📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ক্ষতি ও নির্যাতনের কারণে তালাক

📄 ক্ষতি ও নির্যাতনের কারণে তালাক


ক্ষতি ও নির্যাতনের কারণে তালাক:
ইমাম মালেক ও আহমদের মতে, স্ত্রী যদি অভিযোগ করে যে স্বামী তার উপর এমন নির্যাতন চালাচ্ছে, যার বর্তমানে তাদের উভয়ের দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যেমন মারপিট, গালিগালাজ কিংবা অন্য কোনো পন্থায় কোনো অসহনীয় নিপীড়ন কিংবা তাকে অন্যায় ও অনৈতিক কাজ করতে বা কথা বলতে বাধ্য করা, তাহলে এই অভিযোগের প্রতিকারের জন্য স্ত্রী বিচ্ছেদ প্রার্থনা করতে পারে। এই অভিযোগ যখন স্ত্রীর সাক্ষ্য প্রমাণ বা স্বামীর স্বীকারোক্তি দ্বারা সত্য প্রমাণিত হয় এবং নিপীড়ন এই পর্যায়ের হয় যে, তার বর্তমানে দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসম্ভব এবং আদালত তাদের উভয়ের মধ্যে আপোষ মিমাংসা করতে অক্ষম হয়, তাহলে স্ত্রীর উপর একটা বায়েন তালাক কার্যকর করবে। আর যদি স্ত্রী প্রমাণ উপস্থাপনে অক্ষম হয় কিংবা স্বামী স্বীকারোক্তি না দেয়, তাহলে আদালত তার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু যদি স্ত্রী বারবার অভিযোগ আনতে থাকে, বিচ্ছেদ প্রার্থনা করে এবং তার অভিযোগের সত্যতা আদালতের নিকট প্রমাণিত না হয়, তাহলে আদালত এমন দু'জন ন্যায়পরায়ন পুরুষকে সালিশ নিয়োগ করবে, যাদের ঐ দম্পতি সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তাদেরকে শুধরানোর ক্ষমতাও রয়েছে। সালিশদ্বয়কে যদি দম্পতির পরিবারের মধ্য থেকে যোগাড় করা সম্ভব হয়, তাহলে ভালো হয়। নচেত যেখান থেকেই পাওয়া যায় নিতে হবে। এই দুই সালিশের কর্তব্য হলো, দম্পতির মতবিরোধের কারণ সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং সাধ্যমত তাদেরকে শুধরে দেয়া। তারা দু'জন যদি দম্পতিকে শুধরাতে অক্ষম হয়, আর সম্পর্কের অবনতির জন্য যদি স্বামী স্ত্রী উভয়ে অথবা স্বামী দায়ী হয়। অথবা কে দায়ী তা স্পষ্ট না হয়, তখন সালিশদ্বয় একটা বায়েন তালাকের মাধ্যমে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেবে। আর যদি স্ত্রী দায়ী হয়, তাহলে তালাকের মাধ্যমে নয় বরং 'খুলা'র মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে।

আবু হানিফা, আহমদ ও শাফেয়ির মতে, স্বামী তালাকের ক্ষমতা অর্পণ না করলে সালিশদ্বয়ের তালাক দেয়ার অধিকার নেই। শাফেয়ি ও মালেকের মতে কোনো বিনিময় দ্বারা বা বিনিময় ছাড়া যদি বিবাদ মেটানো তারা উভয়ে সমীচীন মনে করে, তবে তা করতে পারবে। আর 'খুলা' করানো সমীচীন মনে করলে তা করাতে পারবে। আর স্বামীর পক্ষ থেকে আগত সালিশ যদি তালাক সমীচীন মনে করে, তবে তালাক দেবে। এ ব্যাপারে স্বামীর অনুমতি নিতে তারা বাধ্য নয়। কেননা তারা সালিশ, উকিল নয়। উকিল হলে এ ক্ষমতা তাদের থাকবেনা।

