📄 স্ত্রীর মনস্তুষ্টির জন্য স্বামীর সাজসজ্জা
স্ত্রীর মনস্তুষ্টির খাতিরে স্বামীর সাজসজ্জা করা মুস্তাহাব। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: আমার স্ত্রী যেমন আমার জন্য সাজগোজ করে, আমিও তেমনি তার জন্য সাজগোজ করি। আমি তার কাছ থেকে সমস্ত অধিকার কড়ায় গণ্ডায় আদায় করা পছন্দ করিনা। কেননা তাহলে সেও আমার কাছ থেকে সকল অধিকার কড়ায় গণ্ডায় আদায় করতে চাইবে। আল্লাহ নিজেই তো বলেছেন: "স্ত্রীদের নিকট স্বামীর যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি স্বামীর নিকটও স্ত্রীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে।"
ইবনে আব্বাসের এই উক্তি সম্পর্কে কুরতুবী বলেন, আলেমগণ বলেছেন: “পুরুষদের সাজসজ্জার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। এটা নির্ভর করবে তারা তাদের বিচক্ষণতা ও পারিপার্শ্বিকতার সাথে সাযুজ্যকে কিভাবে বাস্তব রূপ দেবে তার উপর। কোনো বিশেষ ধরনের সাজসজ্জা চলমান সময়ের উপযোগী মনে হতে পারে, আবার কোনোটা অনুপযোগী মনে হতে পারে। কোনোটা যুবকদের উপযোগী ও বৃদ্ধদের অনুপযোগী হতে পারে। আবার কোনোটা যুবকদের অনুপযোগী ও বৃদ্ধদের উপযোগী হতে পারে। অনুরূপ, পোশাকের ব্যাপারেও। এসব কিছুতেই স্ত্রীর অধিকার ও মনোরঞ্জনকেই প্রাধান্য দিতে হবে এবং এভাবেই তার নিকট গ্রহণযোগ্যতা ও তার কামনা বাসনার সাথে সাযুজ্য অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। মূল লক্ষ্য হওয়া চাই স্ত্রীর ভালো লাগে ও তাকে আনন্দ দেয় এমন সাজসজ্জা, যাতে সে অন্য পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পায়। আর সুগন্ধী ব্যবহার, দাঁত পরিষ্কার করা, খিলাল করা, শরীর পরিষ্কার করা, অপ্রয়োজনীয় চুল ও লোম দূর করা, পাক পবিত্র থাকা, নখকাটা- এসব কিছু স্পষ্টতই সবার কাছে কাম্য। বুড়োদের জন্য পাকা চুলে মেহেদী দেয়া এবং যুবাবৃদ্ধ সবার জন্য আংটি ব্যবহার করা উত্তম সাজসজ্জা। আংটি পুরুষের বৈধ অলংকার। তাছাড়া পুরুষদের প্রতি স্ত্রীর চাহিদার প্রকৃত সময়টি জানা এবং তাকে ভিন্ন পুরুষের প্রতি আকর্ষণ থেকে মুক্ত রাখাও স্বামীর কর্তব্য। যদি কখনো স্ত্রীর যৌন চাহিদা পূরণে স্বামী নিজের ভেতরে দুর্বলতা রয়েছে বলে অনুভব করে, তবে তার যৌন ক্ষমতাবর্ধক ওষুধ সেবন করা উচিত, যাতে করে স্ত্রীকে ভিন্ন পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া থেকে বিরত রাখা যায়। তবে এ উদ্দেশ্যে কিছু লোক গাঁজা, আফিম ইত্যাদি মাদক সেবনের ন্যায় ধ্বংসাত্মক ও ভুল পথে পা বাড়িয়েছে, যা একদিকে যৌন ক্ষমতাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়া এবং নিজের উপর ও নিজের পরিবারের উপর যুলুম ও অপরাধ করার নামান্তর। আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে রায় দিয়েছেন যে, গাঁজা, আফিম প্রভৃতি মাদক সেবন সম্পূর্ণ হারাম ও মদপানের মতো শাস্তিযোগ্য। আর যে ব্যক্তি একে হালাল মনে করবে, সে ইসলাম থেকে মুরতাদ ও কাফের হয়ে যাবে। আর স্ত্রীর সাথে তার চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ অনিবার্য।
📄 বিয়ে পূর্বের খুতবা
বিয়ের আকদ সম্পাদনকারী বা অন্য কেউ বিয়ের আগে কমের পক্ষে আল্লাহর প্রশংসা ও রসূলুল্লাহ সা. এর জন্য দরূদ সম্বলিত একটা খুতবা বা ভাষণ দেবে। এটা মুস্তাহাব।
