📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 শরিয়তে তালাকের বিধান

📄 শরিয়তে তালাকের বিধান


শরিয়তে তালাকের বিধান:
তালাকের বিধির ব্যাপারে ফকীহদের নানা মত পরিলক্ষিত হয়। তবে সবচেয়ে নির্ভুল মত হলো, হানাফি ও হাম্বলিদের মত : “প্রয়োজন ব্যতীত এটি অবৈধ।” তাদের নিকট এ বক্তব্যের প্রমাণ রসূলুল্লাহ সা.-এর হাদিস : “বারবার তালাক দানকারী বা তালাক গ্রহণকারী এবং ঘন ঘন বৈবাহিক রুচি পরিবর্তনকারীর উপর অভিসম্পাত।” তাছাড়া, যেহেতু তালাক দেয়ার অর্থই হলো, আল্লাহর একটি নিয়ামতের নাশুকরি করা। বিবাহ আল্লাহর নিয়ামত। আর আল্লাহর নিয়ামতের নাশুকরি করা হারাম। সুতরাং অনিবার্য প্রয়োজন ব্যতীত তালাক বৈধ নয়। যে কটি জিনিস এই অনিবার্য প্রয়োজনের আওতাভুক্ত, যার ভিত্তিতে তালাক বৈধ হয়, তা হচ্ছে : স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে স্বামীর মনে সন্দেহের সৃষ্টি হওয়া এবং স্বামীর মনে স্ত্রীর প্রতি বা স্ত্রীর মনে স্বামীর প্রতি অনুরাগ ও আকর্ষণের বিলুপ্তি। কারণ মানুষের মনের পরিবর্তন সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ। তালাকের যদি আদৌ কোনো প্রয়োজন দেখা না দেয়, তাহলে তা হবে নিছক আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা এবং অপর জীবন সংগীর প্রতি অনৈতিক আচরণ। তাই এটা অবাঞ্ছিত ও নিষিদ্ধ কাজে পর্যবসিত হবে।

হাম্বলি মাযহাবে তালাকের একটা চমৎকার বিধি রয়েছে। তার সংক্ষিপ্ত সার এরূপ : তালাক কখনো ওয়াজিব, কখনো হারাম, কখনো মবাহ, কখনো মুস্তাহাব।

ওয়াজিব তালাক : যখন দু'পক্ষের শালিশ স্বামী স্ত্রীর বিরোধ মীমাংসা করতে ব্যর্থ হয়ে তালাকের পক্ষে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে এবং মনে করে যে, তালাকই বিরোধ মীমাংসার একমাত্র উপায়, সে অবস্থায় তালাক দেয়া ওয়াজিব। অনুরূপ, ইলাকারী চার মাস অপেক্ষা করার পর যখন তালাক ছাড়া গত্যন্তর না পেয়ে তালাক দেয়। কেননা আল্লাহ বলেছেন :

لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِنْ نِسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْمُرِجٍ فَإِنْ فَاءُوْ فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيرٌ وَان عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

অর্থ : যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ইলা করে, তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। এরপর যদি তারা (স্বাভাবিক অবস্থায়) ফিরে যায়, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আর যদি তালাক দেয়ার সংকল্প করে, তাহলে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (আল বাকারা : ১২৫-১২৬)

হারাম তালাক : বিনা প্রয়োজনে যে তালাক দেয়া হয়, সেটাই হারাম তালাক। এটা হারাম হওয়ার কারণ হলো, এ দ্বারা স্বামী স্ত্রী উভয়েরই ক্ষতি হয় এবং বিনা কারণে উভয়ের স্বার্থ বিনষ্ট হয়। তাই এটা হারাম, যেমন কোনো সম্পদ বিনষ্ট করা হারাম। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : “নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবেনা, অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবেনা।” অন্য বর্ণনা মতে, এ ধরনের তালাক মাকরূহ। কারণ রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : বৈধ জিনিসগুলোর মধ্যে যেটি আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত, তা হলো তালাক।” (আবু দাউদ) এটি ঘৃণিত এজন্য যে, এর কোনো প্রয়োজন নেই, যদিও রসূলুল্লাহ সা. একে হালাল আখ্যায়িত করেছেন। তাছাড়া, যেহেতু এ দ্বারা বহু উপকারিতার উৎস বিয়ের অবসান ঘটে, তাই এটি মাকরূহ।

মোবাহ তালাক হলো সেই তালাক, যখন যথার্থ প্রয়োজনের ভিত্তিতে এবং স্ত্রীর খারাপ আচার ব্যবহার, ক্ষতিকর চালচলন ও ঈপ্সিত উদ্দেশ্য সিদ্ধ না হওয়ার কারণে তালাক দেয়া হয়।

মুস্তাহাব তালাক হলো সেই তালাক, যখন স্ত্রী আল্লাহর হুকুম যথা নামায ইত্যাদি আদায়ে শৈথিল্য প্রদর্শন করে, অথচ তার উপর সেজন্য বল প্রয়োগ করা সম্ভব হয়না, অথবা যখন সে অসতী হয়। ইমাম আহমদ বলেছেন: অসতী স্ত্রীকে রাখা উচিত নয়। কেননা এতে স্বামীর ধর্মীয় ক্ষতি সাধিত হয়। তাছাড়া, এমন নিশ্চয়তা নেই যে, সে অন্যের সন্তান পেটে ধারণ করে তা স্বামীর সাথে সম্পর্কযুক্ত করবেনা এবং ভিন্ন পুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করে স্বামীর সংসারে কলংক লেপন করবেনা। এরূপ ক্ষেত্রে সে যাতে তার মোহরের দাবি ছেড়ে দিয়ে চলে যায় সেজন্য তার উপর চাপ সৃষ্টি করলেও ক্ষতি নেই। কেননা আল্লাহ বলেছেন:

وَ لَا تَعْضُلُوهُنَّ لِتَذْهَبُوا بِبَعْضٍ مَا أَتَيْتُمُوهُنَّ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ

অর্থ: স্ত্রীদেরকে তোমরা যা কিছু দিয়েছ, তার অংশবিশেষ যাতে তোমরা নিতে পারো সেজন্য তাদেরকে বল প্রয়োগ করোনা। তবে তারা যদি সুস্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয় তাহলে ভিন্ন কথা।” (আননিসা : আয়াত ১৯)

ইবনে কুদামা বলেছেন, এই দুটি ক্ষেত্রে তালাক ওয়াজিব গণ্য হতে পারে। তিনি আরো বলেছেন: পারস্পরিক অবনিবনার ক্ষেত্রে এবং যখন স্ত্রী নিজের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য খুলা করতে প্রস্তুত হয়ে যায়, তখন তালাক মুস্তাহাব।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 তালাকের যৌক্তিকতা

📄 তালাকের যৌক্তিকতা


তালাকের যৌক্তিকতা:
ইবনে সিনা তার 'কিতাবুশ্ শিফা'তে বলেছেন: স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হওয়ার একটা না একটা উপায় থাকাই উচিত এবং সর্বদিক থেকে এর পথ রুদ্ধ করা অনুচিত। কেননা বিয়ে বিচ্ছেদের সকল পথ সর্বতোভাবে বন্ধ করে দেয়া ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক হতে পারে একাধিক কারণে: প্রথমত, জন্মগতভাবে কিছু মানুষের স্বভাব প্রকৃতি এমন হয়ে থাকে, যা অন্যান্যদের স্বভাব প্রকৃতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে এবং নিজেকে সহনশীল ও অনুরক্ত করতে সমর্থ হয়না। এ ধরনের দুই জনকে জোরপূর্বক একত্রিত করে রাখতে যতোই চেষ্টা করা হবে, ততোই বিরোধ, তিক্ততা ও অমঙ্গল বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয়ত, ঘটনাক্রমে এমন স্বামী বা স্ত্রী কারো কারো ভাগ্যে জুটে যেতে পারে, যে তার সমকক্ষ নয়, কিংবা মেলামেশার ক্ষেত্রে প্রীতিকর নয়, অথবা এমন বিরক্তিজনক স্বভাবের যে, অপরজন তাকে মেনেই নিতে পারেনা। এ ধরনের অসম দাম্পত্য বন্ধনের ফলে মানুষ পরকীয়া প্রেম বা বিবাহ বহির্ভূত অবৈধ সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কেননা যৌন আবেগ ও তাড়না একটা স্বাভাবিক ব্যাপার, যা নানা ধরনের অন্যায় ও অপরাধের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। আর না হোক, এ ধরনের দম্পতি সন্তান প্রজননে পরস্পরকে সহযোগিতা না করতে পারে। অথচ জীবন সঙ্গী বা সংগিনী পরিবর্তনের সুযোগ পেলে এ ব্যাপারে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে পারতো। সুতরাং অনিবার্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের একটা সুযোগ থাকা অপরিহার্য। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এ বিষয়ে কঠোর হওয়া চাই।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইহূদি সমাজে তালাক