আর যদি সালিশদ্বয় কোনো বিষয়ে একমত না হয়, তবে আদালত তাদের দু'জনকে নতুন করে তদন্ত ও অনুসন্ধান চালানোর আদেশ দেবে। তারপরও যদি তারা একমত হতে ব্যর্থ হয়, তবে আদালত তাদেরকে অপসারণ করে নতুন করে দু'জন সালিশ নিয়োগ করবে। সালিশদ্বয়ের কর্তব্য নিজ নিজ অভিমত আদালতের নিকট উপস্থাপন করা। আর তাদের রায় কার্যকর করা আদালতের কর্তব্য। কেননা আল্লাহ বলেছেন:

وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا ، إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا .

"যদি তোমরা তাদের সম্পর্কচ্ছেদের আশংকা করো, তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন ও স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ পাঠাও। স্বামী ও স্ত্রী যদি সংশোধন চায় তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে আপোষ করিয়ে দেবেন।" (আননিসা, ৩৫) আল্লাহ আরো বলেছেন: فَإِمْسَاكَ بِمَعْرُوفِ أَوْ تَسْرِيع بِإِحْسَانٍ . "হয় সংগতভাবে পুনর্বহাল করতে হবে, নচেত সৌহার্দপূর্ণভাবে বিদায় করতে হবে।" যেহেতু পুনর্বহালের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে, তাই সৌহার্দপূর্ণভাবে বিদায় করার পথটাই খোলা রয়েছে। রসূল সা. বলেছেন : لَاضَرَرَ وَلَاضِرَارَ "কেউ নিজেও ক্ষতির শিকার হবেনা, অন্যের ক্ষতিসাধনও করবেনা।"

১৯২৯ সালের ২৫ নং আইনে বলা হয়েছে
ধারা ৬: স্ত্রী যখন অভিযোগ করে যে, স্বামী তার ওপর এত নির্যাতন চালায়, যার কারণে উভয়ের সহাবস্থান সম্ভব নয়, তখন সে আদালতের কাছ থেকে বিয়ে বিচ্ছেদ প্রার্থনা করতে পারে। নির্যাতন প্রমাণিত হলে ও আপোষ করতে ব্যর্থ হলে আদালত স্ত্রীকে একটা বায়েন তালাক দেবে। আদালত যদি স্ত্রীর প্রার্থনা অগ্রাহ্য করে, তারপর অভিযোগ পুনঃ পুনঃ আসতে থাকে এবং নির্যাতন প্রমাণিত না হয়, তবে আদালত দু'জন সালিশ পাঠাবে এবং ৭, ৮, ৯, ১০ ও ১১ ধারা অনুযায়ী নিষ্পত্তি করবে।

ধারা ৭: সালিশ নিয়োগে শর্ত এই যে, তারা উভয়ে দু'জন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ হবে, সম্ভব হলে দুই পরিবার থেকে দুইজন হবে, নচেত পরিবারের বাইরে থেকে হবে এবং ঐ দম্পতি সম্পর্কে আগে থেকে জ্ঞাত ও তাদের শুধরাতে সক্ষম হতে হবে।

ধারা ৮: সালিশদ্বয়ের দায়িত্ব হলো, স্বামী স্ত্রীর বিরোধের কারণ অবহিত হবে এবং তা নিষ্পত্তিকরণে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে। কোনো নির্দিষ্ট পন্থায় সম্ভব হলে নিষ্পত্তি করবে।

ধারা ৯: উভয় সালিশ বিরোধ নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ হলে এবং স্বামী বা স্বামী-স্ত্রী উভয়ে এজন্য দায়ী হলে অথবা প্রকৃত অবস্থা অজানা থেকে গেলে তারা একটা বায়েন তালাক দ্বারা বিচ্ছেদ ঘটাবে।

ধারা ১০ : সালিশদ্বয়ের মধ্যে যখন মতভেদ সৃষ্টি হবে, তখন আদালত তাদেরকে পুনরায় তদন্ত চালানোর আদেশ দেবে। এরপরও যদি মতভেদ অব্যাহত থাকে, তবে তাদের বাদ দিয়ে অন্য দু'জনকে সালিশ নিয়োগ করবে।

ধারা ১১: সালিশদ্বয় যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তা হুবহু আদালতে উপস্থাপন করবে এবং আদালত তদনুযায়ী রায় দেবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 স্বামীর অনুপস্থিতির কারণে তালাক

📄 স্বামীর অনুপস্থিতির কারণে তালাক


স্বামীর অনুপস্থিতির কারণে তালাক :
ইমাম মালেক ও আহমদের মতে স্ত্রীর ক্ষতির প্রতিকারের উদ্দেশ্যে স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতির জন্য তালাক কার্যকর করা যাবে। স্বামীর যদি এমন কোনো সম্পত্তিও স্ত্রীর নাগালে থাকে যা থেকে সে খোরপোষ নিতে পারে, তথাপি নিম্নোক্ত শর্তাবলী সাপেক্ষে স্ত্রী স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে বিচ্ছেদের দাবি জানাতে পারবে। বিচ্ছেদ সংঘটিত হলে মালেকের মতে, তা হবে একটি বায়েন তালাক। আহমদের মতে, তা হবে বিয়ে বিচ্ছেদ।

শর্তাবলী: ১. স্বামীর অনুপস্থিতির যদি কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ না থাকে। ২. তার অনুপস্থিতির দরুন যদি স্ত্রীর ক্ষতি হয়। ৩. যে শহরে স্ত্রী বাস করে, স্বামী যদি তা থেকে ভিন্ন শহরে অবস্থান করে। ৪. স্বামীর অনুপস্থিতি যদি এক চন্দ্রবর্ষ প্রলম্বিত হয়, যাতে স্ত্রীর ক্ষতি প্রমাণিত হয়।

যদি গ্রহণযোগ্য কারণে স্বামী অনুপস্থিত থাকে, যথা বিদ্যা অর্জনের উদ্দেশ্যে অনুপস্থিত থাকা, অথবা বাণিজ্য উপলক্ষে অথবা চাকুরি উপলক্ষে, তাহলে এক্ষেত্রে বিচ্ছেদ দাবি করা বৈধ হবেনা। অনুরূপ, স্ত্রী যে শহরে বাস করে, স্বামীও যদি সেই শহরেই থাকে, তবে সে ক্ষেত্রেও বিচ্ছেদ দাবি করা জায়েয হবেনা। পক্ষান্তরে স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতি ছাড়াও স্ত্রীর কাছ থেকে নাতিদীর্ঘ সময় দূরে অবস্থানের কারণেও যদি স্ত্রীর ক্ষতি হয়, তবে সে ক্ষেত্রেও স্ত্রীর বিচ্ছেদ দাবি করার অধিকার থাকবে। অনুপস্থিতির মেয়াদ এক চন্দ্রবর্ষ পরিমাণ দীর্ঘ হওয়া জরুরি, যাতে স্ত্রীর ক্ষতি অনিবার্য হয়ে ওঠে, সে ভীতিপ্রদ নির্জনতা ও নিঃসঙ্গতা অনুভব করে এবং আল্লাহ যেসব জিনিস নিষিদ্ধ ও হারাম করেছেন, তার কোনোটায় পতিত হবার আশংকা বোধ করে। এক চন্দ্রবর্ষকে অনুপস্থিতির মেয়াদ নির্ধারণ করেছেন ইমাম মালেক। অন্যদের মতে, তিন মাস। আহমদের মতে, বিচ্ছেদ দাবি করার উপযুক্ত ন্যূনতম মেয়াদ ছয় মাস। কেননা ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে এবং উমরের অনুসন্ধান ও উম্মুল মুমিনীন হাফসার ফতোয়া থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রীর ধৈর্য ধারণের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ মেয়াদ হলো ছয় মাস।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 স্বামীর বন্দী থাকার কারণে তালাক দেয়া

📄 স্বামীর বন্দী থাকার কারণে তালাক দেয়া


স্বামীর বন্দী থাকার কারণে তালাক দেয়া:
ইমাম মালেক ও আহমদের মতে, স্বামীর গ্রেফতার ও বন্দী থাকার কারণে স্ত্রীর তালাক প্রার্থনার অধিকার রয়েছে। কেননা তার কাছ থেকে স্বামীর দূরে থাকার ফলে তার ক্ষতি সাধিত হয়ে থাকে। তিন বছর বা তার চেয়ে বেশি দিনের জন্য কারাদণ্ড চূড়ান্তভাবে ঘোষিত হলে, তা স্বামীর উপর কার্যকর হলে এবং কার্যকর হওয়ার দিন থেকে এক বছর অতিবাহিত হলে স্ত্রীর তালাক প্রার্থনা করে আদালতে আবেদন করার অধিকার থাকবে। কেননা সে স্বামীর কাছ থেকে দূরে থাকার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এটা প্রমাণিত হবার পর আদালত স্ত্রীকে একটি তালাক দেবে। এটি ইমাম মালেকের নিকট বায়েন তালাক এবং আহমদের নিকট বিচ্ছেদ। ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: বন্দী বা অনুরূপ এমন কোনো ব্যক্তির স্ত্রী, যার স্বামীর কাছ থেকে উপকৃত হবার কোনোই সুযোগ নেই এবং নিরুদ্দেশ ব্যক্তির স্ত্রীর বিধান সর্বসম্মতভাবে একই রকম। আইনের ১২ নং ধারায় বলা হয়েছে: "স্বামী যখন গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই এক বছর বা তার চেয়ে বেশি অনুপস্থিত থাকে, এবং স্ত্রী তার কাছ থেকে দূরে থাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন স্বামীর সম্পত্তি থেকে খোরপোষ গ্রহণের সুযোগ স্ত্রীর যতোই থাকুক, তার আদালতে একটি বায়েন তালাক প্রার্থনা করার অধিকার থাকবে।

ধারা ১৩: নিরুদ্দেশ স্বামীর কাছে চিঠি পৌঁছার সম্ভাবনা থাকলে আদালত তাকে একটা সময় বেঁধে দিয়ে নোটিশ দেবে যে, উক্ত সময়ের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর সাথে থাকার জন্য উপস্থিত না হলে বা তাকে নিজের কাছে নিয়ে না গেলে বা তালাক না দিলে আদালত স্বয়ং তার স্ত্রীর উপর তালাক কার্যকর করবে। বেঁধে দেয়া মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও স্বামী এর কোনো একটি কাজও না করলে এবং সেজন্য কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ না দর্শালে আদালত একটি বায়েন তালাক কার্যকর করে উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাবে। আর নিরুদ্দেশ স্বামীর কাছে চিঠি পৌঁছানো সম্ভব না হলে আদালত কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদের অবকাশ প্রদান ও নোটিশ প্রদান ছাড়াই স্ত্রীকে তালাক দেবে।

ধারা ১৪ : চূড়ান্তভাবে তিন বছর বা তার বেশি সময়ের কারাদণ্ড প্রাপ্ত ব্যক্তির স্ত্রী স্বামীর কারাভোগ শুরু হওয়া থেকে এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর নিজের ক্ষতির প্রতিকারার্থে আদালতের নিকট বায়েন তালাক প্রার্থনাপূর্বক আবেদন পেশ করতে পারবে। চাই স্বামীর সম্পত্তি থেকে খোরপোষ গ্রহণের সুযোগ তার থাক বা না থাক। স্বামীর মধ্যে অন্য কোনো দোষ বা খুঁত থাকলে সে সম্পর্কে শরিয়তের বিধান ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00