📄 কার তালাক কার্যকর হয়?
কার তালাক কার্যকর হয়?:
আলেমগণ একমত, স্বামী যদি সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্ত বয়স্ক ও স্বাধীনচেতা হয়, তবে তার জন্য তালাক দেয়া বৈধ এবং তার তালাক কার্যকর হয়। আর যদি পাগল, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অন্যের বলপ্রয়োগে পরিচালিত হয়, তাহলে তার দেয়া তালাক কার্যকর হবেনা। কেননা তালাক এমন একটা কাজ, যার ফলাফল স্বামী স্ত্রীর জীবনে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। তাই তালাকদাতার যাবতীয় কাজ যাতে শুদ্ধ ও বিধিসম্মত হয়, সেজন্য তার পূর্ণ যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া জরুরি। আর এই পূর্ণ যোগ্যতা কেবল মস্তিষ্কের সুস্থতা, প্রাপ্ত বয়স্কতা ও স্বাধীনচেতা হওয়ার উপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ আলী রা. থেকে বর্ণনা করেন, "রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তিন ব্যক্তিকে দায়িত্ব ও জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক, যতক্ষণ না প্রাপ্তাবয়স্ক হয় এবং পাগল, যতক্ষণ না সুস্থ মস্তিষ্ক হয়।” আর বুখারি ও তিরমিযি আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যার মস্তিষ্ক স্বাভাবিক নেই, সে ব্যতীত সকলের তালাক বৈধ। পরবর্তী বিধিসমূহ সম্পর্কে আলেমদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে, যা আমি সংক্ষেপে তুলে ধরছি: ১. কারো বলপ্রয়োগে দেয়া তালাক, ২. মাতালের দেয়া তালাক, ৩. ঠাট্টা ছলে দেয়া তালাক, ৪. ক্রোধে দিশাহারা অবস্থায় দেয়া তালাক, ৫ উদাসীন ব্যক্তির দেয়া তালাক, ৬. বেহুশ ব্যক্তির দেয়া তালাক।
📄 বল প্রয়োগজনিত তালাক
বল প্রয়োগজনিত তালাক:
যার উপর বলপ্রয়োগ করা হয়, তার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও ক্ষমতা থাকেনা, স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতাও থাকেনা। এই দুটো জিনিসই যখন বিলুপ্ত হয়, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আর কোনো ব্যাপারে দায়ী থাকেনা এবং বলপ্রয়োগকৃত ব্যক্তিকে তার কার্যকলাপের জন্য দায়ী গণ্য করা হয়না। কেননা তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিই তো কেড়ে নেয়া হয়েছে। সে প্রকৃতপক্ষে বলপ্রয়োগকারীর ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তকেই কার্যকরী করে। কাজেই যাকে কোনো কুফরিসূচক কথা বলতে বাধ্য করা হয়, সে ঐ কুফরিসূচক কথা বলার কারণে কাফের হবেনা। কেননা আল্লাহ সূরা আন নাহলের ১০৬ নং আয়াতে বলেন:
إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِي بِالْإِيْمَانِ .
"কিন্তু যাকে কুফরিসূচক কথা বলতে বাধ্য করা হয়, অথচ তার মন ঈমানের উপর অবিচল রয়েছে, সে কাফের হবেনা।" ঠিক তেমনি যাকে মুসলমান হতে বাধ্য করা হয়, সে মুসলমান হয়না। আর যাকে তালাক দিতে বাধ্য করা হয়, তার তালাক কার্যকর হয়না। ইবনে মাজাহ, ইবনে হাব্বান, দার কুতনি, তাবরানি ও হাকেম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আমার উম্মতকে যাবতীয় ভুল ত্রুটি (ভুলক্রমে পরিত্যক্ত ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও কৃত কাজগুলো) এবং যেসব কাজে তাদেরকে বাধ্য করা হয়, তা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।" ইমাম মালেক, শাফেয়ী, আহমদ, দাউদ উমর ইবনুল খাত্তাব, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আলি ইবনে আবু তালেব ও ইবনে আব্বাসও অনুরূপ মত পোষণ করেন। ইমাম আবু হানিফা ও তার শিষ্যগণ বলেন, বাধ্য হয়ে তালাক দিলেও তা কার্যকর হবে। তাদের এই মতের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। উপরন্তু অধিকাংশ সাহাবী তাদের এ মতের বিপক্ষে।
📄 মাতালের তালাক
মাতালের তালাক:
অধিকাংশ ফকিহর মতে, মাতালের তালাক কার্যকর হবে। কারণ তার বিবেক যে কারণে বিকল হয়েছে, তা তার ইচ্ছা কৃত। আর একদল ফকিহ বলেন, তার তালাক অর্থহীন এবং তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। কেননা সে ও পাগল একই পর্যায়ের। উভয়ে বিবেক বুদ্ধিহীন। অথচ বিবেক বুদ্ধিই হচ্ছে শরিয়তের দায়দায়িত্ব আরোপের ভিত্তি। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা নিসার ৪৩ নং আয়াতে বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلوةَ وَأَنْتُم سُكرى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ .
অর্থ: হে মুমিনগণ, তোমরা মাতাল অবস্থায় নামাযের ধারে কাছে যেওনা, যতক্ষণ বুঝতে না পারো তোমরা কী বলছো।"
এ আয়াতে আল্লাহ মাতালের কথাবার্তাকে অর্থহীন আখ্যায়িত করেছেন। কেননা সে কী বলছে, তা সে নিজেই জানে না। উসমান রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি মাতালের তালাককে হিসাবে গণ্য করতেননা এবং কোনো সাহাবিই এ ব্যাপারে তার বিরোধিতা করতেননা বলে কেউ কেউ জানান। ইয়াহিয়া বিন সাঈদ, হুমাইদ বিন আব্দুর রহমান, রবিয়া, লাইস, আব্দুল্লাহ ইবনুল হুসাইন, ইসহাক বিন রাহওয়াই, আবু সাওর, শাফেয়ী, মাযানি, আহমদ, যাহেরি মাযহাব, তাহাবি ও কারখির অভিমতও তদ্রূপ। শওকানি বলেছেন, মাতাল যেহেতু অবুঝ, তাই তার তালাক অকার্যকর, কেননা যে জিনিসের ভিত্তিতে কোনো বিধি কার্যকর হয় তা অর্থাৎ বিবেকবুদ্ধি এখানে অনুপস্থিত ও নিষ্ক্রিয়। তবে যেহেতু শরিয়ত তাকে শাস্তি দিয়েছে, তাই আমাদের অধিকার নেই তাকে নিজেদের মত অনুযায়ী অব্যাহতি দেয়ার। আমরা বলবো, শাস্তি হিসেবে তার তালাক কার্যকর হবে। এভাবে তার উপর দুটো শাস্তি বলবত হবে। (একটা মদ খাওয়ার শাস্তি, আর একটা এ অবস্থায় দেয়া তালাক কার্যকর হওয়া।)
📄 ক্রুদ্ধ ব্যক্তির তালাক
ক্রুদ্ধ ব্যক্তির তালাক:
যে ব্যক্তি ক্রোধে এত দিশাহারা হয়ে গেছে যে, সে যা বলে ভেবে বলেনা এবং তার মুখ দিয়ে কী নির্গত হচ্ছে তা সে জানেনা, তার তালাক কার্যকর হবেনা। কেননা সে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি থেকে বঞ্চিত। আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও হাকেম আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “হতবুদ্ধি অবস্থায় তালাক দিলেও তালাক হবেনা, দাস মুক্ত করলেও মুক্ত হবেনা।" এই হতবুদ্ধি অবস্থাকে ক্রোধ, বলপ্রয়োগের শিকার হওয়া, এবং পাগল হওয়া বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইবনে তাইমিয়া যাদুল মায়াদে এ বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, হতবুদ্ধি অবস্থাটা হলো এ রকম যে, মানুষ যা বলে, তার পেছনে তার কোনো উদ্দেশ্যে থাকেনা এবং তা সে জানেওনা। যেন তার উদ্দেশ্য, বুঝ ও ইচ্ছা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, বলপ্রয়োগের শিকার ও পাগলের তালাকও এর আওতামুক্ত। আর যার বিবেকবুদ্ধি মাতলামি বা ক্রোধের কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং তার ইচ্ছার কোনো কর্তৃত্ব থাকেনা এবং নিজে কি বলছে, তা সে জানেইনা, এমন অবস্থায় যে কথা বলে, তার তালাকও তদ্রূপ অচল ও অকার্যকর। ক্রোধ তিন প্রকার: ১. যা বিবেকবুদ্ধিকে বিকল ও নিষ্ক্রিয় করে দেয়, ফলে মানুষ এতটা দিশাহারা হয়ে যায় যে, সে কি বলছে, তা সে নিজেই জানেনা। এ ধরনের ব্যক্তির তালাক সর্বসম্মতভাবে অকার্যকর। ২. যে ক্রোধ প্রাথমিক অবস্থায় থাকে এবং মানুষের ভেবেচিন্তে কথা বলার ক্ষমতা কেড়ে নেয়না, এ ধরনের ব্যক্তির তালাক কার্যকর হবে। ৩. ক্রোধ অধিকতর উত্তেজিত অবস্থায় উপনীত হয়। তবে বিবেকবুদ্ধিকে পুরোপুরি বিকল করে দেয়না। তবে তার উদ্দেশ্য ও সংকল্পকে ব্যাহত করে। ফলে এ অবস্থায় সে যা করে, তার উপর পরে অনুতপ্ত হয়। এ অবস্থাটা বিবেচনা সাপেক্ষ। এ অবস্থায় তালাক কার্যকর না হওয়ার মত প্রবল।