📄 যাদের মতে বিদয়াতি তালাক কার্যকর হয় না
যাদের মতে বিদয়াতি তালাক কার্যকর হয় না:
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা., সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব এবং ইবনে আব্বাসের শিষ্যদের মধ্য থেকে তাউস, খাল্লাস বিন উমর, আবু কুলাবা, হাম্বলি ইমাম ইবনে আকীল, আহলে বাইয়াতের ইমামগণ, যাহেরি মাযহাব, ইমাম আহমদের মাযহাবের একটি অংশ ও ইবনে তাইমিয়ার মত হলো, বেদয়াতি তালাক কার্যকর হয়না।
📄 গর্ভবতীর তালাক
গর্ভবতীর তালাক:
গর্ভবতীকে যখন ইচ্ছা তালাক দেয়া বৈধ। কেননা মুসলিম, নাসায়ী, আবু দাউদ ও ইবনে মাজায় বর্ণিত, ইবনে উমর রা. তার জনৈকা স্ত্রীকে ঋতুবতী অবস্থায় তালাক দিলেন। বিষয়টি উমর রা. রসূল সা.কে জানালে তিনি বললেন, তাকে তালাক প্রত্যাহার করতে আদেশ দাও। পরে সে যখন পবিত্র হবে কিংবা গর্ভবতী হবে, তখন তালাক দেবে। হানাফি আলেমগণ ব্যতীত অন্য সকল আলেমের মত এটাই। ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ বলেন, দুই তালাক দেয়ার মাঝখানে এক মাসের ব্যবধান রাখা জরুরি, যাতে তিন তালাক পূর্ণ হয়। মুহাম্মদ ও যুফার বলেন, গর্ভবতীর উপর একটার বেশি তালাক দেয়া যাবেনা। এক তালাক দিয়ে তাকে সন্তান প্রসব পর্যন্ত অবকাশ দিতে হবে। তারপর বাদ বাকি তালাক দিতে হবে।
📄 রজয়ী তালাকের বিধান
রজয়ী তালাকের বিধান :
রজয়ি তালাক স্ত্রীর সাথে যৌন সংগমে বাধা দেয়না। কেননা ওটা বিয়ের বন্ধনকে ছিন্ন করেনা। স্ত্রীর ওপর স্বামীর দাম্পত্য অধিকার ক্ষুণ্ণ করেনা এবং তার বৈধতাকে ব্যাহত করেনা। এটা যদিও বিচ্ছেদের একটা কারণ, কিন্তু তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ইদ্দতকালে এর কোনো কার্যকারিতা থাকেনা। তালাক প্রত্যাহার না করলে ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পরই তা কার্যকর হয়। যতক্ষণ ইদ্দত অব্যাহত থাকবে, স্ত্রীর খোরপোষ দিতে স্বামী বাধ্য থাকবে, সে তালাক দিলে তা কার্যকর হবে। একইভাবে কার্যকর হবে যেহার ও ইলা এবং এই সময়ে দুজনের কোনো একজন মারা গেলে অপরজন তার উত্তিরাধিকারী হবে। আর মৃত্যু ও তালাক এই দুটোর যে কোনো একটি পর্যন্ত যে মহরেরর মেয়াদ নির্দিষ্ট রয়েছে, সেই মোহর রজয়ি তালাক দ্বারা প্রাপ্য হয়না। কেবল ইদ্দত শেষ হওয়ার পর অবশিষ্ট মোহর প্রাপ্য হয়। তালাক প্রত্যাহারের অধিকার সমগ্র ইদ্দতব্যাপী একচ্ছত্রভাবে স্বামীর। এ অধিকার শরিয়ত স্বয়ং তাকে দিয়েছে। সে নিজে এ অধিকার রহিত করলে রহিত হবেনা। সে যদি বলেও আমি তালাক প্রত্যাহারের অধিকার রহিত করলাম। তবুও তার এ বক্তব্য প্রত্যাহার ও স্ত্রীর তালাক প্রত্যাহারের অধিকার থাকবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন,
তাদের স্বামীরা তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকার রাখে। আর তালাক প্রত্যাহার করা যখন স্বামীর অধিকার, তখন এতে স্ত্রীর সম্মতি ও অবগতি শর্ত নয়। এজন্য কোনো অভিভাবক ও সাক্ষী রাখারও প্রয়োজন নেই। অবশ্য সাক্ষী রাখা মুস্তাহাব। কেননা পরবর্তীকালে স্বামীর তালাক প্রত্যাহারের কথা অস্বীকার করার আশংকা থাকে। আল্লাহ বলেন, "তোমরা দু'জন ন্যায়পরায়ন লোককে সাক্ষী রাখো।" তালাক প্রত্যাহার কথা দ্বারাও বৈধ, যেমন 'আমি তোমাকে দেয়া তালাক প্রত্যাহার করলাম' বলা। আবার কাজ দ্বারাও প্রত্যাহার করা বৈধ, যেমন সহবাস, বা তার ভূমিকাসমূহ যথা চুম্বন ও কামাবেগ সহকারে আলিঙ্গন ইত্যাদি। ইমাম শাফেয়ির মতে, শুধুমাত্র সুস্পষ্ট কথা দ্বারাই তালাক প্রত্যাহার করা বৈধ। সহবাস বা প্রাগ-সহবাস, চুম্বন ও আলিঙ্গন ইত্যাকার কার্যকলাপ দ্বারা নয়। তারমতে তালাক মাত্রই বিয়ের অবসান ঘটায়।
ইবনে হাযম রহ. বলেছেন, স্বামী যদি সহবাস করে, তবে তা দ্বারা সে তালাক প্রত্যাহারকারী হবেনা, যতক্ষণ না দুজন সাক্ষীর সামনে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় এবং স্ত্রীকে তার ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে না জানায়। সাক্ষীর সামনে প্রত্যাহারের ঘোষণা না দিলে প্রত্যাহারকারী হবেনা। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بمعروف أو فَارِقُومن بمعروف وأَشْهِدُوا ذَوَى عَدْلٍ مِنْكُمْ .
"তারপর যখন স্ত্রীরা ইদ্দত সমাপ্ত করবে, তখন তাদেরকে হয় সুন্দরভাবে বহাল রাখো, নতুবা সদয়ভাবে বিদায় করো এবং তোমাদের মধ্য হতে দু'জন ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখো।” দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তালাক দেয়া, তালাক প্রত্যাহার করা ও সাক্ষী রাখার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। কাজেই এর একটিকে অপরটি থেকে আলাদা করা বৈধ হবেনা। তাই যে ব্যক্তি দু'জন ন্যায়পরায়নব্যক্তিকে সাক্ষী না রেখে তালাক দেবে, অথবা দুজন ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিকে সাক্ষী না রেখে তালাক প্রত্যাহার করবে, সে আল্লাহর বিধান লংঘনকারী হবে। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে, যা আমাদের বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, বায়হাকি ও তাবরানি ইমরান বিন হুসাইন থেকে বর্ণনা করেছেন:
"তাকে (ইমরান বিন হুসাইন রা.কে) সেই ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, যে তার স্ত্রীকে তালাক দেয়, তারপর তার সাথে সহবাস করে, অথচ তালাক ও তালাক প্রত্যাহারের উপর কাউকেও সাক্ষী রাখেনা। তিনি বললেন, তালাকও হয়েছে সুন্নতের পরিপন্থি। তালাক প্রত্যাহারও হয়েছে সুন্নতের পরিপন্থি। স্ত্রীর তালাকে ও তালাক প্রত্যাহারে সাক্ষী রাখো এবং এমন কাজ পুনরায় করোনা।"
শওকানি বলেছেন, প্রথম যুগের মনীষীগণ যা বলেছেন, সেটাই সঠিক, কেননা ইদ্দত হলো, সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সময়। আর এই পুনর্বিবেচনা কথা ও কাজ উভয়ভাবেই করা যায়। তাছাড়া আল্লাহ যে বলেছেন, "তাদের স্বামীদের স্ত্রীদের ফিরিয়ে আনার অগ্রাধিকার রয়েছে” এবং রসূলুল্লাহ সা. কর্তৃক উমর রা.কে বলা, 'তাকে আদেশ দাও তালাক প্রত্যাহার করুক' দ্বারা স্পষ্টতই বুঝা যায়, কাজ দ্বারাও তালাক প্রত্যাহার করা বৈধ। কেননা রসূল সা. কথা বা কাজকে নির্দিষ্ট করেননি। যিনি নির্দিষ্ট করার দাবি করবেন, তাকে প্রমাণ দর্শাতে হবে। (নাইলুল আওতার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২১৪ পৃ.)
📄 রজয়ী তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীর সাথে স্বামীর সম্পর্ক
রজয়ী তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীর সাথে স্বামীর সম্পর্ক:
আবু হানিফা বলেছেন, রজয়ি তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর পক্ষে স্বামীর জন্য সাজসজ্জা করা, সুগন্ধী লাগানো, তাকে উঁকি দিয়ে দেখা, অলংকার পরা, তার সামনে আঙ্গুল প্রকাশ করা ও চোখে সুর্মা লাগিয়ে তা প্রকাশ করা জায়েয। তবে কাশি দিয়ে বা জুতোর শব্দ করে বা অন্য কোনো কথা বা আচরণ দ্বারা স্ত্রীকে অবহিত না করে তার কাছে যাওয়া স্বামীর জন্য বৈধ নয়। ইমাম শাফেয়ির মতে, রজয়ি তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী তালাকদাতার জন্য সম্পূর্ণরূপে হারাম। ইমাম মালেক বলেন, ঐ স্ত্রীর সাথে নিভৃতে সাক্ষাৎ ও তার কাছে যাওয়া তার অনুমতি ছাড়া জায়েয নেই। তার চুলের দিকেও তাকানো জায়েয নেই। তবে স্ত্রীর সাথে অন্য কেউ থাকলে তার সাথে একত্রে পানাহার জায়েয। কিন্তু পরবর্তীকালে ইমাম মালেক এক সাথে খাওয়া দাওয়াকে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেন।