📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সদ্ব্যবহার

📄 সদ্ব্যবহার


স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সর্বপ্রথম যে কর্তব্য তা হলো, তার সাথে ভদ্রজনোচিত আচরণ করা। সদ্ব্যবহার করা, প্রচলিত নিয়মে তার সাথে আচরণ করা, যতদূর সম্ভব এমন আচরণ করা, যা তার মনে স্বামীর প্রতি মমত্ব জন্মায় এবং তার পক্ষ থেকে বিরক্তিকর কিছু পাওয়া গেলে তার প্রতি ধৈর্যধারণ করা। আল্লাহ বলেন: وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَ يَجْعَلَ اللَّهُ فِيْهِ خَيْرًا كَثِيرًا
অর্থ: স্ত্রীদের সাথে প্রচলিত নিয়মে ভালো ব্যবহার করো। তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ করো। তাহলে মনে রেখো, তোমরা হয়তো কোনো জিনিসকে অপছন্দ করবে, অথচ আল্লাহ তার মধ্যে প্রচুর কল্যাণ রেখেছেন।" (সূরা নিসা: আয়াত ১৯)
উঁচুমানের নৈতিকতা ও ঈমানের অগ্রসরতার একটি আলামত হলো, নিজের পরিবার পরিজনের প্রতি কোমল হৃদয় ও বন্ধুভাবাপন্ন হওয়া। রসূলুল্লাহ সা. বলেন: মুমিনরে মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী তিনিই, যিনি সর্বাধিক সুন্দর স্বভাব চরিত্রের অধিকারী। আর তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম, তারাই তোমাদের মধ্যে উত্তম।” আর স্ত্রীর প্রতি ভদ্রতা সৌজন্য প্রদর্শন করা পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্বের লক্ষণ। আর স্ত্রীর সাথে অপমানজনক আচরণ করা হীনতা ও ইতরামির লক্ষণ। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার কেবল মহান ব্যক্তিই করে, আর তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে কেবল নিন্দিত ব্যক্তি।" স্ত্রীর সাথে সহৃদয় ও মনোরঞ্জনমূলক আচরণ করা, আদর সোহাগ ও রসিকতা করাও তার প্রতি ভদ্রজনোচিত ও সৌজন্যমূলক আচরণের অংশ। রসূলুল্লাহ সা. আয়েশা রা. এর সাথে সহৃদয় ও মনোরঞ্জনমূলক আচরণ করতে গিয়ে কখনো কখনো প্রতিযোগিতাও করতেন। আয়েশা রা. বলেন: "রসূলুল্লাহ সা. আমার সাথে প্রতিযোগিতা করলেন। আমি তাকে হারিয়ে দিলাম। কিছুদিন পর যখন আমার মাংসল দেহ আমাকে কষ্টে ফেলে দিলো, তখন তিনি আমার সাথে প্রতিযোগিতা করলে আমি হেরে গেলাম। তখন তিনি বললেন, এই হার আগের দিনের হারের বদলা।"-আহমদ, আবু দাউদ। আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন, রসূল সা. বলেছেন, আদম সন্তানের সকল খেলা অন্যায়, কেবল তিনটে খেলা ব্যতীত: ধনুক দিয়ে তীর ছোঁড়া, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং স্ত্রীর সাথে আমোদফূর্তি করা। এগুলো সবই ন্যায়সংগত।” স্ত্রীকে নিজের সমপর্যায়ে উন্নীত করা, তাকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা এমনকি কর্কশ কথা দিয়েও কষ্ট না দেয়া তাকে সম্মানিত করার নামান্তর। মুয়াবিয়া বিন হায়দা রা. বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে রসূলুল্লাহ আমাদের উপর আমাদের স্ত্রীদের অধিকার কী কী? তিনি বললেন, তুমি যখন খাও, তখন তাকে খাওয়াবে, তুমি যখন পোশাক পরবে, তখন তাকে পরাবে, তাকে কখনো মুখে মারবেনা, ভর্ৎসনা করবেনা এবং ঘরের ভেতরে ব্যতিত তার সঙ্গ পরিহার করবেনা।" মনে রাখতে হবে, নারীর ভেতরে পূর্ণতা কল্পনা করা যায়না। সে যেমন আছে, তেমনভাবেই তাকে গ্রহণ করতে হবে। রাসূল সা. বলেন: "নারীদের প্রতি সদিচ্ছা পোষণ করো। কেননা নারীকে পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পাঁজরের হাড়ের উপরের অংশ সবচেয়ে বেশি বাঁকা। তুমি যদি তাকে সোজা করতে যাও, তবে ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি যেমন আছে তেমন রেখে দাও, তবে তা চিরদিনই বাঁকা থাকবে।" -বুখারি, মুসলিম। এ হাদিসে এই মর্মে ইঙ্গিত রয়েছে যে, নারী মাত্রেরই স্বভাব চরিত্রে জন্মগত বক্রতা রয়েছে। তাকে সংশোধন করা অসম্ভব। ধনুক আকৃতি বিশিষ্ট পাঁজরের বাঁকা হাড়ের ন্যায় তার স্বভাব বাঁকা। তাকে সোজা করা সম্ভব নয়। এতদসত্ত্বেও নারীর মধ্যে যা কিছু দোষগুণ আছে তা সহকারেই তার সাথে সহাবস্থান করা এবং তার সাথে যতো ভালো সম্ভব, ততো ভালো ব্যবহার করা অপরিহার্য। তাই বলে তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া ও সঠিক পথে পরিচালিত করা যাবেনা তা নয়। যখন সে কোনো ব্যাপারে বেঁকে বসবে, তখন তাকে বিচক্ষণতার সাথে ও সুকৌশলে সঠিক পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করতে হবে। কখনো কখনো স্বামী তার স্ত্রীর উত্তম বৈশিষ্ট্য ও মন্দগুণাবলীর প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেনা। পরন্তু তার স্বভাবের কেবল অপছন্দনীয় বৈশিষ্ট্যগুলোই স্বামীর চোখে বড় হয়ে ধরা দেয়। এজন্য ইসলাম নারীর দোষ ও গুণের তুলনামূলক বিচার বিবেচনা করার উপদেশ দেয়। কেননা তার ভেতরে যদি কিছু অপছন্দনীয় জিনিস সে দেখতে পেয়ে থাকে, তবে অবশ্যই কিছু পছন্দনীয় জিনিসও দেখতে পাবে। রসূলুল্লাহ সা. বলেন, "কোনো মুমিন পুরুষের পক্ষে কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা করা বাঞ্ছনীয় নয়। যদি তার কোনো স্বভাব তার নিকট অপছন্দনীয় হয় তবে তার অন্য একটি স্বভাব তার কাছে পছন্দনীয় হবে।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 স্ত্রীর রক্ষণাবেক্ষণ

📄 স্ত্রীর রক্ষণাবেক্ষণ


স্ত্রীকে এমন প্রত্যেক জিনিস থেকে হেফাযত করা স্বামীর কর্তব্য, যা তার মান, সম্ভ্রম ও সুখ্যাতির উপর কালিমা লেপন করে। এ হচ্ছে আত্মশ্রদ্ধা ও আত্মসম্ভ্রমবোধ, যা আল্লাহর নিকট অত্যধিক প্রিয়। বুখারি বর্ণনা করেন:
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আল্লাহ আত্মসম্ভ্রমী, মুমিনও আত্মসম্ভ্রমী। আল্লাহর আত্মসম্ভ্রমবোধ হলো, বান্দাকে যা করতে নিষেধ করা হয়েছে তা যেন না করে।" ইবনে মাসউদ রা. বর্ণনা করেন, রসূল সা. বলেছেন, আল্লাহর চেয়ে অভিমানী আর কেউ নেই। তিনি অভিমানী বলেই প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীল ও লজ্জাজনক কাজকে নিষিদ্ধ করেছেন। আল্লাহর চেয়ে বেশি নিজের প্রশংসা পছন্দকারী কেউ নেই। তাই তিনি নিজের প্রশংসা নিজেই করেছেন। আর আল্লাহর চেয়ে বেশি ওজর পছন্দকারী কেউ নেই। এজন্যই তিনি মানুষের সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে নবী ও রসূল পাঠিয়েছেন (যাতে মানুষ এই ওজর বাহানা না দিতে পারে যে, আখেরাতের কথা তার জানা ছিলনা)। সাদ বিন উবাদা রা. বললেন, আমি যদি কোনো পুরুষকে আমার স্ত্রীর সাথে দেখি, তাহলে তাকে তৎক্ষণাত তরবারী দিয়ে আঘাত করবো। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তোমরা সাদের আত্মাভিমান দেখে অবাক হচ্ছো? আমি ওর চেয়েও বেশি আত্মাভিমানী। আর আল্লাহ আমার চেয়েও আত্মাভিমানী। আল্লাহ তার আত্মাভিমানের কারণেই গোপন ও প্রকাশ্য অশ্লীলতাকে নিষিদ্ধ করেছেন।" ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, রসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তি বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না: পিতামাতার অবাধ্য সন্তান, দায়ুস ও পুরুষ বেশধারী নারী। -নাসায়ী, বাযযার, হাকেম। আম্মার বিন ইয়াসার থেকে বর্ণিত; রসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তি কখনো বেহেশতে যেতে পারবে না: দাইয়ুস, পুরুষ সদৃশ নারী ও মদখোর। লোকেরা বললো: হে রসূলুল্লাহ, মদখোরকে তো চিনি। দাইয়ুস কে? রসূল সা. বললেন, যে ব্যক্তি তার পরিবার পরিজনের কাছে কে আসা যাওয়া করে, তার খোঁজ খবর রাখেনা। আমরা বললাম, পুরুষ সদৃশ নারী কে? তিনি বললেন, যে নারী পুরুষের মতো বেশভূষা অবলম্বন করে। -তাবরানি।
ইমাম মুনযিরি বলেছেন, উপরোক্ত হাদিসের সনদে বিতর্কিত কোনো বর্ণনাকারী নেই। তবে মনে রাখতে হবে, স্বামীর যেমন স্ত্রীর প্রতি কঠোর আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন থাকা উচিত, তেমনি এই আত্মমর্যাদাবোধে তার মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়াও কর্তব্য। কাজেই তার বিরুদ্ধে খারাপ ধারণা পোষণে, তার প্রতিটি চলন বলন পর্যবেক্ষণ ও তদারকীতে এবং তার সকল দোষত্রুটি গণনায় বাড়াবাড়ি করা অনুচিত। কেননা এতে দাম্পত্য সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আল্লাহ যেসব বন্ধনকে জুড়ে দেয়ার আদেশ দিয়েছেন, তা ছিন্ন হয়। জাবের বিন আম্বরা থেকে আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে হাববান বর্ণনা করেন : রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, কিছু আত্মমর্যাদাবোধ এমন আছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন, আর কিছু আত্মমর্যাদাবোধ এমনও আছে যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। কিছু গর্ববোধ এমন আছে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন, আর কিছু গর্ববোধ এমন আছে যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। যে আত্মমর্যাদাবোধ আল্লাহ পছন্দ করেন তা হচ্ছে সন্দেহ হলে আত্মমর্যাদাবোধ। আর যে আত্মমর্যাদাবোধ আল্লাহ অপছন্দ করেন তা হলো যেখানে কোনো সন্দেহ নেই সেখানে আত্মমর্যাদাবোধ। আর যে গর্ববোধ আল্লাহ পছন্দ করেন, তা হলো, যুদ্ধে ও বিপদে নিজের সম্পর্কে গর্ববোধ। আর যে গর্ববোধ আল্লাহ অপছন্দ করেন, তা হলো অন্যায় ও অবৈধ কাজে গর্ববোধ।” আলী রা. বলেছেন, তোমার স্ত্রীর উপর অতিমাত্রায় আত্মমর্যাবোধসম্পন্ন হয়োনা। তাহলে তোমার কারণে তোমাদের উভয়ের মধ্যে পাল্টাপাল্টি খারাপ ধারণা পোষণ চলতে থাকবে।" বস্তুত খারাপ ধারণা পোষণ ও সন্দেহ প্রবণতা আল্লাহ অপছন্দ করেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 স্ত্রীর সাথে স্বামীর যৌন মিলন

📄 স্ত্রীর সাথে স্বামীর যৌন মিলন


ইবনে হাযম বলেছেন, প্রতি পবিত্রতার মেয়াদে (ঋতুস্রাব মুক্ত সময়ে) অন্তত একবার সহবাস করা সামর্থ্যবান স্বামীর উপর ফরয। অন্যথায় সে গুনাহগার ও আল্লাহর অবাধ্য গণ্য হবে। এর প্রমাণ হচ্ছে সূরা বাকারার ২২২ নং আয়াতের নিম্নোক্ত অংশ: فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللهُ . "অতপর যখন স্ত্রীরা পবিত্র হবে তখন তোমরা আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী তাদের নিকট যেও।" অধিকাংশ আলেম ইবনে হাযমের এই মত সমর্থন করেছেন যে, স্বামীর যদি কোনো ওযর না থাকে তবে এটা তার জন্য বাধ্যতামূলক। ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, এটা ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক নয়। কেননা ওটা তার অধিকার। তাই অন্যান্য অধিকারের মতোই বাধ্যতামূলক নয়। ইমাম আহমদ বলেছেন, চার মাসের মধ্যে একবার সহবাস করতে হবে। আর যখন স্ত্রীকে রেখে প্রবাসে যাবে, তখন যদি এমন কোনো ওযর না থাকে, যা তাকে দেশে প্রত্যাবর্তনে বাধা দেয়, তাহলে তার জন্য ইমাম আহমদ সর্বোচ্চ ছয় মাসের সময় বেঁধে দিয়েছেন। এর মধ্যে তাকে স্ত্রীর কাছে ফিরতে হবে। ইমাম আহমদকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, স্বামী কতো দিন স্ত্রীর কাছ থেকে অনুপস্থিত থাকতে পারে? তিনি বললেন, ছয় মাস। এরপর তাকে ফিরে আসতে বার্তা পাঠাতে হবে। যদি না আসে, তবে শাসক তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেবে। এর প্রমাণ এই যে, যায়দ ইবনে আসলাম বর্ণনা করেন, উমর ইবনুল খাত্তাব মদিনার ওলিগলিতে ঘুরে জনগণের অবস্থা পরিদর্শনের সময় শুনতে পেলেন, জনৈকা মহিলা নিম্নরূপ কবিতা আবৃতি করছে: "আহ, আজকের রাতটা কতো লম্বা ও কী অন্ধকার! অনেক দিন কেটে গেছে আমার বন্ধু নেই, যার সাথে আমোদ ফূর্তি করবো। আল্লাহর কসম, আমার যদি একমাত্র আল্লাহর ভয় না থাকতো, তাহলে এই খাটটির চারপাশ আন্দোলিত হতো। কেবল আমার প্রতিপালক ও লজ্জা আমাকে সংযত রাখছে। আর আমার স্বামীকে আমি ভক্তি করি। তাই কাউকে তার বিছানা মাড়াতে দেইনা।" উমর রা. উক্ত মহিলার পরিচয় অনুসন্ধান করলেন। তাকে বলা হলো, সে অমুক মহিলা। তার স্বামী বিদেশে আল্লাহর পথে জিহাদে নিয়োজিত। তারপর তার মেয়ে হাফসার নিকট গিয়ে বললেন, "হে মেয়ে, নারী, স্বামী ছাড়া কতোদিন ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারে?" হাফসা বললেন, সুবহানাল্লাহ, আপনার আমার নিকট এই প্রশ্ন করছেন? (অর্থাৎ পিতা হয়ে মেয়ের নিকট এ প্রশ্ন করা লজ্জাজনক ও বিব্রতকর) উমর রা. বললেন, আমি যদি মুসলমানদের কল্যাণ চিন্তা না করতাম তবে তোমাকে এ প্রশ্ন করতামনা। হাফসা বললেন, "পাঁচ থেকে ছয় মাস।” তখন উমর রা. জনগণের যুদ্ধ বিগ্রহে থাকার জন্য ছয় মাস সময় নির্ধারিত করে দিলেন। এক মাস কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য। এক মাস ফিরে আসার জন্য এবং চার মাস কর্মস্থলে অবস্থানের জন্য। শাফেয়ী মাযহাবের ইমাম গাযযালী বলেছেন, প্রত্যেক চারদিনের মধ্যে একবার স্ত্রী সহবাস করা সর্বাপেক্ষা সুবিচারসম্মত। কেননা স্ত্রী সর্বোচ্চ সংখ্যা চারজন। তাই চারদিন পর্যন্ত বিলম্ব করা বৈধ। তবে স্ত্রীর সতিত্ব রক্ষার প্রয়োজনের এই পরিমাণ কমানো বাড়ানো বাঞ্ছনীয়। কেননা তার সতিত্ব রক্ষা করা স্বামীর কর্তব্য। সংগমের দাবি জানানোর কোনো বাধ্যবাধকতার প্রমাণ নেই বটে। কেননা এ ধরনের দাবি তোলা ও তা পূরণ করা খুবই কঠিন।
মুহাম্মদ বিন মান গিফারী বলেন, জনৈকা মহিলা উমর রা.-এর নিকট এলো এবং বললো, হে আমীরুল মুমিনীন, আমার স্বামী দিনে রোযা রাখে এবং রাতে নামায পড়ে। (অর্থাৎ নফল নামায পড়ে ও রোযা রাখে) আমি তার আল্লাহর ইবাদতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা পছন্দ করি না। উমর রা. বললেন, তোমার স্বামী তো খুবই ভালো স্বামী। এরপরও মহিলা তার কথা পুনরাবৃত্তি করলো। আর উমর রা. তার জবাবের পুনরাবৃত্তি করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে কা'ব আসাদী উমর রা.কে বললো, হে আমীরুল মুমিনীন, এই মহিলা তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে যে, সে তার বিছানা থেকে মহিলাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। উমর রা. বললেন, তুমি যখন মহিলার কথা বুঝেছো, তখন বিবাদটা তুমিই মিটিয়ে দাও। কা'ব বললেন, আমার নিকট মহিলার স্বামীকে হাজির করতে হবে। তাকে হাজির করানো হলো। কা'ব তাকে বললেন, তোমার স্ত্রী তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করছে। স্বামী বললো, খাবারের ব্যাপারে নাকি? কা'ব বললেন, না। তখন মহিলা বললো, হে জ্ঞানী বিচারক, আমার বন্ধুকে তার মসজিদ আমার কাছ থেকে বেখবর করে দিয়েছে। তার ইবাদত তাকে আমার বিছানা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সুতরাং হে কা'ব, কোনো দ্বিধা সংকোচ না করে ফায়সালা করে দিন। তার রাত ও দিন তাকে ঘুমাতে দেয় না। বিশেষ করে মহিলাদের ব্যাপারে তার আচরণকে আমি প্রশংসা করতে পারছিনা।
তার স্বামী বললো: সূরা নাহল ও সাতটি দীর্ঘ সূরায় যা কিছু নাযিল হয়েছে তা এবং আল্লাহর কিতাবের সর্বত্র যে ভয়াবহ সতর্ক বাণী রয়েছে, সেইসব মিলে নারী ও তার ঘরের কথা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছে।
কা'ব বললেন: "হে পুরুষ, তোমার উপর তোমার স্ত্রীর হক রয়েছে। চার দিনে একদিন তার ন্যায্য হিস্সা। কাজেই এই হিস্সা তাকে দিয়ে দাও। টালবাহানা বর্জন করো। এরপর কা'ব আরো বললেন, আল্লাহ তোমার জন্য দুজন, তিনজন বা চারজন স্ত্রী গ্রহণ হালাল করেছেন। এরপর তোমার হাতে তিন দিন তিন রাত অবশিষ্ট থাকছে। সেই কদিন তুমি নফল ইবাদত যত ইচ্ছা করতে পারো। উমর রা. বললেন, হে কা'ব, আমি বুঝতে পারছিনা তোমার দুটি কাজের কোনটিতে আমি বেশি মুগ্ধ। এই দম্পতির সমস্যার উপলব্ধি, না তাদের বিপদের নিষ্পত্তি? যা হোক, তুমি যাও, তোমাকে বসরার কাযী নিয়োগ করলাম। হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়েছে, স্ত্রীর