📄 বোবার ইশারা
বোবার ইশারা:
বোবার জন্য ইশারা হলো মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম। এজন্য তার ইশারা যখন এমন হবে যে, দাম্পত্য সম্পর্কের অবসান বুঝায়, তখন তা তালাক সংঘটিত করার ব্যাপারে কথার স্থলভিষিক্ত হবে। ফকিহগণ এজন্য শর্ত আরোপ করেছেন যে, বোবার ইশারা দ্বারা তালাক সংঘটিত করার জন্য তার লিখতে সক্ষম না হওয়া চাই, লিখতে পারলে ইশারা যথেষ্ট হবেনা। কেননা লিখিত বক্তব্য মনের ভাবকে অধিকতর স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে। তাই লিখতে অক্ষম হওয়া ব্যতীত ইশারা গ্রহণযোগ্য নয়।
📄 দূত পাঠানো
দূত পাঠানো:
অনুপস্থিত স্ত্রীকে তালাক দেয়া হয়েছে জানানোর জন্য দূত মারফত তালাক পাঠানো বৈধ। এরূপ পরিস্থিতিতে দূত তালাকদাতার প্রতিনিধি হবে এবং তার তালাক কার্যকর করবে।
📄 তালাকের সাক্ষী রাখা
তালাকের সাক্ষী রাখা:
প্রাচীন ও সাম্প্রতিককালের অধিকাংশ ফকিহর মতে, তালাক সাক্ষী না রাখলেও কার্যকর হয়। কেননা তালাক স্বামীর অধিকার। এ অধিকার ভোগ করার জন্য তার কোনো সাক্ষীর প্রয়োজন নেই। বস্তুত সাক্ষীর প্রয়োজনীয়তা সাব্যস্ত করে এমন কোনো প্রমাণ রসূল সা. বা সাহাবীগণ থেকে পাওয়া যায়না। তালাক যে স্বামীর একচ্ছত্র অধিকার এবং এতে অন্য কারো কোনো অংশীদারি নেই, তার প্রমাণ নিম্নোক্ত দুটি আয়াত:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْ فَارِقُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ “হে মুমিনগণ, তোমরা যখন মুমিন নারীদেরকে বিয়ে করবে, তারপর তালাক দেবে।" এবং “যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দেবে এবং তারা তাদের ইদ্দুত সমাপ্ত করবে, তখন হয় তাদেরকে ন্যায় সঙ্গতভাবে বহাল রাখো, অথবা ভালোয় ভালোয় বিদায় করে দাও।" ইবনুল কাইয়েম বলেছেন, এ থেকে প্রমাণিত যে, আল্লাহ তালাকের ক্ষমতা স্বামীকেই দিয়েছেন। কেননা বহাল রাখার ক্ষমতাও তারই। ইবনে আব্বাস বলেন, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এলো এবং বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমার মনিব আমাকে তার দাসীর সাথে বিয়ে দিয়েছেন, এখন তিনি আমার ও আমার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে চান। এ কথা শুনা মাত্রই রসূলুল্লাহ সা. মিম্বরে আরোহণ করলেন এবং বললেন: “হে জনমণ্ডলি, তোমাদের কারো কারো এ কী দুর্মতি যে, নিজের দাসের সাথে দাসীকে বিয়ে দেয়, তারপর তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতে চায়। তালাক তো তারই নিরংকুশ অধিকার, যে বিয়ে করেছে।” -ইবনে মাজাহ।
📄 তালাকের সাক্ষী রাখাকে যারা জরুরি মনে করেন
তালাকের সাক্ষী রাখাকে যারা জরুরি মনে করেন:
তালাকে সাক্ষী রাখাকে যারা অত্যাবশ্যক বা ওয়াজিব মনে করেন এবং তালাক শুদ্ধ হওয়ার শর্ত হিসেবে অভিহিত করেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন আমিরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবু তালেব, ইমরান বিন হুসাইন, ইমাম বাকের, ইমাম জাফর সাদেক এবং শেষোক্ত এই উভয় ইমামের সন্তান আহলে বাইতের ইমামগণ। এছাড়া আতা, ইবনে জুরাইজ ও ইবনে সিরীন রহ.। জাওয়াহেরুল কালাম গ্রন্থে আলী রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি তাকে তালাক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, দু'জন ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখেছো কি? সে বললো, না। তখন আলী রা. বললেন: যাও, তোমার তালাক নয়। আবু দাউদ ইমরান বিন হুসাইন রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে যখন তখন তালাক দেয়, আবার তার সাথে সহবাস করে, সে তালাকের উপরও কাউকে সাক্ষী রাখেনা, তালাক প্রত্যাহারের উপরও সাক্ষী রাখেনা, তখন তিনি ঐ ব্যক্তিকে বললেন, তুমি তালাকও দিয়েছো রসূল সা.-এর সুন্নাতের বিপরীত পন্থায়, আবার তালাক প্রত্যাহারও করেছ সুন্নতের বিপরীত পন্থায়। তালাক ও তালাক প্রত্যাহারে সাক্ষী রাখো। আর এ যাবত যা করেছ, তা আর করোনা।"
উসূলে ফিকহ শাস্ত্রে এ মূলনীতি উল্লেখিত হয়েছে যে, সাহাবি যখন বলেন, এটা সুন্নত, তখন বুঝতে হবে, তিনি যা বলেছেন, বিশুদ্ধভাবে রসূল সা. থেকে সরাসরি শুনেই বলেছেন। কেননা সাহাবির উক্তি মাত্রই স্পষ্টত রসূল সা.-এর অপরিহার্যভাবে অনুসরণীয় সুন্নতের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাছাড়া সাহাবির উদ্দেশ্য হয়ে থাকে শরিয়তের বিধান বর্ণনা করা, ভাষা বা রীতিপ্রথা ও আদত অভ্যাস বর্ণনা করা নয়। হাফেয সয়ূতী তার তাফসীর গ্রন্থ দূররে মানছুরে নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে:
فَإِذَا بَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَأَمْسِكُوهُنَّ بِمَعْرُوفٍ أَوْفَارِقُوهُنَّ بِمَعْرُوفِ وَأَشْهِدُوا ذَوَى عَدْلٍ مِنْكُمْ .
"অতপর যখন স্ত্রীরা ইদ্দত পূর্ণ করবে, তখন হয় তাদেরকে ন্যায়সঙ্গতকভাবে বহাল রাখো, নচেত ন্যায়সঙ্গতভাবে বিদায় করো এবং তোমাদের মধ্য হতে দু'জন ন্যয়পরায়ন ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখো" ইবনে সিরীন থেকে বর্ণনা করেন : এক ব্যক্তি ইমরান বিন হুসাইনকে জানালো যে, এক লোক কোনো সাক্ষী না রেখে তালাক দিয়েছে। তখন তিনি বললেন, সে খুব খারাপ কাজ করেছে। তার তালাক বিদয়াত এবং তার তালাক প্রত্যাহার সুন্নত বিরোধী। সে যেন তালাকে ও তালাক প্রত্যাহারে সাক্ষী রাখে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়।” সুতরাং ইমরান বিন হুসাইন রা. কর্তৃক সাক্ষী না রেখে তালাক দেয়া ও তালাক প্রত্যাহার করাকে অপছন্দ করা। এ কাজ থেকে সতর্ক করা ও এ কাজকে গুনাহ আখ্যায়িত করে এর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার আদেশ দেয়ার একমাত্র কারণ স্পষ্টত এটাই যে, তিনি সাক্ষী রাখাকে অপরিহার্য মনে করতেন। "আল ওয়াসায়েল" নামক গ্রন্থে রয়েছে, ইমাম বাকের বলেছেন, যে তালাকের বিষয়ে আল্লাহ তার কিতাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং যার পদ্ধতি রসূল সা. শিখিয়েছেন, তা হচ্ছে, স্ত্রী যখন ঋতুবতী হবে এবং ঋতু থেকে পবিত্র হবে, তখন স্বামী তার সঙ্গ ত্যাগ করবে। অতপর সে যখন পবিত্র থাকবে এবং কোনো সহবাসের কারণে অপবিত্র থাকবেনা, তখন দুজন ন্যায়পরায়ন লোককে সাক্ষী রেখে তালাক দিবে। আর এই তালাকের পর তিনবার ঋতু ও ঋতু থেকে পবিত্রতা অর্জন পর্যন্ত তালাক প্রত্যাহারে স্বামীরই অগ্রাধিকার রয়েছে।
এরূপ নিয়ম অনুসরণ ব্যতীত যে তালাক দেয়া হবে, তা বাতিল, তালাক নয়।
জাফর সাদেক বলেছেন, সাক্ষী ব্যতীত যে তালাক দেয়া হয়, তা কোনো তালাকই নয়। সাইয়েদ মুর্তজা 'আল-ইনতিসার' নামক গ্রন্থে বলেন, ইমামীয়া শিয়ারা যে বলেন, দুজন ন্যায়পরায়ন ব্যক্তির সাক্ষী থাকা তালাকের জন্য শর্ত এবং এ শর্ত অপূর্ণ থাকলে তালাক হবেনা, এর প্রমাণ আল্লাহর এই উক্তি : "এবং তোমরা দু'জন ন্যায়পরায়ন ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখো।” স্পষ্টতই এটা সাক্ষী রাখার জন্য আল্লাহর আদেশ। আর শরিয়তের রীতি অনুসারে সুস্পষ্ট আদেশ দ্বারা অপরিহার্য কর্তব্যই বুঝানো হয়। এখন সুস্পষ্ট আদেশ দ্বারা অপরিহার্য কর্তব্য প্রমাণিত হওয়ার পরও তাকে মুস্তাহাব গণ্য করা বিনা প্রমাণে শরিয়তের সুপরিচিত রীতি লঙ্ঘনের নামান্তর। দুররে মানসূরে সয়ূতী আতা থেকে উদ্ধৃত করেছেন, "বিয়েতে সাক্ষী, তালাকে সাক্ষী এবং তালাক প্রত্যাহারেও সাক্ষী অপরিহার্য।”
তবে ইবনে কাসীর তার তাফসীরে আতার উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, ওযর ব্যতীত বিনা সাক্ষীতে বিয়ে, তালাক ও তালাক প্রত্যাহার জায়েয নেই। আমাদের উল্লিখিত উদ্ধৃতি সমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সাক্ষী রাখা অপরিহার্য, এ মতটি শুধু শিয়াদের নয়, বরং আতা, ইবনে জুরাইয ও ইবনে সিরীন সুন্নী ইমামদেরও।