📄 মুখ্যপয্যায়ে থেকে দেয়া তালাক
মুখ্যপয্যায়ে থেকে দেয়া তালাক:
কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, মৃত্যুশয্যা থেকে তালাক দেয়া হলে তার ফল কি হবে? তবে সাহাবিগণ থেকে জানা যায় যে, আব্দুর রহমান বিন আওফ রা. যে রোগে মারা গিয়েছিলেন সেই রোগশয্যা থেকে তার স্ত্রী 'তামাযার'কে তালাক দিয়েছিলেন। সে তালাক ছিলো তৃতীয় তালাক। উসমান রা. তার সেই স্ত্রীকে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে উত্তরাধিকার প্রদান করেছিলেন। উসমান রা. বললেন, "আমি আব্দুর রহমানকে অভিযুক্ত করছিনা যে, সে তার স্ত্রীকে নিজের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চেয়েছে। আমি শুধু সুন্নত অনুসরণ করতে চেয়েছি।” শোনা যায়, ইবনে আওফ নিজেও বলেছিলেন, আমি তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা বা বঞ্চিত করার জন্য তালাক দেইনি। অর্থাৎ স্ত্রীর উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকার তিনি অস্বীকার করেননি।
স্বয়ং উসমান রা.-এর জীবনেও এরূপ ঘটনা ঘটেছে যে, তিনি যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা নিজ বাড়িতে ঘেরাও হয়ে পড়েন, তখন তার স্ত্রী উম্মুল বানীনকে তালাক দেন। পরে যখন উসমান ঐ অবস্থায় শহীদ হলেন, তখন উম্মুল বানীন আলীর নিকট গেলেন এবং সব খবর অবহিত করলেন। আলী রা. তাকে তার উত্তরাধিকার প্রদান করলেন এবং বললেন, উসমান তার স্ত্রীকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখেছিলেন। তারপর যখন মৃতুর নিকটবর্তী হলেন, তখন তার সাথে সম্পর্ক ছেদ করলেন। এ কারণে ফকিহগণ যে রোগে কারো মৃত্যু হয় সেই রোগে আক্রান্ত থাকাকালে তালাক দিলে কি হবে সে সম্পর্কে বিভিন্ন রকমের মতামত দিয়েছেন। হানাফিগণ বলেছেন, কোনো রোগাক্রান্ত ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে বায়েন তালাক দেয়, অতপর সেই রোগে সে মারা যায়, তবে সে মহিলা তার উত্তরাধিকার পাবে। যদি ইদ্দত শেষ হওয়ার পর মারা যায় তাহলে স্ত্রী উত্তরাধিকার পাবেনা। একই বিধান কার্যকর হবে, যে কারো সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, অথবা কিসাস বা রজমের দায়ে যাকে হত্যার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় নেয়া হয়েছে, সে যদি ঐ কারণে মারা যায় বা নিহত হয়। আর যদি স্ত্রীর অনুরোধেই তাকে তিন তালাক দেয়, কিংবা তাকে বলে, তুমি যা ইচ্ছা করতে পারো। এরপর স্ত্রী নিজেকে বিবাহের বন্ধন থেকে মুক্ত করে বা খুলা তালাক নেয়, তারপর স্ত্রী ইদ্দতে থাকাকালে স্বামী মারা যায়, তাহলে স্ত্রী স্বামীর উত্তরাধিকার পাবেনা। উল্লিখিত দুটি অবস্থার মধ্যে পার্থক্য এই যে, প্রথম অবস্থায় রোগীর পক্ষ থেকেই তালাক দেয়া হয়েছে, এবং সে সময় রোগী সচেতন যে, সে তাকে তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যেই তালাক দিয়েছে। তাই সে নিজের ইচ্ছার পরিপন্থি কাজ করে এবং স্ত্রীর জন্য তার উত্তরাধিকার নিশ্চিত করে। বস্তুত এ কারনেই এ তালাককে বঞ্চনার তালাক বলা হয়। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় অবস্থায় যে তালাক দেয়া হয় তাতে কোনো বঞ্চনার সুযোগ নেই। কেননা স্ত্রী নিজেই এজন্য অনুরোধ করেছে এবং স্বাধীনভাবে গ্রহণ করেছে। অনুরূপ, যে ব্যক্তি আটক বা অবরুদ্ধ থাকে, কিংবা সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত থাকে এবং সেই অবস্থায় নিজ স্ত্রীকে বায়েন তালাক দেয়, তার বিধানও তদ্রূপ। আহমদ ও ইবনে আবি লায়লা বলেন, ইদ্দতের পর অন্য কোনো স্বামীকে বিয়ে না করা পর্যন্ত সে উত্তরাধিকার পাবে। মালেক ও লায়েস বলেন, ইদ্দতে থাক বা না থাক এবং অন্য পতিকে বিয়ে করুক বা না করুক, সে উত্তরাধিকার পাবে। শাফেয়ি বলেন, উত্তরাধিকার পাবেনা।
'বিদায়াতুল মুজাতাহিদ' গ্রন্থে বলা হয়েছে, স্ত্রীর ক্ষতি সাধনের পথ বন্ধ করা ওয়াজিব কিনা, এ ব্যাপারে মতভেদের কারনেই মতের এই বিভিন্নতা। কেননা যখন রোগীকে অভিযুক্ত করা হয় যে সে নিজের রোগাবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছেই তাকে তার উত্তরাধিকারের অংশ থেকে বঞ্চিত করার জন্য, তখন যারা স্ত্রীর ক্ষতি সাধনের পথ বন্ধ করা ওয়াজিব মনে করেন, তাদের মতে স্ত্রী উত্তরাধিকার পাবে। আর যারা মনে করেন, ক্ষতি সাধনের পথ বন্ধ করা ওয়াজিব নয়, তারা স্ত্রীর জন্য উত্তরাধিকার প্রাপ্য মনে করেননা। কেননা এই গোষ্ঠীটির মত হলো:
তালাক যদি সংঘটিত হয়েই থাকে, তাহলে তা তার সকল বিধিবিধান সহকারেই সংঘটিত হবে। কেননা তারা বলেন, স্ত্রী মারা গেলে স্বামী তার উত্তরাধিকারী হয়না। আর যদি তালাক সংঘটিত না হয়ে থাকে, তাহলে তো দাম্পত্য বন্ধন তার যাবতীয় বিধি-বিধানসহ অক্ষুণ্ণই রয়েছে।
তাদের প্রতিপক্ষকে দুইটি উত্তরের যে কোনো একটি বেছে নিতে হবে। কেননা এমন কথা বলা অত্যন্ত কঠিন যে, শরিয়তে এমন তালাকেরও সুযোগ রয়েছে, যাতে তালাকের কিছু বিধান এবং দাম্পত্য সম্পর্কের কিছু বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর চেয়েও কঠিন হলো, শুদ্ধ ও অশুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য আছে একথা বলা। কেননা এটা এমন তালাক হবে যার বিধান ততক্ষণ পর্যন্ত জানাই যাবেনা যতক্ষণ তা শুদ্ধ না অশুদ্ধ, তা স্পষ্ট হবে।
শরীয়তে এ ধরনের কোনো বক্তব্যই দেয়ার অবকাশ নেই। অবশ্য যারা বলেন, ইদ্দতকালে স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী তার উত্তরাধিকার পাবে। তারা একথা বলেন, এজন্য যে, ইদ্দত তাদের নিকট দাম্পত্য জীবনের অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে এটিকে তারা রজয়ি তালাকের মতো মনে করেন এবং উমর রা. ও আয়েশা রা.-এর অভিমতও এরূপ বলে বর্ণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে যারা স্ত্রীকে উত্তরাধিকার দেয়ার জন্য ইদ্দতের পর অন্য স্বামীকে বিয়ে না করার শর্ত আরোপ করেছেন, তাদের এরূপ শর্ত আরোপের কারণ হলো, একজন মহিলার দুজন স্বামীর উত্তরাধিকারী হওয়া বৈধ নয় এ ব্যাপারে মুসলমানদের ইজমা রয়েছে। এর আরো একটা কারণ হলো, যারা উত্তরাধিকারের পক্ষে মত দিয়েছেন, তারা অভিযোগকেই এর কারণ বলে আখ্যায়িত করেছেন, কিন্তু স্ত্রী স্বয়ং যখন তালাকের দাবি জানায় অথবা স্বামী তাকে নিজের উপর তালাক কার্যকর করার ক্ষমতা প্রদান করে এবং তদানুযায়ী সে নিজের উপর তালাক কার্যকর করে, তখন ফকিহদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। আবু হানিফা বলেন, স্ত্রী এক্ষেত্রে আদৌ কোনো উত্তরাধিকার পাবেনা। আওযায়ী তালাক দেয়া ও তালাকের ক্ষমতা অর্জনে পার্থক্য করেছেন। তার মতে, ক্ষমতা প্রদানের ক্ষেত্রে স্ত্রী উত্তরাধিকার পাবেনা, কিন্তু তালাকের ক্ষেত্রে পাবে। ইমাম মালেকের নিকট তালাক ও তালাকের ক্ষমতা প্রদান উভয় ক্ষেত্রে একই বিধান। তবে তিনি বলেন, স্ত্রী মারা গেলে স্বামী তার উত্তরাধিকার পাবেনা, কিন্তু স্বামী মারা গেলে স্ত্রী তার উত্তরাধিকার পাবে। কিন্তু এটা শরিয়তের মূলনীতির পরিপন্থি। (বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ২/৮৬-৮৭)
ইবনে হাযম বলেন, "রোগী কর্তৃক তালাক প্রদান সুস্থ লোকের তালাক প্রদানের মতোই, চাই সেই রোগে তার মৃত্যু হোক বা না হোক। রোগীর দেয়া তালাক যদি তিন তালাক হয় কিংবা তিন তালাকের শেষ তালাক হয়, কিংবা সহবাসের পূর্বে দেয়া তালাক হয়, অতপর ইদ্দত শেষ হওয়ার পরে বা আগে দু'জনের একজন মারা যায়, অথবা যদি রজয়ি তালাক হয় এবং তা আর প্রত্যাহৃত না হয়, শেষ পর্যন্ত দু'জনের একজন ইদ্দত শেষে মারা যায়, তাহলে এসব ক্ষেত্রে স্ত্রীও স্বামীর কোনো উত্তরাধিকার পাবেনা, স্বামীও স্ত্রীর উত্তরাধিকার পাবেনা। সুস্থ স্বামী কর্তৃক রুগ্ন স্ত্রীকে এবং রুগ্ন স্বামী কর্তৃক রুগ্ন স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ক্ষেত্রে একই বিধান। দুটিতে কোনোই পার্থক্য নেই। অনুরূপ যাকে হত্যার জন্য আটকে রাখা হয়েছে তার দেয়া তালাক এবং গর্ভবতীকে দেয়া তালাকও একই পর্যায়ের। তবে এক্ষেত্রে ফকিহদের যথেষ্ট মতভেদ হয়েছে। (আল মুহাল্লা, ১০/২২৩)
📄 স্ত্রীকে বা অন্য কাউকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান
স্ত্রীকে বা অন্য কাউকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান:
তালাক স্বামীর একটা অধিকার। সে ইচ্ছে করলে নিজেও স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে, স্ত্রীকেও নিজের উপর তালাক কার্যকর করার ক্ষমতা দিতে পারে। তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকেও তালাক দেয়ার জন্য প্রতিনিধি নিযুক্ত করতে পারে। এই দুটি কাজের যেটিই সে করুক, স্ত্রীকে বা অন্য কাউকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করুক, তা তার নিজের ক্ষমতাকে কিছুমাত্র খর্ব করে না এবং যখন ইচ্ছা তা প্রয়োগে বাধা দেয়না। যাহেরি মাযহাব এ মতের বিরোধী। তাদের মতে, স্ত্রীকে বা অন্য কাউকে তালাকের ক্ষমতা দেয়া স্বামীর জন্য বৈধ নয়। ইবনে হাযম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিজের উপর তালাক কার্যকর করার ক্ষমতা অর্পণ করে, ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার ক্ষমতা প্রয়োগ করলে তা বাধ্যতামূলকভাবে প্রযোজ্য হবেনা এবং স্ত্রীর উপর তালাক কার্যকর হবেনা, চাই সে নিজেকে তালাক দিক বা না দিক। কেননা আল্লাহ তালাক দেয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন পুরুষদের স্ত্রীদেরকে নয়।
📄 স্বামীর নিয়ত বিবেচ্য, না স্ত্রীর নিয়ত?
