📄 জাহেলী যুগে তালাক
জাহেলী যুগে তালাক:
আয়েশা রা. বলেছেন: (তালাকের বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে) একজন স্বামী তার স্ত্রীকে যতবার ইচ্ছা, তালাক দিত। তারপর ইদ্দতের মধ্যেই তালাক প্রত্যাহার করে তাকে আবার স্ত্রী হিসেবে বহাল করতো। এমনকি একশো বা তার চেয়ে অধিকবার তালাক দিয়েও এরূপ করতো। একবার জনৈক স্বামী তার স্ত্রীকে বললো: আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে কখনো এমন তালাক দেবনা যে, তুমি আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তোমাকে কখনো গৃহে থাকতে দেবনা। স্ত্রী বললো: সেটা কিভাবে হবে? সে বললো: তোমাকে তালাক দেবো। তারপর যখনই ইদ্দত শেষ হওয়ার উপক্রম হবে, তখনই তালাক প্রত্যাহার করবো। স্ত্রী একথা শোনার পর আয়েশা রা.-এর কাছে গেলো এবং তার স্বামী যা বলেছে তা জানালো। আয়েশা রা. নীরব রইলেন এবং রসূলুল্লাহ সা. এলে তাকে জানালেন। রসূল সা. চুপ রইলেন। এরপর এ আয়াত নাযিল হলো: الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَاكُ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيعُ بِإِحْسَانٍ
অর্থ: তালাক মাত্র দু'বার। এরপর হয় যথোচিতভাবে সম্পর্ক বহাল রাখতে হবে, নচেত সহৃদয়তার সাথে মুক্ত করে দিতে হবে।” (আল বাকারা: আয়াত ২২৯)
আয়েশা রা. বলেন: এরপর মানুষ ভবিষ্যতের জন্য নতুনভাবে তালাক দেয়া শুরু করলো, চাই ইতিপূর্বে তালাক দিয়ে থাক্ বা না থাক। -তিরমিযি।
📄 তালাক পুরুষের একক অধিকার
তালাক পুরুষের একক অধিকার:
ইসলাম তালাককে শুধু পুরুষের অধিকারের আওতাধীন করেছে। কেননা বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করার কারণে সম্পর্ক বহাল রাখার ব্যাপারে আগ্রহ তারই বেশি থাকা স্বাভাবিক। তাছাড়া সে শুধু এই বিয়েতেই অর্থ ব্যয় করেনি, বরং তালাক দিয়ে পুনরায় বিয়ে করলে তাকে যে অনুরূপ বা ততোধিক অর্থ ব্যয় করতে হবে তা তার জানা রয়েছে। তাই প্রথম বিয়ে বহাল রাখা যে অধিকতর অর্থ সাশ্রয়ী, তা স্বামীর চেয়ে বেশি কেউ উপলব্ধি করেনা। সে একথাও জানে যে, তালাক দেয়া স্ত্রীকে তার বাদ বাকি মোহর, তালাক উপলক্ষে কিছু উপঢৌকনাদি এবং ইদ্দতকালীন খোরপোষ দিতে হবে। স্বামীর হাতে তালাকের একচেটিয়া অধিকার দেয়ার আরো কারণ হলো, তার বুদ্ধিমত্তা ও ভারসাম্যপূর্ণতা হেতু সে স্ত্রীর কাছ থেকে অনেক অনাকাঙ্খিত ব্যবহার পেয়েও অধিকতর ধৈর্যশীল। সুতরাং এক মুহূর্তের ক্রোধের বশবর্তী হয়ে বা স্ত্রীর একটি অসদাচরণ বা অন্যায়ে অসহিষ্ণু ও অধীর হয়ে সে দ্রুত তালাকের দিকে ধাবিত হয়না। পক্ষান্তরে স্ত্রী স্বামীর চেয়ে দ্রুত গতিতে রেগে বেশামাল হয়ে যায় এবং তার চেয়ে কম সহিষ্ণু হয়ে থাকে। তাছাড়া তালাকের যে পরিণাম ও আর্থিক বোঝা স্বামীকে বহন করতে হয়, স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেয়া হলে তাকে তা বহন করতে হয়না। তাই নগণ্যতম কারণে বা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত কারণে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে স্ত্রীই অধিকতর ক্ষিপ্রতা দেখাতে সক্ষম। এই সর্বশেষ যুক্তির যথার্থতার প্রমাণ এই যে, ইংরেজ জাতি যখন তালাক দাবি করাকে স্বামী ও স্ত্রীর সমানাধিকারে পরিণত করলো। তখন তাদের সমাজে তালাকের সংখ্যা এত বেড়ে গেলো যে, মুসলমানদের তুলনায় তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেলো।
📄 কার তালাক কার্যকর হয়?
কার তালাক কার্যকর হয়?:
আলেমগণ একমত, স্বামী যদি সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্ত বয়স্ক ও স্বাধীনচেতা হয়, তবে তার জন্য তালাক দেয়া বৈধ এবং তার তালাক কার্যকর হয়। আর যদি পাগল, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অন্যের বলপ্রয়োগে পরিচালিত হয়, তাহলে তার দেয়া তালাক কার্যকর হবেনা। কেননা তালাক এমন একটা কাজ, যার ফলাফল স্বামী স্ত্রীর জীবনে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। তাই তালাকদাতার যাবতীয় কাজ যাতে শুদ্ধ ও বিধিসম্মত হয়, সেজন্য তার পূর্ণ যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া জরুরি। আর এই পূর্ণ যোগ্যতা কেবল মস্তিষ্কের সুস্থতা, প্রাপ্ত বয়স্কতা ও স্বাধীনচেতা হওয়ার উপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ আলী রা. থেকে বর্ণনা করেন, "রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তিন ব্যক্তিকে দায়িত্ব ও জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক, যতক্ষণ না প্রাপ্তাবয়স্ক হয় এবং পাগল, যতক্ষণ না সুস্থ মস্তিষ্ক হয়।” আর বুখারি ও তিরমিযি আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যার মস্তিষ্ক স্বাভাবিক নেই, সে ব্যতীত সকলের তালাক বৈধ। পরবর্তী বিধিসমূহ সম্পর্কে আলেমদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে, যা আমি সংক্ষেপে তুলে ধরছি: ১. কারো বলপ্রয়োগে দেয়া তালাক, ২. মাতালের দেয়া তালাক, ৩. ঠাট্টা ছলে দেয়া তালাক, ৪. ক্রোধে দিশাহারা অবস্থায় দেয়া তালাক, ৫ উদাসীন ব্যক্তির দেয়া তালাক, ৬. বেহুশ ব্যক্তির দেয়া তালাক।
📄 বল প্রয়োগজনিত তালাক
বল প্রয়োগজনিত তালাক:
যার উপর বলপ্রয়োগ করা হয়, তার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও ক্ষমতা থাকেনা, স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতাও থাকেনা। এই দুটো জিনিসই যখন বিলুপ্ত হয়, তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আর কোনো ব্যাপারে দায়ী থাকেনা এবং বলপ্রয়োগকৃত ব্যক্তিকে তার কার্যকলাপের জন্য দায়ী গণ্য করা হয়না। কেননা তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিই তো কেড়ে নেয়া হয়েছে। সে প্রকৃতপক্ষে বলপ্রয়োগকারীর ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তকেই কার্যকরী করে। কাজেই যাকে কোনো কুফরিসূচক কথা বলতে বাধ্য করা হয়, সে ঐ কুফরিসূচক কথা বলার কারণে কাফের হবেনা। কেননা আল্লাহ সূরা আন নাহলের ১০৬ নং আয়াতে বলেন:
إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِي بِالْإِيْمَانِ .
"কিন্তু যাকে কুফরিসূচক কথা বলতে বাধ্য করা হয়, অথচ তার মন ঈমানের উপর অবিচল রয়েছে, সে কাফের হবেনা।" ঠিক তেমনি যাকে মুসলমান হতে বাধ্য করা হয়, সে মুসলমান হয়না। আর যাকে তালাক দিতে বাধ্য করা হয়, তার তালাক কার্যকর হয়না। ইবনে মাজাহ, ইবনে হাব্বান, দার কুতনি, তাবরানি ও হাকেম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আমার উম্মতকে যাবতীয় ভুল ত্রুটি (ভুলক্রমে পরিত্যক্ত ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও কৃত কাজগুলো) এবং যেসব কাজে তাদেরকে বাধ্য করা হয়, তা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।" ইমাম মালেক, শাফেয়ী, আহমদ, দাউদ উমর ইবনুল খাত্তাব, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আলি ইবনে আবু তালেব ও ইবনে আব্বাসও অনুরূপ মত পোষণ করেন। ইমাম আবু হানিফা ও তার শিষ্যগণ বলেন, বাধ্য হয়ে তালাক দিলেও তা কার্যকর হবে। তাদের এই মতের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। উপরন্তু অধিকাংশ সাহাবী তাদের এ মতের বিপক্ষে।