📄 ইহূদি সমাজে তালাক


ইহূদি সমাজে তালাক:
ইহূদি শরিয়তে তালাকের যে পদ্ধতি বিধিবদ্ধ ও কার্যকর রয়েছে, তা হলো, কোনো ওযর ছাড়াও তালাক বৈধ। যেমন কোনো পুরুষ অধিকতর সুন্দরী মহিলাকে বিয়ে করার জন্য স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। তবে ওযর ছাড়া তালাক পছন্দনীয় নয়। এই ওযর তাদের সমাজে দু'রকমের: ১. শারীরিক ত্রুটি: যথা- অন্ধত্ব, বধিরত্ব, বাকশক্তিহীনতা, খণ্ডত্ব, বন্ধ্যাত্ব ইত্যাদি। ২. স্বভাব চরিত্রের ত্রুটি: যথা- ঔদ্ধত্য ও বেআদবী, বাচালতা, অপরিচ্ছন্নতা, অবাধ্যতা, হঠকারিতা, জেদ, অপচয় ও অপব্যয়, পেটুকতা, লোভ, খাদ্যবিলাস ও অহংকার। তাদের নিকট সবচেয়ে বড় ওযর হলো ব্যভিচার। এমনকি ব্যভিচারের গুজব ছড়িয়ে পড়াও এজন্য যথেষ্ট, চাই তা প্রমাণিত হোক বা না হোক। অবশ্য হযরত ঈসা আ. ব্যভিচার ব্যতীত উল্লিখিত ওযরসমূহের আর কোনোটির স্বীকৃতি দেননি। তবে স্ত্রীর জন্য কোনো অবস্থায়ই স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া বৈধ নয়। এমনকি তার ব্যভিচার যদি প্রমাণিত হয় তবুও নয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 খৃষ্টধর্মে তালাক

📄 খৃষ্টধর্মে তালাক


খৃষ্টধর্মে তালাক:
পাশ্চাত্যের খৃস্টান জাতিগুলো যে খৃস্টধর্ম অনুসরণ করে, তা তিনটে উপদলে বিভক্ত: ১. ক্যাথলিক, ২. অর্থোডকস, ৩. প্রোটেস্ট্যান্ট।

তন্মধ্যে ক্যাথলিকদের নিকট তালাক সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। যত বড় কারণই ঘটুক, বৈবাহিক বন্ধন ছিন্ন করা কোনো অবস্থায়ই বৈধ নয়। এমনকি দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করলেও তা তালাকের জন্য গ্রহণযোগ্য ওযর বিবেচিত হয়না। বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর মতে একমাত্র দৈহিক বিচ্ছেদই তালাককে বৈধতা দিতে পারে। অথচ এই দৈহিক বিচ্ছেদের পরও তাদের মতে দাম্পত্য সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। তাই স্বামী ও স্ত্রী এ দু'জনের কেউ এই বিচ্ছেদকালে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেনা। কেননা এটা একাধিক বিয়ে গণ্য হবে, যা খৃস্টধর্মে কোনো অবস্থায়ই অনুমোদিত নয়।

ক্যাথলিকগণ এ ব্যাপারে মার্কস বাইবেলে হযরত ঈসার উক্তি হিসেবে যা উদ্ধৃত আছে, তার উপর নির্ভর করে থাকে। তিনি বলেন: “স্বামী স্ত্রী একই দেহে পরিণত হয়। তাই বিয়ের পর তারা আর দু'জন থাকেনা, বরং একই দেহে পরিণত হয়। কেননা আল্লাহ যাকে একত্রিত করেন, তাকে কেউ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনা।” আর খৃস্ট ধর্মের অন্য দুটি উপদল, অর্থোডক্স ও প্রোটেস্ট্যান্ট কয়েকটি বিশেষ অবস্থায় তালাকের অনুমতি দেয়। তন্মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা হলো, দাম্পত্য বন্ধনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা (অর্থাৎ পরকীয়া সম্পর্ক)। তবে এই উভয় উপদল স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্য এরপর আর কোনো বিয়ে করাকে নিষিদ্ধ করে। দাম্পত্য সম্পর্কের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তালাকের অনুমতির প্রমাণ হিসেবে তারা মতি বাইবেলে উদ্ধৃত হযরত ঈসা আ.-এর এই উক্তিকে তুলে ধরে: "ব্যভিচার ছাড়া যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দেয়, সে তাকে ব্যভিচার করতে বাধ্য করে।” আর সকল খৃস্টান উপদল তালাকপ্রাপ্ত স্বামী ও স্ত্রীর উপর বিয়ে নিষিদ্ধ করে মার্কস বাইবেলে বর্ণিত হযরত ঈসার এই উক্তির ভিত্তিতে: "যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দেয় এবং অন্য মহিলাকে বিয়ে করে, সে তার সাথে ব্যভিচার করে। আর কোনো মহিলা যদি তার স্বামীকে তালাক দেয় এবং অন্য পুরুষকে বিয়ে করে, তবে সে তার সাথে ব্যভিচার করে।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00