📄 ওলিমা বা বৌভাত
১. সংজ্ঞা: ওলিমা শব্দের আভিধানিক অর্থ একত্রিত হওয়া। এখানে স্বামী ও স্ত্রী একটি ভোজনে মিলিত হয় বলে এই নামকরণ হয়েছে। বিয়ে সংক্রান্ত যে কোনো ভোজন বা অন্য যে কোনো নিমন্ত্রণে আয়োজিত ভোজনকেও অভিধানে লিমা বলা হয়।
অধিকাংশ আলেমের মতে ওলিমা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ।
১. রসূলুল্লাহ সা. আবদুর রহমান বিন আওফকে বলেছেন: "একটা ছাগল দিয়ে হলেও ওলিমা করো।"
২. আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. তার আর কোনো স্ত্রীর জন্য এমন ওলিমা করেননি, যেমন করেছেন যয়নবের জন্য। যয়নবের জন্য তিনি একটি ছাগল দিয়ে ওলিমা করেছেন। (বুখারি, মুসলিম)
৩. বুরাইদা রা. বলেছেন: আলী রা. যখন ফাতেমা রা.-এর জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেন, তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: বিয়ের জন্য ওলিমা জরুরি। (আহমদ)
৪. আনাস রা. বলেছেন: "রসূলুল্লাহ সা. তাঁর স্ত্রীদের কারো জন্য এমন ওলিমা করেননি, যেমন যয়নবের জন্য করেছেন। লোকদের দাওয়াত করার জন্য আমাকে পাঠাতে লাগলেন এবং তাদেরকে রুটি ও গোশত খাইয়ে তৃপ্ত করলেন।
৫. বুখারি বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. তার কোনো একজন স্ত্রীর জন্য দুই মুদ যব দ্বারা ওলিমা করেছেন।
এই ব্যবধানের কারণ এক স্ত্রীকে অন্য স্ত্রীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া নয়। এ ব্যবধানের কারণ হলো, এক সময় অভাব অনটন ছিলো, আর অন্য সময় ছিলো স্বচ্ছলতা।
৩. ওলিমার সময়: ওলিমার সময় হলো, আকদের অব্যবহিত আগে বা পরে, কিংবা বাসরের অব্যবহিত পূর্বে বা পরে। এতে প্রচলিত রীতিপ্রথা অনুসারে প্রশস্ততার অবকাশ রয়েছে। বুখারির মতে, রসূলুল্লাহ সা. যয়নবের সাথে বাসর যাপনের পরে জনগণকে দাওয়াত করেছেন।
৪. দাওয়াত কবুল করা: বিয়ের ওলিমায় দাওয়াত দেয়া হলে যাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে, তার উপর দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব। কেননা এ দ্বারা আহুত ব্যক্তির প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়, তার জন্য আনন্দ প্রকাশ করা হয় এবং তার মনকে খুশি করা হয়।
১. ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমাদের কাউকে যখন কোনো ওলিমায় দাওয়াত দেয়া হয়, তখন তার ওলিমায় উপস্থিত হওয়া কর্তব্য।
২. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলো, সে আল্লাহ ও তার রসূলের নাফরমানী করলো।
৩. আবু হুরায়রা রা. থেকে আরো বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আমাকে যদি এক ক্রোশ দূরে যাওয়ার দাওয়াত দেয়া হয়, তবু আমি যাবো, আর যদি এক গজ দূরে যাওয়ার দাওয়াত দেয়া হয়, তবুও আমি সেখানে যাবো। (সব ক'টি হাদিস বুখারি কর্তৃক বর্ণিত)
