📄 স্বামীর গৃহে স্ত্রীকে আটকে রাখা
স্বামীর গৃহে স্ত্রীকে আটকে রাখা অর্থাৎ স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে বের হবার অনুমতি না দেয়ার অধিকার স্বামীর রয়েছে। তবে পিতামাতাকে দেখতে যাওয়া থেকে বিরত রাখা যাবেনা। স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়াই সপ্তাহে একবার অথবা সংশ্লিষ্ট এলাকায় যেরূপ রীতিপ্রথা প্রচলিত আছে, তদনুসারে পিতামাতাকে দেখতে যেতে পারবে। কেননা রক্ত সম্পর্ক রক্ষা করার জন্য এটা অপরিহার্য ও ওয়াজিব। পিতামাতা অসুস্থ হলে তাদের পরিচর্যা করার মতো অন্য কেউ থাকলে সে তাদের পরিচর্যার জন্যও স্বামীর অসম্মতি অগ্রাহ্য করেও যেতে পারবে। কেননা এটা ওয়াজিব। স্বামীর অধিকার নেই তাকে তার ওয়াজিব কাজ থেকে বাধা দেয়ার। তবে সেই বাসগৃহটা স্ত্রীর বসবাসের যোগ্য হওয়া এবং দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে এমন হওয়া শর্ত। এ ধরনের বাসগৃহই শরিয়তসম্মত বাসগৃহ নামে আখ্যায়িত। বাসগৃহ যদি স্ত্রীর বাসযোগ্য না হয় এবং যে দাম্পত্য অধিকার অর্জন বিয়ের উদ্দেশ্য, তা অর্জনে করার উপযোগী না হয়, তাহলে সেই বাড়িতে বাস করতে স্ত্রী বাধ্য নয়। কেননা সে বাড়িটি শরিয়তসম্মত বাড়ি নয়। যেমন- বাড়িতে এমন অন্যান্য লোকও বাস করে, যারা তার সাথে একত্রে বাস করলে তার পক্ষে দাম্পত্য জীবন যাপন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা, অথবা তাদের উপস্থিতির কারণে স্ত্রীর ক্ষতি হয় অথবা তাদের কারণে তার আসবাবপত্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশংকা থাকে, কিংবা সে বাড়িতে যদি প্রয়োজনীয় আবাসিক সুযোগ সুবিধা ও সাজসরঞ্জাম না থাকে, কিংবা তার পরিবেশ স্ত্রীর নিকট ভীতিপ্রদ ও অস্বস্তিকর মনে হয়, কিংবা যদি প্রতিবেশিরা খারাপ হয়।
📄 স্ত্রীকে নিয়ে বাসস্থান স্থানান্তর
স্বামী তার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে যেখানে ইচ্ছা স্থানান্তরিত হতে পারে। কেননা আল্লাহ বলেছেনঃ أَسْكُنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وَجَدِكُمْ وَلَا تُضَارُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُوا عَلَيْهِنَّ ۚ অর্থ: তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যে ধরনের গৃহে তোমরা বাস করো, তোমাদের স্ত্রীদেরকেও সে ধরনের গৃহে বাস করতে দাও। তাদেরকে সংকটে ফেলার উদ্দেশ্যে উত্যক্ত করোনা।" (সূরা তালাক: আয়াত ৬)
স্ত্রীদেরকে সংকটে ফেলা ও উত্যক্ত-উৎপীড়ন করার বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা এ আয়াতে উচ্চারিত হয়েছে, তা থেকে বুঝা যায়, স্ত্রীকে অন্য বাড়িতে স্থানান্তরের উদ্দেশ্যও যেন সংকটে ফেলা ও উত্যক্ত করা না হয়। বরং এর উদ্দেশ্য হওয়া চাই একত্রে বসবাস করা এবং বিয়ের উদ্দেশ্য সফল করা। পক্ষান্তরে স্থানান্তর করতে চাওয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর উদ্দেশ্য যদি হয় তাকে সংকটে ফেলা ও কষ্ট দেয়া, যেমন সে এ দ্বারা মহরের অংশবিশেষ স্বামীকে উপহারস্বরূপ ফেরত দিক, অথবা স্বামীর উপর স্ত্রীর যে খোরপোষ দেয়া ওয়াজিব তার খানিকটার দাবি ছেড়ে দিক, অথবা সে বাড়িটা স্ত্রীর জন্য নিরাপদ না হয়, তাহলে স্ত্রীর অধিকার রয়েছে, সেই নতুন বাড়িতে যেতে অস্বীকার করার। আদালত তাকে নতুন বাড়িতে যাওয়ার আদেশ প্রত্যাখ্যান করার অধিকার দিতে পারবে। এ অধিকার ব্যবহারের জন্য ফকীহগণ এ শর্তও আরোপ করেছেন যে, স্ত্রীকে ভিন্ন বাড়িতে স্থানান্তর করতে গিয়ে তার ক্ষতি যেন না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে, যেমন পথের বিপদসংকুল হওয়া, স্ত্রীর অসহনীয় কঠিন পরিশ্রম করতে বাধ্য হওয়া, নতুন বাড়িতে শত্রুর উৎপাতের আশংকা থাকা ইত্যাদি। স্ত্রী যদি এসব সমস্যার কোনো একটিরও আশংকাবোধ করে, তবে সে স্থানান্তরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারবে। প্রসঙ্গত একটি বিচার বিভাগীয় স্মারক থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
"যেহেতু দম্পতির বাসস্থান স্থানান্তর করা ও না করার লাভজনক হওয়ার কোনো বাঁধাধরা রূপরেখা নেই, তাই ফকীহগণ একে অনির্দিষ্টই রেখেছেন। তারা এর কোনো সম্ভাব্য রূপরেখার উল্লেখ না করে বিষয়টিকে বিচারকের প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও ন্যায়বিচারের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। কেননা এটা তো দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, শুধুমাত্র স্ত্রীর দিক থেকে স্বামীর নিশ্চিন্ত হওয়াই তাকে স্থানান্তরে বাধ্য করার লাভজনকতা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং এ ব্যাপারে স্বামী ও স্ত্রীর এবং যে জায়গায় ও যে জায়গা থেকে তারা স্থানান্তরিত হচ্ছে, তার অন্যান্য অবস্থাও বিবেচনা করতে হবে। যেমন (১) এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সুবিধা, যা স্থানান্তরিত হওয়া ছাড়া অর্জন করা যায়না, (২) স্বামী-স্ত্রীর সফরের ব্যয় নির্বাহ করার পরও তার হাতে এতটা অর্থ উদ্বৃত্ত থাকবে যে, তা দিয়ে সে ব্যবসা করলে এত লাভ করতে পারবে বলে প্রবল ধারণা হয়, যা দ্বারা স্বামীর নিজেরও গোটা পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা যায়, কিংবা এমন কোনো কারিগরি পেশায় নিয়োজিত হতে পারে, যা তার ও গোটা পরিবারের জীবিকা উপার্জনে সহায়ক, (৩) দুই এলাকার যাতায়াতের রাস্তা জান, মাল ও সম্ভ্রমের জন্য নিরাপদ, (৪) স্ত্রী এতটা সুস্থ ও সবল যে, যেখানে সে বর্তমানে বাস করছে, সেখান থেকে নতুন জায়গায় সফর করার যাবতীয় কষ্ট সহ্য করতে সক্ষম, (৫) যে স্থানে স্থানান্তরিত হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা নানা রকমের রোগ, মহামারী উপদ্রুত না হয়, (৬) উভয় এলাকার মধ্যে ঠাণ্ডা ও গরমের মাত্রায় এত ব্যবধান না হয়, যা শরীরের পক্ষে অসহনীয়, (৭) নতুন জায়গায় স্ত্রীর মান সম্ভ্রম মূল জায়গার মতোই সুরক্ষিত ও নিরাপদ থাকবে, (৮) স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে স্ত্রীর আর্থিক, শারীরিক ও নৈতিক ক্ষতি না হয়। এ ধরনের আরো বহু বিষয় এরূপ পরিস্থিতিতে বিবেচনা করতে হয়, যা স্থান কাল ও পাত্রভেদে বিভিন্ন হতে পারে এবং যা দক্ষ বিচারকের দৃষ্টি এড়ায়না।” এ বিষয়ে এটাকে একটা উত্তম বিবরণ বলা যেতে পারে।
📄 স্ত্রীকে তার বাড়ি থেকে বের না করার শর্ত
যে ব্যক্তি এরূপ শর্তে কোনো মহিলাকে বিয়ে করে যে, তার বাড়ি থেকে তাকে বের করবেনা কিংবা তার শহর ব্যতীত অন্য অন্য শহরে নিয়ে যাবেনা, তার জন্য এ শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক। কেননা বুখারি ও মুসলিম উকবা ইবনে আমের রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে শর্ত দিয়ে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের যৌন সম্ভোগ হালাল করেছ, সে শর্ত পুরা করাই সর্বাধিক অগ্রগণ্য।" এটা ইমাম আহমদ, আওযায়ি ও ইসহাক বিন রাহওয়াইর অভিমত। অন্যান্য ফকীহদের মতে, এ শর্ত পূরণ করা জরুরি নয়। স্ত্রীকে তার মূল বাসস্থান থেকে স্থানান্তরিত করার অধিকার স্বামীর রয়েছে। তারা এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন: "সেই শর্ত পূরণ করাই জরুরি, যা মহর ও আকদের দাবি অনুযায়ী দাম্পত্য অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট। যা আকদের দাবি নয়, তা পূরণ করা জরুরি নয়। বিয়ের শর্তাবলী ও তা নিয়ে আলেমদের মতভেদ ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে।
📄 স্ত্রীকে কাজ করতে না দেয়া
আলেমগণ স্ত্রীর কাজকে দুই শ্রেণীতে বিন্যস্ত করেছেন: এক ধরনের কাজ হলো, যা স্বামীর অধিকার বিনষ্ট করে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে বা তাকে বাড়ির বাইরে যেতে বাধ্য করে। আরেক ধরনের কাজ হলো, যাতে কোনো ক্ষতি হয়না। প্রথমটিকে স্ত্রীর জন্য অবৈধ ও দ্বিতীয়টিকে বৈধ বলে অভিহিত করেছেন। হানাফী ফকীহদের মধ্যে ইবনে আবেদীন বলেছেন: যে কাজ স্বামীর অধিকার ক্ষুণ্ণ করে বা তার ক্ষতিসাধন করে বা স্ত্রীকে ঘরের বাইরে যেতে বাধ্য করে, তা থেকে স্ত্রীকে বিরত রাখা যেতে পারে। যে কাজে কোনো ক্ষতিসাধনের অবকাশ নেই, তা থেকে বাধা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে শুধু মহিলারাই করতে পারে এমন ফরযে কেফায়ার কাজ যদি কোনো মহিলা পেশা হিসেবে গ্রহণ করে যেমন ধাত্রীমাতার কাজ। তবে সে কাজের জন্য বাড়ির বাইরে যেতে স্ত্রীকে বাধা দেয়ার অধিকার স্বামীর নেই।