📄 ইহূদি সমাজে তালাক
ইহূদি সমাজে তালাক:
ইহূদি শরিয়তে তালাকের যে পদ্ধতি বিধিবদ্ধ ও কার্যকর রয়েছে, তা হলো, কোনো ওযর ছাড়াও তালাক বৈধ। যেমন কোনো পুরুষ অধিকতর সুন্দরী মহিলাকে বিয়ে করার জন্য স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। তবে ওযর ছাড়া তালাক পছন্দনীয় নয়। এই ওযর তাদের সমাজে দু'রকমের: ১. শারীরিক ত্রুটি: যথা- অন্ধত্ব, বধিরত্ব, বাকশক্তিহীনতা, খণ্ডত্ব, বন্ধ্যাত্ব ইত্যাদি। ২. স্বভাব চরিত্রের ত্রুটি: যথা- ঔদ্ধত্য ও বেআদবী, বাচালতা, অপরিচ্ছন্নতা, অবাধ্যতা, হঠকারিতা, জেদ, অপচয় ও অপব্যয়, পেটুকতা, লোভ, খাদ্যবিলাস ও অহংকার। তাদের নিকট সবচেয়ে বড় ওযর হলো ব্যভিচার। এমনকি ব্যভিচারের গুজব ছড়িয়ে পড়াও এজন্য যথেষ্ট, চাই তা প্রমাণিত হোক বা না হোক। অবশ্য হযরত ঈসা আ. ব্যভিচার ব্যতীত উল্লিখিত ওযরসমূহের আর কোনোটির স্বীকৃতি দেননি। তবে স্ত্রীর জন্য কোনো অবস্থায়ই স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া বৈধ নয়। এমনকি তার ব্যভিচার যদি প্রমাণিত হয় তবুও নয়।
📄 খৃষ্টধর্মে তালাক
খৃষ্টধর্মে তালাক:
পাশ্চাত্যের খৃস্টান জাতিগুলো যে খৃস্টধর্ম অনুসরণ করে, তা তিনটে উপদলে বিভক্ত: ১. ক্যাথলিক, ২. অর্থোডকস, ৩. প্রোটেস্ট্যান্ট।
তন্মধ্যে ক্যাথলিকদের নিকট তালাক সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। যত বড় কারণই ঘটুক, বৈবাহিক বন্ধন ছিন্ন করা কোনো অবস্থায়ই বৈধ নয়। এমনকি দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলেও তা তালাকের জন্য গ্রহণযোগ্য ওযর বিবেচিত হয়না। বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর মতে একমাত্র দৈহিক বিচ্ছেদই তালাককে বৈধতা দিতে পারে। অথচ এই দৈহিক বিচ্ছেদের পরও তাদের মতে দাম্পত্য সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। তাই স্বামী ও স্ত্রী এ দু'জনের কেউ এই বিচ্ছেদকালে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেনা। কেননা এটা একাধিক বিয়ে গণ্য হবে, যা খৃস্টধর্মে কোনো অবস্থায়ই অনুমোদিত নয়।
ক্যাথলিকগণ এ ব্যাপারে মার্কস বাইবেলে হযরত ঈসার উক্তি হিসেবে যা উদ্ধৃত আছে, তার উপর নির্ভর করে থাকে। তিনি বলেন: “স্বামী স্ত্রী একই দেহে পরিণত হয়। তাই বিয়ের পর তারা আর দু'জন থাকেনা, বরং একই দেহে পরিণত হয়। কেননা আল্লাহ যাকে একত্রিত করেন, তাকে কেউ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনা।” আর খৃস্ট ধর্মের অন্য দুটি উপদল, অর্থোডক্স ও প্রোটেস্ট্যান্ট কয়েকটি বিশেষ অবস্থায় তালাকের অনুমতি দেয়। তন্মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা হলো, দাম্পত্য বন্ধনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা (অর্থাৎ পরকীয়া সম্পর্ক)। তবে এই উভয় উপদল স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্য এরপর আর কোনো বিয়ে করাকে নিষিদ্ধ করে। দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তালাকের অনুমতির প্রমাণ হিসেবে তারা মতি বাইবেলে উদ্ধৃত হযরত ঈসা আ.-এর এই উক্তিকে তুলে ধরে: "ব্যভিচার ছাড়া যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দেয়, সে তাকে ব্যভিচার করতে বাধ্য করে।” আর সকল খৃস্টান উপদল তালাকপ্রাপ্ত স্বামী ও স্ত্রীর উপর বিয়ে নিষিদ্ধ করে মার্কস বাইবেলে বর্ণিত হযরত ঈসার এই উক্তির ভিত্তিতে: "যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দেয় এবং অন্য মহিলাকে বিয়ে করে, সে তার সাথে ব্যভিচার করে। আর কোনো মহিলা যদি তার স্বামীকে তালাক দেয় এবং অন্য পুরুষকে বিয়ে করে, তবে সে তার সাথে ব্যভিচার করে।"
