📄 বল প্রয়োগজনিত তালাক
বল প্রয়োগজনিত তালাক:
যার উপর বলপ্রয়োগ করা হয়, তার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও ক্ষমতা থাকেনা, স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতাও থাকেনা। এই দুটো জিনিসই যখন বিলুপ্ত হয়, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আর কোনো ব্যাপারে দায়ী থাকেনা এবং বলপ্রয়োগকৃত ব্যক্তিকে তার কার্যকলাপের জন্য দায়ী গণ্য করা হয়না। কেননা তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিই তো কেড়ে নেয়া হয়েছে। সে প্রকৃতপক্ষে বলপ্রয়োগকারীর ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তকেই কার্যকরী করে। কাজেই যাকে কোনো কুফরিসূচক কথা বলতে বাধ্য করা হয়, সে ঐ কুফরিসূচক কথা বলার কারণে কাফের হবেনা। কেননা আল্লাহ সূরা আন নাহলের ১০৬ নং আয়াতে বলেন:
إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِي بِالْإِيْمَانِ .
"কিন্তু যাকে কুফরিসূচক কথা বলতে বাধ্য করা হয়, অথচ তার মন ঈমানের উপর অবিচল রয়েছে, সে কাফের হবেনা।" ঠিক তেমনি যাকে মুসলমান হতে বাধ্য করা হয়, সে মুসলমান হয়না। আর যাকে তালাক দিতে বাধ্য করা হয়, তার তালাক কার্যকর হয়না। ইবনে মাজাহ, ইবনে হাব্বান, দার কুতনি, তাবরানি ও হাকেম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আমার উম্মতকে যাবতীয় ভুল ত্রুটি (ভুলক্রমে পরিত্যক্ত ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও কৃত কাজগুলো) এবং যেসব কাজে তাদেরকে বাধ্য করা হয়, তা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।" ইমাম মালেক, শাফেয়ী, আহমদ, দাউদ উমর ইবনুল খাত্তাব, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আলি ইবনে আবু তালেব ও ইবনে আব্বাসও অনুরূপ মত পোষণ করেন। ইমাম আবু হানিফা ও তার শিষ্যগণ বলেন, বাধ্য হয়ে তালাক দিলেও তা কার্যকর হবে। তাদের এই মতের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। উপরন্তু অধিকাংশ সাহাবী তাদের এ মতের বিপক্ষে।
📄 মাতালের তালাক
মাতালের তালাক:
অধিকাংশ ফকিহর মতে, মাতালের তালাক কার্যকর হবে। কারণ তার বিবেক যে কারণে বিকল হয়েছে, তা তার ইচ্ছা কৃত। আর একদল ফকিহ বলেন, তার তালাক অর্থহীন এবং তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। কেননা সে ও পাগল একই পর্যায়ের। উভয়ে বিবেক বুদ্ধিহীন। অথচ বিবেক বুদ্ধিই হচ্ছে শরিয়তের দায়দায়িত্ব আরোপের ভিত্তি। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা নিসার ৪৩ নং আয়াতে বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلوةَ وَأَنْتُم سُكرى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ .
অর্থ: হে মুমিনগণ, তোমরা মাতাল অবস্থায় নামাযের ধারে কাছে যেওনা, যতক্ষণ বুঝতে না পারো তোমরা কী বলছো।"
এ আয়াতে আল্লাহ মাতালের কথাবার্তাকে অর্থহীন আখ্যায়িত করেছেন। কেননা সে কী বলছে, তা সে নিজেই জানে না। উসমান রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি মাতালের তালাককে হিসাবে গণ্য করতেননা এবং কোনো সাহাবিই এ ব্যাপারে তার বিরোধিতা করতেননা বলে কেউ কেউ জানান। ইয়াহিয়া বিন সাঈদ, হুমাইদ বিন আব্দুর রহমান, রবিয়া, লাইস, আব্দুল্লাহ ইবনুল হুসাইন, ইসহাক বিন রাহওয়াই, আবু সাওর, শাফেয়ী, মাযানি, আহমদ, যাহেরি মাযহাব, তাহাবি ও কারখির অভিমতও তদ্রূপ। শওকানি বলেছেন, মাতাল যেহেতু অবুঝ, তাই তার তালাক অকার্যকর, কেননা যে জিনিসের ভিত্তিতে কোনো বিধি কার্যকর হয় তা অর্থাৎ বিবেকবুদ্ধি এখানে অনুপস্থিত ও নিষ্ক্রিয়। তবে যেহেতু শরিয়ত তাকে শাস্তি দিয়েছে, তাই আমাদের অধিকার নেই তাকে নিজেদের মত অনুযায়ী অব্যাহতি দেয়ার। আমরা বলবো, শাস্তি হিসেবে তার তালাক কার্যকর হবে। এভাবে তার উপর দুটো শাস্তি বলবত হবে। (একটা মদ খাওয়ার শাস্তি, আর একটা এ অবস্থায় দেয়া তালাক কার্যকর হওয়া।)
📄 ক্রুদ্ধ ব্যক্তির তালাক
ক্রুদ্ধ ব্যক্তির তালাক:
যে ব্যক্তি ক্রোধে এত দিশাহারা হয়ে গেছে যে, সে যা বলে ভেবে বলেনা এবং তার মুখ দিয়ে কী নির্গত হচ্ছে তা সে জানেনা, তার তালাক কার্যকর হবেনা। কেননা সে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি থেকে বঞ্চিত। আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও হাকেম আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “হতবুদ্ধি অবস্থায় তালাক দিলেও তালাক হবেনা, দাস মুক্ত করলেও মুক্ত হবেনা।" এই হতবুদ্ধি অবস্থাকে ক্রোধ, বলপ্রয়োগের শিকার হওয়া, এবং পাগল হওয়া বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইবনে তাইমিয়া যাদুল মায়াদে এ বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, হতবুদ্ধি অবস্থাটা হলো এ রকম যে, মানুষ যা বলে, তার পেছনে তার কোনো উদ্দেশ্যে থাকেনা এবং তা সে জানেওনা। যেন তার উদ্দেশ্য, বুঝ ও ইচ্ছা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, বলপ্রয়োগের শিকার ও পাগলের তালাকও এর আওতামুক্ত। আর যার বিবেকবুদ্ধি মাতলামি বা ক্রোধের কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং তার ইচ্ছার কোনো কর্তৃত্ব থাকেনা এবং নিজে কি বলছে, তা সে জানেইনা, এমন অবস্থায় যে কথা বলে, তার তালাকও তদ্রূপ অচল ও অকার্যকর। ক্রোধ তিন প্রকার: ১. যা বিবেকবুদ্ধিকে বিকল ও নিষ্ক্রিয় করে দেয়, ফলে মানুষ এতটা দিশাহারা হয়ে যায় যে, সে কি বলছে, তা সে নিজেই জানেনা। এ ধরনের ব্যক্তির তালাক সর্বসম্মতভাবে অকার্যকর। ২. যে ক্রোধ প্রাথমিক অবস্থায় থাকে এবং মানুষের ভেবেচিন্তে কথা বলার ক্ষমতা কেড়ে নেয়না, এ ধরনের ব্যক্তির তালাক কার্যকর হবে। ৩. ক্রোধ অধিকতর উত্তেজিত অবস্থায় উপনীত হয়। তবে বিবেকবুদ্ধিকে পুরোপুরি বিকল করে দেয়না। তবে তার উদ্দেশ্য ও সংকল্পকে ব্যাহত করে। ফলে এ অবস্থায় সে যা করে, তার উপর পরে অনুতপ্ত হয়। এ অবস্থাটা বিবেচনা সাপেক্ষ। এ অবস্থায় তালাক কার্যকর না হওয়ার মত প্রবল।
📄 হাসিঠাট্টাচ্ছলে তালাক
হাসিঠাট্টাচ্ছলে তালাক:
অধিকাংশ আলেমের মতে, ঠাট্টা পরিহাসচ্ছলে তালাক দেয়া হলে কার্যকর হবে। যেমন এ অবস্থায় সম্পাদিত বিয়েও কার্যকর হয়। কেননা আহমদ আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিযি ও হাকেম আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তিনটে জিনিস এমন রয়েছে, যা গম্ভীরভাবে হলেও গম্ভীর, পরিহাসের সাথে হলেও গম্ভীর : বিয়ে, তালাক ও তালাক প্রত্যাহার।"
কোনো কোনো আলেমের মতে পরিহাসের সাথে দেয়া তালাক কার্যকর হয়না। ইমাম বাকের, সাদেক ও নাসের এই দলভুক্ত। আহমদ ও মালেকের একটি মতও এ রকম। কেননা এসব আলেম তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য কথা দ্বারা সম্মতি জ্ঞাপনকে কিংবা ইচ্ছা জ্ঞাপনকে শর্তরূপে ধার্য করেছেন। সুতরাং নিয়ত ও উদ্দেশ্য যেখানে বিলুপ্ত, সেখানে শপথ ও সংকল্প নিরর্থক গণ্য হয়। আল্লাহ বলেন:
وَإِنْ عَزَمُوا الطَّلَاقَ، فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ .
“ যদি তারা তালাকের সংকল্প করে, তাহলে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (বাকারা: ২৭)
কোনো কাজ করার দৃঢ় ইচ্ছা করাকেই সংকল্প বলা হয়। কোনো কাজ করা বা না করার অনমনীয় ইচ্ছার মধ্য দিয়েই এটা প্রতিফলিত হয়। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, নিয়তের উপরই কাজ নির্ভরশীল। বস্তুত তালাক এমন একটি কাজ, যা নিয়ত বা ইচ্ছা ও সংকল্পের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু যে ব্যক্তি ঠাট্টা পরিহাস করে, তার কোনো নিয়ত ও সংকল্প থাকেনা। বুখারি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন: "তালাকের পেছনে কোনো উদ্দেশ্য থাকতেই হবে।” অর্থাৎ তালাকদাতার তালাক দেয়ার উদ্দেশ্য থাকলেই তা কার্যকর হবে। ইবনে হাজরের মতে, একমাত্র আনুগত্যহীন স্ত্রী ব্যতীত তালাক দেয়া অনুচিত। অসতর্কভাবে তথা অনিচ্ছাকৃতভাবে তালাক দিলে অর্থাৎ তালাক দিতে ইচ্ছা করেনি কিন্তু মুখ ফসকে তালাক উচ্চারণ করে ফেলেছে, এরূপ ব্যক্তি সম্পর্কে হানাফি ফকিহদের মত এই যে, আইনত তালাক কার্যকর হবে। কিন্তু ধর্মীয়ভাবে তার ও আল্লাহর মধ্যে তালাক কার্যকর হবেনা। তার স্ত্রী তার জন্য হালাল থাকবে।