📄 ভরণপোষণ পরিমাণ নির্ণয়ে হানাফিদের অভিমত
হানাফিদের মত হলো, ভরণপোষণের পরিমাণ শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত হয়নি। স্বামীর উপর স্ত্রীকে ততোটুকুই ভরণপোষণ করার দায়িত্ব অর্পিত, যতোটুকু তার জন্য যথেষ্ট ও অপরিহার্য, যথা খাদ্য, ফলমূল, তেল, এবং স্বীকৃতরীতি মোতাবেক অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় জীবনোপকরণ, যা স্থান কাল ও অবস্থাভেদে ভিন্ন ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। শীত ও গ্রীষ্মের উপযুক্ত পোশাকাদিও এর আওতাভুক্ত। হানাফিদের মতে, স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর কর্তব্য, চাই স্ত্রীর আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক না কেন। স্বামী ধনী হলে তার ধনসম্পদের অনুপাতে আর দরিদ্র হলে তার দারিদ্র্যের অনুপাতে ভরণপোষণ নির্ধারিত হবে। কারণ আল্লাহ বলেন:
لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةِ مِنْ سَعَتِهِ، وَمَنْ قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَلْيُنْفِقْ مِمَّا أَتَاهُ اللَّهُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا أَتَاهَا، سَيَجْعَلُ اللهُ بَعْدَ عُسْرِيسرًا .
“সম্পাদশালী ব্যক্তি তার সম্পদ অনুপাতে ব্যয় করবে, আর সীমিত সম্পদের অধিকারী ব্যক্তি তাকে আল্লাহ যা দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন, তদপেক্ষা বেশি বোঝা কারো উপর অর্পণ করেননা। কষ্টের পর আল্লাহ অবশ্যই স্বস্তি দিবেন।” (সূরা তালাক: আয়াত ৭)
আল্লাহ আরো বলেন: "তোমরা যেখানে বাস করো, তাদেরকেও সেখানে বাস করাও তোমাদের সাধ্য ও সামর্থ্য অনুপাতে।" (সূরা তালাক : আয়াত ৬)
📄 ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ণয়ে শাফেয়ীদের মত
শাফেয়ীগণ শুধু ন্যূনতম ও অত্যাবশ্যকীয় জীবনোপকরণের উপরই ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ ছেড়ে দেননি; বরং তারা বলেছেন: এটা কেবল শরিয়ত দ্বারা নির্ধারিত। তারা হানাফিদের সাথে শুধু এই বিষয়ে একমত যে, দারিদ্র্য বা বিত্তশালিতায় স্বামীর অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। বিত্তশালী স্বামীর সংজ্ঞা এই যে, সে নিজের সম্পত্তি ও উপার্জন থেকে ভরণপোষণ চালাতে সক্ষম। আর বিত্তশালী স্বামীর দায়িত্ব হলো, প্রতিদিন দুই 'মুদ' পরিমাণ খাদ্যোপকরণ দেবে। আর দরিদ্র স্বামীর সংজ্ঞা হলো, সে নিজের সম্পত্তি দ্বারাও ভরণপোষণ চালাতে পারেনা, উপার্জন দ্বারাও নয়। তার দায়িত্ব প্রতিদিন এক মুদ খাদ্য ভরণপোষণ হিসেবে দেয়া, আর মধ্যম ব্যক্তির দায়িত্ব হলো, প্রতিদিন দেড় মুদ পরিমাণ কার্যোপকরণ প্রদান। কেননা আল্লাহ বলেন: "সম্পদশালী ব্যক্তি তার সম্পদ অনুযায়ী ব্যয় করবে। আর যার সম্পদ সীমিত, সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় করে।" দেখা যাচ্ছে আল্লাহ এখানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য করেছেন এবং প্রত্যেকের উপর তার সামর্থ্য অনুযায়ী খোরপোষ ধার্য করেছেন। পরিমাণ স্পষ্ট করেননি। তাই ইজতিহাদ দ্বারা পরিমাণ নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। যে জিনিসটির সাথে ভরণপোষণের সাদৃশ্য সবচেয়ে বেশি তা হলো কাফফারার জন্য দেয় খাবার। কেননা এটা ক্ষুধা নিবারণের জন্য শরিয়ত নির্ধারিত খাদ্য। কাফফারা দরিদ্রদেরকে সর্বোচ্চ দুই মুদ খাদ্যদ্রব্য ফিদিয়া স্বরূপ দিতে হয়। আর সর্বনিম্ন ফিদিয়া এক মুদ এবং এটা দিতে হয় রমযানে দিনের বেলা স্ত্রী সহবাসের কাফফারা স্বরূপ।
সে যদি মধ্যম মানের বিত্তশালী হয়, তাহলে তাকে দিতে হবে দেড় মুদ। কেননা সে বিত্তশালীর চেয়ে নিম্নমানের এবং দরিদ্রের চেয়ে উচ্চমানের। তাই তাকে দেড় মুদ দিতে বলা হয়েছে। স্ত্রীদের জন্য যদি প্রয়োজন পূরণের দুয়ার খুলে দেয়া হয়, তাহলে বিতর্ক সৃষ্টি হবে এবং তার কোনো সীমাপরিসীমা থাকবেনা। তাই মারুফ অর্থাৎ প্রচলিত ও স্বীকৃত রীতি অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। খাবারে ঝোল, গোশত ও ফলমূলের ন্যায় অতি প্রয়োজনীয় জিনিস এর বাইরে। শাফেয়ী ফকিহগণ বলেছেন: "স্ত্রীকে পোশাক দেয়ার সময় স্বামী ধনী না দরিদ্র, সেটা বিবেচনা করা জরুরি। ধনী ব্যক্তির স্ত্রী শহরে লোকেরা যে উঁচুমানের পোশাক পরে থাকে, সেই পোশাকের হকদার। আর দরিদ্র্য লোকের স্ত্রী পাবে মোটা সুতী কাপড়। আর মধ্যবিত্তের স্ত্রী পাবে এর মধ্যবর্তী মানের পোশাক। আর তাকে বাসস্থানও দিতে হবে স্বামী ধনী বা দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কিনা সেই অনুসারে। আর তার অবস্থা অনুযায়ী ঘরের আসবাবপত্রও হওয়া চাই। স্বামী যদি দরিদ্র হয়, তবে স্ত্রীকে প্রচলিত ও স্বীকৃত রীতি অনুযায়ী ন্যূনতম যে খাদ্য ও ঝোল তার জন্য যথেষ্ট তা দিতে হবে। আর গরম ও শীতে ন্যূনতম যে মানের পোশাক যথেষ্ট তা দিতে হবে। আর স্বামী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হলে তার ভরণপোষণ দারিদ্রের চেয়ে কিছুটা উঁচুমানের হওয়া চাই আর তা হতে হবে স্বীকৃত প্রচলিত রীতি অনুযায়ী। খোরপোশ প্রচলিত ও স্বীকৃত অনুযায়ী হতে হবে এজন্য যে, স্ত্রীকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। ক্ষতি থেকে রক্ষা করা মধ্যম পর্যায়ের খোরপোষ দেয়া দ্বারাই সম্ভব। আর এটাই বুঝানো হয়েছে 'মারূফ' তথা স্বীকৃত ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী দ্বারা।
📄 ভরণপোষণ নির্ধারিত হবে মুখস্থ, না দ্রব্য সামগ্রীতে?
ভরণপোষণ হিসেবে খাদ্য ও পোশাক বরাদ্দ করার সময় নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের খাদ্য সামগ্রী ও পোশাক সামগ্রী চিহ্নিত করাও বৈধ, আবার মুদ্রা আকারেও তা বরাদ্দ করা বৈধ, যাতে স্ত্রী তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনে নিতে পারে। এটা বাৎসরিক, মাসিক, সাপ্তাহিক বা দৈনিক যে হারে দেয়া স্বামীর জন্য সহজ হবে, সে হারেই বরাদ্দ করা যাবে। বর্তমানে আদালতে যেটি প্রচলিত তা হলো স্ত্রীর খাদ্যের বাবদে মাসিক হারে এবং পোশাকের বাবদ ষান্মাসিক হারে মুদ্রা প্রদান। কেননা গ্রীষ্মকালে এক সেট ও শীতকালে এক সেট পোশাক তার প্রয়োজন। কোনো কোনো বিচারক তিন ধরনের ভরণপোষণের বাবদে মাসিক টাকা ধার্য করে থাকেন। এক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য হলো, ঐ টাকা যেন স্ত্রীর খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায় এবং তা স্বামীর সচ্ছল বা অসচ্ছল অবস্থার সমানুপাতিক হয়।
📄 স্বামীর আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন বা বাজারদরের পরিবর্তন
যে সময়ে ভরণপোষণ ধার্য করা হয় সে সময়কার বাজারদর যদি পরবর্তী সময়ে পাল্টে যায়, অথবা স্বামীর আর্থিক অবস্থা পাল্টে যায়, তাহলে প্রথমে দেখতে হবে এই বাজার দরে কি ধরনের পরিবর্তন এসেছে? হ্রাস পেয়েছে, না বৃদ্ধি পেয়েছে? আর স্বামীর আর্থিক অবস্থা পাল্টে গিয়ে খারাপ হয়েছে, না ভালো হয়েছে? পরিবর্তিত এই অবস্থাগুলোর প্রত্যেকটি বিবেচনা করা জরুরি। বাজার দর যদি বরাদ্দ করার সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পায়, তাহলে স্ত্রী তার ভরণপোষণের পরিমাণ বৃদ্ধির দাবি করতে পারবে। আর যদি দাম কমে যায়, তাহলে স্বামী ভরণপোষণের পরিমাণ কমানোর দাবি জানাতে পারবে। ভরণপোষণ পরিমাণ ধার্য করার পর যদি জানা যায় যে, ধার্যকৃত পরিমাণ ভুল ছিলো এবং স্বামীর অবস্থা খারাপ কিংবা ভালো যাই হোক, সে অনুপাতে স্ত্রীর জন্য তা যথেষ্ট ছিলনা, তাহলে স্ত্রী ঐ ভরণপোষণের পরিমাণ পুনর্নির্ধারণের দাবি জানাতে পারবে। তখন বিচারকের কর্তব্য হবে স্বামীর অবস্থা অনুযায়ী স্ত্রীর খাদ্য ও বস্ত্রের জন্য যথেষ্ট হয় এমন ভরণপোষণ নির্ধারণ করে দেয়া।