সাথে স্বামীর সহবাস একটি সদকা যার জন্য আল্লাহ সওয়াব দিয়ে থাকেন। মুসলিম বর্ণনা করেন, রসূল সা. বলেছেন, তোমার স্ত্রীর সাথে তোমার যৌন মিলনেও তোমার জন্য পুরস্কার রয়েছে। লোকেরা বললো, হে রসূলুল্লাহ, আমরা আমাদের কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করবো, তাতেও পুরস্কার? রসূল সা. বললেন, ভেবে দেখো তো, তোমরা যদি এ কাজটা হারাম উপায়ে করতে, তবে কি তাতে গুনাহ হতো না? তেমনি হালাল উপায়ে করার জন্য তোমরা পুরস্কৃত হবে।” স্ত্রী যাতে পূর্ণ তৃপ্তি লাভ করে সেজন্য আদর, সোহাগ, চুম্বন, আলিঙ্গন, ইত্যাদিতে সময় ক্ষেপণ করা মুস্তাহাব। আবু ইয়ালা আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণনা করেন: রসূল সা. বলেছেন, তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো তখন যথাযথভাবে তা করো। স্ত্রীর পূর্ণ তৃপ্তি লাভের আগে যখন পুরুষ তৃপ্তি লাভ করে, তখন পুরুষ যেন তাড়াহুড়ো করে উঠে না যায়, যতোক্ষণ না স্ত্রী পূর্ণ তৃপ্তি পায়।" ইতিপূর্বে রসূল সা.-এর এ উক্তিও উদ্ধৃত করা হয়েছে, "কুমারী মেয়ে কেন বিয়ে করলে না যে তোমার সাথে আমোদ ফুর্তি করতো এবং তুমিও তার সাথে আমোদ প্রমোদ করতে?"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 সহবাসের সময় পুরোপুরি নগ্ন না হওয়া চাই

📄 সহবাসের সময় পুরোপুরি নগ্ন না হওয়া চাই


ইসলাম সকল অবস্থায় সতর ঢেকে রাখার আদেশ দিয়েছে একমাত্র সেই অবস্থা ব্যতিত, যখন সতর খোলার প্রয়োজন হয়। বাহয বিন হাকিমের দাদা রাসূল সা.কে জিজ্ঞাসা করলেন, "হে রসূলুল্লাহ, আমাদের শরীরের গোপনীয় অংশের কতোটুকু ঢাকবো আর কতোটুকু খুলবো? তিনি বললেন, তোমার স্ত্রী বা বাদী ব্যতিত আর সবার দৃষ্টি থেকে শরীরের গোপন অংশ লুকিয়ে রাখো। পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হলো, হে রসূলুল্লাহ, যখন একজন আর একজনের সাথে সংগমরত হয় তখন? রসূল সা. বললেন, যদি গুপ্ত অংগ না দেখে পারা যায় তবে যেন না দেখে। আবার জিজ্ঞাসা করা হলো, যখন আমাদের কেউ একেবারেই নির্জন স্থানে অবস্থান করে? রসূল সা. বললেন, মানুষের চেয়ে আল্লাহ থেকে বেশি লজ্জা করা উচিত।” (তিরমিযি)
সহবাসের সময় সতর খোলা জায়েয। কিন্তু তা রসূল সা. বলেছেন, সহবাসের সময় স্বামী স্ত্রীর পুরোপুরি নগ্ন হওয়া উচিত নয়। উতবা বিন আবদ সুলাইমি থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমরা যখন স্ত্রীর সাথে সংগম করো তখন যথাসম্ভব সতর ঢাকো এবং গাধা গাধীর মতো উলংগ হয়ো না। (ইবনে মাজাহ)। ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, সাবধান, নগ্ন হয়োনা। কেননা তোমাদের সাথে এমন ফেরেশতা রয়েছেন, যারা কখনো তোমাদেরকে ছেড়ে যাননা একমাত্র পেশাব পায়খানা করার সময় ব্যতিত এবং স্ত্রী সংগমের সময় ব্যতিত। সুতরাং তোমরা তাদের থেকে লজ্জা করো এবং তাদেরকে সম্মান করো (তিরমিযি)। আয়েশা রা. বলেছেন, রসূল সা. কখনো আমার দেহের গুপ্তাংশ দেখেননি, আর আমিও তার দেহের গুপ্তাংশ দেখিনি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00