📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 তালাকের শ্রেণীভেদ

📄 তালাকের শ্রেণীভেদ


তালাকের শ্রেণীভেদ:
যে শব্দ বা ভাষা প্রয়োগ করে তালাক দেয়া হয়, তার আলোকে তালাক তিন শ্রেণীতে বিভক্ত: তাৎক্ষণিক তালাক, শর্ত সাপেক্ষ তালাক, ভবিষ্যতের নিষ্পন্নযোগ্য তালাক। তাৎক্ষণিক তালাক হলো সেই তালাক, যা কোনো শর্ত বা ভবিষ্যতের কোনো সময়ের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং তালাক দাতা তাৎক্ষণিকভাবেই তালাক দিতে ইচ্ছুক। যেমন স্ত্রীকে বলা হলো, তুমি তালাকপ্রাপ্তা বা তোমাকে তালাক দিলাম। এ তালাকের বিধান হলো, তালাকদাতার কাছ থেকে ঘোষিত হওয়া মাত্রই সংঘটিত হবে। শর্ত সাপেক্ষ তালাক হলো, স্বামী থাকে নির্ভরশীল ঘোষণা করে। যেমন স্ত্রীকে বলে, তুমি অমুক জায়গায় গেলে তোমার উপর তালাক সংঘটিত হবে। শর্ত সাপেক্ষ তালাক কার্যকর হওয়া জন্য তিনটে শর্ত পূরণ জরুরি:

১. তালাক এমন জিনিসের উপর নির্ভরশীল হওয়া চাই বর্তমানে যার অস্তিত্ব নেই এবং পরবর্তী সময়ে অস্তিত্ব লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। পক্ষান্তরে তালাক দেয়ার সময় বিদ্যমান কোনো জিনিসের উপর নির্ভরশীল হলে তা হবে তাৎক্ষণিক তালাক যদিও তা শর্ত সাপেক্ষ তালাকের ভঙ্গিতে দেয়া হয়েছে। যেমন: সূর্য উদিত হয়েছে এরূপ অবস্থায় বলা: "সূর্য উঠলে তোমার উপর তালাক কার্যকর হবে।” আর যদি কোনো অসম্ভব জিনিসের শর্তাধীন করে তালাক দেয়া হয়: যথা সূর্যের ছিদ্রের মধ্যে উট প্রবেশ করলে তোমার উপর তালাক সংঘটিত হবে। তাহলে তালাক সম্বলিত উক্তি সম্পূর্ণ বৃথা হবে।

২. তালাকের ঘোষণা হওয়ার সময় স্ত্রী তালাকের যোগ্য হওয়া অর্থাৎ তার বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকা চাই।

৩. শর্তাধীন তালাকের শর্ত পূরণের সময়ও স্ত্রীর অনুরূপ তালাকের যোগ্য থাকা চাই।

শর্তাধীন তালাক দুই প্রকার: ১. যার উদ্দেশ্য হয় স্ত্রীকে কোনো কাজ করতে বা ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করা। যেমন তাকে বলা তুমি যদি বাড়ির বাইরে যাও তাহলে তোমার উপর তালাক পড়বে। এখানে তালাক কার্যকর করার জন্য স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। এটা তালাকের ব্যাপারে কসম খাওয়ার পর্যায়ভুক্ত।

২. শর্ত পূরণ হয়ে গেলে তালাক কার্যকর হওয়া যার উদ্দেশ্য। যেমন স্বামী স্ত্রীকে বলা: "তুমি যদি আমাকে তোমার প্রাপ্য অবশিষ্ট মোহর থেকে অব্যাহতি দাও, তাহলে তোমার উপর তালাক কার্যকর হবে।"

