📄 সহবাসের সময় বিসমিল্লাহ্ বলা
সহবাসের সময় আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়া সুন্নত। বুখারি ও মুসলিম ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন: بِسْمِ الله ... اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ، وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا .
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমাদের কোনো ব্যক্তি স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হওয়ার প্রাক্কালে যদি বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম, আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শায়তান ওয়া জান্নিবিশ শয়তানা মা রযাকতানা" (পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে, হে আল্লাহ আমাদেরকে শয়তান থেকে দূরে রাখো এবং আমাদের ভাবি সন্তান থেকে শয়তানকে দূরে রাখো) তাহলে সেই সহবাসের ফলে তাদের দু'জনের জন্য যদি কোনো সন্তান বরাদ্দ করা হয়, তাহলে শয়তান সেখানে সেই সন্তানের ক্ষতি করতে পারবেনা।
📄 সহবাস চলাকালে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সহবাস সংক্রান্ত বাক্যালাপ
সহবাসের বিষয় আলোচনা করা ও অন্যদেরকে জানানো শিষ্টাচারের পরিপন্থী এবং একেবারেই নিরর্থক ও নিষ্প্রয়োজন। এ বিষয়ে কিছু বলার একান্ত প্রয়োজন দেখা না দিলে এটা পরিহার করাই বাঞ্ছনীয়। সহীহ হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, নিষ্প্রয়োজনীয় জিনিস পরিহার করা ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ। আল্লাহ তায়ালাও বেহুদা ও নিষ্প্রয়োজন জিনিস পরিহারকারীদের প্রশংসা করেছেন
وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ "(মুক্তি পাবে তারাও) যারা বেহুদা কাজ ও কথা পরিহার করে।" (সূরা মুমিনুন: ৩)
অবশ্য এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলা অনিবার্য হয়ে পড়লে তাতে দোষ নেই। জনৈকা মহিলা রসূল সা.-এর নিকট অভিযোগ করেছিল যে, তার স্বামী তার সাথে সহবাসে অক্ষম। তখন তার স্বামী বললো, “হে রসূলুল্লাহ, আমি তাকে পাকা চামড়া যেভাবে ঝাঁকানো হয় সেভাবে ঝাঁকাই।" তবে স্বামী বা স্ত্রী যখন সহবাসের বিস্তারিত বিবরণকে অত্যাবশ্যক পর্যায়ের চেয়ে বেশি সম্প্রসারিত করে এবং উভয়ের মধ্যকার গোপন কাজের খুঁটিনাটি প্রকাশ করে, তখন তা হারাম কাজ হয়ে যায়। আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লার দৃষ্টিতে খারাপ বিবেচিত হবে সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সাথে গোপনে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে গোপনে মিলিত হয়, অতপর সেই গোপন মিলনের কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করে।” (আহমদ) আর আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. নামায পড়ালেন। সালাম ফেরানোর পর নামাযীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন পুরুষ কেউ আছে কি, যে তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ও সতর খোলে, তারপর বের হয়ে লোকজনকে বলে, “আমার স্ত্রীর সাথে এরূপ এরূপ করছি" লোকেরা চুপ থাকলো। এরপর তিনি মহিলাদের দিকে মুখ ফেরালেন এবং বললেন, তোমাদের মধ্যে কোনো মহিলা এমন আছে কি যে এসব কথা প্রকাশ করে? তখন জনৈকা যুবতী হাঁটুর উপর ভর করে ঘাড় উঁচু করে মাথা তুলতে লাগলো, যাতে রসূল সা. তাকে দেখতে পান ও তার কথা শুনতে পান। সে বললো, জ্বি, আল্লাহর কসম, পুরুষরাও এসব বিষয়ে কথা বলেন, মহিলারাও বলে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, "তোমরা জানো, যারা এ রকম করে, তাদের উদাহরণ কী? যারা এ ধরনের কাজ করে তারা সেই শয়তান পুরুষ ও শয়তান মহিলার মতো, যাদের একটা সড়কের উপর পরস্পরের সাক্ষাৎ হয়, আর তখনই জনতার চোখের সামনেই পুরুষটি মহিলারটির সাথে নিজের লালসা চরিতার্থ করে।” (আহমদ, আবু দাউদ)
📄 অস্বাভাবিক পন্থায় যৌন লালসা চরিতার্থ করা
নারীর মলদ্বারে সহবাস করা অত্যন্ত ঘৃণ্য, স্বভাব বিরুদ্ধ ও হারাম কাজ। আল্লাহ বলেন:
নِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ فَأْتُوا حَرْثَكُمْ أَنَّى شِئْتُمْ . "তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্রস্বরূপ। কাজেই তোমাদের ক্ষেতে তোমরা যেভাবে ইচ্ছা যেতে পারো।" শস্য ক্ষেত বলা হয় সেই ভূমিকে যাতে চাষ করা হয় ও বীজ বোনা হয়। (সূরা বাকারা, ২২৩)। এখানে, শস্যক্ষেত দ্বারা সন্তান প্রজননের ক্ষেত্র বুঝানো হয়েছে। আর শস্যক্ষেতে যাওয়ার আদেশ দ্বারা স্পষ্টতই নারীর যৌনাঙ্গে সহবাস বুঝানো হয়েছে। কেননা একমাত্র যোনিপথ দিয়েই সন্তান প্রজনন সম্ভব। আরব কবি বলেন:
"জরায়ু আমাদের জন্য শস্যক্ষেত। সেখানে চাষ করাই আমাদের কর্তব্য। আর ফসল ফলানো আল্লাহর কাজ।” উল্লিখিত আয়াত নাযিল হওয়ার উপলক্ষ প্রসংঙ্গে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে: “রসূলুল্লাহ সা. এর আমালে ইহুদীরা ধারণা করতো যে, স্বামী যদি স্ত্রীর পশ্চাতদিক থেকে যৌনাংগে সংগম করে, তবে সন্তান টেরাচোখা হয়। এ ব্যাপারে আনসারগণ ইহুদীদের অনুসরণ করতো। এজন্য আল্লাহ নাযিল করলেন, তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত। কাজেই তোমাদের শস্যক্ষেতে তোমরা যেভাবে ইচ্ছা যাও।” অর্থাৎ সন্তান উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে যৌনাংগে সংগম করলেই হলো, তা যেভাবেই হোক।
মলদ্বারে সংগম করায় নিষেধাজ্ঞা সম্বলিত একাধিক হাদিস এসেছে। আহমদ, তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "নারীদের মলদ্বারে সংগম করোনা।” রসূল সা. আরো বলেছেন, মলদ্বারে সংগম লুত আ. এর জাতির কাজ।” আহমদ আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর মলদ্বারে সংগম করে সে অভিশপ্ত।”
ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, স্বামী যখন স্ত্রীর মলদ্বারে সংগম করে আর স্ত্রী তাতে স্বামীর আনুগত্য করে, তখন উভয়কেই শাস্তি দেয়া হবে। নচেত উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো হবে।
📄 আযল ও জন্ম নিয়ন্ত্রণ
[যৌনাংগের বাইরে বীর্যপাত করা] ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, ইসলাম জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে সমর্থন করে। কেননা এটা জাতিসমূহের শক্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক। একমাত্র জনবহুল জাতিই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। রসূল সা.-এর নিম্নোক্ত উক্তি এটিকে শরিয়তের দৃষ্টিতেও জরুরি সাব্যস্ত করে, “তোমরা অধিক সন্তান প্রসবিনী মমতাময়ী নারীদেরকে বিয়ে করো। কেননা কেয়ামতের দিন আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করবো।” তথাপি ইসলাম বিশেষ বিশেষ অবস্থায় সন্তান সংখ্যা সীমিত করতে নিষেধ করে না, চাই তা গর্ভনিরোধক ওষুধ ব্যবহার দ্বারা হোক কিংবা অন্য কোনো উপায়ে হোক।
কোনো ব্যক্তি যদি এত বেশি সন্তানের অধিকারী হয় যে, তাদেরকে সঠিকভাবে লালন পালনে সক্ষম নয়, তাহলে তার জন্য জন্ম নিয়ন্ত্রণ বৈধ। অনুরূপ, যখন স্ত্রী দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারিণী হয়, কিংবা তার বিরতিহীনভাবে গর্ভধারণ করার আশংকা থাকে, অথবা স্বামী দরিদ্র হয়। এসব অবস্থায় সন্তান প্রজননকে সীমিত করা জায়েয। এমনকি কোনো কোনো আলেমের মতে, এসব অবস্থায় জন্ম নিয়ন্ত্রণ শুধু জায়েয নয় বরং মুস্তাহাব। অধিক সংখ্যক সন্তান প্রসবে স্ত্রীর সৌন্দর্যহানির আশংকা থাকলেও ইমাম গাযযালীর মতে, জন্ম নিয়ন্ত্রণ বৈধ। কিছু সংখ্যক আলেম শর্তহীনভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। তাদের প্রমাণ নিম্নরূপ:
১. বুখারি ও মুসলিম জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেন: “আমরা রসূল সা.-এর আমলে কুরআন নাযিল হতে থাকা অবস্থায় আযল করতাম।
২. জাবের থেকে মুসলিম বর্ণনা করেন: "আমরা রসূল সা.-এর আমলে আযল করতাম। এটা জেনেও রসূল সা. আমাদের নিষেধ করেননি।"
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, আমরা বেশ কয়েকজন সাহাবি সম্পর্কে জেনেছি যে, তারা এর অনুমতি দিয়েছেন এবং এতে কোনো আপত্তি করেননি। বায়হাকি বলেছেন, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, আবু আইয়ুব আনসারি, যায়দ বিন ছাবেত, ইবনে আব্বাস প্রমুখ আযলকে জায়েয মনে করতেন। এটা মালেক ও শাফেয়ীর মত। উমর ও আলী রা. একমত ছিলেন যে, গর্ভস্থ ভ্রূণ সাতটি পর্যায় অতিক্রম না করলে তা নষ্ট করাকে শিশু হত্যা বলা যাবেনা। কাযী আবু ইয়ালা বর্ণনা করেছেন, উমরের নিকট আলী, যুবায়ের ও সাদসহ কতিপয় সাহাবি বসেছিলেন এবং আযল সম্পর্কে কথা বলছিলেন। তারা সবাই বলেন, এতে কোনো বাধা নেই। এক ব্যক্তি বললো, কেউ কেউ তো একে ছোট আকারের শিশু হত্যা বলে আখ্যা দিচ্ছে। আলী রা. মত দিলেন, শিশু হত্যা গণ্য হবে কেবল সাতটি স্তর অতিক্রম করার পর হত্যা করলে প্রথমে কাদামাটি, তারপর বীর্য, তারপর মাটিরক্ত, তারপর গোশতের টুকরো, তারপর হাড়গোড়, তারপর গোশত, তারপর পূর্ণাঙ্গ অবয়ব। উমর রা. বললেন, আপনি ঠিক বলেছেন, আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন। যাহেরী মাযহাবের আলেমগণ বলেন, গর্ভনিরোধ সম্পূর্ণরূপে হারাম। কেননা জুয়াসা বিনতে ওহাব বর্ণনা করেছেন : "একজন লোক রসূল সা. কে জিজ্ঞাসা করলো আযল কেমন? তিনি জবাব দিলেন, এটা গোপন শিশু হত্যা।"
ইমাম গাযযালী এই প্রমাণ খণ্ডন করে বলেন, একাধিক সহীহ হাদিস থেকে আযল বৈধ প্রমাণিত হয়। উল্লিখিত হাদিসে "গোপন শিশু হত্যা" কথাটা "গোপন শিরক" এর সাথে তুলনীয়। এ দ্বারা মাকরূহ প্রমাণিত হয়, হারাম প্রমাণিত হয়না। আর মাকরূহ অর্থ হচ্ছে অপছন্দনীয়। হানাফিদের কেউ কেউ মনে করেন, স্ত্রী অনুমতি দিলে আযল জায়েয, অন্যথায় মাকরূহ।