তবে দাওয়াত যদি সাধারণভাবে দেয়া হয় এবং কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে না দেয়া হয়, তাহলে তা কবুল করা ওয়াজিবও নয়, মুস্তাহাবও নয়। যেমন দূত বললো: হে জনগণ, (কোনো নির্দিষ্টকরণ ব্যতীত) ওলিমায় আসুন। অথবা দূতকে বলা হলো, যাকে পাও, দাওয়াত দাও। যেমন একবার রসূলুল্লাহ সা. করেছিলেন: আনাস রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বিয়ে করলেন, অতপর তার স্ত্রীর সাথে বাসর যাপন করলেন। তখন আমার মাতা উম্মে সুলাইম হাইস (খেজুর, ঘি ও ছাতু মিশানো খাবার) তৈরি করলেন, তারপর সেই খাবার একটি পাত্রে ঢাললেন। তারপর বললেন: এটা রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট নিয়ে যাও। আমি নিয়ে গেলাম। তিনি বললেন: এখানে রাখো। তারপর বললেন: অমুককে অমুককে এবং যাকে যাকে পাও দাওয়াত করো। তিনি যার যার নাম উল্লেখ করেছিলেন এবং যাকে যাকে পেয়েছিলাম, তাকে তাকে দাওয়াত করলাম।"-মুসলিম।
কারো কারো মতে, দাওয়াত কবুল করা ফরযে কিফায়া। কারো মতে, মুস্তাহাব। তবে প্রথমোক্ত মতটিই অধিকতর যুক্তিসংগত। এ হলো বধূর পক্ষ থেকে আয়োজিত বিবাহোৎসবের ভোজন সংক্রান্ত দাওয়াতের বিধি। বরের পক্ষ থেকে আয়োজিত বিবাহোৎসবের ভোজনের দাওয়াতে অংশগ্রহণ করা অধিকাংশ আলেমের মতানুসারে ওয়াজিব। শাফেয়ী মাযহাবের কেউ কেউ বলেন: সকল দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব। ইবনে হাযমের মতে, এই শেষোক্ত মতটি অধিকাংশ সাহাবী ও তাবেয়ীর। কেননা হাদিস থেকে সকল ধরনের দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব বলে জানা যায়, চাই তা বিয়ের উৎসবের দাওয়াত হোক বা অন্য কিছু হোক।
দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব হওয়ার শর্ত
হাফেয ইবনে হাজার ফাতহুল বারীতে বলেছেন: দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব হওয়ার জন্য ৮টি শর্ত রয়েছে:
১. দাওয়াতকারী যেন স্বনির্ভর, পরিণত বয়সের ও বুদ্ধিমান হয়। ২. দাওয়াত যেন দরিদ্রদেরকে বাদ দিয়ে শুধু ধনীদেরকে না দেয়া হয়। ৩. দাওয়াতের উদ্দেশ্য যেন কোনো ব্যক্তি বিশেষের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ বা ব্যক্তি বিশেষের প্রতি ভীতি দূর করা না হয়। ৪. দাওয়াতকারীর মুসলমান হওয়া। ৫. প্রথম দিনের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়া। ৬. যার দাওয়াত প্রথম পাওয়া যাবে তার দাওয়াত কবুল করা জরুরি। ৭. দাওয়াতের স্থানে এমন কোনো গর্হিত কাজ না হওয়া, যার উপস্থিতিতে তাতে অংশগ্রহণ করা কষ্টকর হয়। ৮. নিমন্ত্রিত ব্যক্তির কোনো ওযর না থাকা।
বগবি বলেছেন, ওযর থাকলে ও পথ দীর্ঘ হলে অনুপস্থিত থাকায় আপত্তি নেই।
দরিদ্রদের বাদ দিয়ে শুধু ধনীদের দাওয়াত করা মাকরূহ:
ওলিমায় ধনীদের দাওয়াত দেয়া ও দরিদ্রদের বাদ দেয়া মাকরূহ। কেননা আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ওলিমায় যোগদানে ইচ্ছুকদের আসতে বাধা দেয়া হয় এবং আসতে অনিচ্ছুকদের দাওয়াত দেয়া হয়, সেটাই নিকৃষ্টতম ওলিমা।” -মুসলিম।
আর আবু হুরায়রা রা. থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন: "সেই ওলিমা নিকৃষ্টতম যাতে দরিদ্রদের বাদ দিয়ে শুধু ধনীদের দাওয়াত দেয়া হয়।"
📄 অমুসলিমদের বিয়ে
অমুসলিমদের বিয়ের ব্যাপারে সাধারণ মূলনীতি: তারা ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের কৃত কাজের শরিয়ত অনুমোদিত অংশ বহাল রাখা হবে।
কাফেরদের বিয়ে শাদী কিভাবে সম্পাদিত হলো, ইসলামের শর্তাবলী অনুযায়ী না হওয়ায় তা বাতিল গণ্য হবে কিনা, এসব নিয়ে রসূলুল্লাহ সা. কখনো মাথা ঘামাননি। কেবল স্বামীর ইসলাম গ্রহণকালীন অবস্থাটা বিবেচনা করতেন। যদি তার স্ত্রীর সাথে থাকা বৈধ হতো, তবে বিয়ে বহাল রাখতেন, চাই তা জাহেলিয়াত যুগেই সম্পাদিত হয়ে থাকনা কেন এবং ইসলামের শর্তাবলী অনুসারে অভিভাবক ও সাক্ষী ইত্যাদির মাধ্যমে হয়ে থাক না কেন। আর যদি বিয়ে এমন হতো যে, তা বহাল রাখা বৈধ নয়, তাহলে বহাল রাখতেননা। যেমন যদি দেখা যেত, ইসলাম গ্রহণকালে তার স্ত্রী কোনো মাহরাম অথবা সহোদর দুই বোন বা ততোধিক বোন। এ হলো রসূল সা.-এর অনুসৃত মূলনীতি। যা কিছু এর সাথে সাংঘর্ষিক হতো, তা বহাল রাখতেননা। -আল্লামা ইবনুল কাইয়েম।
ইসলাম গ্রহণ করার সময় কারো নিকট দুই সহোদর বোন এক সাথে স্ত্রী হিসেবে থাকলে একজনকে বাদ দিয়ে অপরজনকে রাখার অনুমতি দেয়া হবে: যাহহাক বিন ফিরোয তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি, তখন আমার স্ত্রী হিসেবে ছিলো এমন দু'জন মহিলা, যারা পরস্পরে সহোদর বোন। রসূলুল্লাহ সা. আমাকে এদের একজনকে তালাক দিতে আদেশ দিলেন। -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, শাফেয়ি, দার কুতনি, বায়হাকি।
ইসলাম গ্রহণের সময় কারো চারের অধিক স্ত্রী থাকলে চারজনকে বেছে নিতে হবে: ইবনে উমর রা. বলেন: গীলান সাকাফি যখন ইসলাম গ্রহণ করলো, তখন তার কাছে জাহেলি যুগের দশজন স্ত্রী ছিল। তারা সবাই তার সাথে ইসলাম গ্রহণ করলো। তখন রসূলুল্লাহ সা. তাকে তাদের মধ্য থেকে চারজনকে বেছে নিয়ে বহাল রাখার আদেশ দিলেন। -আহমদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ, শাফেয়ি, ইবনে হাব্বান ও হাকেম।
স্বামী স্ত্রীর একজনের ইসলাম গ্রহণ: অমুসলিম অবস্থায় বিয়ে সম্পাদিত হওয়ার পর স্বামী স্ত্রী উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করলে আগেই বলা হয়েছে যে, ইসলামে অনুমোদনযোগ্য হলে উভয়কে স্বামী স্ত্রী হিসেবে বহাল নচেত বিচ্ছিন্ন করা হবে। আর যদি একজন ইসলাম গ্রহণ করে এবং অপরজন না করে, তাহলে দেখতে হবে ইসলাম গ্রহণকারী স্বামী না স্ত্রী। স্ত্রী হলে বিয়ে বাতিল এবং স্ত্রীর জন্য ইদ্দত পালন অপরিহার্য হবে। আর যদি স্বামী ইসলাম গ্রহণ করে এবং স্ত্রী তার ইদ্দতের অধীন থাকে, তবে সে ঐ স্ত্রীর জন্য অধিকতর উপযোগী। কেননা হাদিস থেকে জানা যায়, ওলীদ বিন মুগিরার মেয়ে আতেকা যখন তার স্বামী সাফওয়ানের একমাস আগে ইসলাম গ্রহণ করলো, তারপর স্বামী ইসলাম গ্রহণ করলো, তখন রসূলুল্লাহ সা. তার বিয়ে বহাল রাখবেন। ইবনে শিহাব বলেন: যখনই কোনো মহিলা হিজরত করে রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আসতো এবং তার স্বামী কাফের অবস্থায় বহাল ও কাফের এলাকায় বসবাসরত থাকতো, তখনই তার হিজরতের কারণে তার ও তার স্বামীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে যেতো। অবশ্য তার ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে তার স্বামী হিজরত করে আসলে বিয়ে বহাল থাকতো। অনুরূপ ইদ্দত শেষ হয়ে যাওয়ার পর স্বামী যদি ইসলাম গ্রহণ করে এবং উভয়ে বিয়ে বহাল রাখার ব্যাপারে একমত হয়, তবে স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে না করা পর্যন্ত তাদের আগের বিয়ে বহাল থাকবে, চাই এ সময়টা যতই দীর্ঘ হোক। রসূলুল্লাহ সা. নিজের মেয়ে যয়নবকে দু'বছর পর প্রথম বিয়ে বহাল রেখেই স্বামী আবুল আসের নিকট ফেরত পাঠান। তখন নতুন করে আকদও করাননি, মোহরও ধার্য করেননি। -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি।