অধিকাংশ আলেমের নিকট এই উভয় প্রকারের তালাক কার্যকর হয়। কিন্তু ইবনে হাযমের মতে, তালাক কার্যকর হয়না। ইবনে কাইয়েম ও ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: শর্তাধীন তালাক যদি এমন হয় যে, তাতে কসমের অর্থ পাওয়া যায়, তাহলে সে তালাক কার্যকর হবেনা। এতে যে জিনিসের উপর কসম খাওয়া হয়, তা পূরণ হলে কসমের কাফফারা দেয়া ওয়াজিব হবে। কাফফারা হলো, দশজন মিসকিনকে খাদ্য বা বস্ত্র দান অথবা তিন দিন রোযা রাখা। কসমের অর্থ যুক্ত না হয়ে শুদ্ধ শর্তযুক্ত হলে শর্ত পূরণ হওয়া মাত্র তালাক কার্যকর হবে।

ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, লোকেরা সাধারণত তালাক দিতে যে সফল শব্দ ব্যবহার করে থাকে তা তিন ধরনের: ১. তাৎক্ষণিক ও শপথবিহীন, যথা: "তোমাকে তালাক দিলাম।" এ দ্বারা তালাক সংঘটিত হয়ে যাবে। এতে কোনো শপথও নেই, তাই সর্বসম্মতভাবে এতে কাফফারা নেই। ২. শপথবোধক শব্দ : যেমন তালাক দিতে আমি বাধ্য, এটা আমি দেবোই।” ৩. শর্তযুক্ত শব্দ যথা: আমার স্ত্রী যদি অমুক কাজ করে, তাহলে তার উপর তালাক কার্যকর হবে। এদ্বারা স্বামী যদি শপথ বুঝায় এবং সে তালাক দেয়া অপছন্দ করে, তাহলে এটা একটা শপথ এবং শপথযুক্ত তালাকের মতোই। এ ব্যাপারে সকল ফকিহ একমত। আর যদি শর্ত বুঝায় তবে শর্ত পূরণ হলে তালাক সংঘটিত হবে। যেমন : "তুমি যদি আমাকে এক হাজার টাকা দাও, তবে তোমার উপর তালাক কার্যকর হবে।" অথবা "তুমি যখন ব্যভিচার করবে, তখন তোমার উপর তালাক পড়বে।" আর একথা দ্বারা ব্যভিচার সংঘটিত হওয়া মাত্রই তালাক সংঘটিত হোক এটা কামনা করে, শুধু শপথ করার ইচ্ছা পোষণ করেনা, তাহলে এটা শপথ নয় এবং এতে কোনো কাফফারাও দিতে হবেনা। তবে এতে শর্ত পূরণ হওয়া মাত্র তালাক কার্যকর হবে। যে সকল শব্দ দ্বারা বক্তা কোনো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে চায়, অথবা বিরত রাখতে চায়, অথবা সমর্থন করতে চায় কিংবা অস্বীকার করতে চায়, তা শপথ সম্বলিত শব্দ হোক বা শুধু শর্তযুক্ত শব্দ হোক, সর্বসম্মতভাবে শপথ গণ্য হবে। আর যদি শপথযুক্ত শব্দ হয়, তবে সেই শপথ প্রযোজ্য হলে কাফফারা দিতে হবে। আর প্রযোজ্য না হলে, যেমন কোনো সৃষ্টির নামে শপথ করা হলে, কাফফারা দিতে হবেনা। আর যদি শপথ প্রযোজ্য হয় কিন্তু কেবল শ্রদ্ধাবোধক হয়, যার কাফফারা হয়না, তবে কুরআনে বা হাদিসে কোথাও তার কোনো বিধান নেই এবং তার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণও নেই।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সুন্নাতি তালাক ও বিদয়াতি তালাক

📄 সুন্নাতি তালাক ও বিদয়াতি তালাক


সুন্নাতি তালাক ও বিদয়াতি তালাক:
সুন্নাহ অনুসরণ করা বা না করার ভিত্তিতে তালাক দু'রকম: সুন্নতি তালাক ও বেদয়াতি তালাক।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সুন্নাতি তালাক

📄 সুন্নাতি তালাক


সুন্নাতি তালাক:
সুন্নতি তালাক হলো সেই তালাক, যা শরিয়তের নির্দেশিত পন্থায় দেয়া হয়। সহবাসকৃত স্ত্রীকে ঋতু পরবর্তী পবিত্রাবস্থায় সহবাস না করে তালাক দেয়াকে সুন্নতি তালাক বলা হয়। আল্লাহ বলেছেন: الطَّلَاقُ مَرْتَانِ فَإِمْسَاكَ بِمَعْرُوفِ أَوْ تَسْرِيعُ بِإِحْسَانِ . "তালাক দু'বার। এরপর হয় স্ত্রীকে ন্যায়সংগতভাবে বহাল রাখা, নচেত সদাচারের সাথে বিদায় করা।” অর্থাৎ শরিয়তবিহিত তালাক প্রথমে একবার দেয়া হবে, যার পর তা প্রত্যাহার করার অবকাশ থাকবে। তারপর দ্বিতীয়বার দেয়া হবে যার পর আবারো প্রত্যাহার করার অবকাশ থাকবে। এরপর তালাকদাতার স্বাধীনতা থাকবে হয় ন্যায়সংগতভাবে বহাল রাখবে, নতুবা সদাচারের সাথে বিদায় করা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: يَا أَيُّهَا النَّبِي إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ “হে নবী, যখন স্ত্রীকে তালাক দাও, তখন ইদ্দতের জন্যে তালাক দাও।” অর্থাৎ তালাক দিতে চাইলে এমন সময়ে দাও, যখন সে ইদ্দতের সম্মুখীন হবে। আর তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী ইদ্দতের সম্মুখীন হবে তখনই, যখন সে মাসিক ঋতুস্রাব (হায়েজ) বা প্রসবোত্তর স্রাব (নেফাস) থেকে পবিত্র থাকবে এবং সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হবে।। এর যুক্তি এই যে, ঋতুবতী অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেয়া হলে এ সময়ে সে ইদ্দতের অবশিষ্ট সময় ইদ্দতের মধ্যে গণ্য হয় না। ফলে তার ক্ষতি করা হয়। আর যদি পবিত্রাবস্থায় সহবাস করে তালাক দেয়া হয়, তাহলে স্ত্রী বুঝতে পারে না সে গর্ভবতী হয়েছে কিনা। ফলে সে ইদ্দত কিভাবে গণবে, পবিত্রাবস্থা দ্বারা না সন্তান প্রসব দ্বারা, বুঝতে পারেনা।

নাফে বর্ণনা করেন যে, উমর রা.-এর ছেলে আব্দুল্লাহ রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে তার স্ত্রীকে ঋtতুবতী অবস্থায় তালাক দিলো। উমর রা. এ সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন: "আব্দুল্লাহকে তালাক প্রত্যাহার করতে আদেশ দাও। তারপর পবিত্র হওয়া পর্যন্ত তাকে যেন বহাল রাখে, তারপর সে ঋতুবতী হবে ও পবিত্র হবে। তারপর ইচ্ছা করলে তাকে বহাল রাখবে, নচেত সহবাস করার আগে তালাক দিবে। এটাই হলো সেই ইদ্দত, যা সামনে রেখে স্ত্রীকে তালাক দিতে আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন।” অপর বর্ণনায় বলা হয়েছে রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাকে আদেশ দাও, তালাক প্রত্যাহার করুক। তারপর স্ত্রী পবিত্র হলে কিংবা গর্ভবতী হলে তালাক দিক।" -নাসায়ী, মুসলিম, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ।

এ তালাক থেকে স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে ঋতু পরবর্তী পবিত্রাবস্থায় যে তালাক সহবাসের পূর্বে দেয়া হয়, সেটাই সুন্নতি তালাক। এটাই আবু হানিফার মাযহাব এবং এক বর্ণনা অনুযায়ী আহমদ ও শাফেয়ীরও মত। তারা হাদিসের স্পষ্টক্তি দ্বারাই এর প্রমাণ দিয়েছেন। তাছাড়া যেহেতু ঋতুর কারণেই তালাক দিতে নিষেধ করা হয়েছিল, তাই পবিত্র হওয়ার পর আর নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ রইলনা। কাজেই সেই পবিত্রাবস্থায় তালাক দেয়া জায়েয।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বিদয়াতি তালাক

📄 বিদয়াতি তালাক


বিদয়াতি তালাক:
বেদয়াতি তালাক হলো শরিয়ত বিরোধী তালাক। যেমন: একবারে তিন তালাক দেয়া। কিংবা একই বৈঠকে তিনবারে তিন তালাক দেয়া যেমন এভাবে বলা, তোমাকে তালাক দিলাম, তোমাকে তালাক দিলাম, তোমাকে তালাক দিলাম। কিংবা হায়েজ বা নেফাস থাকা অবস্থায় বা পবিত্রাবস্থায় সহবাস করার পর তালাক দেয়া। আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে বলেছেন, বেদয়াতি তালাক হারাম এবং কবীরা গুনাহ। অধিকাংশ আলেমের মতে, বেদয়াতি তালাক হারাম হলেও তা কার্যকর হবে। এর প্রমাণ: ১. বেদয়াতি তালাক তালাক সংক্রান্ত সাধারণ আয়াতসমূহের আওতাভুক্ত। ২. ইবনে উমর রা. ঋতুবতী অবস্থায় স্ত্রীকে যে তালাক দিয়েছেন এবং রসূলুল্লাহ সা. যা প্রত্যাহারের জন্য তাকে আদেশ দিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে ইবনে উমর রা. সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ঐ তালাক তালাক হিসেবে গণ্য হয়েছে। তবে ইবনে আলিয়া, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে হাযম, ইবনে কাইয়েমসহ কিছু সংখ্যক আলেম মনে করেন, বেদয়াতি তালাক কার্যকর হয়না এবং একে সাধারণ তালাকের ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কেননা আল্লাহ যে তালাকের অনুমতি দিয়েছেন, এটা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং যে তালাক নিষিদ্ধ করেছেন তার অন্তর্ভুক্ত। আর রসূলূল্লাহ সা. উমর রা. কে বলেছেন, ওকে তালাক প্রত্যাহার করার আদেশ দাও। তাছাড়া একথা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত যে, এ খবর জেনে রসূলূল্লাহ সা. রাগান্বিত হয়েছিলেন। অথচ আল্লাহ যে কাজকে হালাল করেছেন, তা করলে তিনি রাগান্বিত হতে পারেননা। ইবনে উমর রা. যদিও বলেছেন, ঐ তালাক তালাক হিসেবে গণ্য হয়েছে কিন্তু কে গণ্য করেছে, তা তিনি বলেননি।

সারকথা এই যে, সুন্নতি তালাকের পরিপন্থী তালাকই বেদয়াতি তালাক এবং এ ব্যাপারে সকলেই একমত। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, প্রত্যেক বেদয়াতই গোমরাহি। এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, আল্লাহ তাঁর কিতাবে তালাকের যে বিধান দিয়েছেন এবং রসূলুল্লাহ সা. ইবনে উমর রা. বর্ণিত হাদিসে যে পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন, এ তালাক তার পরিপন্থী। বস্তুত আল্লাহ ও তাঁর রসূল প্রদত্ত বিধানের পরিপন্থী সবকিছুই প্রত্যাখ্যানযোগ্য। আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে কাজ আমাদের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে করা হয়না তা প্রত্যাখ্যাত।" এটা বুখারি ও মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদিস। সুতরাং যে ব্যক্তি দাবি করে যে, এই বেদয়াতি তালাকের কার্যকারিতা অপরিহার্য এবং রসূলুল্লাহ সা.-এর বিধান অনুসারে না হওয়া এই কাজ কার্যকর হবে, তার এ উক্তি বিনা প্রমাণে কার্যকর হবেনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00