📄 কুরআনে তাবাররুজ প্রসঙ্গ
পবিত্র কুরআনে দুই জায়গায় তাবাররুজ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে: প্রথমত সূরা নূরে: وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاءِ اللَّتِي لَا يَرْجُونَ نِكَامًا فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَنْ يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ غَيْرَ مُتبرجات بزِينَةٍ وَأَن يَسْتَعْفِفْنَ خَيْرٌ لَّهُنَّ .
অর্থ: অধিক বয়স্কা স্ত্রীলোক যারা বিয়ের আশা পোষণ করেনা, তারা যদি তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করার উদ্দেশ্য ছাড়াই তাদের অতিরিক্ত বস্ত্র খুলে রাখে, তাহলে তাতে তাদের কোনো দোষ নেই। তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্য শ্রেয়।” (আয়াত: ৬০) দ্বিতীয়ত সূরা আহযাবে তাবাররুজকে নিষিদ্ধ করা ও এর প্রতি ধিক্কার জানানো হয়েছে:
وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَامِلِيَّةِ الأولى .
"প্রাচীন জাহেলিয়তের ন্যায় তোমরা তাবাররুজ করোনা।" (নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িওনা)। (সূরা আহযাব: আয়াত ৩৩)
📄 তাবাকরুজ ইসলাম ও সভ্যতা উভয়ের পরিপন্থী
যেসব বৈশিষ্ট্য দ্বারা মানুষ ইতর প্রাণী থেকে পৃথক হয়, তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, পোশাক ও শোভাবর্ধক উপকরণাদি ব্যবহার। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْاتِكُمْ وَرِيشًا. وَلِبَاسُ التَّقْوَى، ذَلِكَ خَيْرٌ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ، لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ .
অর্থ: হে আদম সন্তানরা। আমি তোমাদের জন্য পোশাক প্রবর্তন করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থানকেও আবৃত করে এবং বেশভূষার উপকরণও হয় এবং তাকওয়ার পোশাকই উত্তম। এটা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরা আরাফ: আয়াত ২৬)
পোশাক ও সাজসজ্জা সভ্যতা ও শালীনতার নিদর্শন। এ দুটি জিনিস না থাকা পশুত্ব স্তরের দিকে প্রত্যাবর্তনের নামান্তর। জীবন যখন তার স্বাভাবিক গতিতে বহমান থাকে, তখন তার পশ্চাদদিকে প্রত্যাবর্তন করা ততক্ষণ সম্ভব নয়, যতক্ষণ তা এমন কোনো গুরুতর অধোপতনের শিকার না হয়, যা তার মতামত ও চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তন ঘটায় এবং তাকে তার সভ্যতা ও মনুষ্যত্বের অর্জিত অগ্রগতিকে ভুলে গিয়ে বা ভুলে যাওয়ার ভান করে পেছনে দিকে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য না করে।
আর পোশাক পরা যখন উন্নত মানুষের অত্যাবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য, তখন নারীর জন্য তা আরো বেশি অত্যাবশ্যকীয়। কেননা এটাই সেই অপরিহার্য রক্ষাকবচ, যা তার ধর্ম, সম্ভ্রম, মর্যাদা, সতীত্ব, শালীনতা ও লজ্জাকে রক্ষা করে। এই মহৎ গুণগুলো নারীর সাথে অধিকতর সম্পর্কযুক্ত এবং পুরুষ অপেক্ষা নারীর জন্য অধিকতর প্রয়োজনীয়। আর এজন্য লজ্জা ও সংকোচ নারীর উৎকৃষ্টতম ভূষণ। বস্তুত নারীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো শালীনতা, লজ্জা ও সতীত্ব। আর এ গুণাবলীর সংরক্ষণ নারীর সর্বোচ্চ স্তরের মনুষ্যত্বেরই সংরক্ষণ। নারীর লজ্জা ও শালীনতা থেকে বিচ্যুত হওয়া নারীর স্বার্থেরও অনুকূল নয়, সমাজের জন্যও কল্যাণকর নয়। বিশেষত যখন যৌন আবেগ ও আকর্ষণ সর্বকালের সবচেয়ে প্রবল আবেগ ও সবচেয়ে দুর্দমনীয় আকর্ষণ। আর নির্লজ্জতা ও অশালীনতা এই আকর্ষণকে উদ্দীপিত ও উত্তেজিত করে এবং উশৃঙ্খল ও উদ্দাম করে। এর উপর যত বেশি বাধা, বন্ধন ও শৃঙ্খল আরোপ করা হবে, ততই তার উত্তেজনা ও উশৃঙ্খলতা প্রশমিত হবে, ততই তা নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং ততই তা মানুষ ও তার মনুষ্যত্বের উপযোগী শালীন ও সংযত হবে। এ কারণেই ইসলাম নারীর পোশাকের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে এবং খুঁটিনাটি বিধি বিধান বর্ণনা করা সাধারণভাবে কুরআনের রীতি না হওয়া সত্ত্বেও নারীর পোশাকের অত্যন্ত বিশদ বিবরণ দিয়েছে। যেমন সূরা আহযাবের ৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন:
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنْتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْلِيْنَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ، ذلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ ،
"হে নবী, তোমার স্ত্রীদেরকে, মেয়েদেরকে ও মুসলিম নারীদেরকে বলে দাও তারা যেনো তাদের ওড়না তাদের উপরে ছড়িয়ে দেয়। এতে সহজেই তাদেরকে চেনা যাবে। ফলে তাদেরকে ঔত্যক্ত করা হবেনা।" নবীর স্ত্রী, কন্যা ও মুসলিম নারীদেরকে সম্বোধন করা দ্বারা প্রমাণিত হয়, সকল নারীই এ নির্দেশ পালনের জন্য দায়ী। কোনো নারীই এর ব্যতিক্রম নয়, চাই তারা নবীদুহিতা ও নবী সহধর্মিণীদের পর্যায়ের পুণ্যবতীই হোক না কেন। কুরআন এ বিষয়টির প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে ও এর বিস্তারিত খুঁটিনাটি বর্ণনা করেছে। নারীর শরীরের কোন্ অংশ ঢাকতে হবে এবং কোন্ অংশ খোলা যাবে, তাও সবিস্তারে বর্ণনা করেছে:
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِمِنْ أَوْا أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ
অর্থ : হে নবী মুমিন নারীদেরকে বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, সতীত্ব রক্ষা করে এবং যা সাধারণত আপনা আপনি প্রকাশ হয়ে পড়ে, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে। আর তারা যেন তাদের চাদর নিজেদের বুকের উপর ছড়িয়ে রাখে। আর তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য কারো কাছে প্রকাশ না করে কেবল তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীদের পুত্র, ভাই, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভাগ্নে, পরিবারভুক্ত মহিলা, মালিকানাধীন দাসী, যৌন কামনামুক্ত নিষ্কাম পুরুষ এবং এমন বালক যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তারা ব্যতীত। আর তারা যেন নিজেদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে জোরে জোরে না হাঁটে।" (সূরা নূর: আয়াত ৩১)
এমনকি নারী যদি এত বয়স্কাও হয় যে, তারও কোনো যৌন কামনা নেই এবং তার উপরও কারো যৌন কামনা হয়না, তবু এটাই তার জন্যে উত্তম।
ইসলাম এ বিষয়টাকে এত গুরুত্ব দিয়েছে যে, কতো বয়সে নারী পর্দা করা শুরু করবে তাও উল্লেখ করেছে। রসূলুল্লাহ সা. বলেন: “হে আসমা, নারী বালেগা হয়ে যায়, তখন তার শুধু হাতের পাতা ও মুখমণ্ডল ব্যতীত আর কিছুই প্রকাশ করা যাবেনা।” তিনি আরো বলেছেন: "নারী যখন এগিয়ে আসে তখনও তার সাথে একটা শয়তান থাকে, আর যখন পিছিয়ে যায় তখনও তার সাথে একটা শয়তান থাকে।" বস্তুত নারী পুরুষের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক পরীক্ষার বস্তু। তাই নারীর নগ্নতা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন তার মনুষ্যত্বের সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান লজ্জা ও সম্ভ্রমকে বিনষ্ট করে এবং তাকে তার মনুষ্যত্বের স্তর থেকে নিচে নামিয়ে দেয়। এতে যদি তার মনুষ্যত্বে কলংক আরোপিত হয় তা জাহান্নামের আগুন ছাড়া আর কিছু দ্বারা পবিত্র হয়না। রসূলুল্লাহ সা. বলেন: দুই শ্রেণীর দোযখবাসীকে আমি দেখিনি : একদল হলো, হাতে গরুর লেজ আকৃতির বেত্রদণ্ডধারী পুরুষ, আর পোশাকধারিণী হয়েও নগ্ন একদল নারী, যারা মানুষকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য হেলেদুলে চলে। তারা বেহেশতে প্রবেশ তো করবেই না, এমনকি তার ঘ্রাণও পাবেনা। অথচ বহু দূর থেকে তার ঘ্রাণ পাওয়া যায়।”
নবুয়্যত যুগে রসূলুল্লাহ সা. তাবাররুজের (বেপর্দা চলাফেরার) কিছু কিছু আলামত দেখতেন এবং সেগুলোর দিকে মহিলাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতেন: এ হচ্ছে আল্লাহর বিধান থেকে বিদ্রোহের শামিল। তিনি তাদেরকে ইসলামের সহজ সরল পথে ফিরে আসতে আদেশ দিতেন, স্বামী ও অভিভাবকদেরকে এই বিকৃতি ও গোমরাহীর পরিণতির জন্য দায়ী করতেন এবং তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে সতর্ক করতেন।
১. মূসা বিন ইয়াসার রা. বলেন, তীব্র ঘ্রাণযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করে জনৈকা মহিলা আবু হুরায়রার কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। আবু হুরায়রা রা. তাকে বললেন: তুমি কোথায় যাচ্ছো? সে বললো: মসজিদে। তিনি বললেন: তুমি সুগন্ধী ব্যবহার করেছ বুঝি? সে বললো, হাঁ। আবু হুরায়রা রা. বললেন: বাড়ি ফিরে গিয়ে গোসল করে এসো। কেননা আমি রসূল সা.কে বলতে শুনেছি: আল্লাহ এমন মহিলার নামায কবুল করেন না, যার থেকে তীব্র ঘ্রাণ বের হয়, যতক্ষণ না সে বাড়িতে ফিরে গিয়ে গোসল করে।" গোসল করার নির্দেশ দেয়ার উদ্দেশ্য শুধু এই যে, তার ঘ্রাণ যেন দূর হয়ে যায়।
২. আবু হুরায়রা রা. আরো বর্ণনা করেন, রসূল সা. বলেছেন: যে মহিলা সুগন্ধী ব্যবহার করবে সে যেন জামাতে না আসে। (আবু দাউদ, নাসায়ী)
৩. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসূল সা. মসজিদে নববীতে বসেছিলেন। এমতাবস্থায় মুযায়না গোত্রের জনৈক মহিলা জাঁকজমকপূর্ণ সাজগোজ সহকারে সগর্বে মসজিদে প্রবেশ করলো। রসূল সা. তা দেখে বললেন: হে জনতা, তোমরা তোমাদের মহিলাদের মসজিদে সাজগুজে ও অহংকারের সাথে মসজিদে আসতে নিষেধ করো। কেননা বনী ইসরাইলের মহিলারা সেজেগুজে ও অহংকারের সাথে মসজিদে না আসা পর্যন্ত তারা অভিশপ্ত হয়নি। (ইবনে মাজাহ)
উমর রা. এই মারাত্মক ফেতনা সম্পর্কে শংকিত ছিলেন। এজন্য তিনি "চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম" এই নীতি অনুসারে উক্ত ফেতনা সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তার আগাম চিকিৎসা করা পছন্দ করতেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি একদিন রাতে ঘুরে ঘুরে জনগণের অবস্থা অনুসন্ধান করে বেড়াচ্ছিলেন। সহসা শুনতে পেলেন, জনৈক মহিলা বলছে: 'আহা, একটু মদ খাওয়ার কি কোনো উপায় আছে? নতুবা নাসর বিন হুজ্জাজের কাছে যাওয়ার কি কোনো উপায় আছে?'
উমর রা. তৎক্ষনাত স্বগতভাবে বললেন: "উমরের আমলে এর কোনোটারই উপায় নেই।” পরদিন সকালে তিনি নাসর বিন হুজ্জাজকে দরবারে হাজির করলেন। দেখলেন, সে একজন অতি সুদর্শন পুরুষ। এরপর তিনি তার চুল কামিয়ে দেয়ার আদেশ দিলেন। এতে তাকে আরো সুদর্শন দেখাতে লাগলো। ফলে তিনি তাকে দেশ থেকে নির্বাসিত করে সিরিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন।
📄 বিশৃংখলতার কারণ
ইসলামের সহজ সরল পথ থেকে এই বিচ্যুতির কারণ ছিলো অজ্ঞতা ও অন্ধ অনুকরণ। এরপর সাম্রাজ্যবাদ এলো এবং এই বিপথগামিতাকে আস্কারা দিয়ে তার শেষসীমায় পৌঁছিয়ে দিলো। এর ফলে একজন মুসলমান পুরুষ একজন মুসলিম নারীকে নির্দ্বিধায় অশালীন, নির্লজ্জ, রূপ ও সৌন্দর্য প্রদর্শনকারিণী, সেজেগুজে প্রকাশ্যে বিচরণকারিণী এবং বুক, গলা, পিঠ, বাহু ও পায়ের থোড়া বের করে চলাচলকারিণী রূপে দেখতে পেলো। এমনকি মুসলিম নারীরা তাদের চুল ছেটে খাটো করাতেও লজ্জা ও কুণ্ঠাবোধ করলোনা। নানা রকমের প্রসাধনী রং ও ফেস পাউডার মেখে সুগন্ধী ব্যবহার করে ও জাকজমকপূর্ণ পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানোটাও যেন তাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে গেলো। শুধু এখানেই শেষ নয়, মুসলিম যুবতীরা নানা রকম পাপাচার, ব্যভিচার, নাচগান, খেলাধুলা, থিয়েটার ও হোটেল রেস্তোরার আসরে আড্ডা জমানোকে গর্বের কাজ ও প্রগতির নিদর্শন মনে করতে লাগলো। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে ও সমুদ্রতীরে এই নৈতিক অধোপতন চরম আকার ধারণ করলো। এক পর্যায়ে এগুলো গা সওয়া হয়ে গেলো। তারপর আমরা সুন্দরী প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান করতে আরম্ভ করে দিলাম। এতে নারী শুধু পুরুষদের সামনেই আসতে লাগলোনা, বরং তার দেহের প্রতিটি অংগ পরীক্ষা নিরীক্ষার আওতায় আসতে লাগলো এবং প্রতি অংগ সকল ধরনের নারী পুরুষের চোখের সামনে মাপাজোপা হতে লাগলো। আর এসব নিকৃষ্ট উৎসাহ দানে সংবাদপত্র ও অন্যান্য গণমাধ্যম সুদূর প্রসারী ভূমিকা পালন করতে লাগলো। নারীকে এই পশুত্বের সস্তা পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে গণমাধ্যম বাহবা কুড়াতে লাগলো ও নারীকে গৌরবান্বিত করতে লাগলো। পোশাক ব্যবসায়ীরাও এই সুযোগে রমরমা ব্যবসা শুরু করে দিলো।
📄 বিশৃংখলতার পরিণাম
এই বিপথগামিতার পরিণামে পাপাচার ও ব্যভিচারের ব্যাপক প্রসার ঘটলো, পরিবারের বন্ধন ভেঙ্গে পড়লো, ধর্মীয় কর্তব্যগুলো অবহেলার শিকার হলো, শিশুদের প্রতি মনোযোগ পরিত্যক্ত হলো, দাম্পত্য জীবনে সংকট ঘনীভূত ও জটিলতর হলো এবং হালালের চেয়ে হারাম কাজ সমাজে সহজতর হলো। এক কথায়, এই বিপথগামিতায় নৈতিক অধোপতন ত্বরান্বিত হলো। এমনকি সকল ধর্মের মানুষ যেসব নৈতিক মূল্যবোধে অভ্যস্ত ছিলো তাও ধ্বংসের পথে ধাবিত হলো। এই অধোপতন ক্রমান্বয়ে এমন এক স্তরে উপনীত হলো, যা কোনো মুসলমান কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। অধোপতনের আহ্বায়করা একে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক রূপ দিলো, প্রসাধনী ব্যবহার ও সাজসজ্জার নানা রকম উপায় উদ্ভাবিত হলো, নানা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হলো এবং এসব পন্থা ও পদ্ধতি শিক্ষা দানের জন্য প্রতিষ্ঠানাদি গড়ে উঠলো।
কায়রোর দৈনিক "আল-আহরাম” পত্রিকায় "নারীর সাথে” শিরোনামে যে সকল সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, নমুনাস্বরূপ তার কয়েকটির শিরোনাম দেখুন: "আলেকজান্দ্রিয়ায় মহিলাদের কেশবিন্যাস শিক্ষা দেয়ার প্রথম বিদ্যালয়, এক মাস পর এই বিদ্যালয়ে পড়াতে আসবেন জনৈক জার্মান বিশেষজ্ঞ”। উক্ত শিরোনামের অধীন সংবাদটির সারসংক্ষেপ হলো : এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আলেকজান্দ্রিয়ার মহিলাদের কেশবিন্যাস সমিতির সদস্যদের চাঁদা দ্বারা।..... সমিতি এই বিদ্যালয়ের জন্য একটা ছোট ফ্লাটও ভাড়া নিয়েছে, যাতে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিদ্যালয়ের ভিত্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারে। সমিতি তার সকল সদস্যকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে ভাষণ দেয়ার জন্য উপস্থিত হওয়ার দাওয়াত দিয়েছে। ক্লিওপেট্রায় গতকাল সকালে সমিতির জনৈক সদস্য বিদ্যালয়টির উদ্বোধন করে ভাষণ দিয়েছেন। এ বিদ্যালয়ে কেশবিন্যাস, কেশ রঞ্জন, চুলকাটা, নখকাটা, শরীর মাজন ও ডলন ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হবে।
সমিতির সভাপতি কায়রোতে ঘোষণা করেছেন: "সমিতি আগামী মাসে কেশবিন্যাস বিষয়ে মিশরের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার লাভের জন্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে।” শুধুমাত্র কায়রোতে কেশবিন্যাসের সেলুনের সংখ্যা এক হাজারে উপনীত হয়েছে। .... নারীর রূপচর্চা, সৌন্দর্য প্রদর্শনী ও নৈতিক অধোপতনের এই উদ্দাম গড্ডালিকা প্রবাহের মুখেও এ থেকে মুসলিম পরিবারগুলোর পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষার্থে বিপরীতমুখী চিন্তাচেতনার উন্মেষ আয়োজনও থেমে নেই। ২৯/৯/১৯৬২ তারিখের দৈনিক আখবারুল ইয়াওমে নিম্নরূপ শিরোনামে একটি নিবন্ধ ছেপেছে:
"বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়কে পোশাক বিক্রির শোরুম থেকে পৃথক কিছু ভাবছে না।" উক্ত শিরোনামে নিবন্ধের লেখিকা বলেন: আজকাল প্রত্যেক বছর যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রী ভর্তি শুরু হয়, তখন পত্রপত্রিকাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের পোশাক ও মেকআপ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে নিবন্ধ, ফিচার ইত্যাদি ছাপাতে আরম্ভ করে। কেউবা তাদের সবার পোশাক এক রকম অবলম্বন করার আহ্বান জানায়। আবার কেউ তাদেরকে মেকআপ থেকে বিরত রাখার দাবি জানায়। আমি এসব মতামত সমর্থন করিনা। কেননা আমি মনে করি, তরুণীদের ইচ্ছাধীন পোশাক নির্বাচন তাদের ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে এবং তার স্বতন্ত্র রুচি গড়তে সাহায্য করে।
....অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা একক পোশাক পরেনা এবং তাদেরকে মেকআপ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়না। তবুও আমি এসব চরমপন্থী মতামত পোষণকারীদেরকে প্রায়ই ভর্ৎসনা করে থাকি। কেননা আমাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণীরাই তাদেরকে এ ধরনের দাবি জানাতে উদ্বুদ্ধ করে। তারা জানেনা কিভাবে তাদের উপযুক্ত পোশাক ও মেকআপ নির্বাচন করবে। আসলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও পোশাকের শোরুমের মধ্যে পার্থক্যই করতে পারেনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। তারা প্রায়শ এমন টাইট পোশাক ও হাইহিল পরে ক্যাম্পাসে যায় যে, সহজ ও সাবলীলভাবে চলাফেরাই করতে পারেনা। তারা কখনো বইপুস্তক ও লেকচার সিট সাথে নিতে ভুল করলেও করতে পারে, কিন্তু সাজসজ্জা ও প্রসাধনী উপকরণ সাথে নিতে কখনো ভোলেনা। আমার মতে, এসবের মূল কারণ হলো, আজকালকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা পাঠাভ্যাসকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়না এবং তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে তার সাজসজ্জাকে। প্রকৃতপক্ষে এর বিপরীত হওয়াই সমীচীন। কেননা এখন এমন একটা সময় চলছে যখন নারী শিক্ষার উচ্চতর মূল্যায়ন হচ্ছে। এর অর্থ এ নয় যে, আমি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণীদের পোশাক ও সাজসজ্জাকে অবজ্ঞা করছি। আমি শুধু অধ্যয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া এবং এরপরে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দিয়ে চেহারার মেকাপ করার আহ্বান জানাচ্ছি। ক্যাম্পাসের খাতিরে না হলেও ত্বকের যত্নের খাতিরেই এটা করা দরকার। কেননা বেশি মেকাপ ত্বকের ক্ষতিসাধন করে, বিশেষতঃ এমন বয়সে, যখন কৃত্রিম মেকআপের চেয়ে চেহারার স্বাভাবিক লাবণ্য অধিকতর সুন্দর লাগে। সেই সাথে আঁটসাট পোশাকের পরিবর্তে সহজ আরামদায়ক ঢিলেঢালা পোশাক পরার আহ্বান জানাই। কেননা এই বয়সের তরুণীর জীবনের প্রথম ও শেষ লক্ষ্য উগ্র মেকাপ উৎকট সাজসজ্জা দ্বারা দৃষ্টি আকর্ষণ করা নয়। "আজ তার অগ্রাধিকার দিতে হবে নিজেকে বিদ্যাবুদ্ধিতে ক্ষুরধার করা ও সুসভ্য রুচি দ্বারা সমৃদ্ধ করাকে।" এখন ডাইরেক্টরের টেলিফোন ধরার জন্য সেক্রেটারীর আসনে বসা তার সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। তার সামনে এখনও মন্ত্রীত্বের আসন উন্মুক্ত রয়েছে। অপর এক বৃটিশ মহিলা সাংবাদিক কায়রো সফরের পর এক নিবন্ধে কায়রোর উগ্র আধুনিক মহিলাদের সমালোচনা করে লিখেছেন:
"বিমানবন্দরে নেমেই আমি দুঃখ পেয়েছি। আমি ভেবেছিলাম, আমি সঠিক অর্থেই প্রাচ্য ললনার সাক্ষাত পাবো। এ দ্বারা আমি বোরকা নিকাব পরা পর্দানশীল মহিলার কথা বলছিনা। আমি বলছি সেই রুচিবতী প্রাচ্য বৈশিষ্ট্যধারী কর্মোপযোগী পোশাক পরা প্রাচ্য ললনার কথা, যে প্রাচ্যের পদ্ধতিতেই চলাফেরা করে। কিন্তু আমি সে সবের কিছুই পেলাম না। যে কোনো ইউরোপীয় বিমানবন্দরে যে ধরনের মহিলার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, এখানে সে ধরনের মহিলারই সাক্ষাৎ পেলাম। একই বেশভূষা, একই ধরনের কেশবিন্যাস, একই মেকাপ, এমনকি কথা বলা ও চলা ফেরার ভাবভংগীও একই রকম। এমনকি ক্ষেত্রভেদে ভাষাও-কারো বা ইংরেজী, কারো ফরাসী। প্রাচ্য ললনার এ ধারণা আমাকে কষ্ট দিয়েছে যে, পাশ্চাত্য ললনার মতো বেশভূষা ও কৃষ্টি অবলম্বন করলেই পাশ্চাত্য নারীর অনুকরণ হয়ে যায়। তারা ভুলে গেছে যে, তারা নিজেদের নয়নাভিরাম প্রাচ্য পোশাক ও বেশভূষা নিয়েও উন্নতি ও অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।"
১৯৬২ সালের ৯ই জুন শনিবারের দৈনিক 'আস-সাবত' পত্রিকায় নিম্নোক্ত শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করা হয় : "মার্কিন লেখিকার অনুরোধ: যুবক যুবতীর অবাধ মেলামেশা বন্ধ করুন, নারী স্বাধীনতা সীমিত করুন।" উক্ত শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও খোলামেলা বক্তব্য তুলে ধরে পত্রিকাটি বলেছে: "মার্কিন মহিলা সাংবাদিক হেলসিয়ান ক্যান্সবেরী" কয়েক সপ্তাহ অবস্থানের পর সম্প্রতি কায়রো ত্যাগ করেছেন। সফরকালে তিনি বিভিন্ন স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, যুবক অধ্যুষিত বিভিন্ন ক্যাম্প, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, কিশোর কেন্দ্রসমূহ, বিভিন্ন এলাকার নারী, শিশু কেন্দ্র ও বিভিন্ন পরিবার পরিদর্শন করেন। এটা ছিলো আরব্য সমাজে পরিবার ও যুব সমস্যাবলীর তত্ত্বানুসন্ধানমূলক সফর। হেলসিয়ান প্রায় ২৫০টি মার্কিন পত্রিকার সংবাদদাতা ভ্রাম্যমান সাংবাদিক। তিনি প্রতিদিন একটি নিবন্ধ পাঠান। যা লক্ষ লক্ষ লোক পড়ে এবং যা অনূর্ধ বিশজন তরুণ তরুণীর সমস্যাবলী নিয়ে লেখা হয়। তিনি বিশ বছরের বেশি সময় ব্যাপী রেডিও ও টেলিভিশনে চাকরি করছেন ও বিশ্বের সকল দেশ সফর করেছেন। বর্তমানে তার বয়স পঞ্চান্ন বছর। মিশরে এক মাস অবস্থানের পর এই মার্কিন মহিলা সাংবাদিক তার রিপোর্টে বলেন :
"আরব সমাজ একটি পূর্ণাঙ্গ ও শান্তিপ্রিয় সমাজ। এ সমাজে বসবাসকারীদের জন্য এ সমাজের রীতিনীতি ও ঐতিহ্য অনুসরণ করাই সমীচীন। সে ঐতিহ্য যুবক যুবতীদের উপর যুক্তিসংগত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এ সমাজ ইউরোপীয় ও মার্কিন সমাজ থেকে পৃথক। এ সমাজে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এমন ঐতিহ্য রয়েছে, যা নারীর উপর বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, পিতামাতার প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধাকে বাধ্যতামূলক করে এবং সর্বোপরি, পাশ্চাত্যের সেই লাগামহীন বেলেল্লাপনাকে প্রত্যাখ্যান করা বাধ্যতামূলক করে যা বর্তমানে আমেরিকা ও ইউরোপের সমাজ ও পরিবারের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। তাই আরব সমাজ অনূর্ধ বিশ বছর বয়স্কাসহ সকল কিশোরী ও তরুণীর উপর যেসব কড়াকড়ি ও বিধিনিষেধ আরোপ করে, তা তাদের জন্য উপযোগী ও কল্যাণকর। তাই আমি আরবদেরকে পরামর্শ দিচ্ছি, আপনাদের নৈতিকতা ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করুন, অবাধ মেলামেশা বন্ধ করুন এবং কিশোরী যুবতীদের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত করুন এবং পর্দার যুগে ফিরে যান। আপনাদের জন্য এটা অবাধ ও লাগামহীন স্বাধীনতা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং মার্কিন ও ইউরোপীয় নির্লজ্জতার চেয়ে উত্তম। বিশ বছর বয়সের নিচে তরুণ তরুণীদের মেলামেশা বন্ধ করুন। আমরা আমেরিকা এ দ্বারা অনেক দুর্ভোগ পোহায়েছি। সব ধরনের বেলেল্লাপনা ও স্বেচ্ছাচারিতায় ভরপুর মার্কিন সমাজ পঙ্গু সমাজে পরিণত হয়েছে। বিশ বছর বয়সের নিচে বেলেল্লাপনা, স্বেচ্ছাচারিতা ও অবাধ মেলামেলার শিকার তরুণ তরুণীরা মার্কিন কারাগার, পানশালা ও গোপন গৃহসমূহে বসবাস করছে। যে স্বাধীনতা আমরা আমাদের অল্প বয়স্ক কিশোর কিশোরীদেরকে দিয়েছিলাম, তা তাদেরকে সন্ত্রাসী, মাদক সেবী ও মদ্যপায়ী বানিয়েছে। মার্কিন ও ইউরোপীয় সমাজে অবাধ মেলামেশা, স্বেচ্ছাচারিতা ও লাগামহীন স্বাধীনতা পরিবারগুলোর অস্তিত্বকে হুমকির সম্মুখীন করেছে এবং নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে সংকটাপন্ন করেছে। বিশ বছরের কম বয়স্কা কিশোরী আধুনিক সমাজে যুবকদের সাথে মেলামেশা করে, নাচে, মদপান করে, ধূমপান করে ও মাদক সেবন করে। আর এ সবই করে ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে। আমেরিকায় ও ইউরোপে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বিশ বছরের কম বয়স্কা তরুণী তার পরিবারের চোখের সামনেই যার সাথে ইচ্ছা খেলাধুলা ও মেলামেশা করে। বরঞ্চ সত্যি বলতে কি, তার পিতামাতা, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকদেরকে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অবাধ মেলামেশার অধিকারের নামে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েই এসব করে। কয়েক মিনিটেই একজনকে বিয়ে করে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার কাছ থেকে তালাক নিয়ে নেয়। কখনো বা পুনঃবিয়ে ও পুনঃতালাকও।