ি তালাক হবে, আবার কেউ বলেন, মোহরে মিসলের বিনিময়ে বায়েন তালাক হবে। মালেকীদের মতে, অনিশ্চিত বস্তুর বিনিময়ে খুলা জায়েয, যেমন অমুক গাভীর পেটে যে বাছুর আছে তার বিনিময়ে। পরে পেটের বাছুর মারা গেলে স্বামী কিছুই পাবেনা। স্ত্রীর উপর বায়েন তালাক কার্যকর হবে।
অনুরূপ অনির্দিষ্ট কোনো জিনিসের বিনিময়ে, যে ফল বা ফসল এখনো কাটার যোগ্য হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়নি তার বিনিময়ে এবং সন্তানের প্রতিপালনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দানের বিনিময়েও খুলা করা জায়েয। এক্ষেত্রে প্রতিপালনের অধিকার স্বামীর উপর অর্পিত হবে। আর কেউ কোনো হারাম জিনিস, যথা মদ বা জ্ঞাত চোরাই মালের বিনিময়ে খুলা করলে স্বামী কিছুই পাবেনা। এক্ষেত্রে স্ত্রীর উপর বায়েন তালাক পড়বে, মদ ফেলে দিতে হবে এবং চোরাই মাল তার মালিকের নিকট ফেরত পাঠাতে হবে। এর বিনিময়ে অন্য কিছু দিতে স্ত্রী বাধ্য থাকবেনা। বিনিময়ের জিনিসটি যে হারাম, তা স্বামীর জানা থাকাই যথেষ্ট। স্ত্রী জানুক বা না জানুক, কিছুই এসে যায়না। তবে জিনিসটি যে হারাম তা যদি স্ত্রী জানে কিন্তু স্বামী জানেনা, তাহলে স্বামী খুলা গ্রহণ করতে বাধ্য নয়।