📄 জাহেলী যুগে তালাক
জাহেলী যুগে তালাক:
আয়েশা রা. বলেছেন: (তালাকের বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে) একজন স্বামী তার স্ত্রীকে যতবার ইচ্ছা, তালাক দিত। তারপর ইদ্দতের মধ্যেই তালাক প্রত্যাহার করে তাকে আবার স্ত্রী হিসেবে বহাল করতো। এমনকি একশো বা তার চেয়ে অধিকবার তালাক দিয়েও এরূপ করতো। একবার জনৈক স্বামী তার স্ত্রীকে বললো: আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে কখনো এমন তালাক দেবনা যে, তুমি আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তোমাকে কখনো গৃহে থাকতে দেবনা। স্ত্রী বললো: সেটা কিভাবে হবে? সে বললো: তোমাকে তালাক দেবো। তারপর যখনই ইদ্দত শেষ হওয়ার উপক্রম হবে, তখনই তালাক প্রত্যাহার করবো। স্ত্রী একথা শোনার পর আয়েশা রা.-এর কাছে গেলো এবং তার স্বামী যা বলেছে তা জানালো। আয়েশা রা. নীরব রইলেন এবং রসূলুল্লাহ সা. এলে তাকে জানালেন। রসূল সা. চুপ রইলেন। এরপর এ আয়াত নাযিল হলো: الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَاكُ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيعُ بِإِحْسَانٍ
অর্থ: তালাক মাত্র দু'বার। এরপর হয় যথোচিতভাবে সম্পর্ক বহাল রাখতে হবে, নচেত সহৃদয়তার সাথে মুক্ত করে দিতে হবে।” (আল বাকারা: আয়াত ২২৯)
আয়েশা রা. বলেন: এরপর মানুষ ভবিষ্যতের জন্য নতুনভাবে তালাক দেয়া শুরু করলো, চাই ইতিপূর্বে তালাক দিয়ে থাক্ বা না থাক। -তিরমিযি।
📄 তালাক পুরুষের একক অধিকার
তালাক পুরুষের একক অধিকার:
ইসলাম তালাককে শুধু পুরুষের অধিকারের আওতাধীন করেছে। কেননা বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করার কারণে সম্পর্ক বহাল রাখার ব্যাপারে আগ্রহ তারই বেশি থাকা স্বাভাবিক। তাছাড়া সে শুধু এই বিয়েতেই অর্থ ব্যয় করেনি, বরং তালাক দিয়ে পুনরায় বিয়ে করলে তাকে যে অনুরূপ বা ততোধিক অর্থ ব্যয় করতে হবে তা তার জানা রয়েছে। তাই প্রথম বিয়ে বহাল রাখা যে অধিকতর অর্থ সাশ্রয়ী, তা স্বামীর চেয়ে বেশি কেউ উপলব্ধি করেনা। সে একথাও জানে যে, তালাক দেয়া স্ত্রীকে তার বাদ বাকি মোহর, তালাক উপলক্ষে কিছু উপঢৌকনাদি এবং ইদ্দতকালীন খোরপোষ দিতে হবে। স্বামীর হাতে তালাকের একচেটিয়া অধিকার দেয়ার আরো কারণ হলো, তার বুদ্ধিমত্তা ও ভারসাম্যপূর্ণতা হেতু সে স্ত্রীর কাছ থেকে অনেক অনাকাঙ্খিত ব্যবহার পেয়েও অধিকতর ধৈর্যশীল। সুতরাং এক মুহূর্তের ক্রোধের বশবর্তী হয়ে বা স্ত্রীর একটি অসদাচরণ বা অন্যায়ে অসহিষ্ণু ও অধীর হয়ে সে দ্রুত তালাকের দিকে ধাবিত হয়না। পক্ষান্তরে স্ত্রী স্বামীর চেয়ে দ্রুত গতিতে রেগে বেশামাল হয়ে যায় এবং তার চেয়ে কম সহিষ্ণু হয়ে থাকে। তাছাড়া তালাকের যে পরিণাম ও আর্থিক বোঝা স্বামীকে বহন করতে হয়, স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেয়া হলে তাকে তা বহন করতে হয়না। তাই নগণ্যতম কারণে বা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত কারণে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে স্ত্রীই অধিকতর ক্ষিপ্রতা দেখাতে সক্ষম। এই সর্বশেষ যুক্তির যথার্থতার প্রমাণ এই যে, ইংরেজ জাতি যখন তালাক দাবি করাকে স্বামী ও স্ত্রীর সমানাধিকারে পরিণত করলো। তখন তাদের সমাজে তালাকের সংখ্যা এত বেড়ে গেলো যে, মুসলমানদের তুলনায় তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেলো।