📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 ভরণপোষণ নির্ধারিত হবে মুখস্থ, না দ্রব্য সামগ্রীতে?

📄 ভরণপোষণ নির্ধারিত হবে মুখস্থ, না দ্রব্য সামগ্রীতে?


ভরণপোষণ হিসেবে খাদ্য ও পোশাক বরাদ্দ করার সময় নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের খাদ্য সামগ্রী ও পোশাক সামগ্রী চিহ্নিত করাও বৈধ, আবার মুদ্রা আকারেও তা বরাদ্দ করা বৈধ, যাতে স্ত্রী তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনে নিতে পারে। এটা বাৎসরিক, মাসিক, সাপ্তাহিক বা দৈনিক যে হারে দেয়া স্বামীর জন্য সহজ হবে, সে হারেই বরাদ্দ করা যাবে। বর্তমানে আদালতে যেটি প্রচলিত তা হলো স্ত্রীর খাদ্যের বাবদে মাসিক হারে এবং পোশাকের বাবদ ষান্মাসিক হারে মুদ্রা প্রদান। কেননা গ্রীষ্মকালে এক সেট ও শীতকালে এক সেট পোশাক তার প্রয়োজন। কোনো কোনো বিচারক তিন ধরনের ভরণপোষণের বাবদে মাসিক টাকা ধার্য করে থাকেন। এক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য হলো, ঐ টাকা যেন স্ত্রীর খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায় এবং তা স্বামীর সচ্ছল বা অসচ্ছল অবস্থার সমানুপাতিক হয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 স্বামীর আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন বা বাজারদরের পরিবর্তন

📄 স্বামীর আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন বা বাজারদরের পরিবর্তন


যে সময়ে ভরণপোষণ ধার্য করা হয় সে সময়কার বাজারদর যদি পরবর্তী সময়ে পাল্টে যায়, অথবা স্বামীর আর্থিক অবস্থা পাল্টে যায়, তাহলে প্রথমে দেখতে হবে এই বাজার দরে কি ধরনের পরিবর্তন এসেছে? হ্রাস পেয়েছে, না বৃদ্ধি পেয়েছে? আর স্বামীর আর্থিক অবস্থা পাল্টে গিয়ে খারাপ হয়েছে, না ভালো হয়েছে? পরিবর্তিত এই অবস্থাগুলোর প্রত্যেকটি বিবেচনা করা জরুরি। বাজার দর যদি বরাদ্দ করার সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পায়, তাহলে স্ত্রী তার ভরণপোষণের পরিমাণ বৃদ্ধির দাবি করতে পারবে। আর যদি দাম কমে যায়, তাহলে স্বামী ভরণপোষণের পরিমাণ কমানোর দাবি জানাতে পারবে। ভরণপোষণ পরিমাণ ধার্য করার পর যদি জানা যায় যে, ধার্যকৃত পরিমাণ ভুল ছিলো এবং স্বামীর অবস্থা খারাপ কিংবা ভালো যাই হোক, সে অনুপাতে স্ত্রীর জন্য তা যথেষ্ট ছিলনা, তাহলে স্ত্রী ঐ ভরণপোষণের পরিমাণ পুনর্নির্ধারণের দাবি জানাতে পারবে। তখন বিচারকের কর্তব্য হবে স্বামীর অবস্থা অনুযায়ী স্ত্রীর খাদ্য ও বস্ত্রের জন্য যথেষ্ট হয় এমন ভরণপোষণ নির্ধারণ করে দেয়া।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 ভরণপোষণের দায় একটা বৈধ ঋণ এবং তার জন্য স্বামী দায়ী

📄 ভরণপোষণের দায় একটা বৈধ ঋণ এবং তার জন্য স্বামী দায়ী


যেহেতু পূর্বে বর্ণিত শর্তাবলী সাপেক্ষে স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর উপর ওয়াজিব এবং নির্দিষ্ট কারণসমূহ ও শর্তাবলীর উপস্থিতিতে স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর উপর ওয়াজিব হওয়ার পর স্বামী যদি তা না দেয়, তবে সেটি তার ঋণ গণ্য হবে। অন্যান্য ঋণের মতোই এ ঋণ হয় পরিশোধ করতে হবে, নয়তো স্ত্রীর পক্ষ থেকে দায়মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এ ঋণ থেকে সে মুক্ত হবেনা। এটাই শাফেয়ী মাযহাবের মত। মিশরে ১৯২০ সালের ১৫ নং আইন জারি হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি সেটাই অনুসৃত হয়ে আসছে। ঐ আইনে বলা হয়েছে:
ধারা ১: কোনো স্ত্রী তার স্বামীর নিকট নিজেকে সঁপে দেয়ার পর তার ভরণপোষণের ব্যয় স্বামীর ঋণ গণ্য হবে। স্বামীর উপর এই ভরণপোষণের দায় অর্পিত হওয়া সত্ত্বেও সে তা দেয়া থেকে বিরত হওয়ার সময় থেকেই এটা ঋণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ঋণ কোনো আদালতের রায় কিংবা দু'পক্ষের সম্মতির উপর নির্ভরশীল থাকবেনা। এ ঋণ যতক্ষণ পরিশোধ না করা হবে কিংবা স্ত্রী স্বামীকে দায়মুক্ত না করবে, ততোক্ষণ বহাল থাকবে।
ধারা ২: যে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী ভরণপোষণের হকদার, তার ভরণপোষণও ঋণরূপে গণ্য হবে এবং তা তালাক প্রদানের তারিখ থেকেই, ঠিক যেরূপ পূর্বোক্ত ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে। যে কর্তৃপক্ষ থেকে উল্লিখিত আইন জারি হয়েছে, সেখান থেকে (অর্থাৎ আইন মন্ত্রণালয় থেকে একই সাথে আরো কিছু বিধি জারি হয়েছে। সেগুলো নিম্নরূপ:
১. স্ত্রী বা তালাকপ্রাপ্তরা খোরপোষ স্বামীর নিকট ঋণ হিসেবে প্রাপ্য গণ্য হওয়ার জন্য আদালতের ফায়সালা বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের শর্ত নয়। বরং যে মুহূর্তে তা স্বামীর নিকট প্রাপ্য হবে এবং স্বামী তা দেয়া থেকে বিরত থাকবে, সেই মুহূর্ত থেকেই তা ঋণ হিসেবে গণ্য হবে।
২. খোরপোষের ঋণ সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ ঋণ এবং তা পরিশোধ করা অথবা দায়মুক্ত করা ছাড়া রোহিত হয়না।
এই দুটি বিধি থেকে নিম্নোক্ত উপবিধিগুলো গঠিত হয়:
১. স্ত্রী বা তালাকপ্রাপ্তা আদালতে স্বামীর কাছ থেকে নিজের ভরণপোষণ আদায়ের আবেদন জানাতে পারবে এবং আবেদন জানানোর পূর্ব থেকেই তা আমলে আসবে, চাই তা এক মাসের চেয়ে বেশি হোক না কেন। স্ত্রী যদি জানায় যে, তার স্বামী তাকে ভরণপোষণ ছাড়াই ফেলে রেখেছে, অথচ এই সময়ে তার উপর তার ভরণপোষণ দেয়ার দায়িত্ব ছিলো, তাহলে সময়টা লম্বা হোক বা খাট হোক, তার দাবি গোটা সময়ের জন্য প্রযোজ্য হবে। স্ত্রী বা তালাকপ্রাপ্তার এ দাবি যখন যে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত হবে, এমনকি তা যদি ১৭৮ ধারায় বিধিবদ্ধ তদন্ত সাপেক্ষের দ্বারাও প্রমাণিত হয়, তবে সে যা চেয়েছে, তা দেয়ার আদেশ দেয়া হবে।
২. ভরণপোষণের ঋণ স্বামী স্ত্রীর যে কোনো একজন মারা গেলেও রহিত হয়না। তালাক দ্বারাও রহিত হয়না, চাই তা খুলা তালাকই হোক না কেন। তালাক যে ধরনেরই পেয়ে থাকুক না কেন, প্রাপ্য ভরণপোষণের যেটুকু দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় অনাদায়ী রয়েছে তালাকপ্রাপ্তা তা পাওয়ার হকদার, যতোক্ষণ না সেই ভরণপোষণ তালাক বা খুলার বিনিময়ে পরিণত না হয়।
৩. স্বামীর প্রতি স্ত্রীর সাময়িক অবাধ্যতা অনাদায়ী ভরণপোষণকে রহিত করেনা। স্থায়ী অবাধ্যতাই কেবল ভরণপোষণের দায় থেকে ততোক্ষণ স্বামীকে অব্যাহতি দেয়া, যতক্ষণ সে অবাধ্য থাকে, চাই তা স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন চলাকালে হোক, কিংবা ইদ্দতদালে হোক। এই আইন জারি হওয়ার পর কোনো কোনো স্ত্রী এর সুযোগ গ্রহণ করে ভরণপোষণ দাবি করা থেকে বিরত থাকে, যাতে তা থেকে সময়ের ব্যবধানে একটা মোটা দাগের অর্থ সঞ্চিত হয়। অতপর সেই অনাদায়ী ভরণপোষণের সম্পূর্ণটাই স্বামীর কাছ থেকে এক সাথে দাবি করে। এতে স্বামী কঠিন চাপের শিকার হয় এবং তার ঘাড়ে বড় রকমের বোঝা চাপে। এ কারণে স্বামীদের সমস্যা লাঘবের জন্য উপায় খোঁজা হয়। অবশেষে ১৯৩১ সালের ৭৮ নং আইনের ৯৯ ধারার ৬ নং অনুচ্ছেদে শরীয়া আদালতসমূহের ধারাবাহিক বিধিমালা জারি হয়। তাতে বলা হয় : "দাবি পেশের তারিখ থেকে তিন বছরের চেয়ে আগের কোনো দাবি গৃহীত হবেনা।" এই আইনের অধিকতর ব্যাখ্যা সম্বলিত স্মারকে এই অনুচ্ছেদ সম্পর্কে বলা হয়েছে : "অতীত সময়ের বাবদে যে ভরণপোষণ পাওনা রয়েছে। সে ব্যাপারে বিচার বিভাগীয় বিশেষ ক্ষমতা বিধির অধীন এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, খৃস্টীয় তিন বছরের চেয়ে বেশি সময়ের ভরণপোষণের দাবি বিবেচিত হবে না এবং তার সর্বশেষ সময় হচ্ছে দাবি নিবন্ধিত হওয়ার তারিখ। যেহেতু উপস্থাপনের পূর্ববর্তী একটা নির্দিষ্ট সময় বাবদ পাওনা অনাদায়ী ভরণপোষণের দাবি জানানোর শর্তহীন ও অবাধ অনুমতি থাকার কারণে এক সাথে কয়েক বছরের ভরণপোষণের দাবি জানানোর মাধ্যমে দায়ী স্বামীর উপর অতিমাত্রায় বোঝা চাপানোর আশংকা সৃষ্টি হয়, সেহেতু ভরণপোষণের হকদারকে এক এক বছর করে এমনভাবে ভরণপোষণের দাবি জানাতে বাধ্য করা ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন মনে করা হয়, যাতে তিন বছরের চেয়ে বেশি বিলম্বিত না হয়। এর অন্যথা হলে দাবি বিবেচনা করতে অস্বীকার করা হবে মর্মে বিধি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দাবিদারকে পর্যায়ক্রমে এক এক বছরের দাবি জানাতে বাধ্য করা হয়। এতে ভরণপোষণের হকদারের কোনো ক্ষতিও নেই। কেননা তিন বছর অতিবাহিত হবার আগেই সে তার পাওনার দাবি পেশ করার সুযোগ পাচ্ছে। এ আইনের প্রয়োগ এখনো পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ 📄 ভরণপোষণের ঋণ থেকে অব্যাহতি ও তা কেটে নেয়ার নিয়ম

📄 ভরণপোষণের ঋণ থেকে অব্যাহতি ও তা কেটে নেয়ার নিয়ম


যেহেতু স্ত্রীর প্রাপ্য ভরণপোষণ বা খোরপোষ স্বামীর নিকট স্ত্রীর প্রাপ্য ঋণ হিসেবে বিবেচিত এবং যে মুহূর্ত থেকে স্বামী তা দেয়া থেকে বিরত রয়েছে সেই সময় থেকেই এটা ঋণের দায় হিসেবে তার উপর বহাল রয়েছে, সেহেতু স্ত্রী ইচ্ছা করলে স্বামীকে এই ঋণ থেকে পুরোপুরি বা আংশিক অব্যাহতি বা দায়মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতে তার যে ভরণপোষণ পাওনা হবে তা থেকে আগাম দায়মুক্তি ঘোষণা করলে, সে ঘোষণা শুদ্ধ ও বৈধ হবেনা। কেননা তা এখনো ঋণে পরিণত হয়নি। আর দায়মুক্তি কেবল সেই ঋণ থেকেই দেয়া যায়, যা কার্যত ঋণে পরিণত ও ঋণ হিসেবে প্রাপ্য হয়েছে। তবে যদি ভরণপোষণ মাসিক বা অনুরূপ কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ বাবদ দেয়া স্থির হয়ে থাকে, তাহলে আগামী এক মাস বা এক বছরের জন্য আগাম দায়মুক্তি দেয়া যাবে।
আর যখন ভরণপোষণ বৈধ ঋণ হিসেবে গণ্য হয়, যা পরিশোধ করা বা ছেড়ে দেয়া ব্যতিত রহিত হয়না। অথচ একই সময়ে স্ত্রীর নিকট স্বামীর প্রাপ্য কোনো ঋণ থাকে এবং দুজনের যে কোনো একজন উভয় ঋণের কাটাকাটি করার দাবি জানায়, তখন এ দাবি মেনে নিয়ে উভয় ঋণকে সমপর্যায়ে আনা হবে। কাটাকাটির বিষয়ে হাম্বলীদের একটা ভিন্ন মত রয়েছে। তারা স্ত্রীর সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতায় পার্থক্য করে। স্ত্রী যদি সচ্ছল হয়, তবে স্বামী তার প্রাপ্য ভরণপোষণের বিনিময়ে নিজের পাওনা ঋণ তার কাছ থেকে আদায় করতে পারে। কেননা যার কাছে কারো কোনো হক পাওনা থাকে, সে তার যে কোনো সম্পদ থেকে সেই পাওনা পরিশোধ করতে পারে। এখানে স্ত্রীর কাছে তার পাওনা ঋণের অর্থও তার সম্পদ। আর যদি স্ত্রী অসচ্ছল হয়, তবে স্বামী তার ভরণপোষণের বিনিময়ে তার কাছ থেকে নিজের প্রাপ্য ঋণ আদায় করতে পারবেনা। কেননা ঋণ পরিশোধ শুধু জীবন বাঁচানোর জন্য যা অত্যাবশ্যকীয়, তার অতিরিক্ত সম্পদ থেকেই করা ওয়াজিব। স্বামীর যে ঋণ তার কাছে প্রাপ্য, তা তার অত্যাবশ্যকীয় সম্পদের অতিরিক্ত নয়। তাছাড়া আল্লাহ তো অসচ্ছল ব্যক্তিকে অবকাশ দানের আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন: وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةِ . "যদি সে অসচ্ছল হয়, তাহলে তার সচ্ছল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা বাঞ্ছনীয়।” (সূরা আল বাকারা: আয়াত ২৮০)

ফন্ট সাইজ
15px
17px