ইবনুল কাইয়েম বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. ইসলাম গ্রহণকারী স্বামীর সাথে তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ না করলে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাতেননা। বরং যখন অপরজন ইসলাম গ্রহণ করতো, তখন স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে না করে থাকলে বিয়ে বহাল থাকতো। এটাই তাঁর সুবিদিত সুন্নত। ইমাম শাফেয়ি বলেন: আবু সুফিয়ান বিন হারব মাররুয যাহরানে মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলিম আবাস ভূমিতে ইসলাম গ্রহণ করে। মাররুয যাহরান ছিলো খাযায়া গোত্রের বাসস্থান। এই গোত্রে বহু মুসলমান ছিলো। আবু সুফিয়ান অতঃপর মক্কা ফিরে গেল। তার স্ত্রী হিন্দ বিন উতবা তখনো অমুসলিম। সে আবু সুফিয়ানের দাড়ি ধরে বললো, তোমরা এই বিপথগামী বুড়োকে হত্যা করো। পরে হিন্দ আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণের অনেক পরে ইসলাম গ্রহণ করে। সে কাফের ও অমুসলিম বাসভূমিতে অবস্থান করছিল আর আবু সুফিয়ান ছিলো মুসলমান। ইদ্দত পার হওয়ার পর হিন্দ ইসলাম গ্রহণ করলো এবং তাদের বিয়ে বহাল রইল। অবশ্য হিন্দের ইদ্দত তার ইসলাম গ্রহণ করা পর্যন্ত শেষ হয়নি। হাকিম বিন হিযামের ইসলাম গ্রহণও ছিলো তথৈবচ। আবু জাহলের ছেলে ইকরামার স্ত্রী মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করলো এবং মক্কা ইসলামী দেশে রূপান্তরিত হলো। মক্কায় রসূল সা.-এর শাসন চলতে দেখে ইকরামা ইয়ামানে পালিয়ে গেল। ইয়ামান তখনো দারুল হারব তথা অমুসলিম দেশ। সাফওয়ান দারুল হারব ইয়ামানে যাওয়ার ইচ্ছা করেও দারুল ইসলাম মক্কায় ফিরে গেল। সে কাফের অবস্থায় হুনাইন যুদ্ধেও যোগ দেয়। তারপর ইসলাম গ্রহণ করলো এবং তার স্ত্রীর সাথে তার বিয়ে অটুট থাকলো। কেননা তার ইদ্দত শেষ হয়নি। রসূল সা.-এর আমলের যুদ্ধ বিগ্রহের ইতিহাস সংগ্রহকারী বিদ্বানগণ উল্লেখ করেছেন, আনসারদের জনৈক মহিলা মক্কাবাসী এক ব্যক্তির স্ত্রী ছিলো। সে ইসলাম গ্রহণ করলো ও মক্কায় হিজরত করলো। সে ইদ্দতে থাকাকালেই কিছুদিন পর তার স্বামী মক্কায় এলো এবং তাদের বিয়ে বহাল থাকলো।
রওযাতুন নাদিয়া গ্রন্থের লেখক বলেছেন: স্বামী কুফরির উপর বহাল রয়েছে, এমতাবস্থায় স্ত্রীর ইসলাম গ্রহণ তালাকের পর্যায়ভুক্ত নয়। কেননা তা যদি হতো, তাহলে ইদ্দতের পর তাদের পুনর্মিলন স্ত্রীর সম্মতি ও আকদের নবায়ন ব্যতীত সম্ভব হতো না। মোটকথা, কোনো বালিগা মুসলিম নারী ইসলাম গ্রহণের পর সে যাকে ইচ্ছা বিয়ে করতে পারে। বিয়ে করার পর পূর্ব স্বামী ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে পুনরায় গ্রহণ করতে পারবেনা। আর যদি সে বিয়ে না করে, তবে সে প্রথম স্বামীর আকদের অধীন থাকে চাই আকদের নবায়ন ও সম্মতি দান করুক বা না করুক। এ হচ্ছে দলীলভিত্তিক বিধান, যদিও তা আলেমদের মতামতের সাথে সংগতিশীল হোক বা নাহোক। স্বামী স্ত্রীর একজন মুরতাদ হওয়ার বেলায়ও এই বিধি প্রযোজ্য। মুরতাদ যদি পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করে, তবে তার বিধান হবে সেই ব্যক্তির মতো যে, কাফের ছিলো এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেছে।