📄 সুন্নাতি তালাক
সুন্নাতি তালাক:
সুন্নতি তালাক হলো সেই তালাক, যা শরিয়তের নির্দেশিত পন্থায় দেয়া হয়। সহবাসকৃত স্ত্রীকে ঋতু পরবর্তী পবিত্রাবস্থায় সহবাস না করে তালাক দেয়াকে সুন্নতি তালাক বলা হয়। আল্লাহ বলেছেন: الطَّلَاقُ مَرْتَانِ فَإِمْسَاكَ بِمَعْرُوفِ أَوْ تَسْرِيعُ بِإِحْسَانِ . "তালাক দু'বার। এরপর হয় স্ত্রীকে ন্যায়সংগতভাবে বহাল রাখা, নচেত সদাচারের সাথে বিদায় করা।” অর্থাৎ শরিয়তবিহিত তালাক প্রথমে একবার দেয়া হবে, যার পর তা প্রত্যাহার করার অবকাশ থাকবে। তারপর দ্বিতীয়বার দেয়া হবে যার পর আবারো প্রত্যাহার করার অবকাশ থাকবে। এরপর তালাকদাতার স্বাধীনতা থাকবে হয় ন্যায়সংগতভাবে বহাল রাখবে, নতুবা সদাচারের সাথে বিদায় করা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: يَا أَيُّهَا النَّبِي إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ “হে নবী, যখন স্ত্রীকে তালাক দাও, তখন ইদ্দতের জন্যে তালাক দাও।” অর্থাৎ তালাক দিতে চাইলে এমন সময়ে দাও, যখন সে ইদ্দতের সম্মুখীন হবে। আর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী ইদ্দতের সম্মুখীন হবে তখনই, যখন সে মাসিক ঋতুস্রাব (হায়েজ) বা প্রসবোত্তর স্রাব (নেফাস) থেকে পবিত্র থাকবে এবং সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হবে।। এর যুক্তি এই যে, ঋতুবতী অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেয়া হলে এ সময়ে সে ইদ্দতের অবশিষ্ট সময় ইদ্দতের মধ্যে গণ্য হয় না। ফলে তার ক্ষতি করা হয়। আর যদি পবিত্রাবস্থায় সহবাস করে তালাক দেয়া হয়, তাহলে স্ত্রী বুঝতে পারে না সে গর্ভবতী হয়েছে কিনা। ফলে সে ইদ্দত কিভাবে গণবে, পবিত্রাবস্থা দ্বারা না সন্তান প্রসব দ্বারা, বুঝতে পারেনা।
নাফে বর্ণনা করেন যে, উমর রা.-এর ছেলে আব্দুল্লাহ রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে তার স্ত্রীকে ঋtতুবতী অবস্থায় তালাক দিলো। উমর রা. এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: "আব্দুল্লাহকে তালাক প্রত্যাহার করতে আদেশ দাও। তারপর পবিত্র হওয়া পর্যন্ত তাকে যেন বহাল রাখে, তারপর সে ঋতুবতী হবে ও পবিত্র হবে। তারপর ইচ্ছা করলে তাকে বহাল রাখবে, নচেত সহবাস করার আগে তালাক দিবে। এটাই হলো সেই ইদ্দত, যা সামনে রেখে স্ত্রীকে তালাক দিতে আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন।” অপর বর্ণনায় বলা হয়েছে রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাকে আদেশ দাও, তালাক প্রত্যাহার করুক। তারপর স্ত্রী পবিত্র হলে কিংবা গর্ভবতী হলে তালাক দিক।" -নাসায়ী, মুসলিম, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ।
এ তালাক থেকে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে ঋতু পরবর্তী পবিত্রাবস্থায় যে তালাক সহবাসের পূর্বে দেয়া হয়, সেটাই সুন্নতি তালাক। এটাই আবু হানিফার মাযহাব এবং এক বর্ণনা অনুযায়ী আহমদ ও শাফেয়ীরও মত। তারা হাদিসের স্পষ্টক্তি দ্বারাই এর প্রমাণ দিয়েছেন। তাছাড়া যেহেতু ঋতুর কারণেই তালাক দিতে নিষেধ করা হয়েছিল, তাই পবিত্র হওয়ার পর আর নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ রইলনা। কাজেই সেই পবিত্রাবস্থায় তালাক দেয়া জায়েয।
📄 বিদয়াতি তালাক
বিদয়াতি তালাক:
বেদয়াতি তালাক হলো শরিয়ত বিরোধী তালাক। যেমন: একবারে তিন তালাক দেয়া। কিংবা একই বৈঠকে তিনবারে তিন তালাক দেয়া যেমন এভাবে বলা, তোমাকে তালাক দিলাম, তোমাকে তালাক দিলাম, তোমাকে তালাক দিলাম। কিংবা হায়েজ বা নেফাস থাকা অবস্থায় বা পবিত্রাবস্থায় সহবাস করার পর তালাক দেয়া। আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে বলেছেন, বেদয়াতি তালাক হারাম এবং কবীরা গুনাহ। অধিকাংশ আলেমের মতে, বেদয়াতি তালাক হারাম হলেও তা কার্যকর হবে। এর প্রমাণ: ১. বেদয়াতি তালাক তালাক সংক্রান্ত সাধারণ আয়াতসমূহের আওতাভুক্ত। ২. ইবনে উমর রা. ঋতুবতী অবস্থায় স্ত্রীকে যে তালাক দিয়েছেন এবং রসূলুল্লাহ সা. যা প্রত্যাহারের জন্য তাকে আদেশ দিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে ইবনে উমর রা. সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ঐ তালাক তালাক হিসেবে গণ্য হয়েছে। তবে ইবনে আলিয়া, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে হাযম, ইবনে কাইয়েমসহ কিছু সংখ্যক আলেম মনে করেন, বেদয়াতি তালাক কার্যকর হয়না এবং একে সাধারণ তালাকের ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কেননা আল্লাহ যে তালাকের অনুমতি দিয়েছেন, এটা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং যে তালাক নিষিদ্ধ করেছেন তার অন্তর্ভুক্ত। আর রসূলূল্লাহ সা. উমর রা. কে বলেছেন, ওকে তালাক প্রত্যাহার করার আদেশ দাও। তাছাড়া একথা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত যে, এ খবর জেনে রসূলূল্লাহ সা. রাগান্বিত হয়েছিলেন। অথচ আল্লাহ যে কাজকে হালাল করেছেন, তা করলে তিনি রাগান্বিত হতে পারেননা। ইবনে উমর রা. যদিও বলেছেন, ঐ তালাক তালাক হিসেবে গণ্য হয়েছে কিন্তু কে গণ্য করেছে, তা তিনি বলেননি।
সারকথা এই যে, সুন্নতি তালাকের পরিপন্থী তালাকই বেদয়াতি তালাক এবং এ ব্যাপারে সকলেই একমত। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, প্রত্যেক বেদয়াতই গোমরাহি। এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, আল্লাহ তাঁর কিতাবে তালাকের যে বিধান দিয়েছেন এবং রসূলুল্লাহ সা. ইবনে উমর রা. বর্ণিত হাদিসে যে পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন, এ তালাক তার পরিপন্থী। বস্তুত আল্লাহ ও তাঁর রসূল প্রদত্ত বিধানের পরিপন্থী সবকিছুই প্রত্যাখ্যানযোগ্য। আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে কাজ আমাদের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে করা হয়না তা প্রত্যাখ্যাত।" এটা বুখারি ও মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদিস। সুতরাং যে ব্যক্তি দাবি করে যে, এই বেদয়াতি তালাকের কার্যকারিতা অপরিহার্য এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর বিধান অনুসারে না হওয়া এই কাজ কার্যকর হবে, তার এ উক্তি বিনা প্রমাণে কার্যকর হবেনা।
📄 যাদের মতে বিদয়াতি তালাক কার্যকর হয় না
যাদের মতে বিদয়াতি তালাক কার্যকর হয় না:
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা., সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব এবং ইবনে আব্বাসের শিষ্যদের মধ্য থেকে তাউস, খাল্লাস বিন উমর, আবু কুলাবা, হাম্বলি ইমাম ইবনে আকীল, আহলে বাইয়াতের ইমামগণ, যাহেরি মাযহাব, ইমাম আহমদের মাযহাবের একটি অংশ ও ইবনে তাইমিয়ার মত হলো, বেদয়াতি তালাক কার্যকর হয়না।
📄 গর্ভবতীর তালাক
গর্ভবতীর তালাক:
গর্ভবতীকে যখন ইচ্ছা তালাক দেয়া বৈধ। কেননা মুসলিম, নাসায়ী, আবু দাউদ ও ইবনে মাজায় বর্ণিত, ইবনে উমর রা. তার জনৈকা স্ত্রীকে ঋতুবতী অবস্থায় তালাক দিলেন। বিষয়টি উমর রা. রসূল সা.কে জানালে তিনি বললেন, তাকে তালাক প্রত্যাহার করতে আদেশ দাও। পরে সে যখন পবিত্র হবে কিংবা গর্ভবতী হবে, তখন তালাক দেবে। হানাফি আলেমগণ ব্যতীত অন্য সকল আলেমের মত এটাই। ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ বলেন, দুই তালাক দেয়ার মাঝখানে এক মাসের ব্যবধান রাখা জরুরি, যাতে তিন তালাক পূর্ণ হয়। মুহাম্মদ ও যুফার বলেন, গর্ভবতীর উপর একটার বেশি তালাক দেয়া যাবেনা। এক তালাক দিয়ে তাকে সন্তান প্রসব পর্যন্ত অবকাশ দিতে হবে। তারপর বাদ বাকি তালাক দিতে হবে।