📄 “তোমার পথ তুমি দেখ” বা “তোমার ভবিষ্যৎ তুমি বেছে নাও”
“তোমার পথ তুমি দেখ” বা “তোমার ভবিষ্যৎ তুমি বেছে নাও”:
এ বাক্য প্রয়োগ দ্বারা তালাক কার্যকর হয় বলে ফকিহগণ মত দিয়েছেন। কেননা শরিয়ত যে সকল বাক্যকে তালাকের বাক্য বলে চিহ্নিত করেছে, এটি তার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন:
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ إِنْ كُنْتَى تُرِدْنَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ امَتِّعْكُن وَأَسْرِحْكُن سَرَامًا جَمِيلاه وإِن كُنتَى تُرِدْنَ اللهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللَّهَ اعَدَّ لِلْمُحْسَنَتِ مِنْكُنْ أَجْرًا عَظِيمَانِ
অর্থ: হে নবী, তোমার স্ত্রীদের বলো : তোমরা যদি ইহকালীন জীবন ও তার সৌন্দর্য চাও, তাহলে এসো, আমি তোমাদের ভোগের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দেই এবং তোমাদেরকে ভালোভাবে বিদায় করে দিই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখেরাতকে চাও, তাহলে আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা সৎ কর্মশীল, তাদের জন্য বিপুল প্রতিদান নির্ধারণ করে রেখেছেন। (আল আহযাব : আয়াত ২৮-২৯)
এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রসূল (সা) আয়েশার নিকট গেলেন এবং বললেন, "আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার রসূলের মুখ দিয়ে তোমার নিকট একটি বিষয় উল্লেখ করছি। কাজেই তুমি এ ব্যাপারে তোমার পিতামাতার অনুমতি না নিয়ে তাড়াহুড়ো করোনা।" আয়েশা (রা) বললেন, হে রসূলুল্লাহ! সে বিষয়টি কি? তখন রসূলুল্লাহ সা. আয়াত দুটি পড়ে শুনালেন। আয়েশা রা. বললেন : হে রসূলুল্লাহ, আপনার সম্পর্কে আমি আমার পিতামাতার অনুমতি নেব? বরঞ্চ আমি আল্লাহ, তাঁর রসূল ও আখেরাতকে চাই। আর আমার অনুরোধ, আপনি আমাকে যা বললেন, তা আপনার আর কোনো স্ত্রীকে বলবেন না।” রসূলুল্লাহ সা. বললেন, "তুমি আমাকে এ অনুরোধ করোনা। আমি তাদের প্রত্যেককে এটা জানাবোই।" এরপর রসূল সা.-এর সকল স্ত্রী আয়েশার মতোই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। তাদের প্রত্যেকেই আল্লাহ তার রসূল ও পরকালকে প্রাধান্য দিলেন।"
বুখারি মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন, আয়েশা রা. বলেছেন, "রসূলুল্লাহ সা. আমাদেরকে স্বাধীন ক্ষমতা দিয়েছিলেন, তারপর আমরা তাকেই গ্রহণ করেছিলাম। তাই তিনি এতে কিছু মনে করেননি। মুসলিমের বর্ণনা হলো, রসূলুল্লাহ সা. তার স্ত্রীদেরকে স্বাধীন ক্ষমতা দিয়েছিলেন। এতে তালাক হয়নি।" এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, তারা যদি নিজেদেরকে স্বাধীন বলে গ্রহণ করতেন, তাহলে সেটা তালাকে পর্যবসিত হতো এবং এ শব্দটা তালাক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
যাহেরি মাযহাবের অভিমত হলো, রসূলের স্ত্রীগণ যদি নিজেদেরকে স্বাধীন বলে গ্রহণ করতেন, তাহলে রসূল সা. তাদেরকে তালাক দিয়ে দিতেন। নিছক তাদের নিজেদেরকে স্বাধীন বলে গ্রহণ করাতেই তালাক হয়ে যেত না।
যাহেরি ফকিহগণ ব্যতিত অন্য কোনো ফকিহ এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করেননি। এখন স্ত্রী যদি স্বাধীন ক্ষমতা পাওয়ার পর নিজেকে স্বাধীন বলে গ্রহণ করে তাহলে কী হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, একটা রজয়ি তালাক হবে। উমর, ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, উমর বিন আব্দুল আযীয, ইবনে আবি লায়লা, সুফিয়ান, শাফেয়ি, আহমদ ও ইসহাকের মতও অনুরূপ। আর আলী রা. ও হানাফি মাযহাবের মতানুসারে একটা বায়েন তালাক সংঘটিত হবে। আর মালেক বিন আনাসের মতে, স্ত্রী যদি নিজেকে স্বাধীন বলে গ্রহণ করে তাহলে তিন তালাক, আর স্বামীকে গ্রহণ করলে এক তালাক সংঘটিত হবে। হানাফিগণ অবশ্য শর্ত আরোপ করেন যে, যদি তাকে বলা হয়, "তুমি নিজেকে স্বাধীন মনে করো", তবে এর জবাবে তাকে নিজের কথা উল্লেখ করে বলতে হবে যে, নিজেকে স্বাধীন হিসেবে গ্রহণ করলাম বা নিজের ভবিষ্যৎ নিজে বেছে নিলাম বা নিজের পথ নিজেই গ্রহণ করলাম বলতে হবে। শুধু যদি বলে, স্বাধীন মনে করলাম, বা বেছে নিলাম তবে তাতে কিছুই কার্যকর হবেনা। কথাটা সম্পূর্ণ বাতিল ও নিরর্থক হয়ে যাবে।
📄 “তোমার কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা তোমার হাতে”
“তোমার কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা তোমার হাতে”:
অর্থাৎ তোমাকে তালাক দেয়া বা না দেয়ার যে ক্ষমতা আমার হাতে রয়েছে, তা তোমাকে দিলাম। স্বামী একথা বলার পর যদি স্ত্রী নিজেকে তালাক দেয়, তবে উমর রা. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সুফিয়ান, শাফেয়ি ও আহমদের মতানুসারে এক তালাক পড়বে। বর্ণিত আছে, ইবনে মাসউদের নিকট এক ব্যক্তি এসে বললো, আমার ও আমার স্ত্রীর মাঝে এমন কিছু অপ্রীতিকর ব্যাপার হয়েছে, যেমন অনেকের মধ্যেই হয়ে থাকে। তখন সে বললো, আমার ব্যাপারে যে ক্ষমতা তোমার হাতে রয়েছে (অর্থাৎ তালাক সংক্রান্ত) তা যদি আমার হতে থাকতো, তাহলে তা কিভাবে কাজে লাগাতে হয়, আমার জানা আছে। সে বললো, তোমার ব্যাপারে যে ক্ষমতা আমার হাতে রয়েছে, তা তোমাকে অর্পণ করলাম। তৎক্ষণাত সে বললো, তাহলে তোমার উপর তিন তালাক। ইবনে মাসউদ রা. তাকে বললেন, আমার তো মনে হয় এক তালাক হয়েছে। তবে সে যতোক্ষণ ইদ্দতের মধ্যে রয়েছে, ততোক্ষণ তার উপর তোমার অগ্রাধিকার রয়েছে। আমি শীঘ্র আমীরুল মুমিনীন উমর রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করবো।
অতপর তিনি উমর রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করে পুরো ঘটনা জানালেন। উমর রা. বললেন, আল্লাহ পুরুষদের ক্ষমতা প্রদান করেছেন। তিনি তাদের হাতে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তা তারা স্ত্রীদের হাতে হস্তান্তর করে। তুমি এ ব্যাপারে কি বলেছ? আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বললেন, আমার মনে হয়, একটা তালাক হয়েছে এবং স্বামীর এখনো তার স্ত্রীর উপর অগ্রাধিকার রয়েছে। উমর রা. বললেন, আমিও তদ্রূপ মনে করি। তুমি যদি অন্য কিছু বলতে, তাহলে আমি বুঝতাম, তুমি সঠিক বলনি। হানাফিদের মতে, এক্ষেত্রে একটি বায়েন তালাক পড়বে। কেননা স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর নিকট ক্ষমতা অর্পণের দাবি হলো, স্ত্রীর উপর থেকে তার ক্ষমতার অবসান। আর স্ত্রী যখন স্বাধীন ক্ষমতা বলে এই ক্ষমতা গ্রহণ করেছে, তখন তার উপর থেকে এই ক্ষমতার অবসান ঘটা অনিবার্য। আর রজয়ি তালাক হলে তা সম্ভব হয়না।