স্বামীর নিয়ত বিবেচ্য, না স্ত্রীর নিয়ত?:
ইমাম শাফেয়ির মতে, স্বামীর নিয়ত বিবেচ্য, সে যদি এক তালাক নিয়ত করে, তাহলে এক তালাক পড়বে, আর তিন তালাক নিয়ত করলে তিন তালাক পড়বে। এমনকি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ব্যাপারে বা তালাকের সংখ্যার ব্যাপারে আপত্তি জানাতে পারে, ক্ষমতা অর্পণের ক্ষেত্রে। অন্যেরা বলেন, স্ত্রী এক তালাকের চেয়ে বেশি নিয়ত করলে যা নিয়ত করবে, তা পড়বে। কেননা সে সুস্পষ্ট ঘোষণা বলে তিন তালাকের অধিকারী। তাই স্বামীর মতোই ইঙ্গিত দ্বারাও সে তিন তালাকের অধিকারী হবে। এরপর স্ত্রী যদি নিজেকে তিন তালাক দেয়, আর স্বামী বলে যে, আমি ওকে এক তালাকের বেশির ক্ষমতা দেইনি, তবে স্বামীর কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হবেনা। স্ত্রী যা বলবে, সেই অনুসারেই বিচার ফায়সালা হবে। এটা উসমান, ইবনে উমর ও ইবনে আব্বাসের অভিমত। উমর রা. ও ইবনে মাসউদ রা. বলেন, এক তালাক পড়বে।
📄 স্ত্রীর হাতে তালাকের ক্ষমতা অর্পণের কার্যকারিতা তাৎক্ষণিক কিনা?
স্ত্রীর হাতে তালাকের ক্ষমতা অর্পণের কার্যকারিতা তাৎক্ষণিক কিনা?:
ইবনে কুদামা আল মুগনিতে বলেন, স্ত্রীকে যখন তালাকের ক্ষমতা দেয়া হয়, তখন তা তার হাতে স্থায়ীভাবে থাকবে, তাৎক্ষণিকভাবে নয়। এটা আলী, আবু ছাওর, ইবনুল মুনযির ও আল হাকামের মত। মালেক, শাফেয়ি ও আসহাব উর রায়' বলেন, এটা তাৎক্ষণিক এবং যে মজলিসে বসে ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে, সেই মজলিসের মধ্যেই সীমিত। স্বামী থেকে পৃথক হওয়ার পর সে নিজেকে তালাক দিতে পারবেনা। কেননা তাকে 'তুমি নিজেকে স্বাধীন বিবেচনা করো' এই কথা বলার মাধ্যমে তাকে তালাক গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। সুতরাং যে মজলিসে এই ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে, সেই মজলিসেই এর কার্যকারিতা সীমাবদ্ধ থাকবে।
কিন্তু প্রথমোক্ত উক্তি অগ্রগণ্য। কেননা এক ব্যক্তি যখন তার স্ত্রীকে এই ক্ষমতা অর্পণ করলো, তখন আলী রা. বললেন, স্ত্রী যতোক্ষণ এ ক্ষমতা বর্জন না করবে, ততোক্ষণ তা তার হাতে থাকবে। কোনো সাহাবি এই মতের বিপক্ষে বলে জানা যায় না। তাই ধরে নেয়া যায় এটা একটা সর্বসম্মত মত। তাছাড়া যেহেতু এটা এক ধরনের প্রতিনিধি নিয়োগ, তাই এটা স্থায়ীভাবে চালু থাকারই কথা। যেমন কোনো অজানা অচেনা লোককে এ ক্ষমতা দিলে তাও স্থায়ী হয়ে থাকে, তাৎক্ষণিক নয়।